কাজী নজরুল : পাশে আছেন

মুসা আল হাফিজ

তিনি শুধু বর্তমানের কবি ছিলেন না। যুক্ত ছিলেন অতীতের সমৃদ্ধ শেকড়ে। কিন্তু ওয়ালটার স্কটের (১৭৭১-১৮৩২) মতো মুখ ডুবিয়ে রাখেননি অতীতের মধুপাত্রে। ভবিষ্যতেরও ভাষ্যকার ছিলেন তিনি। কিন্তু অনাগত সময়ের কল্পনায় তিনি মজে থাকেননি কবি পার্সি বি শেলির (১৭৯২-১৮২২খ্রি.) মতো। মানুষের পর্ণকুঠির থেকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবের বীজকণা। ‘রাজপ্রসাদের খাসমহলের’ অন্তঃপুরের কার্ণিশে কার্ণিশে তা অনুরণন তুললো, কার্ণিশের পলেস্তরা খসানোর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সে থামলো না। ঔপনিবেশিক- স্বাধীনতাহরণকারী শক্তির কুৎসিত মারণাস্ত্রকে গুড়িয়ে না দেয়া পর্যন্ত তার বিদ্রোহের আগুন থামবার ছিলো না। মানুষের আত্মশক্তির জাগরণ কামনা করে এবং মানবাধিকার হরণকারী শক্তির বিনাশ কামনা করে আকাশকাঁপানো নিনাদে তিনি কাব্য করেছেন। স্বর্গের অনুসন্ধান তিনি করেন ধুলিমলিন জীবনের ক্যানভাসে। জন মিল্টনের (১৭৯৫-১৮২১) মতো স্বর্গের তালাশে তিনি মাটির জগত থেকে উড়াল দেননি অন্যত্র।

চারণিকের চারণবেশে বাংলাজনপদ, লোকপদ থেকে বিশ্বজনপদে ঘুরে বেড়িয়েছেন মাঙ্গলিক আত্মার গান গেয়ে গেয়ে। তার সেই গান যতটা ছিলো সাময়িক, তারচে’ বেশি ছিলো সময়োত্তর। অতিপ্রাকৃত বিষয়কে প্রাকৃতিক স্বাভাবিকতায় তিনি হাতের মুঠোয় অনতে চান। কিন্তু এ পথে সামুয়েল টেইলর কোলরিজের (১৭৭২-১৮৩৪) মতো তিনি অস্পষ্ট নন। সরাসরিই ঘোষণা করেন, ‘বিশ্বটাকে দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’ তার হাতে অতিসাধারণ বিষয় লাভ করে অসামান্য গৌরব, যেমনটি ঘটে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের (১৭৭০-১৮৫০) কবিতায়। কিন্তু তার মতো তিনি প্রকৃতিকে পূজা করতে মগ্ন নন। তার সবকিছুর কেন্দ্রে মানুষ। মানুষের জন্যই তার প্রেম ও বিদ্রোহ। তিনি বিদ্রোহী, সকল যুগের, সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সকল কালের, সকল অসাম্যের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহেও তিনি ছিলেন তার মতো। তারই কালের রাজনীতিমুখর লড়াকু কবি পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩) কিংবা গীতিময়, প্রাণোচ্ছল, ঐতিহ্যলগ্ন কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা (১৮৯৮-১৯৩৬) তাঁর অনেক কাছাকাছি হয়েও তার থেকে যথেষ্ট আলাদা। কাব্যে পৃথিবীর আর কোথাও তার কোনো প্রতিতুলনা কিংবা প্রতিসাম্য নেই। শাশ্বতকালের মানব অস্তিত্ব সন্ধানী তিনি সেই কবি, যিনি ধ্বংস ও সৃষ্টির সমন্বয়ে স্বীয় সত্তার উন্মোচন করেছেন।

কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) কথাই বলছি। নিরন্দ্র অন্ধকারে উপমহাদেশের তেত্রিশ কোটি মানুষের জীবন যাপনকে মাথায় নিয়ে স্বাধীনতার বন্দরের দিকে তিনি যাত্রা করলেন চড়াই-উৎরাই আর বজ্রপাত ঠেলে ঠেলে। পরাধীন উপমহাদেশের অপরিসীম দুরবস্থার ভিতর দিয়ে বিশ্বমানবাত্মার উৎপীড়িত চেহারা ও পরপদানত স্বাধীনতার ক্রন্দন তিনি শ্রবণ করলেন। নিপীড়িত মানুষের পৃথিবীটাই তখন ছিলো ঔপনিবেশিক করাল-প্রাচীরে কবরস্থ। তিনি জানতেন এই করাল প্রাচীরের বিপরীতে গণশক্তির উত্থান যদি না ঘটে, তাহলে যেমন সম্ভব হবে না পরাধীনতার জগদ্দল শিলাটাকে বিচূর্ণ করা, তেমনি অসম্ভব হয়ে রইবে জনগণের জীবন-জাগৃতি ও আত্মশক্তির উদ্বোধন। কবিকে নিজের চেতনাবোধের ভেতর থেকেই উচ্চারণের ভাষা খুঁজে নিতে হলো, ফ্রেডরিখ নিটশে (১৮৪৪-১৯০০) যাকে বলেন উবেরমেন্স, আল্লামা ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) যাকে বলেন খুদি, কাজী নজরুল নিজের চেতনার হিমাদ্রি শিখরে সেই সত্তার ঘোষণা শুনতে পেলেন।
অতঃপর তাকে বিদ্রোহী কবিতা না লেখে উপায় ছিলো না। তার এই কবিতা ছিলো মহাবিস্ফোরণ যা কাঁপিয়ে দিলো করাল-প্রাচীরের বুনিয়াদ, ছাপিয়ে উঠলো বিরাজমান সব স্বাভাবিকতা এবং ঝাঁপিয়ে পড়লো গণসমুদ্রে, নবতর জোয়ারের স্ফূর্তিতে। মুক্তধারা সৃষ্টির জন্যে এই-ই ছিলো যথেষ্ট। নড়ে উঠলো অচলায়তন। জাতীয় জীবনের অন্তরাত্মা উদ্দীপ্ত হলো নতুন করে। প্রবর্তিত হলো সৌন্দর্য ও সুস্থতার নতুন প্রেরণা, পরিবেশ ও প্রতিবেশের নৈরাজ্য ও অবক্ষয়কে দলিত-মথিত করে যা অবতীর্ণ হলো এক যুদ্ধে, যে যুদ্ধ স্বাধীন করবে মানুষের শৃংখলিত মানচিত্রকে। মুক্ত প্রভাত নিয়ে আসবে বন্দি আত্মার উঠানে।

‘মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শ্রান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন- রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বণিবে না
অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে
…. …. …. …. …. …. ….

আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃহ্মত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার।
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন-বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে’

কিংবা
‘জরাগ্রস্থ জাতিরে শুনাই নবজীবনের গান
সেই যৌবন উন্মাদ বেগ, হে প্রিয়া তোমার দান’

কিংবা-


‘আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্ণিশ’

কাজী নজরুল আত্মার বন্দিত্বে কখনো বিশ্বাসী ছিলেন না। আপনাকে ছাড়া আর কাউকেই কুর্ণিশ করতে তিনি শিখেননি। শিখেননি প্রভুত্বকামী কোনো শক্তিমদমত্তের সাথে বিন্দুমাত্র আপোষ। তিনি আপনাকে চিনতে পেরেছিলেন এবং সহসা তার সবগুলো বাঁধ খুলে গিয়েছিলো। ফলে বিশুদ্ধ এক স্বাধীন চিত্ততার জাগরণ তাকে করে তুলেছিলো জন্মস্বাধীন মানুষের অজর প্রতিনিধি। তার স্বপ্ন ছিলো মানুষের পরম মুক্তির এবং সে জন্যে অপরিহার্য ছিলো চিরস্বাধীন আত্মার উদ্ভাসন। এক আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের অঙ্গীকারেই তিনি প্রত্যক্ষ করতেন সেই উদ্ভাসনের শর্ত। কবির ভাষায়-“তারই শক্তিতে শক্তি লভিয়া হইয়া তাহারই ইচ্ছাধীন/মানুষ লভিবে পরম মুক্তি, হইবে আজাদ চির স্বাধীন”। তাওহীদের মধ্যে রয়েছে মানুষের ঐক্যের বুনিয়াদ। এর অনুপস্থিতি বিশ্বমানব পরিবারের অখন্ডতাকে ভেঙে দেয়। “এই তাওহীদ-একত্ববাদ কালে কালে ভুলে এই মানব/ হানাহানি করে ইহারাই হয় পাতাল তলের ঘোর দানব”। যারা তাওহীদ বিরোধী, অবিশ্বাস ও মানবীয়, প্রভুত্বের প্রবক্তা, তারা মূলত জীবনকে সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ ও ডোবার ক্লেদে প্রত্যক্ষ করতে অভ্যস্ত।

“দাসের জীবন” তারা শিখেছে এবং “নিত্যই মৃত্যুভীতির” মধ্যে তারা “লালসার পাঁকে মুখ ঘষে”। এই পৌরুষহীন ও বন্দি মানসকে কবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেননা এরা সংকীর্ণ স্বার্থপুজায় নিমগ্ন হয়ে মানুষকে আবদ্ধ করতে চায় স্বীয় অধীনতায়। এরা হয়তো স্বাধীনতা হরণকারী, নতুবা স্বাধীনতা হরণকারী শক্তির ক্রীতদাস। এরাই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে বৈষম্যের ভেদজ্ঞান। অতএব “জাতিতে জাতিতে মানুষে মানুষে অন্ধকারের এ ভেদজ্ঞান/অভেদ আহাদ মন্ত্রে টুটিবে সকলে হইবে এক সমান”।
জীবন্ত তাওহীদ ও জাগ্রত আত্মবোধ মানুষের চিত্তকে স্বাধীন করবে। তারপর কবি ডাক দিচ্ছেন- “আজাদ আত্মা আজাদ আত্মা সাড়া দাও, দাও সাড়া/এই গোলামীর জিঞ্জিরে ধরি ভীম বেগে দাও নাড়া”। এই যে আত্মার আজাদী সেটা শুধু ভয়-ভীতি-শঙ্কা-হতাশা বা নৈরাশ্যের কবল থেকে নয়, সফেদ দেও বা শ্বেত সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা চিন্তানৈতিক গোলামীর জিঞ্জির থেকে আজাদীও। যে আজাদী উপনিবেশউত্তর, সাম্রাজ্যবাদশাসিত দুনিয়ায়ও সমানভাবে প্রয়োজন।

আজাদ আত্মার জন্য জরুরী হলো, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, সামাজিক কুসংস্কার ও কুপমন্ডুকতার অন্ধ আবিলতা থেকে বিমুক্তি। এ আত্মা হবে মানবতার মূর্তপ্রতীক । কবির প্রত্যাশিত মুক্তি সংগ্রামের নিশানবরদার হতে সে বাধ্য। কাজী কবি তার সন্ধানে ছিলেন ব্যাকুল- “কোথা সে আজাদ? কোথায় পূর্ণ মুক্ত মুসলমান/এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ডরে না কোথা সে জিন্দা প্রাণ।” কবির বিশ্বাস মানুষ প্রত্যেকেই একই বাপ মায়ের সন্তান। ভাষার নামে, বর্ণের নামে, শ্রেণি, রাষ্ট্র, সম্প্রদায় কিংবা লিঙ্গের নামে কোনো বৈষম্য, কোনো সংঘাত কিংবা কোনো হানাহানি মানুষের জন্যে হারাম। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি দরদ ও সহনশীলতা নিয়ে কবিচিত্তের উত্থান ঘটেছে। কবি দেখেন সৃষ্টির গভীরে মানুষে মানুষে কোনো ভেদজ্ঞান নেই। আছে কেবল বাইরের পরিচয়ে। যা থেকে জন্ম নিয়েছে সর্বনাশা বৈষম্যের অমানবিকতা। কবি তাই ঘোষণা করেন। “আল্লাহর দেওয়া পৃথিবীর ধন ধান্যে/ সকলের সম অধিকার/ রবী শশী আলো দেয় বৃষ্টি ঝরে/ সমান সব ঘরে ইহাই নিয়ম আল্লার” সুতরাং স্রষ্টার সত্যকে ধারণ করে উৎসাদন করতে হবে সমস্ত বৈষম্যের।

সব অন্যায় ও নিপীড়নের করাল প্রাচীরকে উৎপাঠন করতে হবে প্রবল জাগরণে। কবি তাই ডাক দিচ্ছেন “এক করে সঞ্চিত, বহু হয় বঞ্চিত/ জাগো লাঞ্চিত জনগণ সবে, সংঘবদ্ধ হও/আপনার অধিকার জোর করে কেড়ে লও।”
উৎপীড়িতের উপর পূজিগর্বী ‘অভিজাতের’ অকথ্য অত্যাচার পীড়িত করেছে কবিকে। নিষ্ঠুরতা আর বঞ্চনায় ক্ষত-বিক্ষত এই জীবনের প্রতি সহানুভূতির বেদনা এবং একাত্মবোধের প্রেমে কাজী কবির চোখের পাতা ভিজে যেতো। যতটা সামর্থ তার, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি চেয়েছেন জীবনের বঞ্চনা ও মানবতার লাঞ্চনার অবসান। এক্ষেত্রে তিনি আশায় বসতি গেড়েছিলেন এবং মানুষের মহীমার বিজয়ের পক্ষে নিখিল স্রষ্টার আশীর্বাদে প্রাণবান ছিলো তার সেই আশা। ফলত তিনি ঘোষণা শুনিয়েছেন- “আসিতেছে শুভদিন/ দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ” কবি তার আশাবাদের সমর্থন পেয়েছেন বিশ্ববাস্তবতায়। প্রকৃতির মধ্যেও তিনি উদঘাটন করেছেন দুর্বলের পক্ষে সহানুভূতি। পাশবিক অবিচারের রক্তস্নাত কাহিনি সূর্যোদয়কে করে তুলছে ব্যথায় কাতর। “আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত-পীড়িতের মাখি খুন/ লালে লাল হয়ে উঠিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ।”

কবি কেবল চেয়ে আছেন সেই নবজাগ্রত মুক্তি সংগ্রামীদের প্রতি, যারা সংগ্রামে-সাহসে মানবতার নব উত্থানের পথ রচনা করছে।- “তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান/ তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান।” তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার পতাকা উড়তে দেখেন জাগরণের ঝড়ের উপর। অধঃপতিত মানুষের মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রয়াসে প্রত্যক্ষ করেন পুঁজিবাদী নিষ্ঠুরতার অনিবার্য অবসান। স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে তিনি দেখেন সেই সময়, যখন মানুষ পরাশক্তির উৎপীড়ন এবং স্বাধীনতা হরণকারী শক্তির বাঁধা বন্ধনকে পরোয়া করতে ভুলে গেছে। আধিপত্যবাদ চায় তাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। চিরপরাধীন করে রাখতে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। কারণ- “চিরঅবনত তুলিয়াছে আজ গগনে উচ্চশির/ বান্দা আজিকে বন্ধন ছেদি ভেঙেছে কারা-প্রাচীর।” যুদ্ধে, আঘাতে, কুটিলতায় যারা উৎপীড়িত জনপদ ও রাষ্ট্র্রসমূহকে স্বার্থের শিকারক্ষেত্র বানিয়ে রাখতে চায়, কবি দেখেছেন তাদের বিরুদ্ধে মানবাত্মার দুঃসাহসী প্রতিরোধের দৃশ্য। উৎপীড়ক ও উদ্ধত সাম্রাজ্যবাদের বুকে মরণ কামড় দেবার জন্য নিরক্ত ও নিশক্ত দেহে শক্তি সঞ্চয় করতে মরিয়া হয়ে উঠছে তৃতীয় বিশ্বের জনগণ। কবি সেই যুদ্ধে উদ্ধুদ্ধ করছেন মুক্তি সেনাদের আর কামনা করছেন নির্যাতিতের বিজয় “ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডংকা শংকা নাহিক আর/ মরিয়ার বুকে মারণের বাণী উঠিয়াছে মার মার/রক্ত যা ছিল করেছে শোষণ/ নিরক্ত দেহে হাড় দিয়ে রণ/ শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড় সেই হাড়ে ওঠে গান/ জয় নিপীড়িত জনগণ জয়, জয় নব উত্থান”

‘শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়’ সেই হাড় ছিলো কাজী কবির অস্ত্র। কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে, কুলি, ভিখেরি থেকে নিয়ে বঞ্চিত ও রক্তাক্তহৃদয়ের প্রতিটি মানুষের আত্মাকে আজাদ করা ও হাড়কে প্রাণের সঙ্গীতে মুখর করা ছিলো তার কাব্যের অন্যতম অভিপ্রায়। কাজীর জীবদ্দশায়ই সে অভিপ্রায় বাস্তবতার বন্দরে নোঙর করে। নিজের জীবনকে সংগ্রামের মশাল বানিয়ে কাজী কবি স্বাধীনতা হরণকারী ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আজাদীর লাল আগুন ছড়িয়ে দিলেন দিকে দিকে। ঔপনিবেশিকতার পোশাকী অবসান হলেও সে আগুন থামছে না। কারণ পৃথিবীতে মানুষের জন্য যারা মারি ও মড়ক জন্ম দিচ্ছে, খোদার উপর খোদকারী করে যারা বিশ্বব্যবস্থাকে নিজেদের খেলার বস্তু বানাচ্ছে, মানুষের উপর যারা চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যায্য প্রভুত্ব, তারা এখনো আছে বহাল তবিয়তে।
নজরুলের বিদ্রোহ তাই থামতে চায় না। গমকে গমকে জেগে উঠে এশিয়া-আফ্রিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের কান্নারত জনপদসমূহে। সাম্যের জন্য, প্রেমের জন্য, স্বাধীনতার জন্য দিকে দিকে শংকা-নাশা যে ঢংকার ঝংকার মন্দ্রিত, ঝাকড়া চুলের কাজী নজরুল যেনো সেই সুরের ভৈরবীতে উত্তাল প্রাণের ফোয়ারা হয়ে জীবন্ত। স্বাধীনতা হরণকারী সাম্রাজ্যবাদ যতই উন্মাতাল হয়ে উঠছে, রক্তচোষা পুঁজিবাদ যতই শোষণের জিহ্বাব্যদান করছে, তৃতীয়বিশ্বের বুকচাপড়ানো যতই বাড়ছে, ততই কাজী কবির আজাদ আত্মা অপরিহার্য হয়ে উঠছে অধিকতরো। সে আজাদ আত্মা উচ্চকোটির কেউ নয়। মাটিলগ্ন শোষিত ও অবহেলিত মানুষ। অধিকারহরণকারী শক্তির চোখে যারা মরে গেছে। যাদের জেগে উঠার সকল সম্ভাবনাকে কবর দেয়ার আয়োজন করে রাখে শোষকবর্গ। হরণ করা হয় তাদের পরিচয় ও ভাষা। কাজী নজরুলের কবিতা সেই কবরের পাশে এসে সেই জীবন্মৃতদের ভাষা হয়ে উঠে। স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের একমাত্র পরিচয়, তারা মানুষ এবং ‘মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড় নহে কিছু মহীয়ান’। কে বলে কাজী নজরুল ইসলাম নেই? মজলুমের দুনিয়ায় তিনি অনেক বেশি আছেন, পাশেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top