রবার্ট ক্লাইভ : ইতিহাসের ঘৃণিত নাবিক

ভারত উপমহাদেশে রবার্ট ক্লাইভ একটি ঘৃণিত নাম। বিশেষ করে ঐতিহাসিক পলাশী ট্র্যাজিডির সে ছিল পালের গোঁদা, পলাশীর পটভূমির খলনায়ক। যে পলাশীর পটভূমিতে ভারতবর্ষে দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের দ্বার উন্মোচন করে দেয়। ইংরেজদের কাছে সে হয়তো তৎকালীন সময়ে হিরো হতে পারে। কিন্তু বাংলার মানুষের কাছে সে ভণ্ড, প্রতারক, শঠ, লোভী, কুটচালে পারদর্শী পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ী কুখ্যাত সেনাপতি।

ইংরেজদের তুলনায় বেঁটে, খাটো প্রকৃতির এই মানুষটি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এমন কী মা-বাবা, ভাই-বোনদেরকেও বিশ্বাস করতো না। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া তেমন নেই। শুধুমাত্র নিজের কুটবুদ্ধি ও সাহসের উপর ভরসা করে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’ নামক প্রতিষ্ঠানের কেরানী পদে চাকুরি করে মাত্র ১৪ বছরের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হর্তকর্তা বনে যান। ভূষিত হন লর্ড খেতাবে।

রবার্ট ক্লাইভের বেড়ে ওঠা

রবার্ট ক্লাইভের জন্ম ১৭২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের স্টাইচের স্রোপশায়ার নামে একটি ছোট শহরে। আর্থিকভাবে বাবা তেমন স্বচ্ছল ছিলো না। পারিবারিক স্বচ্ছলতার জন্য তার ক্লাইভের বাপ আইন পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু সেখানেও তেমন কোনো সাফল্য আনতে পারেননি। ক্লাইভ পরিবারের আর্থিক দৈন্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে শেষপর্যন্ত ক্লাইভকে তার খালু ডেনিয়েল দত্তক হিসেবে গ্রহণ করে। তরুন বয়সেই ক্লাইভ মারদাঙ্গায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। তার মারদাঙ্গা স্বভাবের জন্য খালু ডেনিয়েল তাকে চার্চে দিয়ে আসেন ধর্মশিক্ষার জন্য। স্থানীয় এ চার্চের অধীনে ছিল একটি গ্রামার স্কুল। সেখানে ক্লাইভকে ভর্তি করানো হয়। কতদূর পড়াশুনা করেছিলেন তা জানা যায়নি। তবে পালক মাতার মৃত্যুর পর পালক পিতা ডেনিয়েল অদম্য বেয়াদব ক্লাইভের আচরণে অতিষ্ট হয়ে ক্লাইভকে ত্যাগ করেন।

ক্ষুদে মাস্তান ক্লাইভ :

গতানুগতিক লেখা পড়ার প্রতি ক্লাইভের কোনো আকর্ষণ ছিল না। পড়াশুনার চেয়ে বন্ধুদের সাথে মাস্তানি ও মারামারিত আগ্রহ ছিল বেশি। মাস্তানি আর চাঁদাবাজিই ছিল সেই তরুন বয়সের একমাত্র পেশা। অবস্থা এমন বেগতিক হলো যে, শহরের প্রায় সব ব্যসায়ীরা ক্লাইভের ব্যাপারে নালিশ করতো পিতা রিচার্ড ক্লাইভ ও দত্তক পিতা ডেনিয়েলের কাছে।
সে সময় ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’ লন্ডনের সব বিত্তবান ব্যবসায়ীদের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। বাবা আইন পেশায় নিযুক্ত থাকার কারণে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে তার বেশ খাতির ছিল। সেই খাতিরের সুবাদে বকে যাওয়া, উচ্ছৃঙ্খল ছেলেকে কেরানী হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে ভাগ্য পরীক্ষা :

১৬০০ সালের গোড়ার দিকে ইংল্যাণ্ডের দুইশতাধিক ব্যবসায়ী এই কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে। ভারতবর্ষ থেকে মশলা ও চা আমদানীই ছিল তাদের প্রথম ব্যবসা। পরে রাণী প্রথম এলিজাবেথ ডাচ কোম্পানীর সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে লাইসেন্স দেন। আঠার শতকের গোড়ার দিকে বস্ত্র ব্যবসায় এ কোম্পানি বেশ সুনম অর্জন করেছিলো। এক পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য গঠন করে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী, প্রয়োজনে তারা যুদ্ধ করার সরঞ্জামাদিও সংগ্রহ করে।

১৭৪৩ সালে রবার্ট ক্লাইভ যখন ভারতের উদ্দেশ্যে জাহাজে চরলেন ততদিনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতের সাথে বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা প্রায় দেড়শো বছর অতিক্রম করেছে। কিন্তু ভাগ্য এবার তার অনুকুলে ছিলো না। ক্লাইভের জাহাজটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্রাজিল বন্দরে ভিড়তে বাধ্য হয়। পুরো ন’ মাস ব্রাজিল বন্দরে জাহাজটি আটকা থাকে। বাবার দেয়া সামান্য টাকাও দ্রুত ফুরিয়ে আসে। ক্লাইভ তার আত্মজীবনিতে বলেন, অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছে যে, বাধ্য হয়ে তিনি ক্যাপ্টন, ক্রু থেকে শুরু করে সবার কাছে টাকা ধার নিয়ে চলতে হয়েছে। ব্রাজিলে থাকা অবস্থায় তিনি পর্তুগীজ ভাষাও কিছুটা রপ্ত করেছিলেন। যাহোক, শেষপর্যন্ত জাহাজ মেরামত হলো। জাহাজ ছুটলো মাদ্রাজের দিকে। আবারো দেখা দিলো জাহাজের যন্ত্রাংশের সমস্যা। জাহাজ আবারো নোঙর করা হলো। নানা বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে আঠারো মাস পর জাহাজ ভীড়লো মাদ্রাজ বন্দরে। ততদিনে ক্লাইভের ফকির হওয়ার দশা। যখন ক্লাইভ ভারতের মাটিতে পা রাখলো, তখন সে কপর্দকশূণ্য।

কেরানীর পেশা ক্লাইভের খুব একটা পছন্দ না। কোম্পানীর সহকর্মীদের সাথে সে খুব দুর্ব্যবহার করতে শুরু করলো। একবার সে কোম্পানীর সচিবের সাথেও খারাপ ব্যবহার করলো। সচিব কোম্পানীর গভর্ণরের কাছে ক্লাইভের আচরণবিধি নিয়ে অভিযোগ দায়ের করলো। গভর্ণর, ক্লাইভকে সচিবের কাছে নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আদেশ দিলেন। ক্ষমা প্রার্থনা করে সে যাত্রায় ক্লাইভ রক্ষা পেল। জীবনের এই গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য ক্লাইভ চিন্তা করলেন, সে আত্মহত্যা করবে। জীবন তার কাছে দুর্বিসহ হয়ে উঠলো। একদিন সে গুলি ভরা পিস্তল নিয়ে নিজের মাথা তাক করে ট্রিগারে চাপ দিলো। অবাক করা কা-, পিস্তলের নল থেকে কোনো গুলি বেরুলো না। সে আবারো ট্রিগারে চাপ দিলো কিন্তু না, কিছুতেই গুলি বেরুচ্ছে না। এমন সময় ঘরে ঢুকলো ক্লাইভের নতুন সহকর্মী এডমুন্ড মাস্কেলাইন। এডমুন্ড ঘরে প্রবেশ করায় সে যাত্রায় ক্লাইভ বেঁচে গেলো। এ বিষয়ে এডমুন্ডকে কিছুই বললো না। পিস্তলটা এডমুন্ডকে দিয়ে আকাশে তাক করে গুলি করার জন্য বললো। এডমুন্ড আকাশে তাঁক করে গুলি করলো। ট্রিগারের ছোঁয়ায় ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে গুলি বেরিয়ে গেলো। ক্লাইভ সে দৃশ্য দেখে অবাক হলো। মনে মনে ভালো নিশ্চয় তার বেঁচে থাকার পিছনে সৃষ্টিকর্তার কোনো রহস্য আছে। হয়তো, ক্লাইভ সে সময় মরে গেলে ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুনজরে : কেরানী’র চাকুরিকে গুডবাই

১৭৪৬ থেকে ১৭৪৭ সাল পর্যন্ত ফরাসি বণিকরা ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দখলে থাকা ফোর্ট ডেভিটকে কোনোভাবে দখলে আনতে পারেনি। ফোর্ট ডেভিডকে রক্ষা করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ সৈন্যরা বীরত্বের সাথে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করে। এ যুদ্ধে সামনের সারিতে যার নাম সর্বাগ্রে, তিনি হলেন রবার্ট ক্লাইভ। প্রতিটি যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করে ইংরেজ উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের নজরে পড়েছিলেন। একজন পেশাদার সৈনিক না হয়েও ক্লাইভের অপরিসীম সাহসীকতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। ২রা মে-১৭৪৭ সালে ফোর্ট ডেভিডের গভর্ণর ক্লাইভের পদোন্নতি চেয়ে লন্ডনে চিঠি প্রেরণ করলেন।

‘রবার্ট ক্লাইভ আমাদের একজন ক্লার্ক হিসেবে কর্মরত। তার দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আমরা এনসাইন্স কমিশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিলাম।’ রবার্ট ক্লাইভ এখন সামরিক অফিসার। ফোর্ড ডেভিডের দেখভালের দায়িত্ব এখন ক্লাইভের কাঁধে। ক্লাইভ এখন ইংরেজ বণিকদের চোখে একজন সাহসী যোদ্ধা। এরপর কর্ণাটক ও দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধেও সে অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

১৭৫৩ সালে সে দেশে গেলে তাকে বীরোচিত সম্বর্ধনা দেয়া হয়। কোম্পানীর কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স তাকে ‘জেনারেল ক্লাইভ’ উপাধিসহ একটি রত্নখঁচিত তরবারি প্রদান করে সম্মানিত করে। এরপর রবার্ট ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফোর্ড ডেভিডের গভর্ণের পদ নিয়ে ভারতে চলে এলেন। এ সময় এ অঞ্চলে ইংরেজ বণিকদের সাথে ফরাসী বণিকদের সম্পর্ক মোটেই ভালো যাচ্ছিল না। যাহোক, কুটনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে ক্লাইভ ফরাসি বণিকদের পরাজিত করতে সক্ষম হন।

পলাশি ট্র্যাজিডির ঘৃণিত খলনায়ক রবার্ট ক্লাইভ

এরমধ্যে ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার শ্রদ্ধেয় নানা এবং বাংলা, বিহার উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যু হয়। আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মসনদে বসেন। তখন নবাবের বয়স মাত্র ২৩ বছর। সিংহাসনে বসে তিনি নিজেকে চারিদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। বিশেষ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সীমাহীন দৌরাত্ব নতুন নবাবকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুললো। মসনদে আরোহন করে সিরাজ-উদ-দৌলা ইংরেজদের সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন যে, তারা যদি শান্তিপূর্ণভাবে প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য করে তবে তিনি তাদের সবরকমের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করবেন। অন্যথায় এ দেশ থেকে বহিষ্কার করাই হবে তাঁর একমাত্র নীতি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নবাবের আদেশকে পাত্তা না দিয়ে তারা নিজস্ব নিরাপত্তার নামে আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে নবাবের সাথে ইংরেজদের বিরোধ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। বাধ্য হয়ে নবাব ইংরেজদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রথমে নবাব কাশিমবাজার দূর্গ দখল করেন, এরপর ১৭৫৬ সালের ২০ জুন নবাবী ফৌজ কলকাতায় ইংরেজদের ফোর্ড উইলিয়াম দূর্গ দখল করেন।
পরপর দু’টি দূর্গের পতনের সংবাদ মাদ্রাজে পৌঁছলে, মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষ দূর্গ পুরুদ্ধার বিপদগ্রস্থ ইংরেজদের উদ্ধারের জন্য রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে নৌপথে একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। এডমিরাল ওয়াটস-এর নেতৃত্বে একটি সাহায্যকারী নৌবাহিনী ক্লাইভের সাথে যোগ দেয় এবং তাদের যৌথ নেতৃত্বে ১৭৫৭ সালের ২রা জানুয়ারী ইংরেজ বাহিনী কলকাতার দূর্গ পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়। দূর্গ পুণর্দখলের সংবাদ পেয়ে নবাব হতবাক হয়ে যান। তিনি ইংরেজদের সমুচিত শিক্ষা দানের জন্য কলকাতা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেও কুচক্রী জগৎশেট, মীরজাফর, খাজা ওয়াজিদ, রায়দুর্লভ, উঁমিচাদ ন্যায় অভিজাত অমাত্যদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ইংরেজদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হন। যা ইতিহাসে ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী কোম্পানীর সাথে নবাবের অবমাননাকর ‘আলীগর চুক্তি’ সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি রবার্ট ক্লাইভের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ধূর্ত ক্লাইভ এবার বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা থেকে ফরাসী বণিকদের চিরতরে বিতারণে মনোনিবেশ করেন। ১৭৫৭ সালের মার্চ মাসে ক্লাইভ ফরাসীদের চন্দননগর দূর্গ আক্রমণ করেন। পাঁচশত সুদক্ষ ফরাসি সৈনিক এবং সাতশত সিপাহী নিয়ে ফরাসীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দীর্ঘ দশ দিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে চন্দননগরের পতন ঘটে। দূর্গের দখল নেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। ফরাসীদের পতনের পর রবার্ট ক্লাইভ ও এডমিরাল ওয়াটসন উৎসাহ-উদ্দিপনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে কিভাবে বাংলা, বিহার উড়িষ্যার মসনদে বসবে। তৈরি করে নতুন নীল নকশা। যুক্ত হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে। নবাবের চারিদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে ক্লাইভ নিজেকে উৎসর্গ করলেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকে আরো উস্কে দিতে ক্লাইভ প্রলভোন ও কুটকৌশলের আশ্রয় নিলো। ক্লাইভ দেখলেন, নবাবের প্রধান সেনাপতির মীর জাফর আলী খানের রয়েছে ক্ষমতার প্রতি প্রচ- লোভ। তার সাথে যুক্ত হয়েছে নবাবের খালা ঘষেটি বেগম এবং অমাত্রবর্গদের মধ্যে জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উঁমি চাদ, কৃষ্ণ বল্লবসহ আরো অনেকে। উমি চাঁদের ছিলো সুদের ব্যবসা। নবাবের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণে ব্যবসা ঠিকমতো জমাতে পারছিলো না। ফলে, নবাবের প্রতি ছিল তার প্রচ- ক্ষোভ। আর জগৎশেঠ আদতে বাংলার মানুষ নন। তার আদি নিবাস ছিলো রাজস্থানের জোধপুরের নাগোর অঞ্চলে। প্রথমে সে জৈন ধর্ম পরে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে। জীবনের শেষ অধ্যয়ে এসে আবার জৈনধর্মের আশ্রয় নেন। অষ্টাদশ শতকের দিকে বাংলা মুলুকের এ বিখ্যাত ধনী ‘জগৎশেঠ’-এর প্রকৃত নাম মহাতাব চাঁদ। ‘জগৎশেঠ’ মোঘল স¤্রাটের দেয়া উপাধী। জগতৎশেঠ এতোটাই ধনী ছিলো যে তৎকালীন রাজা-জমিদার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনীকেও এই জগৎশেঠের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হতো। এককথায়, জগৎশেঠকে বাংলার ব্যাংক বলা হতো। তার পূর্বপুরুষরা কিন্তু হতদরিদ্র ছিল। তার সম্পদশালী হওয়ার পিছনে রয়েছে এক লম্বা ঘটনা। সে ঘটনা নিয়ে আর একটি নিবন্ধন লেখা যাবে। তৎকালীন ব্যাংকার জগৎশেঠের সাথে লর্ড ক্লাইভের নিবির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইংরেজদের পক্ষে ওকালতি করার জন্য একবার জগৎশেঠ যান নবাবের দরবারে। সেখানে তিনি ইংরেজদের পক্ষে সাফাই গান। ইংরেজদের ব্যাপারে আন্তরিক হওয়ার পরামর্শ দেন। এতে নবাব ক্ষুদ্ধ হয়ে সজোরে জগৎশেঠের গালে থাপ্পর মারেন। এ অপমানে সে প্রচ- ক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। ক্লাইভের সাথে হাত মিলায়। মীর জাফর ও ঘষেটি বেগমের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জগৎশেঠ ক্লাইভকে পাঠায়। ধূর্ত ক্লাইভ সবাইকে তার প্রলোভনের ফাঁদে ফেলতে সক্ষম হয়। মীর জাফর আলী খান ছিলেন নবাব আলিবর্দী খানের বোনের স্বামী। সেইসূত্রে নবাব সিরাজ উদ দৌলার নানা। চারিত্রিকভাবে সে দুর্বল চরিত্রের একজন ক্ষমতালোভী। ধূর্ত ক্লাইভ তাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষে শুধু ব্যবসা করার জন্যই এসেছে। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ইচ্ছা তাদের মোটেও নেই। ইংরেজরা মনে প্রাণে চায় আপনি মীর জাফর আলী খান মসনদে বসুন। ইংরেজদের সহযোগিতা করে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যান। মীর জাফর এই টোঁপ সহজেই গিলে ফেললো। ১৭৫৭ সালের ১২ জুন মীর জাফর আলী খান আর রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে একটি গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হলো।

ক্লাইভের পলাশী বিজয়

১৭৫৭ সালের ১৯ জুন। মীর জাফর আলী খানের অধিনায়কত্বে নবাবের বিশাল বাহিনী পলাশীর প্রান্তরে উপস্থিত হলো। অন্যদিকে ক্লাইভের নেতৃত্বে তিন হাজার দক্ষ সেনা। হঠাৎ করে আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। অঝোর ধারায় নেমে এলো প্রচুর বৃষ্টি। যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে সৈন্যরা যার যার মতো মাথা গুঁজলো। এদিকে ক্লাইভ চুক্তি অনুযায়ী অপেক্ষা করতে লাগলো কখন মীরজাফরের সেনাদল এসে ক্লাইভের বাহিনীতে যোগ দিবে? উল্টো মীর জাফরের দূত এসে ক্লাইভকে জানালো ইংরেজ বাহিনীর সাথে যোগ না দিয়ে, সে তার বাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চুপ থেকে সহযোগিতা করবে। এ খবর শুনে ক্লাইভের ঘুম হারাম। এখন যদি মীর জাফর কোনোরকম প্রতারণা করে চুক্তি ভঙ্গ করে তাহলে তাদের সব’কটার মাথা কাটা যাবে। ক্লাইভ এ দুশ্চিন্তা নিয়ে চিঠি লিখে ওয়াটসনকে জানালো। চিঠিতে লিখলো, “মীর জাফর আলী খানের কাছ থেকে যে তথ্য আমি পেলাম তাতে আমি খুবই শঙ্কা বোধ করছি। আবহাওয়া খারাপ হওয়ার কারণে যুদ্ধ বিরতি চলছে।’ এর দু’দিন পর ২১ জুন রবার্ট ক্লাইভ ইংরেজ কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘কাউন্সিল অব ওয়ার’-এর আহ্বান করলেন। ক্লাইভ ও ক্লিলপ্রেট্রিকসহ মোট নয়জন এখনই নবাবের সাথে যুদ্ধে না জড়ানোর পক্ষে মত দেন। ওয়াটসনসহ সাত জন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। ক্লাইভ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলেন। নবাব যদি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা সামান্যতম টের পেতেন তাহলে এতক্ষণে তাকে কবরে যেতে হতো।

যাহোক, অবশেষে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আ¤্রকাননে ঐতিহাসিক পলাশী প্রান্তরে প্রহসনের যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে নবাব ধৃত ও বন্দী হলেন। ৩ জুলাই মীর জাফরের পুত্র মীরনের আদেশ নবাবকে হত্যা করা হলো। ক্লাইভের পুতুল নবাব হিসেবে মীর জাফর আলী খান বাংলার মসনদে বসলেন। ইতিহাসে তাকে ‘ক্লাইভের গাধা’ বলা হয়।
ক্লাইভ এখন ইংল্যা-ের হিরো। তবে, জনসাধারণের কাজে ক্লাইভ ‘ধূর্ত ক্লাইভ’ হিসেবেই পরিচিত। সত্যিকার অর্থে ক্লাইভকে নিয়ে লন্ডন যতই মাতামাতি করুক, তাকে কোনো সরকারী খেতাব দেয়া হয়নি। যদিও জীবনের শেষ পর্যায়ে যে ‘লর্ড’ খেতাব দেয়া হয়েছে, তা ইংল্যা-ের লর্ড খেতাবের পরিবর্তে দেয়া হয় আইরিশ লর্ড খেতাব। সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলো, ‘লর্ড ক্লাইভ অব দ্য পলাশি ইন দ্য কিংডম অব ইংল্যান্ড’।

ক্লাইভের জীবনের শেষ অধ্যায়

১৭৭২ সালের ৭ জানুয়ারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রবার্ট ক্লাইভের বিরুদ্ধে ‘ভারতে ক্ষমতার যথেচ্ছা ব্যবহার’ অভিযোগ আনেন। ১৭৭২ সালের ৩০ মার্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘বোর্ড অব ডিক্টেরস’দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং ক্লাইভকে কোর্টে এসে আনীত অভিযোগের ব্যাখ্যা দাবি করেন। ক্লাইভ কোর্টে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তা ইংল্য-ের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করা হয়। তিনি কোর্টকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মামলা করার পরিবর্তে আমি কী আপনাদের প্রশংসা পাওয়ার অধিকার রাখি না? আমি কী নিজের জীবন বিপন্ন করে লড়াই করিনি? জনাব চেয়ারম্যান, আমার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, তা দেখে আমি নিজেই হতভম্ভ হয়ে যাচ্ছি।’ ক্লাইভ আরো ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘তোমরা কি সবাই ভুলে গেছো যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ডাচদের সমস্ত জাহাজ ধ্বংস করে ফেলেছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সবরকম প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলাম। কোর্টে ক্লাইভের শেষ কথা ছিল, ‘আমার ভাগ্য নিয়ে তোমরা যা খুশি করো, কিন্তু দোহাই আমার মর্যাদার কোনো অনিষ্ট করো না’।

মাত্র ৫১ বছর বয়সে ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বও ক্লাইভ আত্মহত্যা করেন। ক্লাইভের মৃত্যু নিয়ে বাতাসে নানা কথা ভেসে বেড়ালো। কেউ কেউ বলে অতিরিক্ত আফিম ও মদ পানই ক্লাইভের মৃত্যু হয়। যাহোক, যে ক্লাইভ নিজের জীবনকে বাজি রেখে ইংল্যাণ্ডের জন্য ভারতের বিজয় এনে দিয়েছিলেন, সেই ইংল্যান্ড-এর এমন আচরণ তাকে দারুনভাবে মর্মাহত করে, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে। রাগে, দুখে, ক্ষোভে, অপমানে ক্লাইভ নিজের গলায় ছুড়ি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। স্ত্রী মার্গারেট গভীর রাতে স্বামী ক্লাইভকে খুঁজতে বের হন। তাকে পান বার্কলে স্কোয়ারের একটি বাড়ির কক্ষে গলাকাটা অবস্থায় দেখতে পান। ধারণা করা হয়, ক্লাইভ নিজেই তার গলায় ছুড়ি চালিয়ে আত্মহত্যা করে।

সর্বশেষ কথা

ভারতবর্ষের ইতিহাসে রবার্ট ক্লাইভ এক চরম বিতর্কিত চরিত্র। উপমহাদেশের মানুষের কাছে সে এক বিয়োগান্ত কাহিনীর প্রণেতা, এক মূর্তিমান শয়তান। অন্যদিকে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সা¤্রাজের ভিত্তি স্থাপনকারী হিসেবে স্বদেশবাসীর সে একজন বীর।

কিন্তু ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, তাকে নিজ দেশের আদালতে আসামীর কাঠকরায় দাঁড়াতে হয়েছে। ক্লাইভ উপমহাদেশের মানুষের কাছে অত্যাচারের প্রতীক।

আমেরিকায় যখন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হলো, তখন তার উত্তাল ঢেউ এসে লাগলো ইংল্যা-ে। সে প্লাবনে দাবী উঠলো ক্লাইভের মূর্তি অপসারণের। আওয়াজ উঠলো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইভের ডক্টরেট ডিগ্রীটি প্রত্যাহারের। এ দাবী সাধারণ মানুষ ছাড়াও জানিয়েছেন বৃটেনের অনেক বিখ্যাত লেখক ও ইতিহাসবিদ। বিখ্যাত ‘হোয়াইট মুঘলস’ এবং দ্য অ্যানার্কি : দ্য রিলেন্টলেজ রাইজ অব দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’ গ্রন্থের লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল। দ্য গাডিয়ান পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে বিট্রিশ সরকারের একেবাওে প্রাণকেন্দ্রে কীভাবে ক্লাইভের মতো লোকের মূর্তি এখনো আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লেখেন, “ক্লাইভ এমন কোনো ব্যক্তি নন, যাকে আমাদেও এই যুগে সম্মান জানানো উচিৎ।—- এখন সময় এসেছে মূর্তিটি জাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়ার। —- কেবল এ কাজ করার মাধ্যমে আমরা শেষ পর্যন্ত আমাদেও অতীত কৃতকর্মেও মুখোমুখি হতে পারব এবং যতকিছুর জন্য আমাদেও ক্ষমা চাওয়া দারকার, সেই ক্ষমা চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবো। তারপরই এই সা¤্রাজ্যবাদী অতীতের ভারী বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা সামনে আগাতে পারবো’

তথ্য সূত্র :

  • বাংলাদেশে আন্দোলন সংগ্রামের হাজার বছর/ এমদাদুল হক চৌধুরী/ নিউক্লিয়াস পাবলিকেশন।
  • জীবন সন্ধ্যায় ইতিহাসে বিখ্যাত-কুখ্যাতরা/এমদাদুল হক চৌধুরী/নিউক্লিয়াস পাবলিকেশন।
  • জানা-অজানা রবার্ট ক্লাইভ/ আদনান সৈয়দ/সূচিপত্র।
  • রবার্ট ক্লাইভ : ইতিহাসে এক ঘৃণ্য খলনায়ক/ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান/মাসিক আত-তাহরীক।
  • খলনায়ক ও একটি গল্প/সুচেতনা সরকার/আনন্দবাজার পত্রিকা।
  • বাংলার ব্যাংক ‘জগৎশেঠ’ কতটা ধনী ছিলেন/ডেইলি বাংলাদেশ।
  • জগৎশেঠ/কালের কণ্ঠ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top