আয়েশা

আয়েশা দাঁড়িয়ে আছে বৈঠক ঘরের লাগোয়া নামাজের ঘরের দরজায় কান পেতে। আব্বাজানের কাছে সকাল থেকেই দফায় দফায় লোকজন আসছে। সরকারি লোক, দলের লোক। আয়েশার বুকে অস্থিরতা আব্বাজান জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় কোনো ভুল সিন্ধান্ত কি নিতে পারেন!

আব্বার তো সব কিছু মনে রাখার বয়সও এখন না। খাদেমরা কানের কাছে মুখ চেপে যা মনে করিয়ে দিচ্ছেন তার উত্তরটুকুই দিচ্ছেন আব্বা। ওর কপালের জমিনে গুড়ি গুড়ি ঘাম জমতে থাকে। পিছনে কাপড় ধরে ওমর আর উসামা টানছে। মা ক্ষুধা পেয়েছে! টিফিন দাও! এক হৃদয় দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ নিয়ে আয়েশা রান্নাঘরের দিকে যায়। রান্নাঘরে ঢুকলেই ওর চোখ ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে থাকা বেকার ছেলের চোখের মতো হয়ে যায়। যেখানে হতাশা ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই। সিঙ্ক ভর্তি এঁটো থালাবাসন। দুর্গের মতো বাড়িতে এত্ত এত্ত খাবার গ্রহণ করার লোক। অথচ কাজের বেলা সব বড় বৌমার কাঁধে। দুনিয়ার বিচার বটে! পাউরুটিতে জেল মাখাতে মাখাতে চুলায় বিকেলের চা বসায় দিয়ে কড়ে আঙুল গুনছে আয়েশা। কতো সদস্য! উসামার পিছনে রাহাতের উচ্চ কন্ঠ– ভাবী আরো দশ কাপ যোগ করো। আব্বাজানের কদর বেড়ে গেছে হেফাজতের আন্দোলনের পর। প্রধানমন্ত্রীর পিএস, উপ সচিব মনিরুলসহ আরো বেশ কিছু মানুষ এসেছেন। তারা হেফাজতের সাথে সমঝোতায় আসতে চায়!

দাঁতে ঠোঁট চেপে রেখে আয়েশা দরজার আড়ালে সরে গেলো। হেফাজতের কথা কানে যেতেই চকিতে বাবার মুখটা ভেসে উঠলো। বাবা! আয়েশার ঠোঁট তিরতির কেঁপে উঠে, কিসের সমঝোতা? রঙ মেখে যারা রাজপথে শুয়েছিলো তাদের রঙের দাম সরকার থেকে আদায় করতে চায় হেফাজত?

নাকি যে স্বপ্নবাজ বাচ্চাগুলো হারিয়ে গেছে রাত্রির অন্ধকারে, তাদের মায়েদের চোখের পানিতে অজু সেরে পাক হওয়ার অঙ্গিকার করবে সরকারের সাথে?

চুলে পাক ধরা মধ্য প্রহরে আটকে যাওয়া বয়স জিম্মি করে যে আলেমরা নিখোঁজ আজো, তাদের ভাগ্যের রশি জালিম সরকারের হাতে দিতেই কি তবে সমঝোতার কথা উঠছে!
আয়েশার গলা ধরে আসে। ওর আনমনে দৃষ্টি হাঁটতে থাকে এলোমেলো। রান্নাঘরের চায়ের কেটলিতে তখন উম্মাহের ভাগ্য ফুটছে।

ছাদের কার্নিশ বেয়ে অপরাজিতার লতা দক্ষিণের বারান্দার অনেকটা দখল করে আছে। আয়েশার খুব মন খারাপ হলে এই অপরাজিতার ঝোপে এসে নিঃশ্বাস লুকায়। ছাদের কার্নিশে ভর দিয়ে দাঁড়ালেই শীতলক্ষ্যার পাড় আবছা চোখে পড়ে। সাথে কাঁচপুর ব্রিজ! একটা মাসের ব্যবধানে ওর ছুটে চলা জীবন কেমন করুণ হয়ে উঠেছে। এই কদিনের ব্যবধানেই ব্রিজের গল্প পালটে গেছে। রোজ নিয়ম করে ছায়া পড়ে আসা বিকেলে আয়েশা ব্রিজের দিকে তাকিয়ে থাকে। অবাধ্য অশ্রুরা ওর সাথী হয়। এই তো সেদিন গুনতে গুনতেও কত্তোগুলা বছর অতীত হলো। আজ থেকে সাত বছর আগের এমনি এক বিকেল। ৬ই মে…. বিকেলের মুছে যাওয়া আলোয় একটা রক্তাক্ত কিশোরের লাশ সহপাঠিরা কাঁধে নিয়ে দৌড়ে গেলো ওর চোখের সামনে দিয়ে। এই অপরাজিতার ঝোপের কোল ঘেঁষেই যেনো। চোখ বন্ধ করলেই তালহার মুখ ভেসে উঠে ওর স্মৃতিপটে। তালহা আয়েশার ছোট ভাই। নাহবেমীর জামাতে পড়ে তখন। হেফজ শেষ করে কিতাববিভাগে পড়া শুরু করেছে বলেই মিযানে থাকতে তালহার মুখে বাকা চাঁদ উঠে। চিকন গোফের রেখা নতুন চাঁদের মতই কিশোরদের মুখ যেনো আলোকিত করে।

চকিতে আয়েশার মুখে হাসি ফুটে উঠে। তালহা বড় হবার দিনগুলো কি মজার ছিলো। মুখের উপর সারাক্ষণ রুমাল চেপে ধরে মিটিমিটি হাসতো। বাবা তখন তালহার দিকে তাকিয়ে বলতেন, তালহার জন্য সোনালী ফিতার ঘড়ি চাই এইবার একটা। আহা বাবা, জাতির ভাগ্য পকেটে নিয়ে আপনি কোথায় হারিয়ে গেলেন। না, তালহার ঘড়ি হলো না; আমার ময়দানের গল্প শোনা হলো!
আহা! রাষ্ট্রের কর্তাদের নির্দয়তার জন্য তালহার বয়সি এমন কত্তোগুলা কিশোর বোনেদের চোখের আলো চিরদিনের জন্য মুছে দিয়ে হারিয়ে গেলো। বাবা নামক কতো কতো বট গাছ নিখোঁজ সংবাদের গল্প হলো।

তবুও আবার সমঝোতা?

কিসের সমঝোতা!

রাগে অভিমানে কান্নায় আয়েশা ভুলে যায় নিচের বৈঠক ঘরের পর পর মিটিং!

ওর ইয়াদে নেই ওমর ও উসামার ক্ষুধার কথা!

চায়ের পানি শুকিয়ে বিকেলের চা আড্ডায় আজ কারফিউ!

অপরাজিতার লতায় পর পর চারটা ফুল ফুটে আছে সেই খুশিও নেই কোথাও!

কাঠ গোলাপের ঝোপে চড়াই পেতেছে সংসার। সেখানেও দেয়া হয়নি নজর।

আয়েশা এখন থেকে যেনো শুধুই কাঁদবে। কান্নার দহনে ওর বুকের জমিন পুড়ে যাচ্ছে। অজানা একটা মায়া! মিহি মায়া!

শোক! তালহার বয়সি সেই নিথর বুকের কিশোরটার জন্য আয়েশার বুক চিরে এক সমুদ্র শোক! গভীর আলোময় দুচোখের অধিকারী বাবার জন্য এক আঁচল তৃষ্ণা!
ইয়া কাইয়ুম ভোর আর কতদূর…..!

জাবের ইয়ামিন! হাতের আংগুলে গুনে গুনে হিসেব রেখেছেন সময় ও দিনের। আজ ১২৩৪তম দিন। শাপলার আন্দোলনে মূখ্য ভূমিকায় যারা ছিলেন তিনি তাদের কেউ না। অতি সাধারণ একজন আলেম। তবে ন্যায়ের ব্যাপারে আপোষহীন ছিলেন আজীবন। ঈমানের তাগিদেই জড়ো হয়েছিলেন ময়দানে। তারপর ভয়াল এক রাতের গল্প রচনা হলো। বাহিরের আলোয় পৃথিবীর জমিনে কি হচ্ছে তার কোন ধারণা নেই তার। উনার শুধু ইয়াদে আছে দিন বয়ে যেতে যেতে ১২৩৪ দিন পার হয়ে গেছে। শরীরের প্রতিটি কোষ জালিমের কারগুজারির হিসেব জানে। তার খুব মনে পরে আবদ্ধ পরিবেশ নিয়ে একটা ভীতি ছিলো। লিফটে উঠতে পারতেন না। একা রুমেও ঘুমাতে পারতেন না। এটা নিয়ে ছেলে তালহা কত্তো মজা করতো। ছেলের মুখ মনে পড়তেই চোখ ভিজে যায়। মেয়েটার মুখও ভাসে। এই মাটির পৃথিবীতে ওদের সাথে দেখা হবে কিনা আর এটা ভেবে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু উনি কাঁদবেন না নিজের সাথে ওয়াদা করেছেন। প্রিয়তম স্ত্রী চারটি সন্তান নিয়ে কেমন করে জীবন পার করছেন উনি জানেন না। তেল আর নুনের হিসাব করতেও যে মানুষটা ঘেমে যেতো সে কি করে তাবত দুনিয়ার হিসাব একা একা করছে আল্লাহ জানেন। জাবের ইয়ামিনের দুচোখ বিনা নোটিশে ভরে উঠে নোনা জলে।

মেয়ে আয়েশার বিয়ে হয়েছে আমীরে হেফাযতের মেঝো ছেলের সাথে। উনি অতি সাধারণ এক আলেম কিন্তু আয়েশা মা যখন সারা বাংলাদেশে দাওরা জামাতে ১ম স্থান অধিকার করলো কত্তো বড় বড় ঘর থেকে মায়ের জন্য প্রস্তাব এসেছিলো। মেয়ের কথা ভেবে জাবের ইয়ামিনের গর্বে বুকটা দুলে উঠে। মেয়েটার ভিতর একটা অদ্ভুত তেজ ছিলো। ইসলামের গর্বিত ইতিহাস নিয়ে বাপে মেয়ে কতো বিকেল মুগ্ধ আলোচনায় পার করে দিয়েছেন। আহ্ মেয়েটা কেমন আছে কে জানে। আমিরে হেফাজত কি সত্যিই তার হারিয়ে যাওয়া সৈনিকদের নিয়ে কিছু ভাবেন নি। এই এত্তোগুলা বছর কোনো প্রিয় শব্দ তার কানে তো এলো না। কতো কতো সবুজ হৃদয় বন্দি এই অন্ধকারে, বাহিরের পৃথিবী তার কোন হিসাব কি রেখেছে?
কে জানে!

বুকের ভাঁজে নিঃশ্বাস আটকে অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে পশ্চিমের দেয়ালে কান পেতে ক্ষীণ আওয়াজে ডাকতে থাকেনÑ ‘ইয়াকুব ভাই! ইয়াকুব ভাই!’ ডাকতে ডাকতে হঠাৎ মনে পড়ে কাল থেকে ওই দিকের তেমন আওয়াজ কানে আসছে না। পলকেই দুশ্চিন্তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে জাবের ইয়ামিনকে। ইয়াকুব ভাই কি তবে…?

ঠিক মনে পড়ছে কাল রাত থেকেই ওই পাশ থেকে কোন কাশির শব্দ, না নিঃশ্বাসের ভারÑ কিছুই উনি পাচ্ছেন না। তবে কি ইয়াকুব ভাই…! পলকেই দুশ্চিন্তা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে জাবের ইয়ামিনকে। এই বন্দি জীবনে হাতড়ে বেড়ানো বন্ধুরা অন্ধকারেই গল্প হয়ে যায়। এটা এখানের নিয়মিত ঘটনা। তবুও কলিজা মোচড় দেয়।

বুকের গভীরে দলা পাকা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইলে তিনি ধীরে ধীরে দেয়াল থেকে পেছনে সরে আসেন। নিঃশ্বাস আটকে আসে গলায়। এই নিঃসঙ্গ নীরব কারাকক্ষের দেয়ালগুলো যেন আজ আরও ভারী হয়ে ওঠে। ঘরটা ছোট, জানালাহীন, বাতাসের চলাচল নেই বললেই চলে। দিনের পর দিন মানুষের কণ্ঠস্বর না শুনলে কেমন যেন চেতনা ঘোলাটে হয়ে যায়, কল্পনা আর বাস্তবের ভেদরেখা মুছে যেতে চায়।

তবুও তিনি ভাঙেন না। নিজের বুকের ভেতর আলো ধরে রাখার সাধনায় লেগে আছেন আজ ১২৩৪ দিন। তিনি জানেন না এই দিনগোনা কতদূর যাবে। তিনি শুধু জানেন, “জুলুম কোনোদিন টেকে না।” এই বিশ্বাসের উপর ভর করেই এখনো বেঁচে আছেন।

জোহরের আজান হয় না এখানে। বাইরের আলো ঢোকে না, খবর আসে না। অথচ তার ভেতরের ঘড়ি ঠিক সময়েই জানান দেয় জোহর, আসর, মাগরিব, এশা, ফজর… প্রতিটা নামাজ, প্রতিটা মুহূর্ত যেন তার জীবনকে ধরে রেখেছে একটা নিরব প্রহরীর মতো।

একদিন এই নীরবতা ভাঙবে। এই দেয়াল, এই তালা, এই কারা সব একদিন কেঁপে উঠবে। ইনশাআল্লাহ।

রাত বাড়ে। পোকামাকড়ের ঘষাঘষি শব্দ, দূরে কোথাও হয়তো কারা-রক্ষীর পায়ের শব্দ, আর নিজের হৃদস্পন্দন এই নিয়ে একটা নিজস্ব পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছেন তিনি।

হঠাৎ মনে পড়ে যায় তালহার বলা কথা “আব্বু, আপনি তো লিফটে উঠেন না, যদি একদিন আকাশে উড়তে হয়?” তখন তিনি হেসে বলেছিলেন, “তখন তো আমি নিজেই পাখি হয়ে যাবো রে।”
এই কথার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে যেন। তবে আজও কাঁদেন না। প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি অশ্রু নয়, দোয়া দিয়ে এই অন্ধকার চিরে ফেলবেন।

হঠাৎ দেয়ালের গায়ে আবার কান লাগান। না, কিছু শোনা যাচ্ছে না। না কাশি, না আওয়াজ। ভেতরটা ধক করে ওঠে।

জাবের ইয়ামিন নামাজে দাঁড়ান। দু’চোখ বেয়ে কান্না নেমে এলেও ঠোঁট নড়ে না। “হে রব, আমাদের ধৈর্য দাও, সাহস দাও, এবং এই অন্ধকারে যেন আমরা আলো হয়ে থাকতে পারি।”

দোয়াটা শেষ করে তিনি আবার দেয়ালের কাছে যান। এবার নীরব দেয়ালে কান পেতে কিছুক্ষণ থাকেন, তারপর চোখ বন্ধ করে ঠা-া গলায় বলেন—“ইনশাআল্লাহ, ইয়াকুব ভাই একদিন নতুন ভোর আসবে। তখন আমরা সবাই আবার একসাথে দাঁড়াবো ময়দানে।”

দেয়াল চুপ, আকাশ চুপ, বাতাসও থেমে আছে। তবুও, জাবের ইয়ামিন জানেন এই নীরবতার পরেই উচ্চারণ হবে সবচে শক্তিশালী শব্দটা: আযাদী। জাবের ইয়ামিনের চোখে পলকে জ্বলে উঠে মুক্তির আলো!

দেয়ালের গায়ে মাছের কাটায় লিখে রাখেন রোজনামচা…

আমরা আবার এক সাথে বসে জলপাই বাগানে সূর্য ডোবা দেখবো আয়েশার আম্মু, সেইদিন পর্যন্ত তোমার হায়াত দীর্ঘ হোক!

…ঘুম আসে না। রাতের শেষ প্রহর। দেয়ালের কংক্রিট ঠা-া হয়ে এসেছে। জাবের ইয়ামিন ঘুমানোর চেষ্টা করেন না। এই অন্ধকারে ঘুমের বদলে ভাবনাই তার সঙ্গী। হঠাৎ এক বিকেলের কথা মনে পড়ে যায়। সেই কবেকার কথা। সে দিন জামেয়া থেকে ফেরার পথে মেয়েটা তার হাত ধরে বলেছিলো— “আব্বু, জানো? আয়নায় নাকি জিনেরা থাকে! আমি তাকালেই মনে হয় আমাকে দেখে হাসে!”

তখন তিনি আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “না মা, আয়নাতে তো আমাদের নিজের ছায়া থাকে। তুমি ভেতরটা পরিষ্কার রাখলেই, আয়নায় তোমাকে সুন্দর দেখাবে।”
তারপর সেই ছোট্ট মুখটা কবে হারিয়ে গেছে কোথায়…

জাবের হঠাৎ কেঁপে ওঠেন। দেয়ালের পাশ থেকে অদ্ভুত এক ঠা-া বাতাস বইছে। কারাকক্ষে কোনো বাতাস থাকার কথা না। তিনি চারপাশে তাকান। তারপর লক্ষ্য করেন, দরজার উল্টো দিকে, যেদিকে আগে কখনো মনোযোগ দেননি, সেখানে দেয়ালের একটা অংশ অদ্ভুতভাবে চকচক করছে কোনো অদৃশ্য আলোয়।

তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। চোখের পলকে বুক ধকধক করতে থাকে। দেয়ালে হাত রাখেন।

তা আয়না না হলেও আয়নার মতো স্বচ্ছ কিছু। কিন্তু সেখানে তার নিজের মুখ দেখা যায় না। দেখা যায় এক শিশুর মুখ তালহা। তারপর স্ত্রীর মুখ, মেয়েটার মুখ। সবার মুখ। তবে সবার চোখ যেন কথা বলছে।

“তুমি এখনো কেন এখানে, আব্বু?”

“আমরা তো জানি, তুমি এখনো মাথা নত করোনি।”

“আল্লাহ দেখছেন, তুমি একা না।”

জাবের চমকে যান। হাত তুলে ছুঁতে চান চেহারাগুলো। কিন্তু আয়না-ঘরের ভেতর তারা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে। এরপর ভেসে আসে একটি কণ্ঠ, যেন স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে থাকা শব্দ “আয়না মানুষকে তার নিজের ভেতরটা দেখায়। তুমি প্রস্তুত তো নিজেকে দেখতে?”

এই কণ্ঠে ভয় নেই, আছে একটা শক্তি। যেন কোনো অতল আস্থা।

আলো নিভে যায় হঠাৎ। আয়নার মতো দেয়াল আবার নিঃশব্দ পাথর হয়ে যায়।

জাবের মাথা নিচু করে বসে পড়েন। তার ঠোঁটে মৃদু কাঁপা হাসি।

“হ্যাঁ,” নিজের মনে বলেন তিনি, “আমি প্রস্তুত। আমার ভেতরের আলোর কাছে আমি দায়বদ্ধ।”

ভোর আসছে। সুর্যের আলো না, কিন্তু কারাকক্ষের অন্ধকার একটু ফিকে। তার চোখ দু’টো এখন জ্বলছে কতোকালের ঘুমহীন প্রতিজ্ঞা, যন্ত্রণা আর ত্যাগের আগুনে।
একদিন এই আয়নার ভেতর দেখা সেই মুখগুলো আবার সামনে আসবে। আলোয়। ময়দানে।

জাবের ইয়ামিন জানেন, সে দিন খুব দূরে নয়!

রাস্তায় বিজয় উল্লাস। চারিদিকে মোহময় ছন্দে একি বাক্য সবার কন্ঠে “কারার ঔ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট, রক্ত জমাট শিকল-পূজার পাশাণ বেদি। ওরে ও তরুণ ঈষাণ…!”
২০১৩ থেকে ২০২৪!

দীর্ঘ ১১ বছরের অংক। আয়েশা মোহাম্মদপুর মায়ের ভাড়া বাসার বারান্দা থেকে বাহিরের জন¯স্রোতের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছে, আব্বু জালিমের লৌহকপাট ভেঙে গেছে। তরুণ দল আসছে নতুন ভোর নিয়ে। আমাদের ১১ বছরের অপেক্ষার দেয়াল ভেঙেছে। কতো গল্প জমেছে বিগত দিনের। আর খানিক অপেক্ষা করেন। মায়ের চোখে আলো নেই ঠিক। ১১ বছরের অপেক্ষার জল মায়ের সব আলো মুছে দিয়েছে আব্বু! আপনি আসবেন। আমরা আপনার প্রিয় কল্পনার জলপাই বাগানে বসে মায়ের হাতের অমৃত চায়ের আড্ডা বসাবো। শুনবো এই দীর্ঘ বছরের ফেলা আসা গল্প। মা তার সব আলো ফিরে পাবেন। আয়েশার চোখের জলে বুক অব্ধি ভেসে যাচ্ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মা জায়নামাজে। ইয়া রাহমান আপনি আমার মায়ের জন্য একটা সুন্দর বিজয় দৃশ্য রাখবেন। এ আমার আর্জি!

দেশ স্বাধীন হলো। স্বৈরাচারমুক্ত আজ ৫ম সকাল। সবার মনেই খুশির উপচে পড়া আলো। কিন্তু প্রিয়জন যাদের ফেরারি তাদের বিজয় উল্লাস আটকে আছে কারাগার থেকে কারাগারে।
এই অপেক্ষার বেদনা কতটা হৃদয়স্পর্শী, তা শুধু তারাই জানে, যাদের বুকের ভেতর এখনো প্রিয়জন হারানোর দগদগে ক্ষত!

তারা জানে কয়টা ঈদ গেছে ছাদে চাঁদ না দেখে, কয়টা জন্মদিন গেছে শুধু একটা ফোনের আশায়। তারা জানে, বিজয়ের ঢাক বাজলেও, তাদের ঘরে এখনো হুজুর আসেন কেবল গায়েবানা জানাজার জন্য।

আয়নাঘর, শুনতে সুন্দর। আয়না বলে মনে হয় আলো আসবে। কিন্তু আয়নাঘর মানে আসলে জালিমের ল্যাবরেটরি, যেখানে প্রতিদিন একজন মানুষকে মেরে একটা জাতিকে বোঝানো হয় “তোমরা চুপ থাকো, না হলে এমন হবে।”

সেই আয়নাঘরে ছিলো আয়েশার আব্বু। একজন শিক্ষক, একজন সংগঠক, একজন নিভৃতচারী আলেম, একজন মানুষ যে বই দিয়ে যুদ্ধ করতো। যার ব্যাগে বোমা ছিলো না, ছিলো কাব্যগ্রন্থ আর স্বপ্নের নকশা।

ওরা সেই মানুষকে টেনে নিয়েছিলো ভয়াল ৫ই মে’র রাতে। তাদের অপরাধ ছিলো তারা সাধারণ কিছু দাবি নিয়ে জড়ো হয়েছিলো ময়দানে।

১১ বছর ধরে মা শুধু দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। আয়েশা প্রতিদিন ক্যালেন্ডারে একটা করে দিন কাটায় আর ভাবে “আব্বু এখনো বেঁচে থাকলে, কয়টা চুল পেকে যেতো?”
বিজয় এসেছে। কাগজে এসেছে, প্রেস কনফারেন্সে এসেছে, মাইক আর পোস্টারে এসেছে। কিন্তু আয়েশার বাড়ির চৌকাঠে বিজয় থেমে গেছে।

Mastul Abashon Prokalpa (MDP)

তারা বিজয় খুঁজতে গেছে আয়নাঘরের দরজায়। কথিত আয়নাঘর। জালিমের নির্যাতনের নীল নকশা। যেখানে বন্দিদের কোনো নাম থাকে না শুধু কোড নাম্বার। মুরগীর খাঁচার মতো ছোট্ট খুপড়ি। তালহা আজ পাঁচ দিন ধরে বড় মামা আর বোন জামাইকে নিয়ে কারাগার থেকে কারাগারে ঘুরছে। আজ অবশেষে অনেক কসরত করে আয়নাঘরের খুপরিতে এসেছে বাবাকে খুঁজতে। ক্ষণে ক্ষণে তালহার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এই ভয়ংকর সেলে বাবা কি করেই বা থাকবে। বাবার আবদ্ধ জায়গার ভীতি ছিলো খুব। হুহু করে ও কান্না করে দেয়। শুধু ও-ই না এমন কোন পাষাণ হৃদয় নেই যে আয়নাঘরের টর্চার সেল দেখে কান্না করছে না। আশা দুরাশার মাঝে তালহা আয়েশার অপেক্ষার দিন দীর্ঘ হচ্ছে। অপেক্ষা যেনো এক সোনার হরিণ!

নতুন দেশের ৭ম ভোর। আরেকটা আয়নাঘরের সন্ধান মিলেছে ধানমন্ডি ১১তে। আয়েশার জিদ চাপে খুব। স্বামী আর ছোট্ট ভাইয়ের সাথে ও নতুন আবিষ্কৃত আয়নাঘরে যায়। আয়নাঘরের বাসিন্দাদের নির্যাতনের নানা রকম টর্চার সেল, উপকরণ আর অবর্ণনীয় কষ্টের স্থির চিত্র দেখে আয়েশা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দেয়ালে দেয়ালে হাত বুলিয়ে খুঁজে প্রিয় বাবার স্পর্শ।

খুঁজতে খুঁজতে স্যাঁতসেতে একটা সেলের অমসৃণ এক দেয়ালে সন্ধ্যার মুছে যাওয়া আলোয় আয়েশা দেখতে পেলো—আবছা কি যেনো আঁকিবুকি। ওড়নার এক অংশ দিয়ে পরিষ্কার করে খুব যতœ নিয়ে ও লিখাটা পড়ে থমকে যায়।

“আমরা আবার জলপাই বাগানে চায়ের আড্ডা বসাবো, আয়েশার আম্মু। সেই অবধি তোমার হায়াত দীর্ঘ হোক।”

দেয়ালটার সামনে থমকে থাকে, তালহা আর আয়েশা চুপ। কেউ কাঁদে না, কেউ চিৎকার করে না। শুধু বুকের ভেতর এক কবর তৈরি হয় যেখানে আব্বু আছেন, কিন্তু দাফন হয়নি।
স্যাঁতসেঁতে সেলের অন্ধকার, আর একটা ঝাপসা লাইন “আমরা আবার জলপাই বাগানে চায়ের আড্ডা বসাবো, আয়েশার আম্মু। সেই অবধি তোমার হায়াত দীর্ঘ হোক।”

এই লাইনটা তাদের বুকের ভেতর পাথরের মতো গেঁথে যায়। তারা আর কিছু চায় না। না কবর, না খবর। শুধু জানে সে ছিলো, সে ভালোবেসেছিলো, সে ফিরে আসতে চেয়েছিলো।

আর এই দেশটা… কতো ত্যাগের আজকের বিজয় উদ্‌যাপন কতো কান্নার ইতিহাস। এই বিজয় হয়তো কোনোদিন জানবেও না একটা মেয়ে কতোটা অপেক্ষা নিয়ে কিশোর তিনটি ভাই তালহা, তারেক, তানজিমকে সাথে করে ১১ বছর প্রতিদিন ঘুরেছে সেলের গন্ধমাখা দেয়ালের পাশে পাশে।

একজন মা, যিনি জানেন না স্বামীর মৃতদেহ কোন খাঁচায় ফেলে রাখা হয়েছে, তবুও প্রতিরাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, “আমার স্বামীকে মুক্ত করুন, অথবা আমাকে তার কাছে পৌঁছে দিন।”

বাইরে আলো। রাস্তায় বিজয়, মাইক, পতাকা, শোভাযাত্রা। মোহাম্মদপুরের এক পুরনো ফ্ল্যাটের বারান্দায় আয়েশা চুপচাপ বসে আছে। দুই ছেলে ওদের বাবার সাথে বিজয় মিছিলে। তিন ভাই গেছেন আব্বুর জামেয়াতে মৃত্যুর সনদ আনতে। আয়েশার হাতে এক কাপ চা।

সামনে খালি চেয়ার। চেয়ারে কেউ বসে না। তবু সে চায়ের কাপটা রেখে বলে— “আপনার মতো করে বানাইছি, আব্বু। আরেকটু গরম থাকলে আপনি বলতেন, আহা! জীবন বড়ই স্বাদ।”
মা পাশে এসে বসেন। তিনিও চা নেন না, কথা বলেন না। শুধু বাতাসের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আর মনে মনে উচ্চারণ করেন– “ইয়া রাহমান, আপনি আমার স্বামীর কবরের জায়গা না দিলেও, তার চিহ্ন দিয়েছেন, তার ভালোবাসা দিয়েছেন। এইটাই আমার বিজয়।”

আয়েশার মনে পরে ১১ বছর আগের বিকেলের কথা!

এইভাবেই শেষ হয় একেকটা যন্ত্রণার অধ্যায়— নীরবে, বুকের ভিতর আর হাজারো মানুষের চোখের কোণে— যারা শুধু প্রশ্ন করে, “আব্বু আসবেন তো?”

বাবা কি সুন্দর আমামা বেঁধে রাজপথে নেমেছিলেন। বিজয় নিয়ে ঘরে ফিরবেন। এত্তো দীর্ঘ অপেক্ষার পর এমন বিজয় কেনো দিলেন মালিক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top