মাত্র বাইশ বছর বয়সে কাজী নজরুল ইসলাম, নিজের তো বটেই, বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখে ফেলেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে রচিত এই কবিতাটি তাকে খ্যাতির শিখরে তুলে দেয়। বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে নানান ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। আমি নানান সময় এর ছন্দের জাদুটা ধরার চেষ্টা করেছি। কবিতাটির ভিত্তি মাত্রাবৃত্ত ছন্দ কিন্তু এতে প্রচুর অপূর্ণ পর্ব এমনভাবে সন্নিবেশিত রয়েছে যে এর দ্যোতনা তাতে কেবল বেড়েছেই। এই রচনায় পুরো কবিতাটির ছন্দ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে আট মাত্রার পর্ব নির্মাণ করে কবিতা লিখেছেন। সেগুলো সুখপাঠ্য এবং জনপ্রিয়ও হয়েছে কিন্তু কবিরা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে প্রধানত ৫, ৬ ও ৭ মাত্রার পর্ব নির্মাণ করতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন এবং এক কবিতায় নানান মাত্রার মিশ্রণ খুব একটা ঘটান না। এতে ছন্দের প্রবহমানতা ভেঙে পড়ে।
নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার ভিত্তি ৬ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত। আমার দৃঢ় ধারণা নজরুল মাত্রাবৃত্তের তাল গুনে গুনে এই কবিতা লেখেননি, তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লিখে গেছেন। একজন প্রকৃত কবি আঙুলে ছন্দ গুনে কবিতা লেখেন না।
অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই আজ আবিষ্কার করার চেষ্টা করবো, এই কবিতার ছন্দ বিন্যাস।
বল বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর।
এই অংশের ছন্দটা দেখা যাক—
প্রথম লাইনে রচিত ‘বল বীর’ চার মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব। দ্বিতীয় লাইনে আছে ‘বল উন্নত মম শির’। এখানেও শুরুতে ‘বল’ এবং শেষে ‘শির’ দুটি দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব এবং ‘উন্নত মম’ ছয় মাত্রার একটি পূর্ণ পর্ব। অথবা দ্বিতীয় লাইনটিকে ৬/৪-এও ভাগ করা যায়— ‘বল উন্নত/ মম শির’। তৃতীয় লাইনে আছে, ‘শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির’। এখানেও লাইনের শুরুতে ‘শির’ এবং শেষে ‘রির’ (হিমাদ্রির শব্দটির মধ্যখণ্ডন করা হয়েছে) দুটি দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব আছে এবং মাঝখানে আছে ৬ মাত্রার ৩টি পূর্ণ পর্ব— ‘নেহারি আমারি/ নত শির ওই/ শিখর হিমাদ্’। চতুর্থ লাইনে আবার ‘বল বীর’ চার মাত্রার অপূর্ণ পর্ব। পঞ্চম লাইনের শুরুতে ‘বল’ দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব থাকলেও লাইনের শেষে আর কোনো অপূর্ণ পর্ব নেই, আছে দুটি পূর্ণ পর্ব- ‘মহাবিশ্বের/ মহাকাশ ফাড়ি’। যে লাইনগুলোতে শুধুমাত্র চার মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব এবং পরের লাইনের শুরুতে দুই মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব আছে, সেখানে দুটি অপূর্ণ পর্বকে (৪+২) একসঙ্গে একটি পূর্ণ পর্ব হিসেবেও ধরা যায়। যেমন- প্রথম ও দ্বিতীয় লাইনের এবং চতুর্থ ও পঞ্চম লাইনের ‘বল বীর + বল’।
৬, ৭ এবং ৮ লাইনে দুটি করে পূর্ণ পর্ব আছে। (৬) ‘চন্দ্র সূর্য্য/ গ্রহ তারা ছাড়ি’ (৭) ‘ভূলোক দ্যুলোক/ গোলক ভেদিয়া’ (৮) ‘খোদার আসন/ আরশ ছেদিয়া’। নবম লাইনে গিয়ে তিনটি পূর্ণ পর্বের পরে একটি ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্বের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে- ‘উঠিয়াছি চির/-বিস্ময় আমি/ বিশ্ববিধাত/ রির’ (বিশ্ববিধাতৃর শব্দটির মধ্যখণ্ডন ঘটেছে)।
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর
আমি চির উন্নত শির!
আমি চির দূর্দম, দূর্বিনীত, নৃশংস,
মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
এখানেও প্রথম লাইনের শুরুতে এবং শেষে দুটি অপূর্ণ পর্ব ‘মম’ এবং ‘রীর’ আছে। মাঝখানে আছে ৪টি ৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব ু ‘ললাটে রুদ্র/ ভগবান জ্বলে/রাজ-রাজটীকা/ দীপ্ত জয়শ’। জয়শ্রীর শব্দটির মধ্যখণ্ডন ঘটেছে। ‘দীপ্ত’-এর সঙ্গে এসেছে ‘জয়শ’, ৩+৩ মিলে ৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব, আর ‘রীর’ আলাদা হয়ে নির্মিত হয়েছে দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব। কবিতাটির পুরো শরীর জুড়ে বহু জায়গায় এই মধ্যখণ্ডনের ঘটনা ঘটেছে।
পরের লাইনের ‘বল বীর’ এবং তার পরের লাইনের ‘আমি’ মিলে একটি ৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব ধরা যায়, যা আগেও বলেছি। অথবা দুটি আলাদা অপূর্ণ পর্বও ( ৪ এবং ২ মাত্রার) ধরা যায়। তৃতীয় লাইনের শেষেও একটি দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘শির’ আছে, মাঝখানে আছে একটি পূর্ণ পর্ব ু ‘চির উন্নত’। চতুর্থ লাইনটি ইউনিক, এখানে ৩টি অপূর্ণ পর্ব এবং একটি পূর্ণ পর্ব আছে। শুরুতে ‘আমি’ ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব, এরপরে ‘চির দুর্দম’ একটি পূর্ণ পর্ব এবং তার পরে ‘দূর্বিনীত’ ৫ মাত্রার একটি এবং শেষে ‘নৃশংস’ ৪ মাত্রার আরো একটি অপূর্ণ পর্ব। ‘দূর্বিনীত’-কে কেউ অশুদ্ধ পূর্ণ পর্ব বলতে পারেন। কিন্তু যেহেতু পড়তে গিয়ে এখানে আমাদের শ্বাসাঘাতে কোনো ব্যত্যয় ঘটে না, তাই আমি একে ‘অশুদ্ধ’ পূর্ণ পর্ব বলবো না, বরং বলবো, শুদ্ধ ৫ মাত্রার ঊনপর্ব।
পূর্ণ পর্বের মাত্রাসংখ্যার চেয়ে (এক্ষেত্রে ৬ মাত্রা) ছোটো যে কোনো সংখ্যার অপূর্ণ পর্ব প্রকরণসিদ্ধ, তবে অপূর্ণ পর্ব সাধারণত পঙক্তির শুরুতে কিংবা শেষে থাকে, এই পাঁচ মাত্রার পর্বটি পঙক্তির মাঝে থাকায় বিশ্লেষকেরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তাই একে আমি অপূর্ণ পর্ব না বলে ঊনপর্ব বলছি। পাঁচ মাত্রার এই ঊনপর্বটি আবার চার মাত্রার একটি শুদ্ধ স্বরবৃত্তের পর্বও হয়েছে। এরকম ঘটনা এই কবিতায় আরও আছে।
পরের লাইনে তিনটি পূর্ণ পর্ব- ‘মহাপ্রলয়ের/ আমি নটরাজ,/ আমি সাইক্লোন’ এবং শেষে একটি ৫ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি ধ্বংস’ আছে। এরপরের পঙক্তিতে দুটি পূর্ণ পর্ব ‘আমি মহাভয়/ আমি অভিশাপ’-এর পরে একটি ৪ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘পৃথ্বীর’ আছে। পরের ৩ লাইনে ক্রমাগত পূর্ণ পর্ব সাজিয়েছেন (৭) ‘আমি দুর্বার (৮) আমি ভেঙে করি/ সব চুরমার (৯) আমি অনিয়ম/ উচ্ছৃঙ্খল’ এবং দশম লাইনে গিয়ে দুটি পূর্ণ পর্ব ‘আমি দলে যাই/ যত বন্ধন’-এর পরে একটি দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘যত’ রেখে আবার একটি পূর্ণ পর্ব ‘নিয়ম কানুন’ লিখেছেন এবং পঙক্তিটি শেষ করেছেন একটি ৪ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘শৃঙ্খল’ দিয়ে। বিদ্রোহী কবিতায় পঙক্তির মাঝখানে মাঝখানেও তিনি বেশ কিছু অপূর্ণ পর্ব ব্যবহার করেছেন, যা ছন্দোবদ্ধ কবিতায় বিরল।
‘আমি মানি না কো কোনো আইন,
আমি ভরা তরী করি ভরা-ডুবি,
আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহ-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর
চির উন্নত মম শির!
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ
আমি আপনার তালে নেচে যাই আমি মুক্ত জীবনানন্দ।’
এই অংশের প্রথম লাইনের শুরুতে এবং শেষে ২ মাত্রার দুটি অপূর্ণ পর্ব ু ‘আমি’ এবং ‘আইন’ আছে, মাঝখানে আছে একটি মাত্র পূর্ণ পর্ব ‘মানি না কো কোনো’। দ্বিতীয় লাইনে দুটি পূর্ণ পর্ব ‘আমি ভরা তরী/ করি ভরা-ডুবি’ থাকলেও, তৃতীয় লাইনে গিয়ে আবার ভেঙ্গেছেন। এই লাইনটিকে দুইভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। শুরুতে এবং শেষে দুটি ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ এবং ‘মাইন’, মাঝখানে দুটি পূর্ণ পর্ব ‘টর্পেডো, আমি/ ভীম ভাসমান’। অথবা পূর্ণ পর্ব ‘আমি টর্পেডো’ দিয়ে শুরু, এর পরে অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ এবং তারপর যথাক্রমে পূর্ণ পর্ব ‘ভীম ভাসমান’ এবং শেষে আবার দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘মাইন’।
চতুর্থ লাইনটিও ঠিক একই রকম, মাঝের ‘আমি’-কে অপূর্ণ পর্ব ধরে লাইনটি ভেঙে পড়া যায়, আবার শুরুর ‘আমি’-কে অপূর্ণ পর্ব ধরে মাঝের ‘আমি’-কে ‘ধূর্জটি’-র সঙ্গে যুক্ত করে পূর্ণ পর্ব করা যায়। আমি লাইনটিকে এভাবে পড়ার পক্ষে ‘আমি ধূর্জটি, (৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব)/ আমি (২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব)/ এলোকেশে ঝড় (৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব) / অকাল বৈশা (৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব) /খীর (২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব)’। এই লাইনে ‘বৈশাখীর’ শব্দটির মধ্যখণ্ডন ঘটেছে। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করুন, ‘বৈশা’ কিন্তু মাত্রাবৃত্তে ছন্দে ৩ মাত্রা (বই ২ মাত্রা + শা ১ মাত্রা)। এখন প্রশ্ন করতে পারেন ‘আইন’ ‘মাইন’ এর ক্ষেত্রে ‘ই’ কোনো মাত্রামূল্য পেল না কিন্তু বৈ-এর স্বরধ্বনি কেন মাত্রামূল্য পেল? ‘ই’ দিয়ে যদি অক্ষর/স্বর (বর্ণ না কিন্তু, এখানে অক্ষর বলতে সিলেবল বোঝানো হচ্ছে) শেষ হয় তাহলে ‘ই’ ব্যাঞ্জনধ্বনির রূপ নেয় (মানে সেটা বদ্ধাক্ষর হয়ে যায়), তাই এক্ষেত্রে ‘ই’ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এক মাত্রা ধারণ করে। ‘ই’ যদি সিলেবলের মাঝে থাকে তাহলে তা স্বরচিহ্নের কাজ করে ফলে ‘ই’ তখন কোনো মাত্রামূল্য বহন করে না।
পরের লাইনটি আমি এভাবে পড়ার পক্ষেঃ পূর্ণ পর্ব ‘আমি বিদ্রোহী’, ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব – ‘আমি’, পূর্ণ পর্ব ‘বিদ্রোহ-সুত’, পূর্ণ পর্ব ‘বিশ্ব-বিধাত’, ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘রির!’
ষষ্ঠ লাইনে ৪ মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব – ‘বল বীর’, সপ্তম লাইনের শুরুতে এবং শেষে একটি করে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব যথাক্রমে ‘চির’ এবং ‘শির’ এবং মাঝখানে একটি পূর্ণ পর্ব ‘উন্নত মম’। অষ্টম লাইনে পরপর দুটি পূর্ণ পর্ব ‘আমি ঝঞ্ঝা/ আমি ঘূর্ণি’। নবম লাইন দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর দুটি পূর্ণ পর্ব ‘পথ-সম্মুখে/ যাহা পাই যাই’ এবং শেষ হয়েছে একটি ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘চূর্ণি’ দিয়ে। দশম লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৩ মাত্রার ‘ছন্দ’ দুটি অপূর্ণ পর্ব আছে, মাঝখানে আছে একটি পূর্ণ পর্ব ‘নৃত্য পাগল’। একাদশ লাইনেরও শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৩ মাত্রার ‘নন্দ’ রয়েছে। মাঝখানে আছে ৩টি পূর্ণ পর্ব ‘আপনার তালে/ নেচে যাই আমি/ মুক্ত জীবনা’। ‘জীবনানন্দ’ শব্দটির মধ্যখণ্ডন ঘটেছে এই লাইনে।
‘আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী আমি ভীতি এ-ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির অধীর!
বল বীর-
আমি চির উন্নত শির!’
এই অংশের প্রথম এবং তৃতীয় লাইনে কোনো অপূর্ণ পর্ব নেই। প্রথম লাইনে ৩টি পূর্ণ পর্ব ‘আমি হাম্বীর,/ আমি ছায়ানট,/ আমি হিন্দোল’। তৃতীয় লাইনে ২টি পূর্ণ পর্ব ‘পথে যেতে যেতে/ চকিতে চমকি’। কিন্তু দ্বিতীয় লাইনের শুরুতে আবার একটি অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ রেখে দুটি পূর্ণ পর্ব ‘চল-চঞ্চল,/ ঠমকি ছমকি’ দিয়ে শেষ করেছেন। চতুর্থ লাইন শুরু করেছেন পূর্ণ পর্ব ‘ফিং দিয়া দিই’ দিয়ে কিন্তু শেষ করেছেন ৪ মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব ‘তিন দোল’ দিয়ে।
পরের লাইন ঠিক একইভাবে লিখেছেন, ‘আমি’ (২ মাত্রার অপূর্ণ) ‘চপলা-চপল’ (পূর্ণ) ‘হিন্দোল’ (চার মাত্রার অপূর্ণ)। ষষ্ঠ এবং সপ্তম লাইনে একটি মজার কাজ আছে। পঙক্তির শেষে সমমাত্রার অতিপর্ব (বা অপূর্ণ পর্ব) ব্যবহারের পরামর্শই বিশেষজ্ঞরা দিয়ে থাকেন কিন্তু নজরুলের কবিতায় এর ব্যত্যয় আছে এবং তা কবিতাকে একটুও ম্লান করেনি বরং আরও ধারালো করেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ষষ্ঠ লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৩ মাত্রার ‘মন যা’ লিখলেও সপ্তম লাইনের শুরুতে কোনো অপূর্ণ পর্ব না রেখে শেষে একটি ৫ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘সাথে পাঞ্জা’ লিখেছেন। ছন্দকে ভেঙে এমন সফল ছন্দ নির্মাণ বাংলা কবিতায় বিরল। পরের লাইনেও একটি পূর্ণ পর্ব ‘আমি উন্মাদ,’ দিয়ে শুরু করলেও শেষ করেছেন পাঁচ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি ঝঞ্ঝা’ দিয়ে।
পরের লাইনটি সাজিয়েছেন এভাবেঃ ‘আমি/ মহামারী আমি/ ভীতি এ-ধরিত/ রীর;’। শেষ তিন লাইনের পর্ব বিভাজন নিচে দেখানো হলো।
(১০)‘আমি/ শাসন-ত্রাসন/ সংহার আমি/ উষ্ণ চির অ/ ধীর! (১১) বল বীর- (১২) আমি/ চির উন্নত/ শির!’
আমি চির দুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম হ্যায় হর্দম ভরপুর মদ।
আমি হোমশিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রানী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য;
আমি কৃষ্ণ কন্ঠ, মন্থন বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধীর।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর-
চির উন্নত মম শির!
৬ মাত্রার মাত্রবৃত্ত যে কবিতার ভিত্তি, সেই কবিতার গায়ে কখনো কখনো ৫ মাত্রার পর্ব বেশ সাবলিলভাবেই বসে যায়, যদি পাঁচ মাত্রার মাত্রাবৃত্তের পর্বটি স্বরবৃত্তের একটি পূর্ণ পর্ব হয়ে যায় তখন এটা আরও নিবিড়ভাবে মেশে।
মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্তের এ-জাতীয় সংমিশ্রণকে অনেকে স্বরমাত্রিক
ছন্দের কবিতা বলে থাকেন।
ওপরে উদ্ধৃত অংশের দ্বিতীয় লাইনটিকে নানান ভাবে ভাঙা যায়। ‘আমি’-কে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব রেখে পড়া যায় ‘আমি/ দুর্দম, মম/ প্রাণের পেয়ালা/ হর্দম হ্যায়/ হর্দম ভর/ পুর মদ’। আবার কবিতাটির প্রবহমানতা এবং যতিচিহ্নের বিরাম ঠিক রেখে এভাবেও ভাঙা যায় – ‘আমি দুর্দম,/ মম প্রাণের পেয়ালা/ হর্দম হ্যায়/ হর্দম/ ভরপুর মদ’। এক্ষেত্রে ‘মম প্রাণের পেয়ালা’ ৮ মাত্রার একটি অধিপর্ব এবং ‘হর্দম’ ৪ মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব পাওয়া যাবে, যা ছন্দ-দ্যোতনায় কোনো ব্যঘাত সৃষ্টি করে না।
অপূর্ণ পর্বকে অনেকে অতি পর্ব বা ভাঙা পর্বও বলেন। পঙক্তির শেষে থাকলে তাকে অতিপর্ব বলা যৌক্তিক হলেও শুরুতে বা মাঝে থাকলে তাকে অপূর্ণ পর্ব বা ভাঙা পর্ব বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। চতুর্থ লাইনটি ৫/৬/৫ মাত্রায় সন্নিবেশিত হয়েছে। ৫ মাত্রার পর্ব দুটিকে এখানে অপূর্ণ পর্ব বলা যেতে পারে আবার অপূর্ণ কথাটি না বলে দুটি ৫ মাত্রার পর্ব বা দুটি স্বরবৃত্তের পর্বও বলা যেতে পারে। ‘আমি যজ্ঞ’ এবং ‘আমি অগ্নি’ পর্ব দুটি একদিকে যেমন সফল ৫ মাত্রার পর্ব আবার দুটি নিখুঁত স্বরবৃত্ত ছন্দেরও পর্ব। এই পর্ব দুটি স্বরমাত্রিক পর্বের প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ।
স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের পার্থক্য হচ্ছে, স্বরবৃত্তে এক সিলেবল বা স্বর এক মাত্রা কিন্তু মাত্রাবৃত্তে খোলা সিলেবল বা স্বরগুলো এক মাত্রার হলেও বন্ধ সিলেবল বা স্বরগুলো দুই মাত্রা ধারণ করে। যেমন যজ্ঞ, অগ্নি, এই শব্দ দুটি বিশ্লেষণ করলে আমরা পাইঃ যগ+গ, অগ+নি। যগ এবং অগ বন্ধ স্বর, স্বরবৃত্তে এদের মান ১ হলেও মাত্রাবৃত্তে এদের মান ২। গ এবং নি খোলা স্বর, সব ছন্দেই এদের মান ১ মাত্রা।
পরের লাইনের ‘আমি লোকালয়’ ছাড়া অন্য ৩টি পর্ব ‘আমি সৃষ্টি,’ ‘আমি ধ্বংস,’ এবং ‘আমি শ্মশান,’ স্বরমাত্রিক পর্ব। প্রতিটি পর্বই ৫ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে এবং ৪ মাত্রার স্বরবৃত্তে শুদ্ধ, তাই ৬ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতায় খুব স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে গেছে।
এই অংশের দশম লাইনের মাঝখানে একটি ২ মাত্রার অতিপর্ব ‘ধরি’ ছাড়া বাকি লাইনগুলির শুরুতে এবং শেষেই কেবল অপূর্ণ পর্ব আছে।
আমি সন্ন্যাসী সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইসরাফিলের শিঙ্গার মহাহুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বমিত্রা-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ খোলা হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহাপ্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহুগ্রাস!
আমি কভূ প্রশান্ত কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
এই অংশের প্রথম ৩টি লাইন পূর্ণ পর্বে রচিত। চতুর্থ লাইনে এসে শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৪ মাত্রার ‘কুর্নিশ’ অপূর্ণ পর্ব রেখেছেন। পঞ্চম লাইন সাজিয়েছেন ৫/২/৬/৪ -এ। এক পঙক্তিতে চার মাত্রার চারটি পর্ব লিখে ছন্দের দ্যোতনা ঠিক রাখা কেবল কাজী নজরুল ইসলামের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে।
ষষ্ঠ লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার এবং শেষে ৪ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ছাড়া মাঝে আছে দুটি পূর্ণ পর্ব ‘আমি/ ইসরাফিলের/ শিঙ্গার মহা/ হুঙ্কার’। পরের লাইনেও শুরুতে ২ মাত্রার এবং শেষে ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব এবং মাঝখানে আছে ৩টি পূর্ণ পর্ব ‘পিনাক-পাণির/ ডমরু ত্রিশূল,/ ধর্মরাজের’। অষ্টম লাইনের ছন্দটি বেশ জটিল, এখানে ভাঙতে হবে ২/৬/৫/৬/৩ মাত্রায় ‘আমি/ চক্র ও মহা/ শঙ্খ, আমি/ প্রণব-নাদ প্র/ চণ্ড’। তৃতীয় পর্ব ‘শঙ্খ, আমি’ একটি পাঁচ মাত্রার ঊনপর্ব। পরের দুটি লাইন একই রকম। শুরুতে ২ মাত্রার ও শেষে ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব এবং মাঝখানে দুটি করে পূর্ণ পর্ব। একাদশ এবং দ্বাদশ লাইন যে দুটি শব্দ দিয়ে শেষ হয়েছে সেই দুটি শব্দের মাত্রামূল্য নিয়ে কথা আছে। আমরা যদি পাঠ করি, ম+হা+ত্রাস এবং রা+হু+গ্রাস তাহলে প্রতিটি শব্দের মাত্রামূল্য ৪। কিন্তু যদি পাঠ করি, ম+হাত+রাস এবং রা+হুগ+রাস তাহলে প্রতিটি শব্দের মাত্রামূল্য হবে ৫ মাত্রা। এ ধরনের শব্দ কবিতায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের কানকে সজাগ রাখতে হয়। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল ঠিক একই বৈশিষ্ট্যের দুটি শব্দ দিয়ে অন্ত্যানুপ্রাস তৈরি করেছেন, কাজেই ৪ বা ৫, মাত্রামান যাই হোক না কেন, তাতে ছন্দের কোনো হেরফের ঘটে না। মুনশিয়ানাটা হচ্ছে ঠিক একই বৈশিষ্ট্যের দুটি শব্দ দিয়ে যুগল তৈরি করতে পারা এবং অন্ত্যানুপ্রাস নির্মাণ করতে পারা। শেষ লাইনে গিয়ে আবার তিনি ভেঙেছেন, পঙক্তির মাঝখানে ২ মাত্রার একটি অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ রেখে।
আমি প্রভোঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছ্বল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!
আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্নি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয় লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!
প্রথম লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৪ মাত্রার ‘কল্লোল’ ছাড়া ভেতরে রয়েছে ৩টি পূর্ণ পর্ব ‘প্রভোঞ্জনের/ উচ্ছ্বাস, আমি/ বারিধির মহা’। পরের দুই লাইনে শুধুই পূর্ণ পর্ব (৩) আমি উজ্জ্বল,/ আমি প্রোজ্জ্বল, (৪)আমি উচ্ছ্বল/ জল-ছল-ছল,/ চল-ঊমির/ হিন্দোল-দোল!’
চতুর্থ লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৩ মাত্রার ‘বহ্নি’ অপূর্ণ পর্ব ছাড়া ভেতরে আছে ৩টি পূর্ণ পর্ব। পঞ্চম লাইনের শেষে একটি পাঁচ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি ধন্যি’ ছাড়া আছে ৩টি পূর্ণ পর্ব। এ-লাইনের শুরুতে কোনো অপূর্ণ পর্ব নেই। ষষ্ঠ, সপ্তম এবং অষ্টম লাইনে কোনো অপূর্ণ পর্ব নেই। এই তিনটি লাইন কবি সাজিয়েছেন শুধুমাত্র পূর্ণ পর্ব দিয়ে। নবম লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৪ মাত্রার ‘গতি ফের’ ছাড়া ভেতরে রয়েছে ৪টি পূর্ণ পর্ব ‘অবমানিতের/ মরম বেদনা,/ বিষ-জ্বালা, প্রিয়/ লাঞ্ছিত বুকে’।
এই কবিতার অধিকাংশ লাইনের শুরুতে এবং শেষে অপূর্ণ পর্ব আছে। দশম লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ৪ মাত্রার ‘সুনিবিড়’ শব্দ দুটি অন্য অনেক লাইনের মতোই সন্নিবেশিত হয়েছে। একদশ লাইনেও একই রকমভাবে শুরুতে ২ মাত্রার ‘চিত’ এবং শেষে ৪ মাত্রার ‘কুমারীর’ অপূর্ণ পর্ব রয়েছে। তবে আগের লাইনে ৩টি পূর্ণ পর্ব থাকলেও এই লাইনে ৪টি পূর্ণ পর্ব আছে। ছন্দ বিষয়ে যাদের প্রাথমিক ধারণা আছে তারা যুগলের মধ্যে সমান সংখ্যক পর্ব না থাকলে ছন্দ ঠিক থাকে না মনে করেন। আমি ছন্দ-শিক্ষার্থীদের এ-কথা বহুবার বলেছি, যুগল পংক্তিদ্বয়ের (যে দুটি লাইনের শেষে অন্ত্যানুপ্রাস দেয়া হয়) মধ্যে পূর্ণ পর্বের সংখ্যা কম-বেশি হলে ছন্দে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না, দক্ষতার সঙ্গে বসাতে হয় অপূর্ণ পর্ব। এক্ষেত্রে মাত্রার হেরফের হলে, বিশেষ করে পঙক্তির শেষে অবস্থিত অপূর্ণ পর্বে, ছন্দে গোলমাল লেগে যায়।
ব্যক্তিক্রম অবশ্যই আছে, ছন্দে অতিমাত্রায় দক্ষ না হলে এ-ধরনের সফল ব্যতিক্রম সৃষ্টি করা কঠিন।
এই অংশের শেষ দুটি লাইন একইরকম ভাবে লিখেছেন। শুরুতে একটি ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব এবং শেষে একটি ৪ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব। ভেতরে আছে ৩টি করে পূর্ণ পর্ব।
আমি চির শিশু, চির কিশোর
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ-কী উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ মর্ত্য করতলে,
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!
প্রথম ৪টি লাইন একই সূত্রে রচিত। প্রতিটি লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার এবং শেষে ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব। পূর্ণ পর্ব আছে প্রথম লাইনে ১টি এবং পরের তিন লাইনে ৩টি করে।
পঞ্চম লাইনটি মূলত দুটি পঙক্তি কিন্তু তিনি এক লাইনে লিখেছেন। লাইনটির পর্ব বিন্যাস হবে এভাবে। ‘আমি/ আকুল নিদাঘ/-তিয়াসা,/ আমি/ রৌদ্র-রুদ্র/রবি’। ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্বের পরে একটি পূর্ণ পর্ব। এরপরে একটি তিন মাত্রার অপূর্ণ পর্ব। এই কবিতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পঙক্তিটি এখানেই শেষ হয়ে যায়। পরের অংশ আবার শুরু হয়েছে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ দিয়ে, এরপর পূর্ণ পর্ব – ‘রৌদ্র-রুদ্র’ এবং শেষ হয়েছে দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘রবি’ দিয়ে।
ষষ্ঠ লাইনের শুরুতে এবং শেষে দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ এবং ‘ছবি’ আছে, ভেতরে আছে ৩টি পূর্ণ পর্ব। পরের লাইন দুটিও একই বৈশিষ্ট্যের তবে শেষ হয়েছে ৪ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘উন্মাদ’ এবং ‘সব বাঁধ’ দিয়ে। নবম লাইনে এসে ৫ মাত্রার একটি ঊনপর্ব ‘পতন, আমি’ লিখেছেন, এখানে এসে ছন্দ কিছুটা হোঁচট খায়। পুরো লাইনটির সঙ্গে পাঁচ মাত্রার এই পর্বটি সম্পূর্ণ মেশেনি। একই বৈশিষ্ট্যে পরের লাইনটি নির্মিত হলেও এ-লাইনে কোনো ঊনপর্ব না থাকায় আবার ঋজু হয়ে উঠেছে।
পরের চার লাইন মূলত দুটি পঙক্তি, তিনি ৪ লাইনে লিখেছেন। দুটি পঙক্তিই একই আদলে নির্মিত। শুরুতে ২ মাত্রার এবং শেষে ৪ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব, ভেতরে প্রথমটিতে ৩টি এবং দ্বিতীয়টিতে ৪টি পূর্ণ পর্ব।
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সঞ্চারি ভূবনে সহসা সঞ্চারি ভূমিকম্প।
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’-
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।
আমি দেব শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অঞ্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহাসিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্ব নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক বাহিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহী-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
এই অংশের অষ্টম লাইনটি ছাড়া বাকি সবগুলো লাইন রচিত হয়েছে একই বৈশিষ্ট্যে।
প্রতি লাইনের শুরুতেই ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব আছে। ১, ২, ৭, ১০, ১১ লাইনের শেষে ৪ মাত্রার অতিপর্ব এবং ৩, ৪, ৫, ৬, ৯, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ লাইনের শেষে ৩ মাত্রার অতিপর্ব আছে। ভেতরে পূর্ণ পর্বের সংখ্যা বিভিন্ন লাইনে বিভিন্ন রকমভাবে সাজানো হয়েছে।
অষ্টম লাইনে একটি ব্যতিক্রম আছে। এই লাইনটিকে ‘আমি ধৃষ্ট,/ আমি/ দাঁত দিয়া ছিঁড়ি/ বিশ্ব মায়ের/ অঞ্চল!’ অথবা ‘আমি/ ধৃষ্ট, আমি/ দাঁত দিয়া ছিঁড়ি/ বিশ্ব মায়ের/ অঞ্চল!’ এভাবেও ভাঙা যায়। এই বৈশিষ্ট্যের লাইন নিয়ে আগেও আলোচনা করেছি। তবে যেভাবেই ভাঙা হোক না কেন এই লাইনে একটি ৫ মাত্রার ঊনপর্ব থেকেই যায়। এই ঊনপর্বটি [‘আমি ধৃষ্ট’ অথবা ‘ধৃষ্ট, আমি’]
পঙক্তির প্রবহমানতার সঙ্গে তেমন অসঙ্গতি তৈরি করেনি।
আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরণীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা-
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর, অমর, অক্ষয়, আমি অব্যয়।
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল-বলরাম স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
উপরের অংশের প্রথম ৫ লাইনের মধ্যে চতুর্থ লাইনটি ছাড়া বাকি লাইনগুলো একই বৈশিষ্ট্যে রচিত। প্রতি লাইনের শুরুতেই ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব এবং প্রথম তিন লাইনের শেষে ৩ মাত্রার অতিপর্ব, পঞ্চম লাইনের শেষে আছে ২ মাত্রার অতিপর্ব। চতুর্থ লাইনটি সম্পূর্ণ স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এখানে তিনটি স্বরবৃত্ত ছন্দের পূর্ণ পর্ব রয়েছে, ‘আমি অন্যায়,/ আমি উল্কা,/ আমি শনি,’। মাত্রাবৃত্তে ভাগ করতে গেলে এদের মান দাঁড়ায় ৬/৫/৪। ষষ্ঠ লাইনে ৪টি অপূর্ণ পর্ব আছে। শুরুতে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’, একটি পূর্ণ পর্ব ‘ছিন্নমস্তা’-র পরে ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘চন্ডী’, এরপরে আবারও ২ মাত্রার ‘আমি’ এবং শেষে ২ মাত্রার ‘নাশী’। ৭, ৮, ৯ লাইন তিনটি একই বৈশিষ্ট্যের। প্রতিটি লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব এবং শেষে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার অতি পর্ব আছে।
দশম লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ থাকলেও শেষে কোনো অতি পর্ব নেই এবং তা প্রবাহিত হয়েছে পরের লাইনেও, অর্থাৎ পরের পুরো লাইনটি রচিত হয়েছে দুটি পূর্ণ পর্ব, ‘বিশ্বের আমি/ চির-দুর্জয়’, দিয়ে। পরের লাইনের শেষে ৩ মাত্রার একটি মাত্র অপূর্ণ পর্ব ‘সত্য’ আছে।
ত্রয়োদশ লাইনের মাঝখানে ৫ মাত্রার একটি ঊনপর্ব ‘মাথিয়া ফিরি’ পঙক্তিটির সঙ্গে দারুণ মানিয়ে গেছে। পরের লাইনে দুটি পূর্ণ পর্ব।
পঞ্চদশ এবং ষষ্ঠদশ লাইনের শুরুতেই দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ আছে। পঞ্চদশ লাইনের শেষে ৪ মাত্রার অতিপর্ব ‘সব বাঁধ’ থাকলেও ষষ্ঠদশ লাইনের শেষে কোনো অতি পর্ব নেই। সপ্তদশ লাইনটি চারটি পূর্ণ পর্বে রচিত ু‘নিঃক্ষত্রিয়/ করিব বিশ্ব,/ আনিব শান্তি/ শান্ত উদার!’ শেষ দুটি লাইন একই বৈশিষ্ট্যের, শুরুতে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ আছে দুটি লাইনেই, এবং শেষেও তিন মাত্রার অপূর্ণ পর্ব যথাক্রমে ‘স্কন্ধে’ এবং ‘নন্দে’ আছে।
মহাবিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না –
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেব পদচিহ্ন!
আমি খেয়ালি-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!
শেষাংশের প্রথম দুটি লাইন একইভাবে রচিত। যদিও লাইন দুটি ৬/৫ এ বিন্যাস করা যায় কিন্তু পুরো কবিতার বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রাখলে বিন্যাসটি করতে হয় ২/৬/৩ মাত্রায়। অর্থাৎ দুটি লাইনই শুরু হয়েছে ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব দিয়ে এবং শেষ হয়েছে ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব দিয়ে। তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইন প্রায় একই রকমভাবে রচিত হলেও তৃতীয় লাইন শুরু হয়েছে একটি দুই মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘যবে’ দিয়ে কিন্তু চতুর্থ লাইন শুরু হয়েছে পূর্ণ পর্ব দিয়ে। দুটি লাইনই শেষ হয়েছে ৪ মাত্রার অতিপর্ব যথাক্রমে ‘ধ্বনিবে না’ এবং ‘রণিবে না’ দিয়ে। পঞ্চম লাইন ৬/৩ মাত্রায় লিখলে ষষ্ঠ লাইনটি আবার শুরু করেছেন ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ দিয়ে। পরের চারটি লাইন একই বৈশিষ্ট্যে রচিত।
প্রতিটি লাইনের শুরুতে ২ মাত্রার এবং শেষে ৩ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব আছে।
কবিপুত্র সব্যসাচী কাজীর আবৃত্তিতে অবশ্য নবম এবং দশম লাইন পাওয়া যায় না। এবং এই দুটি লাইন সপ্তম এবং অষ্টম লাইনের অনেকখানিই পুনরাবৃত্তি।
একাদশ লাইনের শুরুতে অপূর্ণ পর্ব ‘আমি’ থাকলেও শেষ লাইন শুরু হয়েছে পূর্ণ পর্ব ‘বিশ্ব ছাড়ায়ে’ দিয়ে।
ইতোপূর্বে অনেকেই এই কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ করেছেন, কিছু কিছু পড়ার সুযোগও আমার হয়েছে কিন্তু কোনটাই পূর্ণাঙ্গ মনে হয়নি। হয়ত ভবিষ্যতের কোন গবেষক আমার বিশ্লেষণটিকেও অপূর্ণাঙ্গ ঘোষণা করতে পারেন।
ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্ত হচ্ছে এই কবিতার ভিত্তি। বিদ্রোহী কবিতা বাংলা ভাষায় লিখিত সবচেয়ে ধ্বনিমাধুর্যময় কবিতা। বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অসাধারণ সব শব্দের সমাহার তিনি ঘটিয়েছেন এবং সেই শব্দসম্ভার নানান মাত্রার অপূর্ণ পর্বের বিন্যাসে তৈরী করেছে ছন্দের দামামা। ছয়মাত্রার পর্ব আমরা সবগুলো মুক্তাক্ষর দিয়ে তৈরী করতে পারি, সবগুলো বদ্ধাধাক্ষর দিয়ে তৈরী করতে পারি আবার মুক্তাক্ষর এবং বদ্ধাক্ষরের মিশেল দিয়েও তৈরী করতে পারি। এই ক্রাফটিংয়ের দক্ষতার ওপরই ধ্বনিমাধুর্য নির্ভর করে। কোনো সূত্র দিয়ে এটি নিশ্চিত করা যাবে না কীভাবে পর্ব তৈরী করলে স্যামুয়েল কোলরিজের ‘শ্রেষ্ঠতম শব্দের শ্রেষ্ঠতম বিন্যাস’ হবে। এটি একজন কবির সহজাত গুণ, কিংবা বলা যেতে পারে এটিই ঐশ্বরিক ক্ষমতা। একজন কবুয়তপ্রাপ্ত কবির কাছে পঙক্তিরা উড়ে উড়ে আসে, কবিতাই তখন কবিকে লিখতে থাকে, নজরুল ছিলেন সেই কবি।
কাজী জহিরুল ইসলাম