জন্ম : ২৫ মে ১৮৯৯, (১১জৈষ্ঠ ১৩০৬), ইন্তেকাল : ২৯ আগষ্ঠ ১৯৭৬, (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ।
খরার মধ্য দিয়ে রসের অভিযাত্রা, এ যেন নজরুল জীবনের প্রতীকী রূপক। জৈষ্ঠের খরায় তিনি এলেন, ভরা ভাদরের বর্ষণ ঝরিয়ে তিনি বিদায় নিলেন। জৈষ্ঠের দাবদাহের পর, ভাদরের অঝোর ধারা বর্ষণে শুষ্ক ক্লিষ্ট মাটি যেমন প্রাণ ফিরে পায়, নজরুল ইসলামের আবির্ভাবে, শুষ্ক রুগ্ন বাঙালী মুসলমানও তেমনি প্রাণ ফিরে পেয়েছিলো ।
আঠারো শতকের শেষ ভাগে বাঙালী মুসলমানের জীবন ছিলো নিদারুন খরাদগ্ধ। ঘরে ঘরে চলছিলো দুরন্ত জৈষ্ঠের দাবদাহ। নিষ্পেষণের খরতাপে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো মুসলিম জাতিসত্তা ও জাতীয় পরিচয়। জৈষ্ঠের তপ্ত সূর্য ভেদ করে এলেন নজরুল। প্লাবন এলো, রস সঞ্চারিত হলো বাঙালী মুসলমান জাতির শিকড়ে। নব পত্রপল্লবে সুশোভিত হয়ে উঠলো মৃতপ্রায় বাঙালী মুসলমানের প্রাণবৃক্ষ। কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম খরা জৈষ্ঠে, ভরা ভাদরে তার বিদায়, এ যেন বাংলার মুসলিম জাতির জীবনেরই এক অনিবার্য রূপক ।
আমরা অনেকে এ কথাটা বিশ্বাস করতে চাইনা যে, নজরুল ইসলাম না জন্মালে আধুনিক বাঙালী মুসলিম জাতির জন্ম হতো না, আর আধুনিক মুসলিম জাতির জন্ম না হলে স্বাধীন মুসলিম ল্যান্ড হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশেরও উদ্ভব হতো না। বাংলাদেশ এবং কাজী নজরুল ইসলামের নাম অবিচ্ছিন্নভাবে পরস্পর কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছে। এদের বিচ্ছিন্ন করে দেখতে গেলে দেশ এবং জাতি দুটোরই অপমৃত্যু ঘটবে। তাই তো তিনি আমাদের সকলের প্রিয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল আমাদের জাতিসত্ত্বার রূপকার। নজরুল বাংলাদেশী জাতিসত্ত্বার প্রাণপ্রবাহ।
নজরুল আমাদের জীবনে একদিনের বাদশাহ নন। নিত্যদিন প্রতিদিন জুড়ে তার আনাগোনা, ভাবপ্রকাশ। আমাদের প্রতিদিনের কথনে, বচনে, চিন্তায় চেতনায়, শিক্ষা সংস্কারে, অনুভবে, কলমের কালিতে জড়িয়ে আছে তঁাঁর সৃষ্টি, তাঁর স্বাতন্ত্র্য। নজরুলের স্বাতন্ত্র চিন্তা বাদ দিলে আমরা বৃন্তচ্যুত হবো, হারিয়ে যাবো। নজরুলকে জানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাভাষী মুসলমানদের প্রাণধারণের জীয়নকাঠি।
তুরস্কের এক কবি বলেছিলেন ‘কোনো কবিকে জানতে হলে তার তাঁবুতে অন্বেষন করো’। বাংলাসাহিত্যের দিকপাল সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অন্বেষন করলে আমরা জানতে পারি, তার প্রফেট শ্রীকৃষ্ণ, ধর্মগ্রন্থ গীতা এবং জাতীয়তাবাদ হিন্দু। তার পথ ধরে রবীন্দ্রনাথ এলেন উপনিষদের সন্তান হয়ে। বঙ্কিম লিখলেন ‘আনন্দ মঠ’ রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘গোরা’। বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন, ‘বন্দে মাতারম’ অর্থাৎ মায়ের পায়ে মাথা নত করলাম, রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কা হরণ” কিংবা “ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।” দু’টিতেই দূর্গা স্তব, দুটিতেই মূর্তি বন্দনা। তারা উভয়েই ভারতবাসীর হাত ধরে নিয়ে চললেন ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ভারতের পথে। কিন্তু পিছনে পড়ে থাকলো যে বিপুল জনগোষ্ঠী যারা অবতারবাদী নয়, তাদের দেখবার কেউ রইলো না।
এমনি সময়ে উত্তর পশ্চিম ভারতে জন্মালেন কবি আল্লামা ইকবাল (১৮৭৭ সাল) এবং দক্ষিণ পূর্বে আবির্ভূত হলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ সাল)। তাঁরা দুজনেই অনুভব করলেন ভারতের বৃহৎ জনগোষ্ঠী মুসলমানরা প্রকৃত অর্থে তাঁবুহারা গৃহহারা। আপাতদৃষ্টিতে তাদের জীবিত মনে হলেও তারা জীবন্মৃত। হিন্দুত্ববাদের কাছে শ্বাস-প্রশ্বাস ধার করে কোন রকমে বেঁচে আছে। উভয়ে অনুভব করলেন, এভাবে বেঁচে থাকা তো বাঁচা নয়। এপার থেকে নজরুল হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন–
“কোথা সে আজাদ, পূর্ণ মুক্ত মুসলমান ?
আল্লাহ ছাড়া করে না কারেও ভয়, কোথা সেই প্রাণ?”
ওপার থেকে মুহম্মদ ইকবাল ডাক দিলেন-
“ইয়া রব! দিল এ মুসলিমকা ওহ্ জিন্দাহ তামান্না দে,
জো, কলব্ কো গরমাদে, জো, রূহ্ কো তড়পা দে ,
ফিরওয়াদি ফাঁরা কে হর্জররে কো চমকা দে,
ফির শওকে তামাশা দে, ফির যওকে তাকাযা দে”
অর্থাৎ, ইয়া রব! তুমি মুসলমাদের চিত্ত জীবন্ত ইচ্ছায় উদ্ভাসিত করো, যে জীবন্ত চিন্তায় তাদের হৃদয় উষ্ণ হয়, (মৃত) আত্মা উজ্জীবিত করো, ফারানের মৃত্তিকা কণাকে আলোকোজ্জল করো, তাকে কৌতুহলী করো, তার চিত্ত অনুসন্ধানী ইচ্ছায় উদ্দীপ্ত করো।
একই ঐক্যতান দুই কবির কণ্ঠে। উভয়েরই লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জাগিয়ে তোলা ।
“ওরে বে-খবর তুইও ওঠ জেগে, তুইও তোর প্রাণ প্রদীপ জ্বাল।” উর্দূ ভাষীরা ঠিকই তাদের প্রাণের জাতীয় কবিকে চিনে নিয়েছে, তিনি সরকারিভাবে পাকিস্তানের জাতীয় কবি। গোল বেঁধেছে শুধু কাজী নজরুল ইসলামের বেলায়। তাতে কবি নজরুলের কোনো ক্ষতি হয়নি, জাতি হিসাবে আমরা ছোট হয়ে গেছি।
কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। একেকজন একেক রূপে তাঁকে সাজাতে চাইছেন। কেউ বলছেন নজরুল সাম্যবাদী, কেউ বলছেন অবতারবাদী, কেউ বলছেন তিনি দেবপূজারী, কেউ বা বলছেন তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ! এক বিশাল ভ্রান্তি বাংলাভাষী- মুসলমানদের এমন ভাবে বেষ্টন করে রেখেছে যে, তারা বুঝতেই পারছে না, বাংলা কাব্যসাহিত্যে যখন তাদের নিয়ে লেখার কেউ ছিলো না, সর্বত্রই ‘আনন্দময়ীর আগমনের’ আনন্দধ্বনি শোনা যাচ্ছিলো নিরানন্দ ঈদের চাঁদ দুঃখের তপ্ত নিঃশ্বাস উদ্গীরন করছিলো মুসলিম বাংলার ঘরে ঘরে, তখন নজরুল ইসলামই এলেন খুশিতে ডগমগ ঈদের বার্তা নিয়ে “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”। নজরুল বিহনে খুশির ঈদের বার্তা, ঈদ-আনন্দের বার্তা কে শোনাতো বাংলা কাব্যে?
চর্যাপদ থেকে অধুনা বাংলা সাহিত্য পর্যন্ত, বাঙালী মুসলমান পাঠক পড়ে এসেছে, শুনে এসেছে, আনন্দময়ী, দূর্গা, কালী, সরস্বতী, মনসা, জগধাত্রী, দেবতা, ব্রাহ্মণ, ঠাকুর, পুরোহিত, ভজন কীর্তন প্রভৃতি শব্দমালা।
নজরুল ইসলাম এলেন, বাংলা সাহিত্য একদেশদর্শী রূপ থেকে বেরিয়ে এসে সার্বজনীন হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে যেমন পৌরাণিক মিথ এলো, তেমনি এলোÑ ঈদ, ফাতিহা দোয়াজদহম, আল্লাহ, রাসূল, আজান মসজিদ, কাবা, অজু, নামাজ, কালেমা, রোজা, খালেদ, তারেক, মুসা, খয়বর, শেরে খোদা, প্রভৃতি মুসলিম ধর্ম ও ইতিহাস ঐতিহ্য ভিত্তিক শব্দাবলি। যা এতোদিন অচ্ছ্যুৎ জ্ঞানে পরিহার করা হয়েছিলো, সেই শব্দাবলি নজরুলের কলমে এসে বাংলা সাহিত্যে প্রাণ সঞ্চার করলো।
রবীন্দ্র কবিতা যখন বৈষ্ণব কবিতার দ্বারে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো, নজরুল তখন বাংলা কাব্যে ফারসী গজলের প্রাণরস সঞ্জীবিত করলেন। বাংলাভাষী মুসলমানরা বাংলা কাব্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি বিম্বিত হতে দেখে চিৎকার করে উঠলো এই তো আমাদের কবি, একেই তো খুঁজছিলাম এতোদিন ধরে।

নজরুল ইসলাম সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তাঁর কাব্যে হিন্দু মুসলিম সমান প্রাধান্য পেয়েছে। শুধু হিন্দু মুসলিম কেন, শাক্ত বৈষ্ণবরাও তাঁর কাব্য রস থেকে বঞ্চিত হয়নি। নজরুলের এই উদার মানবতাবাদ, সাম্য মৈত্রীর বাণী সবটুকুই ইসলামের মূল রস থেকে আহরিত । ধর্মের কুসংস্কারকে তিনি আঘাত করেছেন, কিন্তু ধর্ম পরিহার করেন নি। তিনিই তো ডাক দিয়ে বলেছেন- “আল্লাহ তে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’’! তিনি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন কিন্তু নিজের সম্প্রদায়কে বর্জন করে নয়। তিনি বলেছিলেন “আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে বাংলা কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাদের কাছ থেকে টুপী আর চাপকান চান না। তারা চান মাঝেমাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে, ফুলবনে কোকিলের গানের বিরতিতে, ‘বাগিচায় বুলবুলি’র সুর। এখানেই নজরুলের বৈশিষ্ট্য, নজরুলের স্বাতন্ত্র্য। নজরুলের ভাষা আহরিত হয়েছিলো তৎকালীন বাংলার ষাটভাগ মুসলমানের উঠান-দহলিজের ভাষা থেকে, এখানেই নজরুল সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য। বাংলাভাষায় তিনশ’র মত ইসলামি গান রচনা করে আপন সংস্কৃতিহারা বাঙালী মুসলমানদের আপন ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুগত করে তুলেছিলেন, এখানেই নজরুলের স্বাতন্ত্র্য। এগুলো গতানুগতিক কোনো ঘটনা ছিলো না, এ ছিলো তাঁর অন্তরে লালিত মিশন (mission)-এরই বহিঃপ্রকাশ। কাজী নজরুল ইসলামের মিশন কী ছিলো সেটা তাঁর সৃষ্টির মাঝেই ছড়িয়ে আছে। খুঁজে নিতে বেগ পেতে হয় না, শুধু চাই কবিকে জানার ইচ্ছা এবং দৃষ্টির স্বচ্ছতা।
দার্শনিক টমাস কার্লাইল বলেছিলেন ‘যদি কোনো সমাজ প্রজ্ঞাবান এবং সৎ মানুষের সন্ধান পায়, তবেই সে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচতে পারে’। নজরুল ইসলামের হাত ধরেই একদিন বাংলার মুসলিম সমাজ ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিলো। আজ আবার বাংলার মুসলমান সমাজ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি মূল্যবোধ এক এক করে ধসে পড়েছে, এমন সময় নেই কোনো প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ত্ব, যে আশা জাগিয়ে বলবে- ‘‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নুতন সৃজন বেদন! /আসছে নবীন- জীবন হারা অসুন্দরে করতে ছেদন’’/ তাই সে এমন কেশে বেশে/ প্রলয় বয়েও আসছে হেসে/ মধুর হেসে/ ভেঙেও আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর”।