শুদ্ধতার ঘ্রাণ

তখনও বিকেল শুরু হয়নি। সূর্যটা মধ্য গগন থেকে সবেমাত্র পশ্চিমে গড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করেছে। এই সময়ই সমস্ত আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে গেলো। সেই সাথে অন্ধকার নেমে এলো ধরনীর পরে।

চারপাশটা কেমন গুমোট বাধা একটা আবহ তৈরি করলো।

আকাশের পশ্চিম কোণা দিয়ে মেঘগুলো দ্রুত সরে যাচ্ছে। কিন্তু মধ্য গগন ও অন্য তিন পাশের মেঘ স্থির হয়ে রইলো। ভূতুড়ে একটা পরিবেশ ঘিরে ধরল যেনো সমস্ত পৃথিবীটাকে।
‘যাহ্! কারেন্ট চলে গেলো!’ হতাশা ঝরে পড়লো হেলালের কণ্ঠে।

‘কী অন্ধকাররে বাবাহ্!’ বলে উঠলো সাইফুল।

‘কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামলো কেমনে?’ প্রশ্নটা করল আনছার। ‘এখনও তো জোহরের নামাজও পড়া হয়নি! না কি …’ সন্দেহ দেখা দিলো ওর কণ্ঠে।
আব্দুল্লাহ বসা থেকে উঠে দেয়ালে লাগানো সুইচ বোর্ড হাতড়ে একটা সুইচ চাপলে আলো জ্বলে উঠলো রুমে।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যেনো সবাই।

এই সময় বাইরে তীব্র আলোর ঝলকানি বয়ে গেলো। পরক্ষণই প্রচণ্ড শব্দে কোথাও বজ্রপাত হলো। লাফিয়ে আনছারকে জড়িয়ে ধরলো সাইফুল।

‘এই দেখো ভীতুর ডিমের অবস্থা।’ সাইফুলকে নিজের গায়ের ওপর থেকে সরাতে সরাতে বললো আনছার।
এরপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমক ও সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাজ পড়ে চললো।

কয়েক বছর ধরে এটাই হচ্ছে। বৃষ্টি শুরুর আগে ঘন ঘন বজ্রপাত। মানুষ মৃত্যুর হারও বেড়ে গেছে অনেক। আর একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়— বৃষ্টিপাতের তুলনায় ঝড়ঝাপটা বেশি।
এবারের গ্রীষ্মকালটা ততটা তপ্ত মনে হচ্ছে না। প্রচণ্ড খরতাপে পুড়ছে না মাঠঘাট। আবহাওয়া নরমই বলা যায়। সময় সময় স্বল্পমাত্রার বৃষ্টি আগুনে পানি ঢালার মতো কাজ করছে। তারপরও যেটুকু তাপ দিয়ে চলেছে সূর্যটা— মাঝে মাঝে তাপদাহের হলকা বাড়িয়ে তুলছে প্রাণীকুলের তৃষ্ণা। তখন ফুলস্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিয়েও হাঁসফাঁস ভাব কাটানো দুষ্কর। ইট-পাথর আর কংক্রিটের ধারণ করা তাপ কামারের হাপড়ের মতো বাইরে ছড়িয়ে দিচ্ছে।


ওরা চারজন সহযোদ্ধা— নিজেদেরকে এভাবেই পরিচয় দেয় ওরা— হেলাল, সাইফুল, আনছার আর আব্দুল্লাহ। টুকটাক সাহিত্য চর্চা করে ওরা। জীবিকার জন্য সংগ্রাম শেষ করে যেটুকু সময় পায়, মানে জোর করে যেটুকু সময় বের করে নেয়, সে সময়টা কোথাও বসে আড্ডা দেয়। চলে সমকালীন সাহিত্য নিয়ে তুমুল আলোচনা। আব্দুল্লাহর বেডরুমটাই ওদের বেশি পছন্দ। বারো বাই দশ মাপের রুমটার দক্ষিণে প্রায় দেয়ালজোড়া জানালা। ওর বাবা আহমদুল্লাহ একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। সেই সাথে পরিবেশ তথা আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়েও বেশ পড়াশোনা আছে। তিনিই বাড়িটা সেভাবেই তৈরি করেছেন। আর ছেলেকেও শিখিয়ে দিয়েছেন পুরো ব্যাপারটা। তবে আব্দুল্লাহ বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়েনি। ওর ঝোঁক লেখালেখিতেই বেশি। পেশা হিসেবে প্রকাশনা শিল্পকেই বেছে নিয়েছে। ওর বেডরুমটা তাই ছোটো খাটো একটা মুদ্রনালয়ই বলা যায়।


বাংলাদেশের মতো মৌসুমী ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি কঠিন, কারণ এখানে তাপমাত্রা আসলে যা থাকে, আর্দ্রতার কারণে তার চেয়ে তিন থেকে চার ডিগ্রি বেশি অনুভূত হয়। তাই তাপমাত্রাজনিত আরাম বা থার্মাল কমফোর্ট নিশ্চিত করতে হয় ভবনের নকশা করার সময়েই। এক্ষেত্রে ভবনের দিক নির্ধারণ হতে পারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে বাতাস আসে। পূর্বদিকে সূর্যালোক সংক্রান্ত সমস্যা থাকায় সাধারণত দক্ষিণমুখীভাবে খোলা রাখলে ঘরে বাতাস প্রবেশ করা সহজ হয়। ভবনের সামনে রাস্তা যেদিকেই থাকুক না কেন, নকশা করার সময় তাই চেষ্টা করা উচিত যেন নিচতলা বাদে প্রতিটি ইউনিট কিছুটা দক্ষিণ দিক পায় ও উত্তর-দক্ষিণ বরাবর যথেষ্ট খোলা (দরজা, জানালা, বারান্দা) থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে নানা কারণে এসবের কোনোটিই সম্ভবপর না হতে পারে। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে দরকারি হচ্ছে ক্রস ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করা। প্রতিটি ঘরে দুটি দিক যদি বাইরের সাথে খোলা থাকে, তাহলে প্রতি দেয়ালে একটি করে জানালা দেওয়া উচিত। যদি সেটা সম্ভব না হয়, একই দেয়ালে দুটি জানালা দিয়ে বা জানালার আয়তন বাড়িয়ে ক্রস ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে দরজা-জানালা মিলিতভাবেও ক্রস ভেন্টিলেশনের কাজ করতে পারে। কক্ষের ভেতরের বাতাস প্রবাহমান রাখতে পারলে তাপমাত্রা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ফ্যান কোনো নতুন বাতাস তৈরি করে না। শুধুমাত্র ঘরের বাতাস প্রবাহমান রাখে। তাই দরজা-জানালা খোলা রেখে ফ্যান চালালে সেটি অধিক কার্যকর হয়।


আবার এটাও মনে রাখা দরকার যে, ঘরে সূর্যের আলো প্রবেশ করলেই ঘর অধিকতর গরম হয় না। সূর্যালোককে যদি স্তিমিত করে ঘরে প্রবেশ করানো যায়, তাহলে তা যেমন আলোর চাহিদা পূরণ করবে, তেমনি ঘরের তাপমাত্রাও বাড়বে কম। এটি করতে সূর্যালোক ঘরের বেষ্টনির যে তলগুলোতে পড়ছে, সেগুলো ছায়ায় রাখতে পারলে ঘরের তাপমাত্রা অনেক কম থাকবে। আজকাল সব বাসাতেই থাই গ্লাসের জানালা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি জানালার আয়তন অর্ধেক করে ফেলে এবং স্থায়ী কাঁচের ব্যবহারের কারণে ঘরে তাপ আটকে থাকে বেশি। এজন্য ঐতিহ্যবাহী পাল্লা ধরনের জানালার ব্যবহার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পালন করতে পারে দারুণ ভূমিকা।
আহমদুল্লাহ সাহেবের বাড়ি তৈরিসংক্রান্ত এই নীতিমালা আব্দুল্লাহর সাথে সাথে অন্যদেরও মুখস্থ।
কিন্তু এখনকার বিষয় সেটা না। গুড়ুম গুড়ুম মেঘের ডাক, কালো আকাশ বিদীর্ণ করে বিদ্যুৎ চমকের ঝলকানি আর বজ্রপাতের তাণ্ডব বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে চার সহযোদ্ধার কাছে। যার যার মতো করে সাহিত্য রস উগড়ে চলেছে ওরা। সবাই সবারটা শুনছে আর বাহবা দিচ্ছে।
এমনই ওরা। কারোর প্রতি কারোর কোনো হিংসা বা অনুরাগ নেই। একসাথেই পত্রিকায় লেখা পাঠায় ওরা। তবে ছাপা হয় খুব কমই। তবুও থেমে থাকে না। চলতেই থাকে ওদের সাহিত্যচর্চা।
বাইরে এবার তুমুল বর্ষা শুরু হয়েছে।


প্রসঙ্গক্রমে এক সময় কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষা বন্দনা এলো। হেলাল তার ভাঙা গলায় গেয়ে উঠলো—

ছড়ায়ে বৃষ্টির বেলফুল, দুলায়ে মেঘলা চাঁচর চুল/ চপল চোখে কাজল মেঘে আসিল কে/ বাজায়ে মেঘের মাদল/ ভাঙালে ঘুম ছিটিয়ে জল,/ একা-ঘরে বিজলিতে এমন হাসি হাসিল কে/ এলে কি দুরন্ত মোর ঝোড়ো হাওয়া,/ চির-নিঠুর প্রিয় মধুর পথ-চাওয়া।/ হৃদয়ে মোর দোলা লাগে/ ঝুলনেরই আবেশ জাগে,/ ফলে-যাওয়া বাসি মালায়- আবার ভালোবাসিল কে
‘চমৎকার বর্ণনা!’ বলে উঠলো আনছার। ‘কি চমৎকারভাবে বর্ষার মেঘের রূপ বর্ণনা করা হয়েছে এই গানে- নানা রূপকতা অবলম্বন করে।’

হেলাল বললো, ‘কবি এই গানের স্থায়ীতে বর্ষার বৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেওয়া বেলফুল হিসেবে কল্পনা করেছেন। আর আকাশজোড়া এলোমেলো মেঘরাশিকে কল্পনা করেছেন চপল কাজল চোখের মেঘবালিকার কুঞ্চিত চুল হিসেবে। মেঘবালিকা আসে মেঘের মাদল বাজিয়ে, ঘুম ছুটানো জল ছিটিয়ে, বিজন ঘরে বিজলির হাসি ছড়িয়ে। সে আসে দুরন্ত ঝোড়ো হাওয়া সাথে নিয়ে, আসে চিরনিঠুর প্রিয়তমের পথচাওয়ার গোপন আনন্দের অভিসারিণীর বেশে। তারই পরশে কবির হৃদয়ে প্রেমের দোলা লাগে। মনে জাগে প্রণয়যুগলের ঝুলনের আবেশ। স্মৃতিকাতরতায় ব্যর্থ প্রেমের বাসি ফুলে জাগে নতুন ভালোবাসার সাধ!’ একটু থামল হেলাল। চোখ বুলিয়ে নিলো অন্যদের মুখের ওপর দিয়ে। সবাই বেশ আগ্রহ ভরেই ওর কথাগুলো শুনছে। কাজেই, আরও আগ্রহ সৃষ্টি হলো নজরুল সম্পর্কে জ্ঞান জাহির করার। বিশেষ করে এই গানটি নিয়ে— ‘এই গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুলাই অর্থাৎ ২৬ আষাঢ় ১৩৪৭ বঙ্গাব্দ রোজ বুধবার, বিকাল ৫টায় কলকাতা বেতার কেন্দ্র ক-এর চতুর্থ অধিবেশনে, বিকাল ৫টা থেকে ৫.৪৫টা পর্যন্ত ‘পল্লীমঙ্গল আসর’-এ নজরুল ইসলামের রচিত ‘বর্ষা মোদের প্রাণ’ গীতিকা-অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। ওই অনুষ্ঠানেই গানটি প্রথম পরিবেশিত হয়েছিল। তখন নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বছর ১ মাস।’

হেলালের কথা শেষ হতেই আনছার বলে উঠলো, ‘সত্যিই হেলাল, তুমি দিনে দিনে একজন বড় মাপের নজরুল গবেষক হয়ে উঠছো। আমি বাপু তোমার মতো অমনটা হতে পারবো না। তবে যৎসামান্য জানা আমারও আছে। সম্প্রতি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জাতীয় কবির একটা গল্প আছে “বাদল বরিষণে” নামে। সেখানে তিনি শুরুই করেছেন এভাবে—
বৃষ্টির ঝম-ঝমানি শুনতে শুনতে সহসা আমার মনে হল, আমার বেদনা এই বর্ষার সুরে বাঁধা!…
সামনে আমার গভীর বন। সেই বনে ময়ূরে পেখম ধরেছে, মাথার উপর বলাকা উড়ে যাচ্ছে, ফোটা কদম ফুলে কার শিহরণ কাঁটা দিয়ে উঠছে, আর কীসের ঘন-মাতাল-করা সুরভিতে নেশা হয়ে সারা বনের গা টলছে!…’
আনছারকে থামিয়ে দিয়ে আব্দুল্লাহ শুরু করলো এবার। বলল, ‘গল্পের শেষটা আমিই বলি শোনো— যখন চোখ মেলে চাইলাম, তখনও বৃষ্টির ধারা বাঁধ-ছাড়া অযুত পাগলাঘোড়ার মতো ঝরে ঝরে পড়ছে — ঝম ঝম ঝম! এত জলও ছিল আজকার মেঘে! আকাশ-সাগর যেন উলটে পড়েছে, এ বাদল-বরিষণের আর বিরাম নেই, বিরাম নেই!…
বৃষ্টিতে কাঁপতে কাঁপতে দেখলাম, আঁখির আগে আমার নীলোৎপল-প্রভ মানস-সরোবরে ফুটে রয়েছে সরোবর-ভরা নীল-পদ্ম।
আসরটা এখন পুরোপুরি নজরুলচর্চায় রূপ নিয়েছে। বোঝায় যাচ্ছে, নজরুল নিয়ে ওদের সবারই বেশ গবেষণা আছে। হেলালের ভাষ্যে, নজরুল শুধুমাত্র সাহিত্যের ক্ষেত্রেই চর্চার বিষয় না, জীবনের সকল ক্ষেত্রেই নজরুল গবেষণা প্রয়োজন। নজরুলের পুরো জীবনটা যেরূপ সংগ্রামে মোড়ানো, তেমনি আমাদের সবার জীবনটা হওয়া উচিত। নজরুলের শিকল ভাঙার গান তো বিপ্লবী জীবনের একান্ত অনুষঙ্গ! চব্বিশের বর্ষা বিপ্লব তো এই গানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিলো আর সবশেষে বিজয় অর্জন হয়েছে। নজরুল যেমন হাতে প্রেমের বাশরী আর ফুলের ডালা বহন করেছেন, তেমন হাতে তুলে নিয়েছেন বন্দুক। ঝাঁপিয়ে পড়েছেন যুদ্ধে। মানবতার পাশে রচনা করে চলেছেন জীবনের জয়গান।


‘কিন্তু এই রুদ্র গ্রীষ্মে আমরা কেনো বর্ষার কোমলতা নিয়ে পড়লাম?’ হঠাৎ করেই প্রশ্নটা ছুড়লো হেলাল। তবে কাউকে উদ্দেশ্য করে না। আসলে রজরুলের দীপ্ত উচ্চারণকে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছে না ও। বৈশাখ পুরাতনের বিদায় দেয়। আনে নতুন কাব্য। বৈশাখ আসে ঝড় নিয়ে। এজন্য বৈশাখ সাহসী, ক্ষ্যাপা, বৈরী, অশান্ত, অসীম, আর সেই সাথে মারমুখো ও নির্দয়। আমাদের জাতীয় কবির রেখে যাওয়া বৈশাখের ছন্দমালা এখনো দুলে বাতাসের ভেলায়। বলতে গেলে নজরুল নিজেই ছিলেন বৈশাখের প্রতীক। সাহিত্যে কালবৈশাখীর মতোই তার আবির্ভাব। বিদ্রোহী কবিতায় তার উচ্চারণ— ‘আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকালবৈশাখীর।/
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী সূত-বিশ্ব বিধাত্রির।’

প্রতি বছর ফিরে আসে বৈশাখ। নতুন বছর। নতুন সূর্যের আভায় বিচ্ছুরিত আলোকণা দুলে ওঠে হৃদয়ে। আর কবিমনে আলোড়ন জাগাতে আসে বৈশাখ। গাছে নতুন পাতা যোগ করার মতোই আমাদের মনকে নতুন করে বৈশাখ। নির্লিপ্ত আকাশ চুইয়ে গ্রীষ্মের দাবদাহ যখন জীবন মরুময় করে, চৈতালি রোদে যখন কাঁদামাটি ঠনঠনে, মাঠে-ঘাটে কৃষক-কৃষাণীর যখন নাভিশ্বাস, তখনই বৈশাখ আনে ঝড়। সাথে নির্মল পানির ফোয়ারা। আনে প্রশান্তির শীতল বাতাস। ঘরময় তৈরি হয় এক নীরব আবহ। সেই ঝড় শুষ্ক পাতা ঝড়িয়ে দেয়। নবীন জন্মকে তরান্বিত করে। তবে এই গড়ার মাঝে অনেককিছু ভেঙ্গেও দিয়ে যায়। বাড়ি ঘর তছনছ করে দিয়ে যায় তার তীব্র স্রোতময় গতি দ্বারা। এজন্য ঝড়কে ধ্বংসেরও প্রতীক বলা হয়। তবে সেটা নিছক ধ্বংসই নয় এই ঝড় সৃষ্টিও করে অনেক কিছু। রাখে অফুরন্ত সম্ভাবনা।

কিন্তু বর্তমানকালের বৈশাখে সেই আবহ কমই পরিলক্ষিত হয়। এখন বৈশাখ মানে ধ্বংস, জীবনদান।


‘কড়্ড়াৎ…’ প্রচণ্ড শব্দে পাশেই কোথাও বজ্রপাত হলো। চমকে উঠলো চারজনই।

‘কী ভীরু দেখ আমরা!’ ভীরুতা ভেঙে বলে উঠলো আনছার। ‘অথচ এই আমরাই চাচ্ছি নজরুলকে ধারণ করতে।’
‘এতে দোষের কিছু নেই।’ বললো হেলাল। ‘ঝড় সবার জন্যই ভয়ের এবং আতঙ্কের। এর ভেতর থেকেই শক্তি সঞ্চয় করতে হয়। খুঁজে নিতে হয় জীবনের মানে। যারা এ কাজটা করতে পারে, তারাই পুরাতন ও জরা-জীর্ণতাকে ভেঙে নতুন কিছু গড়তে জানে। ক্ষমতার মসনদ পারে নাড়িয়ে দিতে। উৎখাত করতে পারে ফ্যাসিবাদের ভিত।’

‘কিন্তু নজরুলকে শুধু গ্রীষ্ম আর বর্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না।’ বলে উঠলো আব্দুল্লাহ। ‘জীবনকে বিশেষ করে মানবকল্যাণমুখী সমাজ গড়তে নজরুল চর্চা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।’
সাইফুল বললো, ‘কিন্তু বন্ধুরা, নজরুল চর্চাকে শুধু আমাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, ছড়িয়ে দিতে হবে সবখানে।’
আনছার বললো, ‘ঝড়-বৃষ্টি বোধহয় এবার থেমে যাবে। দেখ, বাইরেটা ফরসা হতে আরম্ভ করেছে।’
সত্যিই তাই, বাইরেটা ক্রমশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। জানালা খুলে দিলো আব্দুল্লাহ। একরাশ শীতল হাওয়া বয়ে গেল রুমের ভেতর। শীত শীত করে উঠলো ওদের।
একটু আগের থেমে যাওয়া জীবনাচার আবারও সরব হয়ে উঠলো। সর্বত্র ফিরে আসতে শুরু করেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
কারোরই জোহরের নামাজ আদায় হয়নি। উঠে দাঁড়াল। নামাজের আগে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।
যেমনি করে ধুয়ে-মুছে ছাফ হয়ে গেছে চারপাশের নোংরা-আবর্জনা— ঝড় আর বৃষ্টিতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top