মধ্যরাতের অতিথি

তখন শীতের মধ্যভাগ। কনকনে ঠান্ডায় শরীর জমে যাওয়ার অবস্থা। বসে আছি কমলাপুর রেলস্টেশনের ভিআইপি লাউঞ্জে। পদ্মা এক্সপ্রেসে যাবো রাজশাহী। মেহরিন এবং আমার একমাত্র ছেলে সামির সাথে আছে। চাকরির সুবাদে গত দু’বছর রাজশাহীতে আছি। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে রাজশাহীর মতো এতোটা গোছালো শহর আর নজরে পড়েনি।

রেল ছাড়ার কথা রাত ১০টায়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে আমরা স্টেশনে বসে আছি। কি এক অজানা কারনে আজকে সবগুলো ট্রেন দেরি করছে। বসতে বসতে কোমর ব্যথা হয়ে যাওয়ার অবস্থা। মাঝখানে একবার সামিরকে রেস্টুরেন্ট থেকে বার্গার খাইয়েছি। ছেলেটা এই জিনিসটাই মনের মতো করে খায়। ভাত-মাছ ওর ভালো লাগে না। মেহরিনকে অনেক বকেছি বাচ্চার এসব ফাস্টফুড ধরনের ছাইপাশ খাওয়ার অভ্যাস করানোর জন্য। মেহরিন অবশ্য বলে অন্য কথা। স্কুলে বন্ধুরা সবাই ফাস্টফুড খায় তাই সামিরও এমন খাবারে আসক্ত হয়ে পড়েছে। যাই হোক, সামির এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মেহরিন আধো ঘুম, আধো জাগরণে। আমি টেলিভিশনের স্কিনে খবর দেখছি। দেশে কোনো রেল দুর্ঘটনা হয়েছে কি না জানার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কোনো চ্যানেলেই এ ধরনের কোনো খবর পেলাম না। লাউঞ্জে একটা মাত্র টিভি। রিমোট নিয়ে হয়েছে মহা ক্যাচাল। এক বয়স্ক লোক রিমোট হাতে নিয়ে বাংলা সিনেমা চালু করেছে। কোনোভাবেই তিনি চ্যানেল পাল্টাতে দিচ্ছেন না। দিচ্ছেন না বলাটা ভুল হবে। তিনি রিমোট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। হাতে নয়, একেবারে তার ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রেখেছেন। রিমোট নিয়ে তার সাথে এক যুবকের প্রায় হাতাহাতি হয়ে গেল, তবুও তিনি রিমোট দিতে নারাজ। লাউঞ্জে অপেক্ষারত প্রত্যেকেই অত্যন্ত অদ্র এবং শিক্ষিত। এই মধ্যরাতে সবাই যখন নিজ নিজ গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অস্থির ঠিক তখনই সামান্য এক রিমোট নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড।

শেষমেশ কোন সমাধান না পেয়ে সার্ভিস স্টাফ এসে টেলিভিশনের লাইন খুলে দিলো। এতে লোকটা আরো ক্ষেপে গেল। লাউঞ্জের ভেতরে একধরনের মারামারি লেগে গেল। দু’তিনজন যুবক বৃদ্ধকে জোর করে ধরে লাউঞ্জের বাইরে রেখে এলেন। তার দু এক মিনিট না যেতেই তিনি এসে হাজির। কি মুশকিল। তাকে নিয়ন্ত্রণ করাই যাচ্ছে না।

এতক্ষণ আমি দর্শকের মতো পুরো ঘটনা দেখেছি। এবার আমি উঠে দাঁড়িয়েছি বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশ্যে। হঠাৎ পেছন থেকে মেহরিন আমার চাদর টেনে ধরলো। আমি মেহরিনকে শান্ত করে বৃদ্ধের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃদ্ধের চোখে চোখ রেখে বুঝতে পারলাম— লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছি, লোকটা আসলে অতটা খারাপ না। তার পাশে বসে ঘাড়ে হাত রাখলাম। তিনি চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। কিছুটা ভয়ে জড়সড় হয়ে। তিনি নিশ্চয় ভেবেছেন আমি তাকে মারবো! আমি তার আরো কাছাকাছি হয়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম— তার কোন ক্ষতি আমি করবো না। লোকটা সাহস পেলেন। লোকটার ডান হাত চেপে ধরে বললাম— চাচা আমি আপনার ছেলের মতো। ছেলেও বলতে পারেন। আমি পুরো কথা শেষ করতে পারিনি তার আগেই লোকটার দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল নেমে এলো। আমি বিস্মিত হলাম। তাকে আমি বুকে টেনে নিলাম। তিনি শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আমি তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম— চাচা আপনি স্বাভাবিক হোন। উঠুন আপনার সাথে আমার কথা আছে। তাকে নিয়ে আমি লাউঞ্জ থেকে বের হলাম। তখন প্রায় রাত দুইটা।

দোতলায় রেলওয়ের রেস্তোরাঁয় বসলাম। আমরা মুখোমুখি বসেছি।

: চাচা,আপনি কী খাবেন?

: আমি কিছু খাবো না বাবা (কান্নাজড়িত কণ্ঠে)

: তা কি করে হয়? আমি খাবো আর আপনি খাবেন না?

: কমলাপুরে আজ পাঁচ বছর থাকি, কেউ এত আপন করে কথা বলেনি, জড়িয়ে ধরেনি।

: আপনি শান্ত হোন চাচা। আমরা আগে খেয়ে নিই। তারপর আপনার সব গল্প শুনবো।

এর মধ্যে ওয়েটারকে আমি বিরিয়ানির অর্ডার করেছি। খাবার গরম হতে একটু সময় লাগবে তাই আমরা আবার গল্প শুরু করলাম—

: তা চাচা আপনার পরিবারে কে কে আছে?

: সবাই ছিলো। এখন কেউ নেই।

: বুঝলাম না। বিস্তারিত জানতে চাই।

: বাজান কী হবে ওসব শুনে?

বলেন না। আমার শুনতে মন চাচ্ছে।

: সেসব গল্প বলতে গেলে রাত শেষ হয়ে যাবে। আপনি ট্রেন মিস করবেন।

: হোক রাতশেষ। রেল ফেল করলেও সমস্যা নাই। আপনি বলেন।

: বাবা আমার বাড়ি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায়। আমি ছিলাম স্কুল মাস্টার। তিন মেয়ে, এক ছেলে। সুখের সংসার। ছেলেটা সবার ছোট। মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছি। বড় মেয়ের জামাই এডভোকেট। দুই নাতি নিয়ে তারা সুখে আছে। মেজ মেয়ে আছে জার্মানিতে। জামাইয়ের সাথে ওখানে সেটেল। ছোট মেয়ে স্থানীয় একটা কলেজে শিক্ষকতা করে। জামাইয়ের বিশাল খামার আছে। সে তার ব্যবসা দেখাশোনা করে। একমাত্র ছেলে সৌরভ। লেখাপড়ার জন্য তাকে ইংল্যান্ড পাঠিয়েছিলাম। এমবিএ পাস করে দেশে ফেরত আসলো। আমি ভাবলাম ছেলে ভালো কোন পজিশনে সরকারি অথবা প্রাইভেট চাকরি করবে। কিন্তু না, সে ব্যবসা করবে।

: চাচা এবার থামেন, আমার বউ ফোন দিয়েছে ওর সাথে একটু কথা বলি।

মেহরিন প্রায় এক ঘণ্টা যাবৎ আমাকে ফোন দিচ্ছে, আমি খেয়াল করিনি। বউ আমার ভয়ে অস্থির হয়ে আছে— না জানি আমি কোনো বিপদে পড়লাম। মেহরিনকে আশ্বস্ত করে চাচার দিকে মনোযোগ দিলাম।

: চাচা খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! আগে খেয়ে নেন। পরে বাকি গল্প শুনবো। চারদিকে নীরব পরিবেশ। খুব বেশি মানুষজন নেই।

আমাদের দু’টেবিল পরে চার পাঁচজনের একটা গ্রুপ খাচ্ছে। বাকি রেস্তোরা পুরোটাই ফাঁকা। অবশ্য এতে রাতে মানুষ না থাকারই কথা। এখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে তিনটা। খাবার শেষে হাত মুছতে মুছতে চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম— চাচা আপনার ছেলে কী যেন ব্যবসা করবে বলেছিল?

: ছেলে আমার বায়না ধরেছিলো সুপারশপ করবে। আমি বলেছিলাম— জেলা শহরে সুপারশপ করে লাভ হবে না। তাছাড়া এত টাকা আমি কোথায় পাবো? ছেলে নাছোড়বান্দা। শেষমেশ তাকে জমি বেচে বিশ লাখ টাকা দিলাম। ঈশ্বরদী বাজারেই ‘সৌরভ সুপার শপ’ নামে প্রতিষ্ঠান দিলো। সে বছরই ছেলে আমার বিয়ে করলো। এবং ঐ বছরই তার মা মারা গেল। আমি বড় একা হয়ে গেলাম। পরের বছর আমি চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করলাম। এর মধ্যে সে ব্যবসায় লস করতে লাগলো। আমাকে টাকার জন্য চাপ দিলো। আমি রিটায়ার্ডে প্রাপ্ত সমস্ত টাকা-পয়সা তার হাতে তুলে দিলাম। কথা শেষ করতে না করতেই চাচার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরতে লাগলো কষ্টের বৃষ্টি।

চাচাকে পানি এগিয়ে দিয়ে সান্তনার সুরে বললাম— চাচা, আপনি শান্ত হোন। তিনি বেশ ধীরে পানিটুকু গিললেন। মনে হলো তার গলা দিয়ে জল নামছে না।

কিছু সময় স্থির থেকে তিনি বলতে শুরু করলেন— একদিন দুপুরে ছেলে বাড়িতে এসে বললো, বাবা রেডি হয়ে নাও আমরা বেড়াতে যাবো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায়? সে সহজ কোনো উত্তর না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লো। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ছেলে বউ আমার জামাকাপড় ভর্তি ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বললো বাবা ব্যাগে আপনার সকল জিনিসপত্র আছে। আর যদি কোনো জিনিসপত্রের প্রয়োজন হয় তবে আপনার ছেলে কিনে দেবে।

আমি তখনো কিছুই বুঝতে পারিনি। কিছু সময় পরে আমার উঠোনে এসে একটা প্রাইভেট গাড়ি হাজির। ছেলে আমাকে নিয়ে গাড়িতে চড়লো। আমি একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম। গাড়ি আমাদেরকে সাভার বাজারের পাশে নামিয়ে দিলো। গাড়ি থেকে নেমে দেখি পাশে একটি পাঁচতলা পুরনো বিল্ডিং। অনেকটা পরিত্যক্ত। বড় সাইনবোর্ডে লেখা— মানবিক বৃদ্ধাশ্রম, সাভার।

আমার কলিজায় একটা টান পড়লো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। ছেলেকে কিছুই বুঝতে দেইনি। ছেলে আমাকে রেখে বিদায় নিলো।

দীর্ঘ এক মাস কেটে গেল। ছেলে, ছেলের বউ কেউ আমার খবর নেয়নি। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লাম। একদিন ভোরে বৃদ্ধাশ্রম থেকে পালালাম। এক সপ্তাহ ঢাকা শহরের অলিগলিতে ঘুরলাম। শেষে আশ্রয় নিলাম কমলাপুর রেলস্টেশনে। অনবরত কথাগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধ চেয়ারে হেলে পড়লেন। আমি চিৎকার করে উঠলাম।

রেস্তোরাঁর লোকজন ছুটে এলো। সবাই ধরাধরি করে বৃদ্ধকে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে আনলাম। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রাশমনো জেনারেল হাসপাতালে ফোন। দিলাম। ততক্ষণে মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো আসসালাতু খাইরুন মিনান নাওম…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top