দরদ

আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে শফিকুল। প্রায় এক মাস পর মুক্তি মিলল তার। কিডনির জটিল অসুখ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। পরিবারের লোকজন না শুধু, ডাক্তাররাও তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কিডনির এমন দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কেউ সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই রেকর্ড নাকি নেই। কিন্তু শফিকুল রেকর্ড ভেঙেছে। অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তবেই সে বাসায় ফিরেছে। বিদায়ের সময় ডাক্তার বলে দিয়েছেন, খাবার-দাবারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করে জীবন যাপন করতে পারলে আর কখনো তাকে কিডনি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ডাক্তার আরও বলে দিয়েছেন, কমপক্ষে তিন দিন পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে হবে। পুরোপুরি বিশ্রাম বলতে, বাসার বাইরে যাওয়া যাবে না। অবশ্যই ঘরে থাকতে হবে। আর ঘরে থাকতে হবে এমনভাবে, যাতে অন্য সদস্যরা সেভাবে টের না পায়। অর্থাৎ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শোয়া থেকে ওঠা যাবে না, বিছানা থেকে নামা যাবে না। খুব দরকার না হলে কারো সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলা যাবে না। কারণ, কথা বললেও নাকি শরীরের উপর বাড়তি একটা চাপ পড়ে। যে চাপ সদ্য রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

বাসায় ফেরার পর ঘণ্টা তিনেক শফিকুল বিশ্রামেই ছিল। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন ছাড়া বিছানা থেকে নামেনি, কথাবার্তা বলেছে ইশারা-ইঙ্গিতে। আর মুখে কিছু বললেও অত্যন্ত সংক্ষেপে বলেছে। দু-এক শব্দের বেশি খরচ করেনি। এরপর দুপুর যত বিকেলের দিকে গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে তার বাইরে যাওয়ার ব্যাকুলতা। শেষবিকেলে সে এত বেশি ব্যাকুল হয়ে ওঠে, বের না হয়ে আর পাত্রে না। ভাই-ভাবির চোখকে একরকম ফাঁকি দিয়ে নেমে যায় নিচে।

তারপর একটা রিকশা নিয়ে সোজা কাঁটাবনে। আতাহারের পাখির দোকানে। শফিকুল আতাহারকে চেনে বছর দেড়েক ধরে। একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আড্ডা দিয়ে সে রিকশাযোগে বাসায় ফিরছিল। কিন্তু রিকশা কাঁটাবন পৌছতেই এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। হাইস্কুলজীবনের বন্ধু। যার সঙ্গে আনন্দ-বেদনার নানা স্মৃতি জড়িত। শফিকুল লাফ দিয়ে নেমে যায় রিকশা থেকে। বন্ধুর সঙ্গে কোলাকুলি করে, কুশল বিনিময় করে। তারপর রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিয়ে চলে যায় চায়ের দোকানে। চা খেতে খেতে অনেকক্ষণ আড্ডা দেয় দুজন। আর তখনই আতাহারের দোকানটা প্রথম চোখে পড়ে শফিকুলের। সে আকৃষ্ট হয়। তাই আড্ডা শেষ হতেই চলে যায় দোকানটার কাছে।

বাহ্যিক চেহারার দিক থেকে আতাহারের দোকানটা এমন কোনো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল না, যা দেখে শফিকুল আকৃষ্ট হতে পারে, ছুটে যেতে পারে। আশপাশের অন্য দশটা দোকানের মতোই সাধারণ ছিল ‘আতাহার পাখিঘর’। সে আকৃষ্ট হয়েছিল মূলত তার প্রিয় জাতের কবুতর দেখে। জাতটা বিরল না। তবে দামি। বলা চলে গরুর দামের সমান। এক জোড়া কবুতরের দাম প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা, ভাবা যায়? ভাবা না গেলেও এটাই সত্যি।

শফিকুল সেদিন আতাহারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিল, সে জোড়াটার দাম চায় বায়ান্ন হাজার টাকা। তবে পঁয়তাল্লিশ পেলেই ছেড়ে দেবে। শফিকুলের পকেটে তখন পাঁচ হাজার টাকা ছিল। তাই আগপাছ না ভেবে টাকাটা সে দিয়ে দেয় আতাহারকে। আর বলে, যত দ্রুত সম্ভব বাকি চল্লিশ হাজার টাকা পরিশোধ করে দেওয়া হবে। সে সর্বোচ্চ সময় নেয় দশ দিন। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধের একটা আভাসও দিয়ে রাখে।

আট দিন পার হতে না হতেই শফিকুল টাকা জোগাড় করে ফেলে এবং কবুতর বুঝে নেয় আতাহারের কাছ থেকে। সেদিন তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিল শফিকুল। আর সেই আন্তরিকতার সূত্র ধরেই দুজনের মধ্যে চমৎকার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সময়ের ব্যবধানে যা পৌঁছে গেছে বন্ধুত্বের পর্যায়ে। সুযোগ পেলেই তারা জমিয়ে আড্ডা দেয়। আর আড্ডার মূল বিষয় থাকে কবুতর। দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির কবুতর।

আজকের দিনটা ভিন্ন। কারণ, আতাহারের কাছে শফিকুল আজ আড্ডা দিতে আসেনি। এসেছে হাবু আর বাবুর খোঁজ নিতে। হাবু-বাবু হচ্ছে কবুতরের নাম। ছেলেটার নাম হাবু। কারণ, ও একটু বোকাসোকা। খাওয়া ছাড়া কিছু বোঝে না। এছাড়া যে পাত্রে খায়, সে পাত্রেই মলত্যাগ করে। আর বাবু মেয়েটার নাম। বাবুদের মতো ফিটফাট বলেই ওর জন্য এই নাম বরাদ্দ করেছিল শফিকুল। তবে কবুতরের নামকরণের বিষয়টাকে ভালোভাবে নেননি ভাই-ভাবি। তাদের কথা হচ্ছে, পশু-পাখির আবার নাম কিসের। এত আহাদের কী আছে! ভাই কথাগুলো হাবভাবে প্রকাশ করলেও ভাবি প্রকাশ করতেন মুখে। দুদিন পরপরই বলতেন। মুখে ভেংচি কেটে কেটে বলতেন।

ভাই-ভাবির কথায় কিছু মনে করত না শফিকল। তাই হাবু-বাবুকে যতটুক স্বাধীনতা দেওয়া দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা দিয়ে পুষত। যেমন অন্যদের মতো সে ওদের খাঁচায় বন্দি করে রাখত না। বরং বারান্দায় ছেড়ে রাখত। পুরো বারান্দায় না, তিনখণ্ডে বিভক্ত বারান্দার একটা খণ্ডে। তবে খোলা থাকলে যেহেতু বেড়াল ঢোকার আশঙ্কা থাকে বা ওদের বের হয়ে যাওয়ারও ভয় থাকে, তাই বারান্দার নির্দিষ্ট খণ্ডটা সে বন্ধ করে দিয়েছিল নেট দিয়ে।

ভাই-ভাবি যখন বাসার বাইরে থাকতেন, তখন বিশেষ সুবিধা পেত হাবু-বাবু। শফিকুল বারান্দার গ্লাস খুলে দিত। ওরা ঘরে ঢুকে অবাধে ঘুরে বেড়াত আর এখানে ওখানে বসে ‘রোমান্স’ করত। ওদের ভীষণ প্রিয় ছিল ড্রইংরুমটা। বিশেষ করে সোফাগুলো। সোফার বিভিন্ন অংশে বসে ওরা ডাকাডাকি আর রোমান্সের পাশাপাশি আচ্ছামতো মলত্যাগ করত। তবে খোলা সোফায় যেহেতু মলের দাগ লেগে যাওয়া স্বাভাবিক, তাই শফিকুল পরিত্যক্ত বিছানার চাদর বিছিয়ে দিত। তারপর ভাই-ভাবি বাসায় ফেরার আগেই আবার আগের মতো ফিটফাট করে ফেলত।

শফিকুল যখন নিশ্চিত হলো তাকে মাসখানেক হাসপাতালে থাকতে হবে, তখন হাবু-বাবুকে বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তার অনুপস্থিতিতে কে ওদের দেখবে? এছাড়া যে জিনিস বিক্রি করলে মোটামুটি পঞ্চাশ হাজার টাকা পাওয়া যায়, কেন সেটা ঘরে ফেলে রাখবে? এক মাস হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার খরচ কি কম? টাকা-পয়সার দরকার আছে না?

অবশ্য শফিকুলের ভাইয়ের যা রোজগার, তাতে একাই তিনি সব ব্যয় বহন করতে পারতেন। করেননি। স্ত্রীর কারণে করতে চাননি। তার কাছে ছোটভাইয়ের সন্তুষ্টির চেয়ে স্ত্রীর সন্তুষ্টিটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আরও বড় ব্যাপার হচ্ছে, তিনি চাননি বাসায় কোনো কবুতর থাকুক। অসুস্থতার উসিলায় আপদ-জোড়া যদি বিদায় হয়, মন্দ কী! এমন উসিলা তো আর সবসময় সামনে আসে না।

শফিকুল যখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিল হাবু-বাবুকে বিক্রি করে দেবে, তখন অনেকেই কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সে কারো কাছে বিক্রি করতে রাজি হয়নি। কারণ, ‘কীভাবে পুষবেন’ প্রশ্নের জবাবে প্রত্যেকেই বলেছিল খাঁচায় ভরে পোষার কথা। যা শফিকলের পছন্দ হয়নি। যে কবুতরগুলো খোলামেলা বারান্দায় ওড়াউড়ি করে অভ্যস্ত, ঘরজুড়ে ঘোরাঘরি করে অভ্যস্ত, ওরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস খাঁচায় বন্দি থাকবে— ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছিল তার। তাই ফেসবুকের ইনবক্সে যোগাযোগকারীদের প্রত্যাখ্যান করে চলে এসেছিল আতাহারের কাছে।

বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে শফিকুল আতাহারকে কিছু শর্ত দিয়েছিল। বলেছিল— কবুতর দুইটা আপনি যার তার কাছে বেচতে পারবেন না। কথা বলে যদি বোঝেন খাঁচায় বন্দি করে পোষার জন্য নিচ্ছে, তাহলে বলবেন বিক্রি হবে না। সে যদি বেশি টাকা দিতে চায়, তবুও না। আর যার কাছে বিক্রি করবেন, অবশ্যই তার নাম-ঠিকানা-ফোন নাম্বার রেখে দেবেন। যদি সম্ভব হয়, নিজে গিয়ে একটু দেখে আসবেন সত্যিই খোলামেলা পোষার মতো ব্যবস্থা তার বাসায় আছে কি না। নিজে যেতে না পারলে অন্তত কাছের কাউকে পাঠাবেন। আতাহার অবাক হয়েছিল। জানতে চেয়েছিল এত শর্ত কেন দিচ্ছে। শফিকুল কোনো জবাব দেয়নি। টাকাটা নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল দোকান থেকে। আর বের হওয়ার সময় হাবু-বাবুর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন দুদিন পরই আবার ওদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, ওদের আদর করার সুযোগ পাচ্ছে।

পরদিন বিক্রি হয়ে যায় ওরা। বিক্রির সময় শফিকুলের শর্তের কথা মাথায় রাখেনি আতাহার। কারণ, তার মাথায় কেবল লাভের চিন্তাই ঘুরেছে। এক জোড়া কবুতরে দশ হাজার টাকা লাভ, চাট্টিখানি কথা! যে কাস্টমার এমন উদার হাতে টাকা দেয়, তাকে সে কীভাবে প্রশ্ন করে খাঁচায় বন্দি করে পুষবে কি না?

অনেকদিন পর শফিকুলকে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে আতাহার। শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নেয়। হাসপাতালে কাটানো দিনগুলোর বর্ণনা শোনে। আর এক ফাঁকে ফুট-ফরমায়েশ খাটা ছেলেটাকে পাঠায় চা আনতে। শফিকুল চা খাবে না বললেও পাঠায়। জানতে চায় ‘প্ল্যান-প্রোগ্রাম’ কী। আবার কবুতর পোষার ইচ্ছে আছে কি না। পুষলে কোন জাতের কবুতর পুষবে, আগের জাতই, নাকি নতুন কোনো জাত— জিজ্ঞেস করে।

শফিকুল দায়সারা উত্তর দেয় আর হাবু-বাবুর প্রসঙ্গ তোলার সুযোগ খোঁজে। তারপর সুযোগটা পেয়ে গেলেই সে বলে— আমার কবুতর দুইটা যার কাছে বিক্রি করেছেন, তার ঠিকানাটা একটু লাগবে। ঠিকানারও দরকার নেই। ফোন নাম্বার হলেই চলবে। আমি কিন্তু বলে রেখেছিলাম নাম্বারটা রাখার জন্য। আপনার হয়তো মনে আছে। আর আমার বিশ্বাস, আপনি আপনার হিসাব-নিকাশের খাতায় লিখে রেখেছেন। কী, রাখেননি?

আতাহার হাসতে হাসতে বলে— কী যে বলেন না আপনে। আমি একজন দ্বায়িত্ববান মানুষ। আমার কাছে ব্যবসার চেয়ে দায়িত্ব বড়। কবুতরগুলার প্রতি আপনের কী পরিমাণ আদর-মহব্বত ছিল, আমি জানি না মনে করছেন? জানি,  জানি। জানি বলেই তো লোকটার ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব রাইখা দিছি। আপনে বইলা রাখছিলেন, এই জন্য রাখছি, ব্যাপার কিন্তু সেইটা না। আমি আমার দায়িত্ব পালনের খাতিরেই রাখছি। আপনে যদি না বলতেন, তারপরেও রাখতাম। ব্যবসায়ী হইছি বইলা কি মানুষের মন বুঝি না মনে করছেন।

আতাহারের কথায় খুশি হয় শফিকল। আর তার এই খশি বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়, যখন ঠিকানা ও ফোন নম্বর সম্বলিত একটা কাগজ হাতে পায়। শফিকল ধন্যবাদ জানিয়ে চায়ে চুমুক দেয়। চুমুক দেয় আতাহারও। তারপর আবার হাসপাতালের প্রসঙ্গ তুলতে চায়। কিন্তু শফিকল ওই প্রসঙ্গে না গিয়ে জিজ্ঞেস করে হাবু-বাবুকে বিক্রির সময় ক্রেতাকে এই শর্ত দিতে মনে ছিল কি না— খাঁচায় বন্দি করে পোষা যাবে না।

আতাহার চায়ে ঘনঘন তিনটা চুমুক দেয়। ছোট চুমুক। তারপর লম্বা একটা চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখতে রাখতে বলে— সব কথা সবাইরে বইলা দিতে হয় না। যারা ভালো বংশের মানুষ, তারা খুব ভালো কইরা জানে ক্যামনে পশু-পাখির খাতির-যত্ন করতে হয়। আসলে ভালো বংশের মানুষের আচার-আচরণই অন্যরকম। তাদের আচরণে মানুষও কষ্ট পায় না, জীবজন্তুও কষ্ট পায় না। খোঁজ নিয়া দেখেন, আপনের হাবু-বাবু সুখে-শান্তিতেই আছে।

আতাহারের কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। হাবু-বাবু ভালো নেই। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মতো বন্দি দিন কাটাচ্ছে ওরা। ওদের বন্দিদশা দেখে চোখ ফেটে কান্না আসে শফিকুলের। সে স্থির থাকতে পারে না। খাঁচার উপর প্রায় হামলে পড়ে বন্ধ মুখ খুলে দিতে চায়। এবার রেগে যান হাবু-বাবুর মালিক মাসুদ সাহেব। তিনি বজ্রগম্ভীর গলায় বলেন— আমি বাড়াবাড়ি একদম পছন্দ করি না। আপনি দাবি করেছেন, কবুতরগুলো আপনার ছিল। তাই একনজর দেখতে চান। সাবেক মালিক হিসেবে আমি আপনাকে সম্মান করেছি, দেখার সুযোগ দিয়েছি। তার মানে তো এই না যে আপনি যা ইচ্ছে তাই করবেন। আমি অনুরোধ করছি, এখান থেকে বিদায় হোন। নইলে কিন্তু বিদায় করতে বাধ্য হব। আমার ভদ্রতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

শফিকুল বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। তাই সে দ্রুতই সামলে নেয় নিজেকে। তারপর বলে— আপনার জিনিস আপনি যেভাবে খুশি সেভাবে রাখতে পারেন। এই ব্যাপারে নাক গলানোর কোনো অধিকার আমার নেই। তবে অনুরোধ করার অধিকার তো সবারই থাকে। সেই অধিকার থেকেই একটা অনুরোধ করি। দয়া করে কবুতর দুইটাকে খাঁচায় বন্দি করে রাখবেন না। এরা বোবা প্রাণী। কথা বলতে পারে না। এই জন্য কষ্টের কথা বলতে পারছে না। তবে এদের খুব কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। দয়া করে আপনি এদের কষ্ট থেকে মুক্তি দিন, প্লিজ।

শফিকুলের অনুরোধের প্রেক্ষিতে মাসুদ সাহেব কিছু বলেন না। অথবা বলার প্রয়োজনই মনে করেন না। তিনি জানান, তার হাতে অনেক কাজ। এখন আর শফিকুলকে সময় দেওয়া সম্ভব না। তাকে বাইরে বের হতে হবে। এতে শফিকুল অপমান বোধ করে এবং আবার খানিকটা অসংযত হয়ে ওঠে। বলে— আপনি যদি এদেরকে কষ্ট থেকে মুক্তি না দেন, তাহলে পরকালে আপনারও মুক্তি মিলবে না। দোজখে পড়ে থাকতে হবে।

এবার শফিকুলের কলার চেপে ধরতে ইচ্ছে হয় মাসুদ সাহেবের। বাইরে হলে হয়তো ইতোমধ্যে ধরেও ফেলতেন। কিন্তু বাসায় আসা একটা মানুষের গায়ে হাত দিতে তার বিবেক বাধা দেয়। তাই হাত দুটো তিনি পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেন। আর বলেন— কবুতরগুলো যেহেতু আমি টাকা দিয়ে কিনেছি, অতএব আমি যেভাবে ইচ্ছে রাখতে পারি, যা ইচ্ছে করতে পারি। যদি জবাই করে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়, খেয়েও ফেলতে পারি।

জবাইয়ের কথা শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না শফিকুল। সে হইচই বাধিয়ে দেয়। কিন্তু মাসুদ সাহেব মাথা ঠাণ্ডা রাখেন। আর জানান, তার কথা এখনও শেষ হয়নি। এরপর শফিকুল কিছুটা শান্ত হলে তিনি বলেন— আমি অমানুষ নই। এই জন্য জবাই করে ফেলার অধিকার থাকলেও জবাই করবো না। বরং আপনাকে একটা সুযোগ দেবো। সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলে ভালো, না পারলে কিছু করার নেই। শোনেন, আপনি যদি আপনার কবুতর ফেরত নিতে চান, তাহলে পঞ্চান্ন হাজার টাকা নিয়ে আসবেন। কত? পঞ্চান্ন হাজার। এক টাকাও কম না কিন্তু। যান এখন।

শফিকুলকে বাইরে বের করে দিয়ে সশব্দে দরজা লাগিয়ে দেন মাসুদ সাহেব। শফিকুল সিঁড়ি বেয়ে যত নিচে নামে, ততই তলিয়ে যেতে থাকে দুশ্চিন্তায়। হাবু-বাবুকে এই বন্দিদশা থেকে কীভাবে উদ্ধার করবে সে? কীভাবে জোগাড় করবে পঞ্চান্ন হাজার টাকা? দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেই তো তার পরিবার প্রায় সর্বস্বান্ত। এদিকে ভাই-ভাবি বিরক্ত। চিকিৎসা বাবদ তাদের তহবিল থেকে কয় টাকা গেছে, হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে কত সময়ের অপচয় হয়েছে- সেই হিসেব শুনিয়ে দেন দুদিন বাদে বাদেই। আছে ওইসব পাওনাদারের চাপও, যাদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে প্রথমবার কবুতর কিনেছিল।

বাসায় ফেরে শফিকুল। অথৈ দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খেতে খেতে ফেরে। এখন তার মন পাথরের মতোই শক্ত। মনে কোনো আবেগ নেই, পিছুটান নেই। আছে নির্মম বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণের নিরুপায় অনুভূতি। আছে এই স্বার্থপর ভাবনা— তার মতো যে চলচুলোহীনের কিসের এত শখ? কোন যুক্তিতে সে চিন্তা করে অর্ধলক্ষের বেশি চাকা শখের পেছনে ঢালার? তার তো চিন্তা করা উচিত কীভাবে ঢাকা শহরে টিকে থাকবে, কীভাবে দুটো খাবে, পরবে, পড়াশোনাটা শেষ করবে। আরে, তার নিজের জীবনই তো মুক্ত-স্বাধীন না। তাহলে সে কেন কবুতরের স্বাধীনতা আর হন্দিদশা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে? তার কি খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই?

হাবু-বাবুর চিন্তা মন থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে নির্ভার মনে রাত বারোটার দিকে ঘুমুতে যায় শফিকুল। শরীর ক্লান্ত থাকায় ঘুম চলে আসে সহজেই। তারপর এক ঘুমে রাত কাবার। কিন্তু সকালে যখন সে বিছানা ছাড়ে, তখন আবারও তার মন ভারাক্রান্ত। এতটা ভারাক্রান্ত, যেন হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে। ভাই থমথমে গলায় জানতে চান কী হয়েছে। শফিকুল হাসিমুখে ‘কিছু না’ বলে নাশতা না করেই বের হয়ে পড়ে বাসা থেকে। চলে যায় আতাহারের দোকানে। সেও জানতে চায় কী হয়েছে।

শফিকুল ভাইয়ের প্রশ্নের জবাব না দিলেও আতাহারের প্রশ্নের জবাব দেয়— শেষরাতে স্বপ্নে দেখেছি আমার হাবু-বাবু খাঁচা থেকে বের হওয়ার জন্য পাগলের মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে। কিন্তু বাসায় কেউ নেই। এমন সময় একটা বিড়াল ঢোকে। বিড়ালটাকে দেখে ভয়ে আধমরা হয়ে যায় হাবু-বাবু। আরও জোরে ডানা ঝাপটাতে থাকে। এবার বিড়ালটা আস্তে আস্তে খাঁচার কাছে যায়। ভেতরে হাত ঢোকায়। তারপর যখন হাবুর গলা চেপে ধরতে যাবে, আমার ঘুম ভেঙে যায়।

বলতে বলতে কেঁদে ফেলে শফিকুল। আতাহার তাকে সান্ত্বনা দেয়। বোঝাতে চায়, স্বপ্ন স্বপ্নই, স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। শফিকুল বলে— আমি এইসব শুনতে চাই না আতাহার ভাই। আমার হাবু বাবু ভালো নেই। খুব কষ্টে আছে। আমি এদেরকে মুক্ত করতে চাই। আপনি আমাকে সাহায্য করেন। দয়া করে এদেরকে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেন। আমি যেভাবে পারি আপনার টাকা পরিশোধ করে দেবো। প্লিজ ভাই, এই উপকারটা করেন। হাবু বাবু খুব কষ্টে আছে ভাই। আমি এদের কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। প্লিজ ভাই, দয়া করেন। টাকাটা দেন। আমি প্রয়োজনবোধে আমার কিডনি বিক্রি করে আপনার টাকা ফেরত দেবো।

আতাহার ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসে। বলে— চাপা মারার জায়গা পান না মিয়া। কিডনি নাকি বেচবো। কয় কী! আরে ভাইরে, আপনার যেই কিডনি, এই কিডনি দিয়া তো আপনে নিজেই চলতে পারেন না। দুইদিন পরে পরে হাসপাতালে ভর্তি হন। যাইবো গা। ডাক্তারে জোড়াতালি দিয়া ঠিক কইরা দেয়। পাবলিক আপনের এই আধানষ্ট মাল কিন্না করবো কী? এই কিডনি যার শইল্লে ফিট করবো, তার তো লিভারও পইচ্যা যাইবো গা।

আতাহারের ব্যঙ্গাত্মক হাসি আর কথায় রেগে যেতে চায় শফিকল। কিন্তু সুযোগ পায় না। আতাহার তাকে অনেকটা ঠেলে বের করে দেয় দোকান থেকে। মনে মনে ‘পাগল ছাগল’ বলে গালও পাড়ে। শফিকুল দ্রুত পা চালায় মাসুদ সাহেবের বাড়ির উদ্দেশে। আজ সে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকবে ওই বাডির সামনে। ওখানে যে আমগাছটা, এর নিচে দাঁড়ালে মাসুদ সাহেবের বারান্দা স্পষ্ট দেখা যায়। দেখা যায় হাবু বাবুর অসহায় মুখগুলোও। শফিকল আজকের দিনটা ওদের মুখ দেখেই কাটাবে। কিন্তু ওরা ঠিক আছে তো? রাতে দেখা দুঃস্বপ্নের কোনো প্রভাব পড়েনি তো ওদের উপর?

আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে বারান্দার দিকে তাকাতেই বুকটা ধক করে ওঠে শফিকুলের। কারণ, পানির বাটিটা উল্টে পড়ে আছে। আর হাবু-বাবু গলা লম্বা করে রেখেছে খাঁচার বাইরের দিকে। তার মানে ওরা পিপাসায় কষ্ট পাচ্ছে। শফিকুল দৌড় দেয় গেটের দারোয়ানকে লক্ষ্য করে। বলে মাসুদ সাহেবের বাসায় যাবে। দারোয়ান গেট খোলে না। জানায় মাসুদ সাহেব সপরিবারে ঢাকার বাইরে গেছেন। তিন-চার দিন পর ফিরবেন। আরো দেরিও হতে পারে।

শফিকুল মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। দারোয়ান তাকে গেটের সামনে থেকে সরতে বলে। মুখের কথায় কাজ না হলে গেটে বাড়ি মারে ঠাস করে। ঝনঝনিয়ে ওঠে পুরো গেট। শফিকুল এবার উঠে দাঁড়ায় এবং টলতে টলতে আবারও যায় আমতলায়। ছলো ছলো চোখে তাকিয়ে থাকে বারান্দার দিকে। হাবু-বাবু এখন প্রচণ্ড ডানা ঝাপটাচ্ছে খাঁচা থেকে বের হওয়ার জন্য। হয়তো পিপাসা আর ক্ষুধায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে ওদের। শফিকুলের কলিজাও যেন ফেটে যেতে চায় কষ্টে। সে আর সহ্য করতে পারে না। দু হাতে চোখ চেপে ধরে ত্বরিত সরে যায় আমতলা থেকে।

পরদিন সকাল। পত্রিকার একটা খবরের শিরোনামে চোখ আটকে যায় মাসুদ সাহেবের— ‘গ্রিল কেটে বাসায় ঢোকার সময় গণপিটুনিতে যুবক নিহত’।

3 thoughts on “দরদ”

  1. 33win68… I remember seeing an ad for them. I’d say they have a pretty decent selection of casino games. Signed up and got some bonus but honestly don’t expect much. Maybe its just me. Check it out at: 33win68

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top