হরেক রকম জিকির

মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

জাকির হোসেন ও শাকির হোসেন দুই ভাই। তাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু ফকির আলী। দুই ভাই এলাকায় জাকের ও শাকের নামে পরিচিত। একই ক্যাটাগরির নাম হলেও ফকির আলী নামটা ইনট্যাক্ট রয়েছে। তাকে কেউ ফকির বা ফাকের বলে না। অরিজিনাল নামেই ডাকে।

ফকির আলী কিন্তু ফকির নয়। জায়গা-জমিন, বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট, কোন লাল মিয়া যদি এতো কালা হয়, তবে কালা মিয়ার অবস্থা কী হবে। তারপরেও কালা চাঁনের কোনো অভাব নাই। ধলা চাঁন বলে কেউ নাই।

এক সময় ফকির আলীদের অনেক তাল গাছ ছিল। তালের রস দিয়ে তাড়ি খেতে অভ্যস্ত ছিল পরিবারের লোকেরা। এখন তারা রেকটি ফাইড স্পিরিট সেবন করে। কিছু হোমিওপ্যাথ ডাক্তার এই ব্যবসা করে। নেশাখোরদের কাছে এই এলকোহল আখেরি মুনাজাতে শরিক হয়ে সারা বছরের পাপ মোচন করে। ফাজায়েলের জিকিরের বয়ান খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে এলকো মজলিসে তার আমল করে:

— আল্লা আল্লা আল্লাহু, লা ইলাহা ইল্লাহু।

তুমি খাওয়াও, তুমি পিন্দাও, আল্লা আল্লা আল্লাহু।

— এই ছাগল, গেলে দে।

— এই পাগল, আল্লারে ডাক।

— আল্লায় পারলে আমারে হোগনার মধ্যে চুবাক।

কেরামত আলী একজন দেখক ও লেখক। সে ঘুরে ঘুরে এসব দেখে ও পত্র-পত্রিকায় লেখে, যাতে সমাজ মেরামত হয়।

দেশে হরেক রকম জিকিরের আমল চলছে। সবচেয়ে সহজ ও পছন্দনীয় আমল এই জিকির।

— মাইজভাণ্ডারের বাবায় কইছে বইসা জিকির ভালো নয়, ফালদা ফালদা কর জিকির, যাতে বাবায় রাজি হয়।

অনেক পীরের দরবারে চলে মিউজিক্যাল জিকির। বাদ্যযন্ত্র ও সুরের তালে তালে চলে নৃত্য-জিকির:

— আল্লাহ আল্লাহ, হরদমে আল্লাহ, ফানাফিল্লাহ।

রোমান্টিক জিকির হয় এক পীরের খানকায়। পর্দার একদিকে নারী ও অন্যদিকে পুরুষ মুরিদেরা। এক পর্যায়ে পীর সাহেব ঘোষণা দেন:

— মনের আলো বড় আলো, বাইরের আলো নিভাও রে, মনের পর্দা বড় পর্দা বাইরের পর্দা উঠাও রে। বাত্তি নিভাইয়া দাও। আল্লাহু আল্লাহু। পর্দা উঠাইয়া দাও। আল্লাহু আল্লাহু।

এলাকার মসজিদগুলোতে চালু আছে সাপ্তাহিক হালকায়ে জিকির, জিকিরে জলি, জিকিরে খফী।

জিকির শুরুর আগে ইমাম সাহেব হাদিস বয়ান করেন:

— পাপ করলেই কালবে একটা স্পট পড়ে। কাপড়ে দাগ পড়লে যেমন সাবান দিয়ে ঘষতে হয়, তেমনি কালবের দাগ উঠানোর জন্য জিকিরের ঘষা মারতে হবে। ঘষার চোটে অনেকে লাফ মারে, অনেকে বুক চাপড়ায়।

নির্বাচনী মিছিলে এক রকম জিকির হয়। কেউ জিকির না বললেও জিকিরের

মতোই শোনায়—

— মার্কা আছে?

— আছে!

— কোন সে মার্কা?

— হুক্কা।

— সবাই বলো

— হুক্কা হুক্কা হুক্কা

— জোরছে বল

— হুক্কা

এদেশের দ্বীনি আমল দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সব কিছুর মাঝে বিশ্ব যোগ আছে। বিশ্ব নারী, বিশ্ব মাতা, বিশ্ব বাবা, বিশ্ব যুব, বিশ্ব বৃদ্ধ, বিশ্ব রোড, বিশ্ব জাকের, বিশ্ব এস্তেমা। দেশী আদর সোহাগের পরিবর্তে বিশ্ব ভালোবাসা। বিশ্ব হাত ধোয়া, বিশ্ব ডিম খাওয়া দিবসও পালন হয়।

চোখ থাকলেই দেখা যায় কিন্তু হাত থাকলেই লেখা যায় না। সুকান্তের ভাষায়— সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।

যারা এই কেউ কেউ হতে পারে না, তারাই ঘেউ ঘেউ করে। তারা আবিষ্কার করেছে জিকিরে ধান্ধাবাজি। কাজ ফাঁকি দেয়ার জন্য, পাওনাদারের তাগাদা এড়ানোর জন্য মহব্বতের সাথে জিকিরে মশগুল হয়ে যায় সুযোগ বুঝে। হরেক রকম নকর জিকিরের ভিড়ে আসল জিকির লাপাত্তা। অথচ আল্লাহ পাক স্বয়ং বলেছেন— নামাজ শেষ করার পর তোমরা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াও, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর, এবং বেশি করে আল্লাহর জিকির কর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top