মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
পেশাজীবনের শুরুতে আপনি সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন। এরপর ব্যাংকিং কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি সবকিছুর উপরে আপনি ইতিহাস চর্চাটাকেই বিশেষভাবে নিয়েছেন। আপনি এই ইতিহাস চর্চায় আসলেন কেন?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : সাংবাদিকতা পেশার সাথে আমার নেশার সম্পর্ক ছিলো। সাংবাদিকতাকে আমি আমার উদ্দেশ্য অর্জনে অবলম্বন বা হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। আমার একটা প্রতিজ্ঞা ছিলো। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি প্রচণ্ড রকমে সক্রিয় ছিলাম। একটি আদর্শকে সামনে রেখে আমি সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম। আমি ‘৭২ থেকে ‘৭৫ পর্যন্ত সাপ্তাহিক সোনার বাংলার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। বুঝতেই পারছেন সেই সময়টি ছিলো একটি বিশেষ সময়। এই সময় আমি আমার ব্যক্তি জীবনের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করিনি। আমার ব্যর্থতাই এই যে, শেষ পর্যন্ত আমি এই পেশায় কন্টিনিউ করতে পারিনি। ১০৮৩ সালে আমি ব্যাংকিং পেশায় জড়িয়ে পড়ি। সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরে গেলেও এই পেশার সাথে প্রত্যক্ষ কার্যক্রমের বিচ্ছেদ ঘটলেও মানসিক প্রবল টান এখনো রয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, ১৯ বছর হলো আমি সাংবাদিকতা পেশা থেকে সরে এসেছি, কিন্তু এখনো আমি সাংবাদিকতার প্রতি যতোটা টান অনুভব করি, যতোটা আপন ভাবি, ব্যাংকিং পেশা ততোটা আপন হয়ে উঠতে পারেনি। এটা আমার জন্য একটা বাস্তবতা, একটা টানাপোড়েনও বলা যায়।
সংবাদপত্রকে বলা হয় চলমান ইতিহাস। আমি সেই চলমান ইতিহাসের সাথে যুক্ত ছিলাম। সংবাদপত্র জগত থেকে বেরিয়ে আসার পরেও আমার মনে হয়েছে এ থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা উচিত নয়। হয়তো ইতিহাস চর্চার সাথে জড়িয়ে পড়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।
এছাড়াও আরো কিছু বিষয় এক্ষেত্রে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। একটি ঘটনার কথা বলি শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবদুল গফুর তখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক। সময়টা ১৯৮৫ সাল। তিনি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৯টি বিষয়ের উপর ১৯টি সেমিনারের আয়োজন করেন। একটি বিষয়ের উপর আমাকে আলোচক হিসেবে রাখা হয়েছিলো। সেমিনারের বিষয় ছিলো ‘বাংলার মুসলিম নবজাগরণ : একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা’। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রিন্সিপাল নূরুল করিম। প্রবন্ধকার ছিলেন কবি আল মাহমুদ। প্রবন্ধটির ওপর আলোচনার জন্য তা আগে পেতে চেয়ে আমি ব্যর্থ হই। পরে জানা যায় তখন পর্যন্ত কবি আল মাহমুদ প্রবন্ধটি লিখে উঠতে পারেননি। আমি প্রবন্ধের শিরোনামের উপর ভিত্তি করে মোটামুটি একটি বড় ধরনেরই খসড়া তৈরি করে সেমিনারে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম সত্যি সত্যিই আল মাহমুদ প্রবন্ধ আনেননি। শেষ পর্যন্ত আমার নোটটিই সেখনে প্রবন্ধ হিসেবে পঠিত হয়। দেখা গেলো সবাই প্রবন্ধটি এপ্রিশিয়েট করলেন। প্রিন্সিপাল নূরুল করিম আমাকে দারুণ উৎসাহ দিলেন। আমিও অনুপ্রাণিত হলাম। অধ্যাপক গফুর সাহেব সেমিনারে পঠিত ১৯টি প্রবন্ধ নিয়ে ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। সেখানে আমার প্রবন্ধটিও ঠাঁই পায়। আমি অবশ্য সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধটিকে পরে বড় আকারে লিখে দিয়েছিলাম। বলা যায় সেই থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতি আমার বিশেষ মনোযোগ আকৃষ্ট হয়।
এই প্রবন্ধটিকে কেন্দ্র করেই আমি আমার ‘মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা’ বইটি লিখতে শুরু করি। বইটি প্রকাশ হওয়ার পর সবাই এর প্রশংসা করেন। বইটি এতো বেশি গ্রহণযোগ্য হবে আমি নিজেও কিন্তু ভাবিনি। সেই থেকেই আমার ইতিহাস চর্চা। তবে এটা ঠিক, আত্মার ইতিহাস চর্চা কোনো লক্ষ্যহীন বা উদ্দেশ্যহীন ব্যাপার নয়।
একটা অভিযোগ অনেকেই করে থাকেন যে, আমাদের দেশে ঐতিহাসিকদের অনেকেই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। এটা কেনো এবং কিভাবে হলো?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : এই অভিযোগ সত্য। ইতিহাস লেখার ব্যাপারে একজন ঐতিহাসিকের মধ্যে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই খণ্ডে যে ‘হিস্টি অব বেঙ্গল’ বেরিয়েছে তা একটি বড় ধরনের কাজ। যদুনাথ সরকাররা এতে কাজ করেছেন এই গ্রন্থটি সম্পর্কেও একপেশে হবার অভিযোগ উঠেছে প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে বড় ধরনের কাজ করেছেন, তার মত হলো ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ কেবল একপেশেই নয়, এতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। একই সাথে ইংরেজদের পক্ষপাতিত্বও করা হয়েছে।
আসলে যারা এই কাজটি করেছেন তারা তা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই করেছেন। তারা আসলে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিটাই আরো করতে চেয়েছেন। এটাও মনে রাখতে হবে সব ইতিহাসই যে পক্ষপাতদুষ্ট এমন কিন্তু নয়। এর উর্ধ্বে উঠেও অনেকে কাজ করেছেন। যেমন সুখময় মুখোপাধ্যায়। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সম্পর্কে তার লেখা অনেকখানি নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসের সত্যকে ধারণ করেছে। অবশ্য হিন্দুদের প্রসঙ্গ আসলে তিনিও সেখানে কিছুটা পক্ষপাতিত্ব করেছেন। তারপরেও মুসলমানদের ইতিহাস যেহেতু খুব কম আলোচিত হয়েছে, কম লিখিত হয়েছে- সেদিক থেকে দেখতে গেলে সুখময় মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস গ্রন্থকে আমরা অনেকখানি নিরপেক্ষ বলতে পারি।
বর্তমানে অবশ্য বাংলার মুসলমানদের এবং মুসলিম শাসকদের উপর কাজ হচ্ছে। ড. আবদুল করিম কাজ করছেন। ড. মোহর আলী বাংলাদেশের ইতিহাসের উপর বড় ধরনের কাজ করেছেন। তার কাজ অবশ্য এখনও শেষ হয়নি। ১৮৭১ সাল পর্যন্ত তিনি কাজ করেছেন। আমি মনে করি প্রফেসর মোহর আলীর কাজটি শেষ হলে বাংলাদেশের বিশেষ করে এখানকার মুসলমানদের ইতিহাসের একটি নিরপেক্ষ অধ্যায় আমরা তার কাছ থেকে পাবো। এই দুইজন মুসলিম ইতিহাসবিদের পথ ধরে অনেকেই সঠিক এবং সত্য ইতিহাস রচনায় এগিয়ে এসেছেন। আমার ধারণা, এতোকাল নিরপেক্ষ ইতিহাসের যে ঘাটতিটুকু ছিলো সে ঘাটতি অচিরেই পূরণ হবে ইনশাআল্লাহ।
আমাদের আরো মনে রাখতে হবে, ইংরেজরা এখানে ইতিহাস চর্চার চেষ্টা করেছিলো। এক্ষেত্রে তারা যতোটুকু করেছে তা অনেকাংশে ছিলো উদ্দেশ্যমূলক। তারা এখানকার হিন্দু হিরোদের খুব বড় করে তুলে এনেছেন। একই সাথে মুসলমানদের বিপক্ষে হিন্দুদেরকে একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় যে হিন্দু জাগরণ ঘটে সেখানে এইসব ইংরেজ ঐতিহাসিকদের একটি ভূমিকা ছিলো। পরবর্তীতে আমরা দেখি হিন্দু ঐতিহাসিকরা ইংরেজ ঐতিহাসিকদের পথটিকেই অনুসরণ করেছেন। আমি একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই। পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস শেষ পর্যন্ত টেকে না। একটা সময় আলটিমেটলি ইতিহাসের মূল সত্যটাই বেড়িয়ে আসে।
‘৪৭-এ ভারত ভাগ, পাকিস্তানের জন্ম। এরপর ৭১-এ বাংলাদেশ। এই যে বিভক্তি এবং নতুন দেশের উৎপত্তি এসবের পিছনে কোন ঐতিহাসিক অনিবার্যতা কাজ করেছে?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : ‘৪৭-এর বিভাজন অনেক আগের। পাকিস্তান ভাঙার ব্যাপারটি সাম্প্রতিক। ইতিহাসের কোনো বিষয় সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেয়ার জন্যিএইটুকু সময় যথেষ্ট নয়। এরপরও আমি মনে করি এটি একটি আলোচিত প্রশ্ন। অনেক প্রশ্নই তো উঠেছে। ‘৪৭ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করলাম তা নিয়েও অনেকে নানান প্রশ্ন তুলেছেন। লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে যে একাধিক পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব ছিলো সেখান থেকে সরে ইউনাইটেড পাকিস্তান গঠনের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিলো কিনা সে প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন। এইসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক ছিলো। এখনও আছে। যার যার অবস্থান থেকে সবাই কথা বলছেন। অনেকে আবার উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করে মিথ্যা তথ্যকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালান।
শরৎ বসুর সাথে মিলে সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম যে অখণ্ড বাংলা গঠনের চেষ্টা করেছিলেন সেখানে জিন্নাহর অনুমোদন ছিলো। কিন্তু গান্ধী অখণ্ড বাংলা গঠনের চেষ্টা থেকে বিরত থাকার জন্য শরৎ বসুকে নির্দেশ দিলেন। যেহেতু তৎকালীন বাংলার মুসলমানরাই ছিলো মেজরিটি কাজেই গোটা বাংলাই পাকিস্তানের অংশ হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তারা বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে আপোষ করলেন। অথচ ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ করা হয় তখন তারা ‘বঙ্গমাতা’ বিভক্ত হলো বলে চিৎকার, আন্দোলন শুরু করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রথমবাররে মতো হিন্দুরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফনা তোলে। ইংরেজরা হিন্দুদের দাবি মেনে নেয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে সরিয়ে নেয়া হয়। তারা নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করলেন। কলকাতা রাজধানী না থাকুক এতে কোনো আপত্তি নেই, ঢাকা যাতে রাজধানী হতে পারে এই সাম্প্রদায়িক চেতনা তারা ধারণ করলেন।
১৯৪৭ সালেই যদি বর্তমান বাংলাদেশ স্বাধীন হতো তহলে কতোটুকু ভালো হতো এ ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমাদের কোনো সচিবালয় ছিলো না। অর্থনৈতিক কোনো অবকাঠামো ছিলো না, ব্যাংক ছিলো না। ডা: বাসেত তার একটি বইয়ে লিখেছেন ১৯৪৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট খুলছেন তর্যা বাঁশের বেড়া দিয়ে। সামান্য আলপিন পর্যন্ত ছিলো না। বাবলা গাছের কাঁটা ব্যবহার করা হতো আলপিনের পরিবর্তে। এই ধরনের নাজুক অবস্থা ছিলো আমোদের মিলিটারি, সিভিল ব্যুরোক্রেসি, পুলিশ কোনো কিছুই ছিলো না তখন আমাদের ।
১৭৫৭ সালের পর থেকেই এই দীর্ঘ সময়ে ঢাকা শহর একটি মফস্বল শহরে পরিণত হয়। ভাবতে অবাক লাগে শায়েস্তা খাঁর আমলে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিলো কয়েক লক্ষ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে সেটা ৬৭ হাজারে নেমে আসে। এই যখন অবস্থা তখন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার অবস্থান তৈরির জন্য একটা সময়ের দরকার ছিলো। আমি বলি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে একটি অবকাঠামো দাঁড়িয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের আগে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো একটি পঙ্গু বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়া সত্ত্বেও এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো এফিলিয়েশনের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। এফলিয়েশনের ক্ষমতা জুড়ে দেয়া হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এফিলিয়েশনের ক্ষমতা লাভ করলো। শিক্ষার ভরকেন্দ্র কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হলো। সব মিলিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে ওঠে।
হ্যাঁ, প্রথমত আমি বলবো ‘৪৭-এর ভারত ভাগের অনিবার্যতা ছিলো। সতেরো শ’ সাতান্ন থেকে আঠারো শ’ সাতান্ন পর্যন্ত যে ব্রিটিশ বিরোধী আযাদী আন্দোলন, সেখানে ভারতের হিন্দু ও মুসলমানের ভূমিকা অভিন্ন ছিলো না! সিপাহী বিপ্লবের পরও ইংরেজদের নীতি হিন্দু ও মুসলমানদের প্রতি এক রকম ছিলো না। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দীর্ঘদিন কংগ্রেসের সাথে যুক্ত থেকে হিন্দু-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত রূপে ভূমিকা পালন করে ব্যর্থ হয়েছেন। ১৯০৫ সালে ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী করে বঙ্গ-আসাম প্রদেশ গঠনকে কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দুরা শুধুমাত্র একারণে মেনে নিতে পারেনি যে, এর ফলে পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা সুবিধা পাবে। ১৯১৬ সালের লাখনৌ চুক্তিতে মুসলমানদের যেসব দাবি মেনে নেয়া হয়, ১৯২৮ সালের নেহেরু কমিটির রিপোর্টে তা অস্বীকার করা হয়। ৪০ কোটি ভারতীয়ের শাসনতন্ত্রে নয় কোটি মুসলমানের রক্ষা কবচের বিধান রাখার সব চেষ্টাই যখন ব্যর্থ হয় তখনি মুসলমানরা স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এটাই ছিলো ইতিহাসের অনিবার্যতা।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী থানের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে একের পর এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এ দেশটিতে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দেয় নি। ঊনষাট সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে আইয়ুব ধানের মার্শাল ল’ ছিলো আরেকটি বড় আঘাত। সত্তুরের নির্বাচনের পর সামরিক জান্তা ও বেসামরিক আমলারা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে যেভাবে মুকাবিলা করে তার মধ্যেই পাকিস্তানের বিভক্তির বীজ নিহিত ছিলো।
বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের স্বাভাবিক এবং একটি অনিবার্য প্রভাব রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলই এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারে না। অথচ দখা যায় একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী এবং কিছু শিক্ষিত লোক এই অনিবার্য বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চান। তাদের এই প্রবণতার পেছনে কারণ হিসেবে কোন উপাদানগুলো কাজ করছে?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: বাস্তবতা যে কোনটা তা বোঝার জন্য একটি প্রক্রিয়া থাকার দরকার ছিলো। সেই ক্রিয়াটিই আমাদের এখানে কাজ করেনি। আমি প্রথমেই আমাদের শিক্ষানীতির কথা বলতে চাই। আমাদের এখানে ইতিহাসকে এমনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং ইতিহাসের কিছু কিছু বিষয় এমনভাবে চাপা পড়ে গেছে যে, লোকেরা জানেই না প্রকৃতপক্ষে কারা এই এলাকার জনগণের জন্য দীর্ঘদিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে শুরু করে এই এলাকায় মুসলিম শাসনের আগে একটানা সাড়ে পাঁচশ’ বছর ধরে ইসলাম প্রচারকগণ জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করেছেন। সামাজিক ভেদ-বৈষম্য ও জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তারা জনগণের পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং জনগণের মুক্তি সংগ্রামের প্রকৃত নায়করূপে তারা ভূমিক লালন করলেন। ইসলাম প্রচারকগণ এই এলাকার জনগণের সুখ-দুঃখের সাথী হয়েছেন। অত্যাচারী নিপীড়কদের বিরুদ্ধে তারা সংগ্রাম করেছেন। বিক্রমপুরের আদম শহীদ মক্কীর কথাই ধরুন। তার সাথে সাত হাজার লোক ছিলেন। তিনি তাদের সবাইকে মক্কা থেকে নিয়ে আসেননি। এই এলাকার মানুষ আদম শহীদ মক্কীকে কেন্দ্র করে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো।
শাসকের নামের পাশে এক বা একাধিক বিশিষ্ট ইসলাম প্রচারকের নাম উঠে আসবে। এমনকি অনেক ইসলাম প্রচারক মুসলিম শাসকদের চেয়েও বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন। নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের নাম কিন্তু আমাদের অনেকেই জানে না। কিন্তু খান জাহান আলীকে সবাই চেনে। শাহজালালের র: নাম জানে না এরকম হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান কেউ নেই। কিন্তু তিনি কোনো শাসকের আমলে এই দেশে এসেছিলেন- তার নাম কিন্তু লোকেরা জানে না। এর অর্থ হলো, ইসলামের পক্ষের শক্তি হিসেবে যারা এই এলাকায় কাজ করেছেন- তারা যে জনগণের পক্ষের শক্তি ছিলেন, ইসলামের পক্ষ আর জনগণের পক্ষ যে একাকার ছিলো, একাত্ম ছিলো, তা এদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য।
১৭৫৭ সালে আমরা যখন পরাজিত হলাম- তার পরবর্তীকালেও এখানে যতো আন্দোলন হয়েছে তাতে ইসলামী আন্দোলনের নেতারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন সবসময়ই আমাদের আজাদী আন্দোলনের নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এসে আমাদেরকে সেই ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেয়া হলো। আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই ইতিহাস পড়ানো হলো না। আমাদেরকে ভুলিয়ে দেয়া হলো মজনু শাহ, শমশের গাজী, আবু তোরাবদের কথা। যার ফলে আমাদের এখানে একদল আত্মবোধ বঞ্চিত শিক্ষিত লোকের সৃষ্টি হলো।
এইসব বুদ্ধিজীবী যখন তরুণ ছিলেন, ছাত্র ছিলেন- তখন তাদের সামনে এই এলাকার জনগোষ্ঠীর সঠিক ইতিহাসটি তুলে ধরা হয়নি বলে আজ তারা ইসলামের বিরোধিতায় নেমেছেন। এই গ্যাপটা দূর করলে দেখা যাবে যারা এই এলাকার জনগণের প্রকৃত বন্ধু ছিলেন তাদের সঠিক পরিচয় সবাই জানতে পারবে।
এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে যারা মতলবি, যারা আমাদের সংহতি বিনষ্ট করতে চায়, আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চায়- তারা এইসব বুদ্ধিজীবীকে ব্যবহার করছে।
এর জন্য শাসকরাও কিন্তু কম দায়ী নন। যারা দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমাদের শাসন করেছেন তারা আমাদের জাতির গৌরবময় প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন নি। ১৯৬৯ সালে এসে ‘পাকিস্তান : দেশ ও কৃষ্টি’ নামে একটা বই বের করা হয়। এই গ্রন্থটিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনের প্রকৃত কারণগুলো তুলে ধরা হয়। হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে একটি দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন পূর্ব-বাংলার মুসলমানদের মধ্যেই গরজটা ছিলো বেশি। তার কারণও আছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে তারা পুরো একশ’ বছর নির্যাতিত হয়েছে। পরবর্তীতে বৃটিশ সরকারের অধীনে তারা নব্বই বছর শাসিত হয়েছে। কোম্পানি এবং সরকারের ব্যাপারটি খেয়াল করতে হবে। কোম্পানি এবং সরকার এক জিনিস নয়। লাভ করাটাই কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসন এবং সুবিধা লাভের লক্ষ্যে এখানকার একটি লুটেরা শ্রেণিকে তাদের সাথী হিসেবে, কোলাবরেটর হিসেবে নিয়েছিলো। এই এলাকার মুসলমান, যাদের সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টার বলেছেন, এই এলাকার মুসলমানরা গরীব হতে পারে এটা এক সময় ভাবাই যেতো না । বর্তমানে এটা ভাবা যায় না যে, এই এলাকার মুসলমানরা গরীব ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে তাদের অস্তিত্বকে প্রকাশ করতে পারে। একদিকে ইংরেজ আরেক দিকে তাদের কোলাবরেটর বর্ণ হিন্দুশ্রেণি, হিন্দু জমিদার দ্বারা এই এলাকার সাধারণ মানুষ চরম নিগ্রহের শিকার হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের লড়াই করাটা ছিলো অনিবার্য এবং তারা তাই করেছে।
পূর্বসুরীদের এই লড়াইয়ের ইতিহাস আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে ‘৪৭ থেকে ৬৮ পর্যন্ত তুলে ধরা হয়নি। যখন বিভিন্ন কারণে আমরা আলাদা হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেলাম, তখন রুগ্ন পাকিস্তানকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা হিসেবে ‘পাকিস্তান : দেশ ও কৃষ্টি’ বইটি বের করে কোরামিন দেয়ার চেষ্টা করা হলো। সবারই জানা, সেই কোরামিনে কাজ হয়নি।
আমাদের দেশটা এমন যে সামান্য কিছু অংশ বাদে ভূমি প্রকৃতি অভিন্ন। জনগণের খাদ্যাভাস, চেহারা, ধর্ম, জীবন প্রণালী- সবকিছুই একই রকম। কিন্তু দুঃখজনক হলো আমাদের এখানে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিভাজনটা তীব্র। এটা কিভাবে হলো?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : আসলে মেজর ইস্যুতে আমাদের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। বিভাজনের তো চেষ্টা করেছে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে আমাদের একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জনের বিষয়টি যারা একেবারেই সহ্য করতে পারছিলো না তারা এর থেকে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে এবং বলা যায় তারা সফলও হয়েছে। তাদের এই মতলবি বিষয়টি এখন ভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। কেউ মুখে স্বীকার করেছেন। কেউবা তাদের লেখা বইপত্রের মাধ্যমেও তা প্রকাশ করেছেন।
এর থেকে উত্তরণের উপায় কি?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: এর জন্য জাতিকে সঠিক নিক নির্দেশনা দিতে হবে। আমাদের এখানে নেতৃত্বের একটা বিরাট সংকট রয়েছে বলে আমি মনে করি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ময়দানেই নয়- সকল অঙ্গনে বৃদ্ধিবৃত্তিক একটা শূন্যতা রয়েছে। যারা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তাদেরকে জাতির গোটা ইতিহাস, ঐতিহ্য- আমরা যাকে সয়েল টেস্ট (ংড়রষ ঃবংঃ) বলতে পারি- জানতে হবে। একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গেলে প্রথমে মাটি পরীক্ষা করে দেখা হয় সেখানে ভবনটি দাঁড়াবে কিনা। আপনি একটি জাতি নির্মাণ করবেন- আর সেই জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে একটা প্রকৃষ্ট ধারণা অর্জন করবেন না তা হতে পারে না। আমি যখনই কোনো হিতে রাজনৈতিক নেতার সাথে কথা বলি, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ছাত্রের সাথে কথা বলি, তখন ইতিহাসের ব্যাপারে তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা আমাকে দারুণ কষ্ট দেয় । আমি দেখি তারা এ ব্যাপারে অত্যন্ত অগভীর একটি স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন।
আমাদের যে পাঁচ-ছয় হাজার বছরের ইতিহাস আছে- সেই ইতিহাসের কোন স্তরে আমরা কি অবস্থায় ছিলাম, আমাদের সংগ্রামগুলোর কারণ ও ধরন কি ছিলো, কোন পথে আমরা সেই সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছি, কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের পরাজয়ের কারণগুলো কি কি ছিলো- এই বিষয়গুলো যদি একজন নেতার সামনে স্পষ্ট না থাকে তাহলে তিনি একটি জাতির নেতৃত্ব দিবেন কীভাবে? আমাদের অনেক নেতাই এসব জানেন না। জানেন না যে, এটাও আবার অনেকে জানেন না। না জেনে পাণ্ডিত্য প্রকাশ করা অধিকতরো বিপদজনক।
স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে বাঙালী আর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক চলছে। এই বিতর্কটা কি রাজনৈতিক নাকি সাংস্কৃতিক?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: আমার কাছে মনে হয় এটা একটা অহেতুক বিতর্ক। যেই অর্থে বাঙালী বলা হলো সেই অর্থে আমাদের এখানকার লোকেরাই বাঙালী, বর্তমান ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা কখনই বাঙালী ছিলো না। এরা ছিলো রাঢ়ী। বঙ্গ বা বাঙলা শব্দটা বিভিন্নভাবে এই এলাকার জন্যেই ব্যবহৃত হয়েছে। এটা ঐতিহাসিকভাবে এই এলাকার সাথে রিলেটেড। এই এলাকার রাজনৈতিক ঐক্যের স্বার্থে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছেন একজন মুসলিম সুলতান। তিনি হচ্ছেন হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। তিনি দিল্লীর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে স্বাধীন সুলতান হিসেবে এই এলাকার রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক ঐক্য স্থাপন করেন। তার আগে এই এলাকা নানাভাবে বিভক্ত ছিলো। যেমন লাখনৌতি, সাতগাও, সোনারগাঁও- এভাবে প্রশাসনিক বিভাজন ছিলো। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এই সংহতি স্থাপন করলেন। জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করলেন। নিজেকে তিনি শাহ-ই- বাঙালা, সুলতানে বাঙালা এবং শাহ-ই-বাঙালীয়া নামে পরিচিত করলেন। বর্তমানে বাঙালী শব্দটি শুনলে যারা মনে করেন এটা আমাদের শব্দ নয়- আমি বলতে চাই এটা ঠিক নয়।
পরবর্তীকালে অনেকেই বাঙালী এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন টেনেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, বাঙালী এবং মুসলমানদের মধ্যে খেলা হচ্ছে, অর্থাৎ তারা চাইলেন মুসলমানদেরকে বাঙালী থেকে আলাদা করে ফেলতে। এই বিভাজন টানার ক্ষেত্রে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো- এই অভিযোগ যদি কেউ করেন, তাহলে সেটা একবারে খণ্ডন করা যাবে না।
নৃতাত্ত্বিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমরা বাাংলা ভাষায় কথা বলি। আমরা বঙ্গীয় এলাকার লোক। সেই হিসেবে আমরা বাঙালী। এর বাইরেও জাতি হিসেবে আামাদের আরেকটি পরিচয় আছে। এই দেশের নাম বাংলাদেশ। কাজেই আমরা বাংলাদেশী। সংবিধানে তাই বলা হয়েছে।
অনেকে এটাকে সাংস্কৃতিক দ্বন্ধ হিসেবেও উল্লেখ করতে চান।
মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান : এটা স্পষ্ট যে, বর্তমানে যারা বাঙালীর পক্ষে কথা বলছে তারা এক ধরনের থাকতে পারেন না। সংস্কৃতি সম্পর্কে নিরপেক্ষতার কথা বললে সেখানে আর রাজনীতি থাকে না। আপনার রাজনীতির অর্থ হলো আপনার নিজস্ব একটি এনটিটি আছে, একটি জাতিসত্তা আছে। আপনি সেই জাতিসত্তার পরিচয় বহন করেন, এই জাতিসত্তাকে যারা স্বীকার করে নিয়েছে তাদেরকে নিয়েই আপনি একটি নেশন গড়ে তুলেছেন। তাদেরকে কেন্দ্র করেই আপনার নেশনালিটি ডেভেলপ করেছে। কাজেই সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে রাজনীতি হবে না।
এদেশে মুসলমান এবং হিন্দু- এই দুই ধর্মের লোক দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মুসলমানরা হিন্দুদের সম্পর্কে যতোটুকু জানে- হিন্দুরা মুসলমানদের সম্পর্কে ততোটুকু তো দূরের কথা সত্যি বলতে গেলে কি কিছুই জানে না। কিংবা যাও-বা জানে সেটা ভুল জানে। পাশাপাশি অবস্থানের পরেও হিন্দুদের এই অজ্ঞতার কারণ কি?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : বিষয়টি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। পণ্ডিত, মনীষী এবং সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে যারা আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম জবাব দিয়েছেন। বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্যে আমাদের একটু পেছন দিকে তাকাতে হবে। এই দেশে মুসলমান যারা এসেছিলেন, ইসলামের প্রচারক হিসেবে, তারা তাদের এই কাজের জন্য এই এলাকার মানুষকেই সাথে নিয়েছেন। ইসলামের সাম্যের দিকটি এই এলাকার মানুষকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। তারা দেখলেন মুসলিম প্রচারক ও শাসকরা সাধারণ লোকদের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন, এক দস্তরখানায় বসে খাওয়া দাওয়া করছেন। মুসলমানদের মধ্যে এই সাম্য দেখে এই এলাকার মানুষ অবাক হয়েছে। মুসলমানরা তাদেরকে একই দস্তরখানায় বসে খাবার গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একত্রে বসা, পানাহার করা, পাঠভ্যাস করা বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করা এটা এই এলাকার ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রভাবিত সংস্কৃতিতে ছিলো না। যার কারণে তারা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। মুসলমানদের সাথে একাত্ম হয়েছে।
মুসলমানদের আগমনের পূর্বে এখানে ছিলো ব্রাহ্মণ্যবাদের আগ্রাসন। এই ব্রাহ্মণরা বর্ণপ্রথা চালু করেছিল। বিশেষ করে সেন ও বর্মণ আমলে এখানে তারা বর্ণে বর্ণে জাতিতে জাতিতে লোকদেরকে বিভক্ত করেছে, বিভাজিত করেছে। ৩৬টি বর্ণে তারা এই এলাকার মানুষকে ভাগ করেছে। কারোর ছায়া মাড়ালে গোছল করতে হবে, কারোর হাঁড়ি ছুঁয়ে দিলে সেই হাঁড়ি ভেঙে ফেলতে ২০১১ এ ধরনের একটা ছুতমার্গীয় প্রবণতা চালু করা হয়। একটি ঘৃণার ধর্ম এখানে চালু করা হয়। এর আগে জৈন ও বৌদ্ধদের সময় কিন্তু এই এলাকায় এই ধরনের ঘৃণার সংস্কৃতি চালু ছিলো না।
ইসলাম এসে ঘৃণা নয় ভালোবাসার কথা বললো। দূরে ঠেলে দেয়া নয়, কাছে টানার কথা বললো। মানুষ দলে দলে ইসলামের সাম্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হলো। ব্রাহ্মণ্যবাদের যে কথা বললাম, তার সাথে কিন্তু এই এলাকার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মিল ছিলো না। কিন্তু তাদের এই হিংসা এবং ঘৃণার সংস্কৃতি পরবর্তীকালে আর সমূলে উচ্ছেদ করা যায়নি। লক্ষ্য করবেন এটা শুধু মুসলমানদের প্রতি বর্ণহিন্দুদের ঘৃণার ব্যাপার নয়, হিন্দুদের নিজেদের মধ্যেও এই পারস্পরিক ঘৃণার সংস্কৃতি রয়েছে।
হিন্দু কি? হিন্দু বলে কোনো ধর্ম নেই। সিন্ধু অববাহিকায় বসবাসরত লোকদেরকেই হিন্দু বলা হতো। আমি সেই কাহিনীতে যাচ্ছি না। উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি জাতি বা জনগোষ্ঠী সামনের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের প্রগতির যাত্রা অব্যাহত থাকে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ এমন একটি ধর্ম যেখানে বলা হলো উৎপাদনের সাথে যার যতো সম্পর্ক কম তার মর্যাদা সমাজে ততো বেশি। ব্রাহ্মণরা কোনো কাজ করবেন না। তারা পরগাছার মতো অন্যের উপর নির্ভর করবেন, অন্যের রক্ত শোষণ করবেন। এর পর ক্ষত্রিয়, তাদের মর্যাদা হচ্ছে দ্বিতীয় স্তরে। তারা যুদ্ধ করবে। বৈশ্য- এরা ব্যবসা বাণিজ্য করবেন। এদের অবস্থান তৃতীয় স্তরে। আর যারা কায়িক পরিশ্রম করবে, শ্রমের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত থাকবে, উৎপাদনের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে, তাদেরকে সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরে ঠাঁই দেয়া হলো। অর্থাৎ তারা নিজেদের মধ্যেই মোটা দাগের বিভাজন টেনে দিলো।
আমাদের দেশে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের বিশ্বাসের বিপরীত চিন্তাধারাই সংস্কৃতিকে ডমিনেট করেছে। এখানে সংস্কৃতি বলতে আমরা প্রচলিত সংস্কৃতিকে বোঝাচ্ছি।
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : আমি এটা মনে করি না। আপনারা নাচ, গান ইত্যাদির কথা হয়তো বলবেন। নৃত্যের সাথে এদেশের গরিষ্ঠ মানুষের কোনো কালেই সম্পৃক্ততা ছিলো না। নৃত্যের উৎপত্তিই হয়েছে মন্দিরগুলোতে। আর মন্দিরগুলোর সাথে তো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ এটা ঠিক, আরোপিত কোনো কোনো বিষয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদেরকে প্রভাবিত করেছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। এটা অতীতে যেমন করেছে বর্তমানেও করছে।
একটি দেহের মধ্যে চোখের যে গুরুত্ব একটি জাতির দেহে সংস্কৃতির গুরুত্বটাও তেমনি। এই গুরুত্বটি বুঝতে হলে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আমাদের জানতে হবে। যুগে যুগে আর্যরা, ব্রাহ্মণরা ক্ষাত্র শক্তির জোরে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছিলো। কিন্তু তারা সামরিক শক্তির জোরে বাংলাদেশ এলাকায় আসতে পারেনি। সামরিকভাবে তারা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। পরে তারা কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে এখানে এসেছে। পাল আমলের শেষের দিকে শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা এই কাজটি করেছে। পাল রাজারা সবাই ছিলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধরা তো এখন বুদ্ধের মূর্তির পূজা করে। নবম শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এখানে কোনো বৌদ্ধ মূর্তিই ছিলো না। আর্যরা এখানে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের নামে পালদের ওপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালায়। পালরা পরাস্ত হয়। পালদের পরাজয়ের প্রক্রিয়াটি লক্ষ্য করুন। পালরা নিরাকার ইশ্বরের আরাধনার পরিবর্তে পদ্মফুল সামনে রেখে বুদ্ধের পূজা শুরু করল। এরপর সেখানে বুদ্ধের কাল্পনিক পদযুগল স্থাপন করলো এবং পূজা শুরু করল। আস্তে আস্তে সেই পদযুগল মূর্তির অবয়ব ধারণ করল। শুরু হলো বুদ্ধের মূর্তি পূজা। এভাবেই সমন্বয়ের নামে আর্যরা নিজেদের মূর্তি পূজার সংস্কৃতিটি বৌদ্ধদের উপর চাপিয়ে দিলো। সংস্কৃতির এই দুর্বলতার কারণেই শেষ পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের পতন হলো।
এরপর আসুন সেন রাজাদের কথায়। তারা এদেশের মানুষকে ৩৬টি জাতিতে ভাগ করলো। বর্ণপ্রথা চূড়ান্ত চেহারা পেলো। সেন রাজারা আদিভৌতিক, জাদু, গণনা, জ্যোতিষ শাস্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লো। ফলে তারা জনগণ থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। সেনদের এই বর্ণবাদী শাসনের সময় এদেশে ইসলাম প্রচারকরা তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে সাংস্কৃতিকভাবে ইসলামের একটি প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছিলো। আমি আগেই বলেছি বখতিয়ার খিলজীর আসার পাঁচশ বছর আগ থেকেই এদেশে ইসলাম প্রচারকরা কাজ করে আসছিলেন। ১৭ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে বখতিয়ার খিলজী আসলেন। লক্ষণ সেন পালিয়ে গেলেন আর বাংলা দখল হয়ে গেলো- এটা গালগল্প মনে হতে পারে। কিন্তু দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে- এক. এখানে বৌদ্ধরা সেন রাজাদের অত্যাচার এবং নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিলো। দুই. ইসলাম প্রচারকদের দীর্ঘদিনের কাজের ফলে এই এলাকায় ইসলাম একটি শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। ইসলামের প্রতি জনসমর্থনের একটি সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিলো। কাজেই একদিকে বখতিয়ার খিলজীকে বৌদ্ধরা যেমন উৎসবের সাথে স্বাগত জানায় তেমনি ইসলামী শক্তি তাকে সমর্থন যোগায়।
সুলতানী আমলের শেষের দিকে মুসলমানরা সাংস্কৃতিকভাবে দুর্বল হতে শুরু করলো। জনগণ এবং শাসকদের মধ্যে বিচ্ছন্নতার সৃষ্টি হলো। অতীতে আলেমরা শাসক ও জনগণের মাঝে যোগসূত্র রূপে যে ভূমিকা রাখতেন তারা সেখান থেকে সরে আসলেন। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের আমলে নূর কুতব-উল-আলম গণেশের অভ্যুত্থানের মুকাবিলায় যে রোল প্লে করেছেন- পরবর্তীতে, মোগল সুবেদারি আমলে কুতব-উল-আলমের মতো – কাউকে দেখা গেলো না। সেই কারণেই এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এখানে পলাশীর বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলো।
একারণেই আমি মনে করি রাজনৈতিক বিজয়কে ধারণ করার জন্য সাংস্কৃতিক বিজয় প্রয়োজন। একটা দৃষ্টান্ত দেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে এদেশে বাম- রাজনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে। বলা যায় রাজনীতির ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে এই গোষ্ঠী, এখনও নানাভাবে নানা ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে আছে। এর মানে হলো তারা রাজনৈতিকভাবে যতো না অগ্রসর ছিলো, সাংস্কৃতিকভাবে ছিলো তার চেয়ে বেশি।
ইসলামের গোটা ব্যাপারটাই হচ্ছে একটা সাংস্কৃতিক বিষয়। ইসলামের বিশ্বাস এবং কর্মের যে বিভিন্ন দিক রয়েছে তার টোটাল কালচার। এই সংস্কৃতিটিকে আমরা যদি আমাদের জীবনে গভীরভাবে গ্রহণ করতে না পারি, সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে না পারি এবং সাংস্কৃতিকভাবে যদি আমরা যদি সামর্থ অর্জন করতে না পারি তাহলে কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের অন্য যে সব অর্জন আছে, রাজনৈতিক বলুন, অর্থনৈতিক বলুন, সেগুলো কিন্তু আমরা ধরে রাখতে পারবো না। শুধুমাত্র শক্তিশালী সামরিক বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না। দুঃখজনক হলো এই ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার ঘাটতি আছে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে পরিমাণ মনোযোগ দেয়ার দরকার, শ্রম এবং অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন তা কিন্তু হচ্ছে না।
বর্তমান বিশ্বে সংস্কৃতির বিকাশ এবং লালনের পেছনে মিডিয়া একটি বড় ভূমিকা রাখছে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমানে মিডিয়াই সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতির পক্ষে মিডিয়ার অবস্থান খুবই দুর্বল।
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: আমি আবারো আপনাদেরকে একটু পিছনের দিকে নিয়ে যাই। শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী, যার জন্ম ১৭০৩ সালে। তিনি চিন্তার জগতে একজন দিকপাল ছিলেন। তিনি দিল্লীতে বসে ইসলামের বিভিন্ন দিকে যে বক্তব্য রেখেছেন তার বিস্তার কেবল দিল্লীর আশপাশেই ঘটেছিলো। অর্থাৎ তার চিন্তাধারা দিল্লীর বাইরে যায়নি। কারণ তার চিন্তাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য কোনো মিডিয়া ছিলো না। কার্ল মার্কসের জন্মের অনেক পরে। তার জন্ম জার্মানীতে হলেও তিনি লন্ডনের মিউজিয়ামে বসে কাজ করেছেন। প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে কার্ল মার্কসের চিন্তাধারা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো এবং বিপ্লবের জন্মদিনে এসে গবেষকরা বলছেন, শাহ ওয়ালী উল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তা কার্ল মার্কসের অর্থনেতিক চিন্তার থেকে অনেক বেশি বিপ্লবী ছিলো। কিন্তু মিডিয়া সাপোর্ট না থাকার কারণে শাহ ওয়ালী উল্লাহর চিন্তাধারা সমসাময়িক পটভূমিতে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
আজকের দিনেও আপনি লক্ষ্য করবেন যে, কমিউনিস্টরা এখানে কখনোই সংখ্যায় বেশি ছিলো না। জনসমর্থনও কখনো অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু মিডিয়ার পয়েন্টগুলো তারা ঠিকই দখল করতে পেরেছে। আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে, আদর্শবাদী আন্দোলন সফল করার জন্য সাধারণের চাইতে তারা এ ব্যাপারে একটু বেশি সচেতন ও সক্রিয় ছিলো। দুর্ভাগ্য যে, এখানকার মেজরিটি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও চেতনাকে ধারণ করে যারা- কাজ করেছেন এবং করছেন তারা এক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন বলে আমার মনে হয়। মুসলিম লীগ এই ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এই ব্যর্থতার কারণ কি?
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: সচেতনতার অভাব। তারা অন্য দিকেই মনোযোগী ছিলেন বেশি। মিডিয়ার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টরা ঠিকই পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হয়েছে। অত্যন্ত কম রিসোর্স নিয়ে কী করে অনেক বেশি অর্জন করা যায় কমিউনিস্টরা সেই দিকটিই ভেবেছেন। মুসলিম লীগের কিন্তু বিরাট সুযোগ ছিলো। তাদের পেছনে ছিলো বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন। তারা ইচ্ছে করলে জনগণের চাহিদানুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে যে কোনো ধরনের শেপ দিতে পারতেন। মুসলিম লীগ একটি ভালো মিডিয়া তৈরি করতে পারেনি। আবুল মনসুর আহমদ আক্ষেপ করে বলেছেন, মুসলিম লীগ নেতা আকরম খাঁ ‘আজাদ’ পত্রিকার মালিক ছিলেন কিন্তু সেখানকার বেশিরভাগ সাংবাদিক ছিলেন কমিউনিস্ট এবং হিন্দু। ‘দৈনিক সংবাদ’ মুসলিম লীগই বের করেছিলো। সে পত্রিকা আলটিমেটলি বামদের পত্রিকা হয়েছে। আইয়ুব খান ‘দৈনিক পাকিস্তান’ (পরবর্তীতে ‘দৈনিক বাংলা’) বের করলেন। ট্রাস্টের এই পত্রিকাটিরও বেশিরভাগ সাংবাদিকই ছিলো বামপন্থী। কাজেই মিডিয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম লীগকে কোনো কৃতিত্ব দিতে আমি রাজি নই। কৃতিত্ব আমি কমিউনিস্টদের দিতে চাই। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা পঞ্চম বাহিনী হিসেবে নির্বাসিত হয়েছে। এক জায়গায় দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেনি। এরপরও নিজেরা মিডিয়া না করে অন্যের মিডিয়া ঠিকই ব্যবহার করেছে তারা। এটা তাদের বড় রকমের সফলতা। তবে, আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে মিডিয়ার ব্যাপারে সচেতনতা ক্রমেই বাড়ছে। এদেশের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা শক্তিশালী মিডিয়ার দাবিতে ক্রমেই সোচ্চার হচ্ছেন। এটা একটা পজিটিভ উপলব্ধি। এ থেকে আগামীর ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যায়।
আমাদের দীর্ঘ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ।
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকারটি সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় ‘বিশেষ সাক্ষাৎকার’ হিসেবে ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ প্রচার করা হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে নব্বই দশকের শক্তিমান সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমদ ও কবি ওমর বিশ্বাস
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের মানসকাঠামো ও সৃজনচিন্তার মূল প্রেরণা স্বদেশ। নতুনতর ইতিহাস আবিষ্কারের দ্যোতনায় উদ্ভাসিত তার ‘বাংলা ও বাংগালী মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা’ (১৯৯১), ‘আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা’ (১৯৯৪), ‘বঙ্গভঙ্গ থেকে বালাদেশ’ (২০০৭) শিকড়সন্ধানি ইতিহাস চেতনার এবং ইতিহাস পুনর্র্নিমাণের অখণ্ড দলিল। রাজ-রাজড়ার কাহিনী না বলে তিনি স্বজাতির স্বরূপ অন্বেষায় চির মুক্তিপিপাসু নির্বিত্ত লাঞ্ছিত মানুষের দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামের আনুপূর্বিক ইতিবৃত্তের সাথে বর্তমানকে যুক্ত করেন। তার লেখা ‘বাংলাদেশের পুলিশ’ (১৯৮৩), ‘গবেষণার নীতি ও পদ্ধতি’ (১৯৯০), ‘সৌদি আরবে বাংলাদেশী অভিবাসী : একটি সরেজমিন সমীক্ষা’ (২০০১), ‘এই আমার বাংলাদেশ’ (কিশোর, ২০০৩), ‘ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা’ (২০০৭), ‘বাংলার মুসলিম নবজাগরণে শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও জামাল উদ্দীন আফগানী’ (২০০৭), ‘সোনার দেশ বাংলাদেশ’ (কিশোর, ২০০৮), ‘কালো গেলাফ’ (ভ্রমণ, ২০১৫), ‘ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার গোড়ার কথা’ (২০১৬) তাকে চিহ্নিত করেছে স্বতন্ত্র মনীষায়। বাংলাদেশের অন্যতম কবি বেলাল চৌধুরী ও মনু ইসলাম তার জীবনীর উপর ‘জীবনের শতবাঁকে’ নামে একটি গ্রন্থ’ সম্পাদনা করেন। ইতিহাস গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি ‘নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এ্যাওয়ার্ড’ (২০১৪), ‘বায়তুশ শরফ আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ এ্যাওয়ার্ড’ (২০১২), ‘কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ পদক’ (২০১১), ‘কবিতালাপ পুরস্কার’ (২০১১), ‘নওয়াব সলীমুল্লাহ মেমোরিয়াল এ্যাওয়ার্ড’ (২০০৮), ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা স্বর্ণ পদক’ (২০০৮), ‘জাতীয় নজরুল সমাজ পদক’ (২০০৮)-সহ বহু সম্মাননা ও সংবর্ধনা লাভ করেন। দেড় দশক সাংবাদিকতার পর ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক-এ যোগ দিয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সাল থেকে তিন মেয়াদে প্রায় সাত বছর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর এবং সিইও থাকাকালে তিনি ২০১৩-২০১৫ মেয়াদে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহক ভিত্তি প্রসার, দারিদ্র বিমোচন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, মানবসম্পদ ও কাঠামোগত উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে এশিয়ার এগারো হাজার প্রধান নির্বাহীর মধ্য থেকে ‘দি এশিয়ান ব্যাংকার সিইও লীডারশীপ এচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ড’ (২০১৬) লাভ করেন। এ ছাড়া ‘ইসলামী ব্যাংকিং এ্যাওয়ার্ড’ (২০১৪), ‘রেমিট্যান্স এ্যাম্বাসেডর অব বাংলাদেশ’ উপাধি (২০১২) ‘র্যাপোর্ট বাংলাদেশ এ্যাওয়ার্ড’ (২০১১)-সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পান।
৫ আগস্ট ২০২৪ েেশর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২৩ আগস্ট ২০২৪ দেশে ফিরতে সক্ষম হন। এর পরপরই বাংলাশে ব্যাংক ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি.’র তৎকালীন বোর্ড বিলুপ্ত করে নতুন পরিচালনা পর্ষদের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টর ও চেয়ারম্যান হিসেবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দায়িত্ব দেয়। এরপর দেশের ৩৯টি ইসলামিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত ইসলামী ব্যাংকস কনসালটেটিভ ফোরামের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০২৫ সালে সেন্ট্রাল শরীয়াহ্ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস্ অব বাংলাদেশের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের জন্ম ১৯৫২ সালে, নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার সত্যভান্দি গ্রামে। পিতা মরহুম মৌলভী মোহাম্মদ আবদুল মালেক ছিলেন ব্যবসায়ী এবং সমাজকর্মী। মা মরহুমা জোবায়দা বেগম। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের পেশাজীবনের শুরু। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রথমে বার্তা সম্পাদক, এরপর নির্বাহী সম্পাদক এবং সর্বশেষে তিনি সোনার বাংলার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দৈনিক আজাদে যোগদান। ১৯৭৭ সালে দৈনিক সংগ্রামে যোগ দেন। দৈনিক সংগ্রামে সর্বশেষ তিনি চিফ রিপোর্টার ও কূটনৈতিক সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এ যোগ দেন।
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান তিন কন্যার জনক। স্ত্রী মাকসুদা মান্নান গৃহিনী এবং লেখালেখির সঙ্গে জড়িত।