চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান: নজরুল সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা

লোকমান হোসেন জীবন

যে কোন পরাধীন দেশ ও জনপদের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তির পথরেখা চিহ্নতকরণে সাহিত্যের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদলে এবং জনসাধারণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নেও রয়েছে সাহিত্যের সক্রিয় অবদান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের সৈ¦রাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মুক্তিকামী ছাত্র জনতার প্রতিবাদের ভাষাকে শক্তিশালী ও প্রাণময় করে তোলে সাহিত্যের সুমহান বাণী। কবিতা, গান আর শিল্প-সাহিত্যের নানা উপাদানে রাজপথে জেগে ওঠে তারুণ্য। চব্বিশের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে চির সুন্দরের কবি কাজী নজরুল ইসলাম’র গান ও কবিতা। অন্যায় আর অসত্যকে রুখে দেবার সঞ্জিবণী শক্তিতে বলিয়ান তাঁর গান কবিতা ছাত্র-জনতার প্রাণের ভাষায় পরিণত হয়। নজরুল-সাহিত্যের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বেলিত হয় জেন জি (জেনারেশন জি)। মিছিল, মিটিং, দেওয়াল লিখন, সোস্যাল মিডিয়া প্রভৃতি  মাধ্যমে ব্যবহৃত হয় নজরুলের উদ্দিপনামূলক গান, কবিতা এবং অন্যান্য সাহিত্যের অংশবিশেষ।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আবারও প্রামাণিত হলো, নজরুল সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা চিরকালীন। মানুষ আর মানবতার প্রয়োজনে, দেশ ও জাতির দুর্দিনে, পরাধীনতার গহীন অন্ধকারে, কাল বেয়ে কালান্তরে, উষার দুয়ারে বাবেবারে আঘাত হানের নজরুল। অথচ সমকালীন অনেক কবি ও বুদ্ধিজীবি তাকে ঞড়ঢ়রপধষ ঢ়ড়বঃ বলে অবমূল্যায়নের ্রচেষ্টা করেন। তাদের ভাষ্য ছিল, নজরুলের কবিতা গান প্রভৃতি একটি বিশেষ সময়কে কেন্দ্র করে রচিত। ঐ বিশেষ সময় শেষে তাঁর রচিত সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যাবে। নজরুল নিজেই তাঁর রচিত ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় নিজেকে ‘বর্তমানের কবি’ বলেছেন। অথচ তৎকালীন সময়ের দাবি মিটিয়ে, শতাব্দিকাল পরে নজরুল সাহিত্যর উপযোগিতা বিস্ময়কর।    

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শুধু নজরুলের গান, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, অভিভাষণ প্রভৃতিই আমাদের প্রেরণার উৎস ছিল না। তাঁর সংগ্রামী জীবন এবং কর্মও আমাদের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। তৎকালীন বিপ্লবীদের সাথে নজরুল নানাভাবে যুক্ত ছিলেন।     

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নজরুল রচিত সাহিত্য সাহস ও প্রেরণায় মুক্তিকামী জনতাকে অনুপ্রাণিত করে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে ছিল নজরুলের গান ও কবিতা। 

প্রায় দেঢ়যুগ এদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করায়ত্ত করে ফ্যাসিবাদ ভয়ংকর থাবা বিস্তার করে। নানামাত্রিক দমন পীড়ন, জেল-জুলুম, হত্যা, গুম, রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট প্রভৃতি অপকর্মে লিপ্ত ছিল শাসকগোষ্ঠি। বিরোধী চিন্তা ও মত পোষনকারী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং অসংখ্য ব্যক্তিবর্গ এ স্বৈরশাসকের রোষানলের শিকার হয়ে চরম নির্যাতনের মুখোমুখি হয়। স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং বিরোধী মত ধমনে একাধিক গণহত্যা চালায় ফ্যাসিস্ট সরকার। বাক্-স্বাধীনতা হারিয়ে দেশের সর্বস্তরের জনগণ আতংকিত এবং হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে।

দেশ, জাতি ও মানবতার এ চরম সংকটে শিল্প-সাহিত্য চর্চা ব্যাপকভাবে ব্যহত হয়। ফ্যাসিজমের প্রবল প্রতাপে অবরূগ্ধ হয়ে পড়ে সাহিত্যাঙ্গন। বিধি নিষেধের শৃঙ্খলে বন্দি হয় লেখকের শিল্পসত্তা। ফ্যাসিবাদের দাশত্বকে মেনে নেয় সাহিত্যাঙ্গনের একদল সুবিধাভোগী লেখক।  এসব লেখকেরা সর্বদা মশগুল ছিল  খুনী, লুটেরা স্বৈরশাসকের গুণকীর্তনে। দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী কবি-লেখকদের বরণ করে নিতে হয় নানামুখি জুলুম নির্যাতন। কারারুগ্ধ হন অসংখ্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংবাদিক।

দেশ ও জাতির এমন দুর্দিনে আপোষহীন মুক্তিকামী লেখকেরা নিস্ক্রীয় ছিলেন না। তাঁরা লিখেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন রাজপথে। ছাত্র জনতার ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন ধমনে সৈ¦রসাশক যখন হত্যাযঞ্জে মেতে ওঠে, তখন ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে যায় আমাদের লেখকেরা। রাজপথে ছড়িয়ে দেয় সাহসের বাণী, প্রেরণার আলো। এ প্রসঙ্গে সমালোচক লিখেছেন—

যে কোন আন্দোলনে কবি-লেখকদের একটি বড় ভূমিকা থাকে আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত রাখতে। কিন্তু গত দেড়দশকে বাংলাদেশের কবি-লেখক, শিল্পী সমাজের প্রধান অংশটি ছিল সরকারের উচ্ছিষ্টভোগী। রাজবন্দনা আর সরকারের দক্ষিণা গ্রহণে তারা ছিলেন তৎপর। … সেজন্য আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রজ কবি-লেখক-শিল্পীদের বড় অংশটি ছিল নীরব। তবে এর বিপরীতে দেশপ্রেমী অগ্রজ ও তরুণ কবি-লেখক-শিল্পী সমাজের একটি অংশ সরাসরি আন্দোলনে, লেখায় ও সামাজিক মাধ্যমেও ছিলেন সরব। প্রবাসী কবি-লেখক-শিল্পীদের ভূমিকাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

ফ্যাসিস্ট সরকার চেয়েছিল এদেশের জনগণকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখতে। ফলে এ দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য, মানুষ ও মানবতার পয়োজনে আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে সাহস ও সক্ষমতার। সক্ষমতা জন্য সাহস অধিক গুরুত্ববহ। সাহসকে জাগ্রত করার জন্য যে আওয়াজ প্রয়োজন, সেই আওয়াজ উঠানোর শক্তি সাহিত্য যোগান দেয়। চব্বিশের প্রেক্ষাপটে আওয়াজ উঠাতে সাহিত্যের ব্যাপক ভূমিকা লক্ষণীয়। হান্নান  হোসাইন শিমুল’র ‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ’ শিরোনামের হিপ হপ সঙ্গীতে প্রতিবাদের প্রবল ধ্বনি রাজপথে আওয়াজ উঠায়। ইথুন বাবু’র লেখা ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গানও উদ্দীপনা ছড়ায় সর্বসাধারণের মাঝে। বেলাল হোসাইন নূরী’র লেখা ‘আয় তারুণ্য আয়’ গানটিও ছিল সাহস ও প্রেরণা-সঞ্চারী। নূরুজ্জামান শাহ রচিত ‘জেগেই যখন উঠেছো বন্ধু’ শিরোনামের গানটি ভীত-সন্ত্রস্ত জাতিকে জাগাতে বেশ সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও চব্বিশের আন্দোলনে অসংখ্য লেখকের গান, কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি সাহিত্য সাহস ও প্রেরণায় উজ্জিবিত করে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে।

সাহস, প্রেরণা ও সম্ভাবনার আশ্বাস নিয়ে জনতার এ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন বাংলাসাহিত্যের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা পূর্বসূরি সাহিত্যিক। তাদের লেখা গান, কবিতা এবং অন্যান্য সাহিত্যসমূহ আন্দোলনকারীদের মুক্তির উম্মাদনায় উদ্ভাসিত করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত সাহিত্যের অবদান সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও রবিদ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ খ্রি.-১৯৪১ খ্রি.) রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’, মোহিনী চোধুরী (১৯২০ খ্রি—১৯৮৭ খ্রি.) রচিত ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩ খ্রি.—১৯১৩ খ্রি.) রচিত ‘ধন ধান্য পুসú ভরা, আপেল মাহমুদ (১৯৪৭ খ্রি) রচিত ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর’, গোবিন্দ হালদার (১৯৩০ খ্রি.—২০১৫ খ্রি.) রচিত ‘সূর্য উঠেছে পূর্ব দিগন্তে’ , জহির রায়হান (১৯৩৫ খ্রি.—১৯৭২ খ্রি.) রচিত ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাস, সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬ খ্রি.—১৯৪৭ খ্রি.) রচিত ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের কবিতা, আল মাহমুদ (১৯৩৬ খ্রি.—২০১৯ খ্রি.) রচিত ‘আমাদের মিছিল’ শিরোনামের কবিতা রাজপথে আন্দোলনকারীদের সাহস ও প্রেরণায় উজ্জিবিত করে। 

চব্বিশের রক্তক্ষয়ি সংগ্রামে নজরুল ছিলেন নানাভাবে, নানারূপে। তাঁর লেখা কবিতা, গান, নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি সাহিত্য একদিকে ছাত্র-জনতাকে বিপ্লবী মন্ত্রে দিক্ষিত করেছে; অন্যদিকে তাঁর সংগ্রামী জীবন মুক্তিকামীদের সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছে। নজরুলের সাহিত্যসাধনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের করাল গ্রাস হতে ভারতবর্ষকে মুক্ত করা। ফলে তাঁরই সম্পাদিত ধুমকেতু পত্রিকায় ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে নজরুল লিখেছিলেন—

সর্বপ্রথম, ‘ধুমকেত’ু ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাট টরাজ বুঝিনা, কেননা, ও-কথার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমানু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবেনা। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন ভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে।

ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে নজরুলের এ বিদ্রোহ ভারতবাসীকে আশান্বিত করেছিল। তাঁর এ দ্রোহের বাণী শতাব্দিকাল পরেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে চব্বিশের আন্দোলনে। নজরুলের প্রায় সমগ্রজীবন প্রবাহ চব্বিশের বিপ্লবীদের বিশ্বাসের ভিত্তিকে সুদেঢ় করে এবং দাবি আদায়ে অনুপ্রাণীত করে। কারারুগ্ধ নজরুল ঊনচল্লিশ দিন অনশন করেন। কারাভ্যান্তরে বসে লিখেছেন শিকল পরার গান— 

এই শিকল পরা ছল্ মোদের এই শিকল পরা ছল।

এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল \

বিষের বাঁশি কাব্যের এ গানটি চব্বিশের আন্দোলনে নানাভাবে মুক্তিকামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে। বন্দিদশার ভয় ও বেদনাকে জয় করার মহামন্ত্র হিসেবে কারাগার থেকে রাজপথ সব জায়গায় বিপ্লবীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে এ গান। এছাড়াও গণঅভ্যুত্থানের পূর্ব ও পরবর্তীসময়ে পিচঢালা রাজপথে কিংবা দেয়ালে-দেয়ালে গ্রাফিতিতে এবং স্যোসাল মিডিয়ায় নানাভাবে, নানা রঙে উপস্থাপিত হয়েছে।

বিগত সময়ে নানাভাবে নজরুল-সাহিত্যের সংস্পর্শ থেকে নতুন প্রজম¥কে দূরে রাখার অপতৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত পাঠ্যপুস্তকে নজরুল সাহিত্যের বিপ্লবী চেতনা এবং জীবন-ঘনিষ্ট রচনাসমূহ উপেক্ষিত ছিল। গত দেড়দশকে বাংলা একাডেমিতে নজরুল চর্চার কোন নজির নেই। নজরুল ইন্সিটিটিউটও ব্যস্ত ছিল রাজবন্দনায়। ফলে, অন্যায় আর অসুন্দরের যুগে চির সুন্দরের কবি নজরুলকে জানার তেমন সুযোগ নতুন প্রজম্মের ছিল না।

নজরুল সাহিত্যের ওজ্জ¦ল্য অবদমনের এ অপচেষ্টা চূড়ান্তভাবে সফল হয়নি। পরাধীনতার অন্ধারে জেনারেশন-জি খুঁজে নিয়েছে নজরুলকে। তাঁরা নজরুলের বিপ্লবী চেতনায় অনুরণিত হয়ে গেয়েছে— 

মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্যাম

মোরা ঝরণার মত চঞ্চল

মোরা বিধাতার মত নির্ভয়

মোরা প্রকৃতির মত সচ্ছল \

জীবনবোধের এ গীতি কবিতা আত্মজাগরণে অতুলনীয় প্রভাব বিস্তার করে। চব্বিশের আন্দোলনে ছোট বড় প্রায় প্রতিটি সমাবেশে এ গানটি সংগ্রামী জনতার সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।

‘জেন-জি’র এ মহাজাগরণে নজরুল রচিত ‘নতুনের গান’ শিরোনামের গানটির প্রভাব ছিল অসামান্য। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’র সম্মেলনের উদ্দেশ্যে ঢাকায় অবস্থানকালে নজরুল দাদরা তালের এ গানটি রচনা করেন। সন্ধ্যা কাব্যের এ গানটি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি তৎকালীন মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশের ‘রণ-সংগীত’ হিসেবে গৃহিত হয়। এ বিষয়ে সমালোচক লিখেছেন— ‘বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গানটির তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনেক। গানটি তরুণদের অগ্রগতির প্রতিধ্বনিতে মুখরিত’।  চব্বিশের আন্দোলনে তরুণ সমাজকে বিপ্লবী প্রেরণায় উদ্বেলিত করে এ গানের প্রতিটি পঙক্তি। এ গানের কথা ও সুরের প্রবল শক্তিমত্তা তরুণ সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে উপনীত করে—     

চল্ রে নৌ-জোয়ান,

শোন্ রে পাতিয়া কান—

মৃত্যু-তোরণ-দুয়ারে-দুযারে

জীবনের আহ্বান

ভাঙ্ রে ভাঙ্ আগল

চল্ রে চল্ রে চল্

চল্ চল্ চল্ \

চব্বিশের আন্দোলন ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তরুণ সমাজের অধিকার আদায়ের দাবি ক্রমান্বয়ে রূপ নেয় দেশ ও জাতির চূড়ান্ত মুক্তির সংগ্রামে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে নজরুল সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। কুলি-মুজুর, জেলে, তাঁতি-সহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি লিখেছেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি ন্যায় সঙ্গত আন্দোলনে তাঁর রচিত সাহিত্য প্রাসঙ্গিক।

ফ্যাসিবাদের প্রবল প্রতাপে যখন মানুষ দিশেহারা; যখন অন্যায়, অসত্য আর অসুন্দরের আস্ফালন; তখন নজরুল তাঁর লেখা ‘সেবক’ কবিতায় তুলে ধরেন মুক্তির পথরেখা। এ যেন অন্ধকারে পথ হারানো জাতির সম্মুখে মেলে ধরলেন ঊষালোকে পৌছানোর মানচিত্র—  

সত্যকে হায় হত্যা করে

অত্যাচারীর খাঁড়ায়

নেই কি রে কেউ সত্যসাধক

বুক খুলে আজ দাঁড়ায়?

চব্বিশের এ অমানিশায় আমরা পেয়ে গেলাম সত্যসাধকের দেখা! অত্যাচারীর রাইফেলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন মহাবীর ‘আবু সাইদ’। বুলেটে-বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত হলো; তবু মাথা অবনত করেনি অসত্যর সামনে। জেগে উঠলো সমগ্র বাংলাদেশ। অগণন আবু সাইদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো—‘চির উন্নত মম শির’।

ধ্বংস ও রক্ত মাড়িয়ে আন্দোলন এগিয়ে গেল কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। স্বৈরশাসকের মসনদে কাঁপন ধরিয়ে দিলো ছাত্র-জনতা। অত্যাচার তীব্র থেকে আরো তীব্রতর হতে লাগলো। নজরুল চেতনায় উজ্জীবিত ‘জেন-জি’ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্লোগানে-শ্লোগানে উত্তাল করে তুললো রাজপথ। তাদের প্রেরণা যোগালো দ্রোহের কবি নজরুল—

মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না

বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত।

এ আন্দোলনে নজরুলের লেখা ভাঙার গান গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা অসামান্য। এ গ্রন্থের ‘ভাঙার গান’ শিরোনামের গানটি প্রায় প্রতিটি সমাবেশে ছাত্র জনতা সমবেত কণ্ঠে গেয়েছে। গীতিকার এ গানের মাধ্যমে পরাধীন এ দেশকে একটি কারাগারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি তরুণদেরকে আহ্বান করেছেন, তারা যেন লাথি মেরে কারার ঐ লৌহ কবাট (কপাট) ভেঙে এ দেশ ও জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেয়। ‘ভাঙার গান’ প্রসঙ্গে সমালোচক লিখেছেন—      

সমকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই গানটি বহুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে আসছে। এর জ্বালাময়ী হুঙ্কার ধ্বনি পরাধীনকে উজ্জীবিত করে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পূর্বকালে এই গানটি ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অপরিহার্য অঙ্গ। অধিকাংশ সমাবেশ-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই এই গান দিয়ে শুরু অথবা শেষ হতো।

চব্বিশের নির্ভীক তরুণেরা স্বৈরশাসকের জিন্দান তুল্য এ দেশকে মুক্তি দিতে নজরুল-চেতনায় আন্দোলিত হয়ে আপোষহীন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় । ‘ভাঙার গান’ এ নজরুল লিখেছেন—

কারার ঐ লৌহ-কবাট

ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট

রক্ত-জমাট

শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী!

ওরে ও তরুণ ঈশান!

বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ!

ধ্বংস নিশান!

উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি।

চব্বিশের আন্দোলনের রূপরেখা পাওয়া যায়, নজরুলের লেখা ‘ভূতের ভয়’ নাটিকায়। পরাধীন মাতৃভূমি উদ্ধার প্রচেষ্টা এ নাটিকার ভিত্তি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিকামীদের পথ নির্দেশক এ নাট্য চব্বিশের আন্দোলনে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। চব্বিশের সংগ্রামে ছাত্র জনতা বলেছিল, পেছনে ফেরার কোন সুযোগ নেই! ‘ভূতের ভয়’ নাট্যের সংলাপেও একই সুর লক্ষ্য করা যায়। দখলদার ভূতের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ মুক্তিকামীদের অস্ত্র নিঃশেষ হলে বিপ্লব-কুমার বলেছিলেন— ‘(যুদ্ধ করিতে-করিতে) শুধু হাতে পায়ে যুদ্ধ কর। হত আহত সৈনিকের হাত ছিঁড়ে নিয়ে তাই দিয়ে আক্রমণ কর। মনে রেখো বন্ধু, আমরা কেউ ফিরে যাবার জন্য আসিনি!’

নজরুল সুনিদিষ্ট কোন দেশ কিংবা জাতির কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানুষ ও মানবতার কবি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই অন্যায়, অবিচার আর অসংগতি বিস্তার; সেখানেই নজরুল সাহিত্যের প্রসঙ্গিকতা প্রকট হয়ে ওঠে। নজরুলের বিশ্বচিন্তা তাঁর রচিত সাহিত্যে অনায়াসে পাওয়া যায়। কোন কালের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি তাঁর সাহিত্য-সম্ভার। সময়ের আবর্তে নজরুল সকল কালের সব মানুষের কবি। শতাব্দিকাল পরেও বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে নজরুল সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা বিশ্বয়কর!

তথ্যনির্দেশ—

১। মনসুর আজিজ (সম্পাদক), আড্ডাপত্র (ঢাকা: রাইটর্সি অব বাংলাদেশ, ফেব্রু. ২০২৫ খ্রি.), পৃ. ২১

২। অরূপ তালুকদার (সম্পাদক), কাজী নজরুল ইসলামের ধুমকেতু (বরিশাল: পরিচয় প্রকাশনী, ১৩৭৭

    বঙ্গাব্দ), পৃ. ১৩

৩। নজরুল রচনাবলী (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ), প্রথম খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৬ খ্রি.), পৃ. ১২৭

৪।  নজরুল রচনাবলী (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ), দ্বিতীয় খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৫১

৫। পারভীন আক্তার জেমী, নজরুল সাহিত্যে বিপ্লবী চেতনা (ঢাকা: অনন্যা, ২০২০ খ্রি.). পৃ. ১৮৭

৬। নজরুল রচনাবলী (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ), চতুর্থ খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৬৬

৭। নজরুল রচনাবলী (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ), প্রথম খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১২

৮। কাজী নজরুল ইসলাম, অগ্নিবীণা (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০২ খ্রি.), পৃ. ১৭

৯। আবুল আজাদ, নজরুল ইসলামের বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ বই (ঢাকা: গ্লোবলাইব্রেরী প্রাইভেট লিমিটেড,

    ২০০৩ খ্রি.), পৃ.৪৭

১০। নজরুল রচনাবলী (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ), প্রথম খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৯

১১। নজরুলের নাট্য সমগ্র (ঢাকা: কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, ২০২০ খ্রি.), পৃ. ৭১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top