‘ম্লান জোছনা’য় সমকালীন বাস্তবতা : শুকরান সাবিত

সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, মানব সমাজের আশির্বাদ হিসাবে যন্ত্রের আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু এখন যেন খোদ আবিষ্কারক সেই মানুষকেই শাসন করছে যন্ত্র। মানুষ আবির্ভূত হয়েছে যন্ত্র নাগরিক হিসাবে। বাসায়-বাড়িতে, অফিসে-আদালতে, স্কুলে-কলেজে, রাস্তায় এমনকি মানুষের সাথে মোলাকাতের সময়ও এখন এই যন্ত্র নাগরিকরা থাকেন মাথা নিচু করে; হাতের যন্ত্রটির দিকে তার সম্পূর্ণ মনোনিবেশ। এভাবেই যন্ত্র আমাদের বেঁধে ফেলেছে কঠিন নাগপাশে। আর এতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নামে কয়েকটি অ-সামাজিক প্লাটফর্ম। এই সামাজিক মাধ্যমগুলো আমাদের বাস্তবতা বিবর্জিত একটি সমাজে দাঁড় করিয়েছে।

ম্লান জোছনা’র একটি দৃশ্য

এসব সাইটের মধ্যে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক, লাইকি প্রভৃতি। কোনটা শুধু ছবি, কোনটা শুধু শর্ট ভিডিও আর কোনটা মতামত, ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যম। আর একে ছাড়িয়ে সবগুলোই হাজির হয়েছে আত্মপ্রচারের মাধ্যম হিসাবে। তবে এতটুকু থাকলেও হয়তো চলে যেত! কিন্তু এসব সাইটকে ঘিরে দিন দিন অপকর্ম বেড়েই চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে নগ্ন ছবি-ভিডিও প্রচার, নারীদের হয়রানি, স্পর্শকাতর বিষয়ে অপপ্রচার, কুরুচিপূর্ণ ছবি ছড়িয়ে হেনস্তা করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর আঘাত, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও গুজব ছড়ানো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।

এতসব কিছু হচ্ছে মানুষের অন্তরের অনিয়ন্ত্রিত অমানুষের জন্য। বাস্তবিক সমাজে বিদ্যমান ‘অবদমন’ -এর ধারণা অনলাইনের সমাজে যেন অচল। এখানে মানুষের দমনের চাইতে আত্মপ্রচার কিংবা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা চলে। অনেক সময় সামাজিক কাঠামোর মধ্যে তা সম্ভব হয় না। আর এই ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা সমভিব্যাহারে আমাদের তরুণ সমাজকে নিয়ে চলেছে ধ্বংসের গোরস্তানে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে এতটা ভূমিকার কারণ হচ্ছে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া সাইমুম থিয়েটারের টেলিছবি ম্লান জোছনা। উপরোল্লিখিত পরিস্থিতির সাথে মিল রয়েছে ফিল্মটির কাহিনী বিন্যাসের। এ.কে. জিলানীর রচনা ও নির্মাতা আব্দুল্লাহিল কাফির পরিচালনায় ম্লান জোছনায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনয় শিল্পী ইশতিয়াক হাসান তাকি। গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে ছিলেন মরহুম মাসুম আজিজ। আরও ছিলেন মুস্তাগিছুর রহমান মুস্তাক, সবুজ করিম, ফারুক হাসানের মত অভিনেতারা।

টেলিফিল্মটির কাহিনী একটি গ্রামের এক পাগল যুবককে ঘিরে। লোকে বলে হাসান পাগলা। মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া আর তার ছবি তুলে ভাইরাল করতে চাওয়া-ই তার পাগলামি। কিন্তু হাসান পাগলা ছাড়াও গ্রামের আরও অনেক সুস্থ যুবকও যেন ইদানিং পাগলামির রোগে ভুগছে। চুরি করে হলেও তাদের মাদক সেবন করা লাগে। আর সংলাপ থেকে উদ্ধৃত না করলেই চলে না যেÑ

“আইজ-কালকার পোলাপানগুলো মাঠ খালি রাইখ্যা মোবাইলে ফুটবল, আর ওই মারামারি খেলতেছে।”

“…পোলাপানগোরে এখন কি আর খেলার সময় আছে! এখন ওই মোবাইলে টিকটক না কি জানি বানায়া ইন্টারনেটে ছাড়ে। এরপরে কী আজব অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি! ছি ছি ছি ছি! আরে আগে আমরা… কে আগে মাঠ দখল করব এ নিয়া দুই দলের মধ্যে মারামারি হইত। আর এখন! আহা-রে!”

গ্রামের মুরব্বিরা সিদ্ধান্ত নেন যুবকদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাবেন। এজন্য একজন স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে এসে সভা করা হয়। সে সভায় ঝামেলা পাকায় হাসান পাগলা। একই কা- করে রাস্তাতেও। এ নিয়েই প্রবেশের দুয়ার খোলে মূল কাহিনী।

বাস্তবে হাসান পাগলা গ্রামের এক সাধারণ জেলে মনু মিয়ার (মাসুম আজিজ) মেধাবী ছেলে। যে উচ্চ মাধ্যমিকে উপজেলায় প্রথম হয়ে পাশ করে। এরপর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে। এগিয়ে চলে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ একটি ঝড় তার জীবনটা তছনছ করে চলে যায়। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। এটা পার হলেই শুরু হবে ইন্টার্নি। এ সময়ে হাসান জানতে পারে তার রুমমেটরা ভর্তি পরীক্ষা জালিয়াতি চক্রের সাথে জড়িত। সরল-সহজ জীবন যাপনকারী হাসান তা জানিয়ে দেয় মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে। এ ঘটনা বুঝতে পেরে তার বন্ধুরা তাকে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করে। তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে তার সাথে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভাইরাল করা হয়। ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তাকে ‘হাতেনাতে’ আটক করে। কলেজের সুনাম ক্ষুণœ হয়। কর্তৃপক্ষও তার ছাত্রত্ব বাতিল করে। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কলেজে ঠাঁই না পেলে গ্রামে ফিরে যায় হাসান। কিন্তু জানতে পারে তার ‘কর্মকা-ে’ আঘাত পেয়ে আর সহ্য করতে পারেনি তার অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা। মারা গেছেন তিনি। জীবনের এই বিষণœ বাস্তবতা মেনে নিতে পারেনি হাসান। গ্রামবাসী তার চিকিৎসার বহু চেষ্টা করেও তাকে সারিয়ে তুলতে পারেনি।

মোটাদাগে এই প্লটের উপর দাঁড়িয়ে ম্লান জোছনা। টেলিফিল্মের অন্যান্য দিক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই লোকেশনের তারিফ করতে হয়। রাজশাহীর আড়ানির অত্যন্ত মনোরম গ্রামীণ পরিবেশে নাটকটির শ্যুটিং হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে ঢাকা মেডিকেল কলেজেও শ্যুটিং করতে হয়েছে। আর অভিনয়ের তারিফ না করলেই নয়। মরহুম মাসুম আজিজ বাংলা নাট্যজগতে নিজ স্বাতন্ত্র্যে আসন গড়ে নিয়েছিলেন। তাঁর অত্যন্ত আন্তরিক অভিনয় মনু মিয়া চরিত্রে বাস্তবিক প্রাণ সঞ্চার করেছে। পিতৃ¯েœহ! মনু মিয়ার পিতৃ¯েœহ প্রেম আর বিষাদে জড়ানো। সম্ভবত প্রতিটি পিতৃচরিত্রই এমন। নইলে দর্শক এমন আবেগে বিগলিত হবে কেন!

মুস্তাগিছুর রহমান মুস্তাক কিছুটা বনেদী পরিবারের প্রতিনিধি। গ্রামে পরিচিত হাশেম চাচা হিসাবে। তার বয়ানেই দর্শক জানতে পারে হাসানের জীবনের সেই বিষাদগীতি। এর বাইরে ম্লান জোছনার ঘটনা পরম্পরায় তাঁর বিশেষ অংশগ্রহণ নেই। নিজ অবস্থান থেকে যথাসাধ্য টেলিফিল্মটিকে এগিয়ে নিয়েছেন।

হাসান পাগলার চরিত্রে অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনেতা ইশতিয়াক হাসান তাকি। তার চমৎকারিত্ব বিশেষ যখন তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে নিজেই যেন হারিয়ে গেছেন হাসান পাগলার মধ্যে।

হাসানের পরিণতির জন্য যারা দায়ী তাদের ভূমিকায় সামির (জাবির আল মাহমুদ), রাফসান (নাজমুল হাসান) ও ইয়ামিনও (রেজাউল ইসলাম রাজিব) ভালো অভিনয় করেছেন। দোকানদার চরিত্রে রণদেব, শাফিন চরিত্রে নাজমুল বিন আশশাব ভালো ভূমিকা রেখেছেন। সামান্য সময়েও প্রভাব রেখেছেন প্রিন্সিপাল চরিত্রে বদিউর রহমান সোহেল। কিন্তু গল্পে প্রাসঙ্গিকতা আনতে শুরুর দিকে যেসব চরিত্র চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে অভিনয়ে সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা করা হয়নি, এমনকি তাদের প্রাসঙ্গিকতা-ই তেমন রক্ষিত হয়নি।

এতক্ষণে আরও কিছু কথায় আসা যাক। টেলিছবির শেষ দিকে এসে দর্শক কামনা করে যেন হাসানের সুচিকিৎসা সম্ভব হয়। কিন্তু নাট্যকার তার পথ খোলা রাখেননি। তাঁর এই সংযম বেশ প্রশংসার। একই সাথে অন্যান্য কোন চরিত্রেরই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছে। তবে সাধারণভাবে চিরকাল ভালো কিংবা চিরকাল মন্দ, অর্থাৎ টাইপ বা ফ্ল্যাট চরিত্র পাঠক ও দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারে না। এজন্য নাটক-উপন্যাসের নায়ক মাত্রই ভুল-ভ্রান্তি ও ভালো-মন্দের মিশেলে মানুষ হয়ে থাকেন। কিছু চরিত্রই থাকে যারা জীবন ও জগতের ভাঙা-গড়ায় অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু ম্লান জোছনায় এমন কোন নজির মেলে না। এখানে যারা ভালো তারা চিরকালই ভালো আর মন্দরাও চিরকালই মন্দ। অথচ জীবনের বাস্তবতা তা বলে না। তবুও গণহারে সবাইকে মতান্তর ঘটানোর চাইতে নাট্যকারের এই নাট্যপরিকল্পনা অধিক সঙ্গত।

কাহিনী প্রসঙ্গে আরও বলতে গেলেÑ দর্শক হাসানের জীবনের মর্মন্তুদ নিয়তি জানতে পারে হাশেম চাচার মুখে। কিন্তু যতটুকু কাহিনী জানা গেল তাতে হাশেম চাচার কাছে তা বর্ণনা করার মতো সময় ও পরিবেশ হাসান কখনও পায়নি। সে বাড়িতে পৌঁছতেই বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন হিসাবে দাঁড়িয়ে গেল কিনা তা নাট্যকার ও সংশ্লিষ্টরা ভেবে দেখবেন। আরেকটি বিষয় বলতেই হচ্ছেÑ এ ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে এমন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। এদিক থেকে প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িতদের ধরা পড়ার বিষয়টি তারা ধামাচাপা দিতে পারেন। কিন্তু এতটা উন্নাসিক হওয়ার কথা নয়। একটি ছেলে কয়েক জনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ দিল, কিন্তু তার নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা করা হয়নি। ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে দোষীদের কোন শাস্তি দেওয়া হয়নি। উপরন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কিভাবে ছড়াল তা সামান্য খতিয়ে দেখলেই ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়ে যেত। কিন্তু কলেজ প্রশাসন সেদিকে এগোয়নি। তাছাড়া ঢামেকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলেও কলেজ প্রশাসনের ‘কনসার্ন’ প্রয়োজন। কিন্তু এখানে দেখা গেল তাকে সরাসরি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পরবর্তীতে তা কলেজ কর্তৃপক্ষের ‘নজরে এসেছে’। কিন্তু সাময়িক শাস্তি নয়, তারা নিয়েছে কঠোরতম পদক্ষেপ। এর সবকিছুই কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় তথা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতার পরিচায়ক। এমনটি হলে ঠিকই আছে। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি এত সহজে ধামাচাপা দিতে পারা স্বাভাবিক নয়; স্বাভাবিক নয় কলেজ প্রশাসনের অজ্ঞাতে হোস্টেল থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা, একইসাথে এতবড় শাস্তিও। কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে বড় বড় ঘটনাও শাস্তির আওতামুক্ত থেকে যায়। কাজেই এগুলো রচনার ত্রুটি কিনা তাও নির্মাতাদের ভাবতে হবে।

প্রখ্যাত শিল্পী তোফাজ্জল হোসেন খানের সুরে ‘যন্ত্রের যাদুকর’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল নোমান

টেলিফিল্মে দুইটি গান ব্যবহার করা হয়েছে। দুইটিই লিখেছেন নাজমুল বিন আশশাব। প্রখ্যাত শিল্পী তোফাজ্জল হোসেন খানের সুরে ‘যন্ত্রের যাদুকর’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল নোমান। গানটি প্রাসঙ্গিকতা রক্ষা না করেই পরিবেশিত হয়েছে। আরেকটি গান ‘নিয়তি’। এটিও নাজমুল বিন আশশাবের লেখা। আবু তৈয়ব মিসবাহর সুর করা এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন আতিক আশরাফ। কিন্তু গানটিতে ব্যবহৃত ‘খোকা’ শব্দটি আরও প্রাসঙ্গিক হত যদি হাসানের শৈশব কিংবা কৈশোর দেখানো হত। কিন্তু তা হয়নি।


দুই

‘আধুনিক’ শব্দটি দিয়ে আসলে নির্দিষ্ট কোন সময়কে বেঁধে দেওয়া চলে না। সময়ের প্রবহমানতার ¯্রােতে আধুনিকতাও ভেসে চলে। অভিধান দেখতে গেলে আধুনিকতার অর্থ মেলেÑ যা কিছু বর্তমান। এই বর্তমান অতীতেও ছিল। সে অর্থে যে সময়টাকে প্রাচীন কাল হিসাবে কিংবা মধ্যযুগ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে তাও সে সময়ে ছিল ‘আধুনিক’। অর্থাৎ প্রতিটি কালই পূর্বতন কালের তুলনায় আধুনিক কাল। কালের প্রসঙ্গ এই কারণেই আনতে হয়েছে যে প্রতিটি কালই পূর্বতন সময়ের সাথে কিছু ঠা-া-যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। যারা তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ পড়েছেন তারা দেখেছেন প্রবীণ যারা, পূর্বতন যুগের প্রতিনিধি যারা তারা আধুনিক কালের মনস্তত্ত্ব ধরতে ব্যর্থ হন এবং তার সাথে প্রতিযোগিতা এমনকি বিরোধিতায় লিপ্ত হন। কিন্তু আধুনিকতার প্রবল তুফান পূর্বসূরীদের সমস্ত বিশ^াস ও সংস্কারকে মুছে দিয়ে চলে যায়। এজন্য দেখা যায় পূর্ববর্তী জরাজীর্ণ সমাজের প্রতিনিধি বনওয়ারী বাধা দেয় করালিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁশবাদির অতিপ্রাকৃত জগতের বিপক্ষে জয়ী হয় আধুনিক যন্ত্রযুগ। যদিও লেখক যন্ত্র শাসিত সভ্যতার প্রতি বিরূপ ছিলেন কিছুটা, তবুও উপন্যাসে তিনি তার জয়কে আটকে রাখতে পারেননি।

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’য় হাজার বছরের সংস্কারবদ্ধতার প্রতীক কাহার সম্প্রদায়ের কাছে যন্ত্র ছিল আধুনিক জীবনের এক বিপর্যয়ের নামান্তর। তারা বুঝেছিলেন এতে পুরান সমাজকাঠামো ভেঙে পড়বে। এমনটা হয়েছিলও শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আমরা দেখেছি এতে আরেকটি নতুন সমাজকাঠামো নির্মিত হয়েছে। সেটি ভালো কি মন্দ তা বিস্তর আলোচনা সাপেক্ষ। তবে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছেÑ যন্ত্র মানব সমাজের জন্য আশির্বাদ হিসাবেই হাজির হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ‘আধুনিক কাল’ যেন পূর্বের সব সীমাÑপরিসীমা ছাড়িয়ে ডানা মেলেছে আরও বেশি বিপর্যয়ের ওপর ভর করে। হাঁসুলী বাঁকের আদিম মানুষেরা সামান্য কল-কারখানায় কাজকর্ম করাকেও যন্ত্রের শাসন হিসাবে দেখেছিলেন। এখন তো মানুষ মাত্রই স্বীকার করবেন যে যন্ত্রই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

হাঁসুলী বাঁকের মতোই এই টেলিছবির পুরাতন সমাজ আধুনিক জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এ ‘জীবন বাস্তবতা’ যতটুকু, তারও অধিক জীবন যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণার প্রতীক হিসাবে দর্শকের সামনে হাজির হয়েছে হাসান। মেধাবী, সদা হাসিমুখ, ন¤্র-ভদ্র এই ছেলেটি একটি সময় মুখোমুখি হয়েছে অশেষ লাঞ্ছনার। তার সহ্যের অতীত ছিল এ যন্ত্রণা। এজন্যই তাকে দেখা যায় পাগলামিতে।

দুই গল্পের পরিস্থিতি এক ও অভিন্ন নয়। হাঁসুলী বাঁকের বাঁশবাদি গ্রামে আধুনিকতার অভিঘাতে পুরাতনকে ভেঙে যে নতুন সমাজ জন্ম নিয়েছে তা একটি রূপান্তরমাত্র। কিন্তু ম্লান জোছনার গ্রামীণ সমাজ যে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তার মোকাবেলা না করলে রূপান্তর নয়, সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে। তবে শিল্পের প্রশ্নে প্রচারণার ব্যাপারটি এমন খোলাখুলিই আসবে কিনা তা তর্কাতীত নয়। কোন কথা না বলেও যদি বার্তা উপস্থাপন করা যায়, তাহলে শিল্পের স্বার্থে আরও কিছু রাখঢাক রাখা যায় কিনা সেটি ভাবা যেতে পারে।


তিন

আবারও ফিরতে হয় শুরুতে। যন্ত্র যুগের যন্ত্র নাগরিক আমরা। আমাদের চারপাশের সবকিছুই যন্ত্র। যন্ত্র কী তার সংজ্ঞা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। থ্রি ইডিয়টসের মতো ‘আসান ভাষা’য় বলতে গেলে সেসব কিছুই যন্ত্র যা মানুষের কাজে আসে এবং সময়ের অপচয় রক্ষা করে। কিন্তু যন্ত্র এখন শুধু মানুষের কাজে আসছে না, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গত বছর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫২.২ মিলিয়ন। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন বলছে, সর্বোচ্চ ফেসবুক ব্যবহারকারী তিন দেশের একটি বাংলাদেশ। আর গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ একবারের জন্য হলেও ফেসবুক ব্যবহার করেছে। সে বছর ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ডিসেম্বরে বিশে^র এক-চতুর্থাংশ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করবে। আর ডিসেম্বরের হিসাব বলছে, ফেসবুক তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছে।

কিন্তু খুবই আশ্চর্যজনক যে কথা ফেসবুক বলছে তা হচ্ছেÑ ভারত, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন Ñএই তিনটি দেশের ব্যবহারকারীদের জন্য গড় ব্যবহারকারীর এই সংখ্যা বাড়ছে। এটি শুধু ফেসবুকের তথ্য। অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য জানতে গেলে আরও ভয়াবহ পরিসংখ্যান বেরিয়ে আসবে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দুঃসাধ্য ব্যপার। এজন্যই তরুণ সমাজ খুব সহজেই জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপতৎপরতায়। এ থেকে মুক্তির সহজ উপায় সমাজের ঢিলেঢালা রক্ষণশীলতাকে পূর্ণ বিকশিত করা। ধর্মীয় অনুশাসনের কোনই বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে।

এরই একটি সচেতন প্রয়াস হিসাবে ম্লান জোছনা নির্মিত হয়েছে বলে বিশ^াস করা চলে। এজন্য টেলিফিল্মের সাথে জড়িত কলাকুশলীদের প্রত্যেকেই ধন্যবাদার্হ। উপরোল্লিখিত সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি এড়িয়ে গেলে খুব সাধারণভাবে ম্লান জোছনা অনবদ্য একটি নির্মাণ। এর বহুল প্রচার কামনা করি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top