আমি দশ টাকার একটা নোট। টাকশালে জন্ম, আর মৃত্যু হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পিছনে—যদি স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। আমি যে জায়গাটায় থাকবো সে জায়গাটাতে আগুন লেগে গেলে, যার কাছে বা যে ব্যাগে থাকবো সে বা তা মাটির নিচে চাপা পড়লে অথবা আমি নিজেই পানিতে ডুবে গেলে অপমৃত্যুও হতে পারে আমার—চলে যেতে পারি কোনো ছাগল, মাছ বা হিংস্র প্রাণীর পেটে। অথবা ব্যাংকে বা ড্রয়ারে থাকতে থাকতে এক সময় টেম্পার নষ্ট হওয়ার কারণেও চলে যেতে পারি খরচের খাতায়। তবে আজকে আমার নিজের কাহিনী বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এটুকু বলে রাখি যে, দশ টাকার নোটেই পরিবর্তন এসেছে সবচেয়ে বেশি; দশ টাকার নোটের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
আমি আমার জীবন চলার পথে বেশ কিছু ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। সেগুলো শোনাবো আপনাদেরকে। একবার এক কবির হাতে পড়েছিলাম। কবি তার হাতের মুঠোয় আমাকে আর একটা কাগজের টুকরাকে দলামোচা করে হাঁটছিলেন। রাস্তার পাশে ছিলো একটা ডোবা। ডোবায় হাঁসেরা খেলছিলো। কিছু শাপলাও ফুটেছিলো সেখানে। কবি সে দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলেন। দলামোচা করা কাগজটা মেলার চেষ্টা করলেন। সেটা করতে গিয়ে তিনি আমাকে ফেলে দিলেন রাস্তার কিনারে। হয়তো সে মুহূর্তে তার কোনো কবিতার আইডিয়া চলে এসেছিলো। কবি দশ টাকা নিয়ে বের হয়েছিলেন কলা কিনবেন বলে। আমাকে ওভাবে ফেলে রেখেই কবি এক সময় সেখান থেকে চলে গেলেন।
আমাকে পতিত অবস্থা থেকে তুলে নিলো এক ভিক্ষুক। আমার মেজাজটাই গেলো খারাপ হয়ে। ভিক্ষুকের হাতে পড়েছি সে জন্য নয়, ব্যাটা আমাকে বিড়ির ঠোঙ্গার মধ্যে রাখলো বলে। বিড়ির গন্ধে আমি মাখামাখি হয়ে গেলাম। বাড়িতে নিয়ে ভিক্ষুক আমাকে একটা বাঁশের চোঙ্গার মধ্যে রাখলো। ওখানেই সে তার টাকা জমা করে রাখে। সেখান থেকে এক ফাঁকে আমাকে চুরি করে নিয়ে গেলো তার মেয়ে। মেয়েটার বয়স আট থেকে দশের মধ্যে। এই চুরির অপরাধে ওর বাপ ওকে মারতে মারতে আধামরা করে ফেললো। ওর মা-ও ওকে ছাড়াতে এলো না। ভেবে দেখেছেন, ভিক্ষুকটা সবার করুণা ভিক্ষা করলেও ওর মধ্যে কিন্তু করুণার কণাও নেই।
আরেকবার আমি এক নিশিকন্যার হাতে গিয়ে পড়লাম। সে আবার টাকা-পয়সা খুব যত্ন করে রাখে। ব্লাউজের ভিতরে তার টাকা রাখার ব্যবস্থা আছে। টাকার প্রতি তার খুব মায়া বলে সে এমনটা করে না। পুলিশের বখরার হাত থেকে বাঁচতেই সে এ কাজটা করে। নির্ধারিত বখরা দেয়ার পরও মাঝে মধ্যে পুলিশ তার কাছে অতিরিক্ত দাবি করে। সে তার বুকে ঝুলানো শূন্য মোবাইল ব্যাগটা দেখিয়ে বলে, ‘অহনো কুনু কাস্টমার পাই নাই।’
পুলিশ তাকে গালি দেয়, ‘তুই কাস্টমার পাবিও না মাগী।’
পুলিশ তাকে পার হয়ে গেলে সে থু থু পেলে। ঘৃণার থু থু, তৃপ্তির থু থু। এরপর সে বুকে হাত দিয়ে নিশ্চিত হয় তার টাকাগুলো আছে কি না। পুরুষ মানুষ টাকা রাখে পাছার নিচে। সেই তুলনায় আমি এখানে কী যত্নেই না ছিলাম! টাকার মধ্যে যারা নিজেদের ছবি ছাপায় তারা কি চিন্তা করে লোকজন তাদেরকে পাছার নিচে রাখে?
নিশিকন্যার একটা কথা আমার মনে আছে। সে বলতো, ‘হায় রে ট্যাহা! তুই আর আমি একই। এই হাত থিকা ঐ হাতে।’
আরেকটা মেয়ের কাছে এর চেয়েও বেশি যত্নে ছিলাম। মেয়েটা তখন ক্লাশ টেনে পড়ে। মেয়েটা ফুলের পাপড়ি, ছবি, কার্ড, ময়ূরের পালক—সব কিছুই বইয়ের মধ্যে রাখতো। আমারও জায়গা হয়েছিলো তার বইয়ের মধ্যে। খুবই গোছালো ছিলো মেয়েটা। বই যেটা পড়তো, শুধু সেটাই নামাতো। বাকিগুলো সাজানো থাকতো। বইয়ে একটা দাগও দিতো না। কেউ দাগ দিলে তার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিতো। দীর্ঘ দিন নার্সি হোমে থাকলে কালো মানুষও যেমন সুন্দর হয়ে ওঠে, আমি তার বইয়ের মধ্যে থেকে তেমনি যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠেছিলাম। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে মেয়েটা সব বই বিক্রি করে দিলো। বইয়ের সাথে ফুলের পাপড়ি, ছবি, কার্ড, ময়ূরের পালক এবং আমিও বিক্রি হয়ে গেলাম। কী করে যে সে তার প্রিয় জিনিশগুলোর কথা ভুলে গেলো, বুঝলাম না। হয়তো সে পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আমাদের কথা ভুলে গিয়েছিলো।
আমাকে নষ্ট করে ফেলেছে এক বেকুব। সে আমার গায়ে তার নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর লিখে ভরিয়ে ফেলেছে। ব্যাংকারদের বাইরে এই বেকুব শ্রেণীই কেবল টাকার উপরে কলমের দাগ লাগায়। খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে এই বেকুব শুধু আমাকেই নষ্ট করেনি, স্কুলের বেঞ্চে, দেয়ালে, বাথরুমে, বাসের সিটের পিছনে—মোট কথা যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানেই ওর নাম-পরিচয় লিখে রেখেছে। ওর দলে যত বেকুব আছে সেগুলো পুরুষ টয়লেটেও নিজের নাম আর মোবাইল নম্বর লিখে ভরিয়ে ফেলে। ও রে গাধারাম, পুরুষ টয়লেটে কি কোনো দিন মেয়েরা ঢুকবে? হ্যাঁ, টয়লেট পরিষ্কার করার কাজে কোনো মেথরনী ঢুকতে পারে। সেই মেথরনী কি ওগুলো পড়বে না পড়তে পারবে?
বেকুবটার হাতে আমার রূপ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার মন খুবই খারাপ। এই সব বেকুবের জন্য একটা আইন করা দরকার। টাকা ছাপাতে টাকা লাগে। জনগণের টাকা। জনগণের সম্পত্তি যারা এভাবে নষ্ট করে তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য অবশ্যই আইন থাকা দরকার।
রূপ নষ্ট হওয়ায় আমার এত আফসোস কেন? কারণ এই মুহূর্তে আমি একটা ছোট্ট মেয়ের হাতে আছি। আমার কারণে তার মন খারাপ। মেয়েটার নাম তাশফিয়া। তাশফিয়ার আব্বু বিদেশে থাকেন। ওর আম্মুও চাকরি করেন। তাশফিয়ার সুখের জন্য তারা নিজেদের জীবন নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। ওর আব্বু মিনহাজুল ইসলাম একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। থাকেন দুবাইতে। সরকারী চাকরি করেন। ওর আম্মু আফরোজা রুমকি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। তিনি চাকুরি করেন একটা সিএ ফার্মে। তাদের স্বপ্ন হলো মেয়েকে তারা অ্যারোনটিক্সে পড়াবেন। মেয়ের স্বপ্ন আব্বু-আম্মুর হাত ধরে পার্কে ঘোরা। ওর আব্বু যখনি জানতে চান, ‘আম্মু তুমি কী চাও’, ও ওর এই স্বপ্নের কথা বলে।
তাশফিয়া ক্লাশ টুতে পড়ে। স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য গাড়ি ঠিক করা থাকলেও ভ্যানে শুধু স্কুল থেকে বাসায় যাওয়া হয়। আসার সময় ওর আম্মু ওকে দিয়ে যান। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ওর নানু প্রত্যেক দিনই ওর ব্যাগে পাঁচ-দশ টাকা ঢুকিয়ে দেন এটা সেটা খাওয়ার জন্য। ওর আম্মু সব সময় নিষেধ করেন, ‘বাইরের কোনো খাবার খাবা না। ওগুলোতে ধুলোবালি থাকে। খেলে পেটে অসুখ হবে। তুমি কী খেতে চাও সেটা আম্মুকে বলবা। আম্মু কিনে আনবো, না হয় ঘরে বানিয়ে দেবো।’ সে কারণে নানী-নাতনীর এই গোপন দেয়া-নেয়ার কথা ওর আম্মু জানেন না।
আজও ওর নানু ওকে দশ টাকা দিয়েছেন। সেই টাকাটা হলাম আমি। ও ময়লা টাকা খুব একটা পছন্দ করে না। কিন্তু নানু সব সময় টাকা দেন লুকিয়ে। সে কারণে টাকাটা নতুন না কি পুরনো সেটা দেখার সুযোগ থাকে না।
তাশফিয়া বেশির ভাগ সময়ই টাকা বাসায় ফেরত নিয়ে যায়। নিয়ে প্লাস্টিকের ব্যাংকে রাখে। ওর আম্মু ওকে প্লাস্টিকের একটা ব্যাংক কিনে দিয়েছেন। তালা ব্যাংক। সেই তালা ব্যাংকে মা-মেয়ে মিয়ের টাকা জমায়। তাশফিয়া যে টাকা জমানোর লোভে টাকা ফেরত নিয়ে যায়, ব্যাপারটা তা নয়। প্রায় প্রতি দিনই তাশফিয়ার মন খারাপ থাকে। সবার আব্বুই স্কুলে আসে। কেউ সপ্তাহে এক দিন আসে, কেউ মাসে আসে মাসে এক দিন। দু-একজনকে অভিভাবক সমাবেশ বা রেজাল্টের দিন আসতে দেখা যায়। তাশফিয়ার আব্বু কোনো দিনই আসেন না। আব্বুদেরকে মেয়েরা যা বলে তারা তা-ই শোনেন। আম্মুরা আবার সব কথা শুনতে চান না। তাশফিয়ার নানু অবশ্য আসতে চান ওকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেটাতেও ওর আম্মু রাজি নন। তাতে না কি নানী-নাতনী দুজনই হারিয়ে যাবে।
আজও তাশফিয়ার মন খারাপ। তার স্কুল ছুটি হয়েছে এইমাত্র। আংকেল বলে গেছেন, তোমরা গাড়িতে বসে থাকো। হেড স্যারের সাথে আমার একটু কথা আছে। গাড়ির জানালা দিয়ে সব মেয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরের দৃশ্যগুলো দেখছে তারা। তাশফিয়াও বাইরে তাকিয়ে আছে। একটা কিশোর ছেলে হেঁটে হেঁটে খেজুর গাছের পাতা দিয়ে বানানো ফুল বিক্রি করছে। তাশফিয়া হাত ইশারা করে তাকে ডাকলো। ছেলেটা এসে গাড়ির পাশে দাঁড়ালো। ফুলগুলো দেখতে সূর্যমুখীর মতো। এক ডাঁটে তিনটা ফুল। মাঝখানেরটার তুলনায় দু’পাশের ফুল দুটো একটু উঁচুতে। তাশফিয়ার কাছে মনে হলো মাঝখানেরটা সে, আর দু’পাশে তার আব্বু-আম্মু। সে জানতে চাইলো, ‘কত টাকা?’
‘বিশ টাকা।’ ছেলেটা জানালো।
‘দশ টাকায় দেবেন?’
‘না। দশ টাকা দিয়া চরকা নিতে পারো।’ ছেলেটা চরকা দেখালো।
তাশফিয়া ডানে-বামে মাথা নাড়লো। ছেলেটা সরে গেলো। তাশফিয়া ফুল কেনার জন্য ব্যাগ থেকে আমাকে বের করে হাতে নিয়েছিলো। এবার সে আমাকে তার ফ্রকের উপরে রেখে দুই টুকরা করে ফেললো। টুকরা করার পর আবার আমাকে সে পায়ের নিচে নিয়ে দলতে লাগলো। সে জানে না আমার জীবন কেঁচোর মতো। মূল অংশটা থাকলেই আমি চলি। জোড়া লাগিয়ে দিলে আবার আমি আগের মতো। একটা আশার মৃত্যু ঘটলেও আমার কিন্তু মৃত্যু হলো না।
