নজরুল প্রাসঙ্গিক নয় কেন

নজরুল কি অপ্রাসঙ্গিক আমাদের দেশে? এমন প্রশ্ন করা হলে মিনমিন স্বরে অনেকে জবাবে বলবেন- তা কেন হবে। কিন্তু ছানি কেটে স্বচ্ছ চোখে তাকিয়ে দেখুন, কোথায় নজরুল প্রাসঙ্গিক- কোথায় নজরুল চর্চা হচ্ছে? নেই। নিয়ম মেনে জন্ম-মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে কিছু সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা-তাও দায়সারা গোছের। ‘জাতীয় কবি’ ঘোষণার বহু বছর পর ‘৩৬ জুলাইয়ের’ পট পরিবর্তনের পর সরকারি গেজেটে স্বীকৃতি মিলেছে। ওই পর্যন্তই।

নজরুলের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হচ্ছে কোথায়? এতোগুলো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, কয়টা থিসিস বের হচ্ছে প্রতিবছর? যে বিশাল ও সমৃদ্ধ সঙ্গীতের ভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা ঘুমিয়ে আছে কিছু এলপি, সিডি, ক্যাসেটের বুকে।

পশ্চিমবঙ্গে এতো এতো সঙ্গীত শিল্পী কতজন নজরুল সঙ্গীত নিয়ে আছেন? নজরুল ‘মুছলমান’ বলে সেখানে হিন্দুদের কাছে উপেক্ষিত, কিন্তু বাংলাদেশে? বঙ্গদেশে ‘মুসলমান বাঙালি’ কেন নজরুল চর্চা বাদ দিয়ে রেখেছে?

কতোজন এ দেশে সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন? কতোজন নজরুলের অসাধারণ গান নিয়ে মেতে আছেন? ‘নজরুল শিল্পী’ হাতের কড়ে আঙুলে নিমিষে গুনে শেষ করা যায়। অনেকে নজরুল সঙ্গীত চর্চা করা লজ্জাকর মনে করে। তাই নজরুল সঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক গান গেয়ে জাতে উঠার চেষ্টা করেন। একজন শিল্পী সবরকম গান গাইতে পারেন- এটা তার যোগ্যতা, তাতে মানা নেই। কিন্তু নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে নিজের অবস্থান নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগা কেন!

পরিস্থিতি এমনটা ছিলো না কিছুকাল আগেও। নজরুলের রাগ নির্ভর এবং নানা সুরের উঁচু মানের কথার গানগুলো আগে পশ্চিম বঙ্গের (সর্বভারতে) লিজেন্ড হিসাবে খ্যাত শিল্পীরা গেয়েছেন। বাংলাদেশেও বহু বড় বড় শিল্পী নজরুলের গানে সমর্পিত ছিলেন আজীবন, এখন নয়। কেন নজরুল চর্চার এ দশা হলো আমরা অন্বেষা দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করবো।

প্রথমে আসি নজরুল সাহিত্য গবেষণা চর্চার বিষয়ে। ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের মাধ্যমে পশ্চিম ও পূর্ব দুই খণ্ডে  আমরা যে পাকিস্তান পেলাম, সেটা ছিলো প্রায় দু’শো বছর ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির। একদিকে ব্রিটিশ বেণিয়া অপর দিকে তাদের নিযুক্ত হিন্দু জমিদারদের অধীন বঙ্গের মুসলমানরা নিষ্পেষিত ও শোষণের শিকার হয়েছিলো। ফলে আর্থিক-সাংস্কৃতিক উভয় দিক থেকে মাজাভাঙ্গা একটা জাতি পেলো একটি মানচিত্র ও পতাকা। সেই মানচিত্র রক্ষা করা পতাকা সমুন্নত রাখা ছিলো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে হেরে গেছে এ জাতি। তাই বিশাল ভারত বহুভাষা, বহু ধর্ম, বহু জাতপাতের হওয়া সত্ত্বেও অবিভক্ত থাকলেও এক ধর্মের, এক সংস্কৃতির, দু’ভাষার জনগোষ্ঠী একত্রে থাকতে পারেনি। নজরুলকে অপ্রাসঙ্গিক রাখার পেছনে নিহিত ষড়যন্ত্রের ফল তারা খেয়েছে। আমরা এখনও বুঝতে পারিনি কোথায় পরাজয় ঘটেছে।

যা হোক, সাতচল্লিশের ভাগাভাগিতে অনেক কিছু ভাগ হলো। ভাগ হলো মানুষের বাসস্থান, ভাগ হলো পরিবার-পরিজন, ভাগ হলো শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী অনেক বাঙ্গালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে পাড়ি দেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। কেউ কেউ দেশভাগের পরপরই চলে আসেন। কেউ কেউ উনিশ’ পঁয়ষট্টিতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর। আসতে বাধ্য হন তারা। এর ভেতর যারা বিহার, ভূপাল, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল হতে বাংলাভাষী নন ‘বিহারী’ হিসাবে চিহ্নিত তারা ছাড়া বাংলাভাষীরা আত্মীকরণ প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে মিশে গেছেন- নির্বিঘ্নে বসবাস করছেন।

আমার রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানার উদ্দেশ্য নজরুল চর্চা কোন সময়ে কি রকম ছিলো তা সামান্য আলোকপাত করা। দেশ ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বিপুল উৎসাহ চাড়া দিয়ে ওঠে। এতোদিন ছিলো যা কলকাতাকেন্দ্রিক, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ‘আশীর্বাদ’ নিয়ে, নাম লুকোচুরি করে, নিজের আত্মপরিচয় [মুসলমান) ভুলে মাথা নত করে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করা- পূর্ব পাকিস্তানে তা আর থাকলো না, মুক্ত পরিবেশে রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্রিক সঙ্গীত ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার হিড়িক পড়ে গেল। এ সময় নজরুল ছিলো ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মূলধারা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করতেন এমন বাঙালি কবি সাহিত্যিক-শিল্পীরা পূর্ব পাকিস্তানে এসে মুক্ত পরিবেশে স্বাধীনভাবে ইসলামি ভাবধারায় ব্যাপক সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় মনোযোগ দিলেন। তখন নজরুল-গোলাম মোস্তফা-ফররুখ চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে।

এ সময়ে কিছু সাহিত্য-সংস্কৃতিমূলক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যথারীতি ডান ও বাম ধারার এসব সংগঠন রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে তৎপরতা অব্যাহত রাখে। এ সব সংগঠন কোনো কোনোটা ব্রিটিশ ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভকরে। পরে পূর্বপাকিস্তানে পূর্বের নাম পরিবর্তন করে কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখে। যেমন সাম্যবাদী ধারায় ১৯৩৫ সালের গোড়ার দিকে সৈয়দ সাজ্জাদ জহীর ও মুলক রাজ আনন্দ ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে নানভাগে নানা নামে বিভক্ত হয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান লেখক সংঘ’ নামে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হলে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের একাংশ ‘পাকিস্তানি আদর্শের’ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য মুজিবুর রহমান খাঁকে আহ্বায়ক করে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা পায় ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’। সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে ইসলামি ভাবধারার সাহিত্যের রূপায়ন ও বিকাশ ঘটানো।

প্রগতি লেখক সংঘের অবলুপ্তির পর ১৯৫২ সালের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’। ড. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) ছিলেন এর প্রথম সভাপতি। পর্যায়ক্রমে আতোয়ার রহমান, হাসান হাফিজুর রহমান এই সংগঠনের হাল ধরেন। আবদুল গনি হাজারী, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, আনিসুজ্জামান গংসহ এ বামধারার সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রকাশ্যভাবে সমাজতন্ত্র আদর্শ প্রচার ও সংগঠন করার পরিবেশ ছিলো না। তাই বামপন্থীরা নানাভাবে সাহিত্য সংগঠনের ব্যানারে আদর্শ প্রকাশের সুযোগ খুঁজতো।

১৯৫২-৫৩ সালে ম্যাকসিম গোর্কি, ১৯৫৩ সালে বঙ্কিমচন্দ্র ও ১৯৫৫ সালে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভিন্ন ধারা সৃষ্টির প্রয়াস পায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এতোদিনের তাদের প্রচেষ্টাকে গতি দিলো।

উল্লেখ্য, ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল ইসলামপন্থী সংগঠন ‘তমুদ্দুন মজলিসের’ মাধ্যমে। কিন্তু ৫২’এর ২১ শে ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী ঘটনাকে বামপন্থীরা নিজেদের করে নেয়ার প্রয়াস চালায়- এতে খানিকটা কৃতকার্যও হয়। ভাষা আন্দোলনের ঘটনাকে বামপন্থীরা কখনও রবীন্দ্রনাথকে এনে কখনও প্রভাত ফেরী, শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি, কালো ব্যাজ ধারণ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের মনোজগতে পৌত্তলিকতার বীজ বপন করতে থাকে। দীর্ঘ সময় পায় তারা মানুষের ভেতর স্যেকুলার সংস্কৃতির ভাবনাকে নৈয়ায়িক ধারা সংযোজনে।

এ সময় ‘তমুদ্দুন মজলিস’, ‘নজরুল একাডেমী’ প্রভৃতি সংগঠন কিছু সাহিত্য সম্মেলন ছাড়া তেমন জোরালো তৎপরতা চালাতে পারেনি। এক সময় নজরুল ইসলাম যেভাবে প্রাসঙ্গিক ছিলেন, ধীরে ধীরে অনেকটা ঝিমিয়ে আসতে থাকে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এগোতে থাকে বাম ঘরানার কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবীরা।

আগেই বলেছি, সাতচল্লিশের দেশভাগের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক মুসলমান কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করেন, এদের মধ্যে অনেকে পূর্ব থেকে খ্যাতিমান ছিলেন। এরা পূর্ব পাকিস্তানে এসে নতুন ধারার অর্থাৎ পৌত্তলিকতামুক্ত আল্লাহ-রাসূলের প্রতি বিশ্বাসকে ধারণ করে মুসলিম সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারা সৃষ্টির প্রচেষ্টা নিয়োগ করলেন।

১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসের তেইশ থেকে ছাব্বিশ পর্যন্ত মুসলিম লীগ বিরোধী জোট যুক্তফ্রন্টের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ধারার উদ্যোগে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর উদ্বোধন করেছিলেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ভাষণে মুসলিম লীগের সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের কথাও খোলামেলাভাবে বলেন। তিনি বলেন-

“১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট বহুদিনের গোলামীর পর যখন আযাদীর সুপ্রভাত হলো, তখন প্রাণে আশা জেগেছিলো যে এখন স্বাধীনতার মুক্ত বাতাসে বাংলা সাহিত্য তার সমৃদ্ধির পথ খুঁজে পাবে। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় যে সাহিত্য সম্মিলনীর অধিবেশন হয়েছিলো, তাতে বড় আশাতেই বুক বেঁধে আমি অভিভাষণ দিয়েছিলুম। কিন্তু তারপর যে প্রতিক্রিয়া হয় তাতে হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম স্বাধীনতার নূতন নেশা আমাদের মতিচ্ছন্ন করে দিয়েছে। আরবী হরফে বাংলা লেখা, বাংলা ভাষায় অপ্রচলিত আরবী ফার্সী শব্দের অবাধ আমদানি, প্রচলিত বাংলা ভাষাকে গঙ্গাতীরের ভাষা বলে তার পরিবর্তে পদ্মাতীরের ভাষা প্রচলের খেয়াল প্রভৃতি বাতুলতা একদল সাহিত্যিকদের পেয়ে বসলো। ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এবং অন্যান্য পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাহিত্যিকগণের কাব্য ও গ্রন্থ আলোচনা, এমনকি বাঙ্গালী নামটি পর্যন্ত যেনো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে কেউ কেউ মনে করতে থাকেন।’

[পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা- সাঈদ-উর-রহমান, পৃষ্ঠা-]

এ সম্মেলনের মাধ্যমে মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিভাজন স্পষ্টতর হয়, এবং ক্রমে তার আওতা বাড়তে থাকে। এযাবৎকালে মুসলিম লীগের দ্বিচারি নীতির কারণে ঘটে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হবে ‘কুরআন ও সুন্নাহ’ মোতাবেক এ অঙ্গীকারে স্বাধীন দেশের প্রথম গভর্ণর কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সরে গেলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, এখন থেকে রাজনৈতিকভাবে এ দেশের সকল নাগরিকের পরিচয় হবে পাকিস্তানী হিসাবে হিন্দু বা মুসলিম রূপে নয়। কায়েদে আজমের পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারে অবদান এতোটা বিশাল- এক পাল্লায় তাঁর অবদান রাখলেও অন্য পাল্লায় সকল মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দদের রাখলে কায়েদে আজমের পাল্লা ভারী হবে। গান্ধী যিনি অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতাই চেয়েছিলেন পাকিস্তান চাননি কখনও, কায়েদে আজম সম্পর্কে এ কে ফজলুল হককে বলেছিলেন, তোমাদের ওই জিন্নাহর সাথে পারলাম না- পাকিস্তান নিয়েই ছাড়লো। ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক প্রেরিত বাউন্ডারি কমিশন এসে ভারত-পাকিস্তানের বাউন্ডারি লাইন টেনে যাচ্ছিলো, তখন অন্যায্য  বিভাজন দেখে একদল মুসলিম লীগ নেতা কায়েদে আজমের কাছে ছুটে গেলো। কায়েদে আজম তাদের শান্ত হতে বললেন। বললেন, আল্লাহ পাক যতোটুক দেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, সেই পাক (পবিত্র) স্থানে আল্লাহর কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শাসন কায়েম করুন। কিন্তু পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম মুসলিম লীগ নেতৃ বৃন্দের বিশ্বাসঘাতকতা, নেতৃত্বের কোন্দল আর এর সুযোগ গ্রহণ করে সেনাবাহিনী।

প্রসঙ্গ এ জন্য অবতারণা করলাম তৎকালীন পাকিস্তানে অশান্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অগোছালো রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এসে পড়েছে। বাংলা ভাষার ওপর আঘাত আসার বিষয়টা আরও দ্বিধাবিভক্ত করে তোলে। এক সময় যারা মুসলিম লীগের রাজনীতি পছন্দ করেছেন, পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িত ছিলেন তারাই হলেন মুসলিম লীগ বিরোধী (প্রকারান্তরে পাকিস্তান বিরোধী আখ্যায়িত) হিসাবে চিহ্নিত হলেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় অনুর্ভুক্তির ব্যাপারে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমূখ লিখিতভাবে দাবি করলেন। তাঁর (মুজতব আলীর) লিখিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ গ্রন্থে তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন কিভাবে একটি জাতি ভাষা নিজস্বভাবে বেড়ে ওঠে, যাকে উৎখাত করা যা না। তার ভাষায়-

“আরব ও ইরানের (পারস্যের) মানচিত্রের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন যে এ দু’ দেশের মাঝখানে কোনো তৃতীয় দেশ নেই। অর্থাৎ আরবদেশের পূর্ব সীমান্তে যেখানে আরবী ভাষা এসে শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকেই ফার্সী ভাষা আরম্ভহয়েছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তেও যেখানে আরবী ভাষা শেষ হয়েছে সেখান থেকেই তুর্কী ভাষা আরম্ভ হয়েছে।

সকলেই জানেন খলিফা আবু বকরের আমলে মুসলিম আরবেরা অমুসলিম ইরান দখল করে। ফলে সমস্ত ইরানের লোক আগুন-পূজা ছেড়ে দিয়ে মুসলিম হয়। মুসলিম শিক্ষা দীক্ষা মুসলিম রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার কেন্দ্রভূমি তখন মদীনা। কেন্দ্রের ভাষা আরবী এবং যে ভাষাতে কুরআন নাজিল অর্থাৎ অবতীর্ণ হয়েছে, হজরতের বাণী হাদীসরূপে সেই ভাষায়ই পরিস্ফুট হয়েছে। কাজেই আমরা অনায়াসে ধরে নিতে পারি যে কেন্দ্রের সঙ্গে যোগসূত্র দৃঢ় করার বাসনায় ইরানে আরবী ভাষা প্রবর্তিত করার ব্যাপক চেষ্টা করা হয়েছিলো। আমরা জানি বহু ইরানবাসী ইসলাম গ্রহণ করে, আরবী শিখে, মুসলিম জগতে নাম রেখে গিয়েছেন। আরো জানি পরবর্তী যুগে অর্থাৎ আব্বাসী আমলে আরবী রাষ্ট্রকেন্দ্র ইরানের আরো কাছে চলে এসেছিলো। ইরাকের বাগদাদ ইরানের অত্যন্ত কাছে ও আব্বাসী যুগে বহু ইরানী বাগদাদে বসবাস করে উচ্চাঙ্গের আরবী শিখতে সমর্থ হয়েছিলেন। সমস্ত ইরানদেশে তখন আরব গভর্ণর, রাজকর্মচারী, ব্যবসাদার, পাইক-বরকন্দাজে ভর্তি হয়ে গিয়েছিলো। ইরানের সর্বত্র তখন আরবী মক্তব-মাদরাসার ছড়াছড়ি, আরবী শিক্ষিত মৌলভী-মৌলানায় ইরান তখন গমগম করত।”

[পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, পৃষ্ঠা- ২]

ইতিহাস বলে এতদসত্ত্বেও ইরানে তাদের নিজস্ব ভাষা পাহলভি ভাষার পুনর্জন্ম লাভ করে। নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন মহাকবি ফেরদৌসীর মত ক্ষণজন্মা কবি প্রতিভা। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শাহনামা’ লিখলেন পাহলভি ভাষায়। এই শাহনামা মহাকাব্যে তিনি প্রাচীন ইরানের বিস্মৃত গৌরবের অধ্যায়গুলো বর্ণনা করেন। পরবর্তীতে পারস্যে মালেক শাহ গজনিতে সুলতান মাহমুদ এবং তার উত্তরাধিকারী কাদের বিন ইব্রাহিম এবং তুর্কিস্তানে কাদির খান প্রত্যেকেই নিজের রাজধানীকে সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পাদপীঠে পরিণত করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম হলেন বাংলার ফেরদৌসী। সেটা মুসলমানরা বুঝতে পারেনি, পেরেছে বামপন্থী ও হিন্দুরা। তাই নজরুলকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলার ষড়যন্ত্র পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে। নজরুল বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব আত্মপরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য চাই স্বতন্ত্র ভাষা। যে ভাষা হিন্দুদের হাতে জন্ম নেয়া সম্ভব নয়। মধুসূদন-বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরৎ বিরচিত সাহিত্য দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের জীবন বিশ্বাস, জীবনাচরণ, ঐতিহ্য-ইতিহাস রক্ষা হবে না। নজরুল তাই একদিকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য হিন্দু-মুসলমানের মিলনের কথা বলেছেন, বিশ্বস্ততা অর্জনে ৫ শ’র অধিক হিন্দুত্ববাদি গান রচনা করেছেন, কবিতায় হিন্দুদের দেব-দেবীর নাম উচ্চারণ করেছেন। কাফের ফতোয়া জুটেছে একদিকে অপরদিকে দু শ’র বেশি ইসলামি গান, আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দ আমদানি করে বাংলা ভাষাকে মুসলিম ভাষীর ভাব প্রকাশের উপযুক্ত করে তুলেছেন। এসব নজরুলের অপরাধ হিসাবে রাজনৈতিক ধান্দাবাজদের কাছে মনে হয়েছে, তারাই নজরুলকে অপ্রাসঙ্গিক করতে চেয়েছেন, এখনও করে চলেছেন। আর আমরা কতিপয় ‘গাধা’ মুসলিম বাঙালি চেয়ে চেয়ে দেখছি ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত আমার প্রিয়’ বলে জাতে ওঠার চেষ্টা করছি।

রচনা:

এপ্রিল ২০২৫

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top