আল নাহিয়ান
সিগারেটে শেষ টানটা দিতে পারছে না আবিদ। ব্যথায় হাত টনটন করছে। কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত চামডা ছিঁড়ে গেছে। সম্ভবত মাংস বেরিয়ে এসেছে। রক্তের কারণে বোঝা যাচ্ছে না। সিগারেটটা বাম হাত থেকে ডান হাতে নিলো সে। এবার টের পেল ডান হাতেও চোট লেগেছে।
একটু আগে রাস্তা পার হবার সময় একটা মাইক্রোবাস তাকে ধাক্কা দিয়েছে। রাস্তায় ছিটকে পড়েছে সে। গাড়িটা ইচ্ছে করলেই চলে যেতে পারতো। যায়নি। ব্রেক কষে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে চালক। মধ্যবয়স্ক ওই ভদ্রলোকই গাড়ির মালিক। সাদা পাঞ্জাবির ওপর লাল টকটোকে হাতাকাটা কোট। শরীরের নাক অবশ করা সুগন্ধি। আবিদের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেছে সে। কপালের শ্যামলা চামড়ার ওপর ঘামের কয়েকটা সমান্তরাল রেখা ফুটে উঠেছে। ভদ্রলোক আবিদকে টেনে তোলার জন্য হাত বাড়ালেন। আবিদ অবশ্য নিজেই উঠে দাঁড়ালো। চারপাশে লোক জমে গেছে। কাউকে কাউকে ক্ষীণকণ্ঠে বলতে শোনা যাচ্ছে- মাল খায়া গাড়ি চালাইলে এইডিই অয়। ভদ্রলোককে দেখে অবশ্য ‘মাল খাওয়া’ মনে হচ্ছে না। ঘটনার আকস্মিকতায় নার্ভাস হয়ে গেছেন। আবিদ তাকে স্বাভাবিক করতে চায়।
ভিড় থেকে কেউ একজন বলে উঠলো- ‘কিলিনিকে লয়া যান নাইলে মইরা যাইবো’। ভদ্রলোক আবিদকে গাড়িতে উঠতে বললেন। হেসে জানালো এটা তেমন কোনো চোট নয়। যদিও তার কপালের ডান পাশ এবং বাঁ হাত থেকে রক্ত পড়ছে। ভদ্রলোক কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছেন না। নিজের ভুলের জন্য তিনি প্রচন্ড অনুতপ্ত। সেই সঙ্গে আবিদের প্রতি মুগ্ধ। কারণ এ ধরনের চোট পাওয়ার পর ভিকটিম সাধারণত মোটা অংকের ক্ষতিপুরণ ছাড়া গাড়ি ছাড়ে না। আবিদ তেমন কিছুই করছে না। তবুও ভদ্রলোক নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। দায়মুক্তির জন্য এই মহর্তে তার কাছে যা চাওয়া হবে তিনি তাই দিয়ে দিবেন। তার সবচেয়ে রূপবতী কন্যাটিকে বিবাহ করতে চাইলে হয়তো সেটিও মেনে নেবেন। আবিদ তার কন্যাকে চাইলো না। সিগারেট চাইলো।
: আমাকে কিছুই দিতে হবে না। আপনার পকেটে সিগারেট দেখা যাচ্ছে। একটা সিগারেট দিন।
বলেই হেসে ফেললো সে। আবিদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সিগারেট চেয়েছে। হলোও তাই। একট নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। নিরাশ হলো চারপাশের লোকজন। ঢাকা শহরের পথে ঘাটে কোনো ঘটনা ঘটলে পঞ্চাশ-একশ জন জমে যায়। এমনকি দুই বন্ধুর অনেক দিন পর দেখা হলে যদি একটু জোরে সৌজন্য বিনিময় হয়, সেটি দেখার জন্যেও তিন-চার জন দাঁড়িয়ে যায়। তারপর বাসায় গিয়ে স্ত্রীকে বলে- আজকে রাস্তায় তুমুল এক ঝগড়া দেখলাম, আমি না থাকলে কোপাকুপি হয়ে যেত।
আবিদ এই মুহূর্তে তার জখম নিয়ে ভাবছে না। ভাবছে অন্য বিষয়ে। তার মাথায় এখন শারীরিক ক্ষতের চিন্তা ঢুকবে না। বাঁ হাতটা যদিও অবশ্য হয়ে আসছে। মাইক্রোটার বাম্পার ছিলো ভাঙা। ভাঙা বাম্পারের চোখা অংশ গভীর ক্ষত বানিয়ে ফেলেছে। রক্ত থেমে আসার পর সেটা বোঝা যাচ্ছে। আবিদ পকেট থেকে মার্লবোরো’র আস্ত প্যাকেট বের করলো। প্যাকেটটা ওই ভদ্রলোক দিয়ে গেছেন। জোর করে শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেছেন। অবশ্য জোর করা লাগতোই না। সে এমনিই নিয়ে নিতো। ধূম্রসেবীরা যেকোনো বিষয়ে না করতে পারলেও, ধূমশলাকার ব্যাপারে তাদের না নেই। আবিদ হাঁটতে হাঁটতে পৃথাদের বাসার সামনে চলে এসেছে। শান্তিনগর কর্ণফুলী টাওয়ারের পাশেই বাসা। মেইন রোডের পাশে হওয়ায় দূর থেকে বাসাটা চোখে পড়ছে। হলুদ রঙের মরিচ বাতি দিয়ে পুরো বাড়িটা সাজানো।
আবিদ বাসাটার সামনে এসে দাঁড়ালো। রাস্তা পার হয়ে উল্টো পাশে গেল। এবার অবশ্য খুব সাবধানে পেরিয়েছে সে। কিছুক্ষণ আগে অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা পার হতে গিয়েই রক্তাক্ত হতে হয়েছে তাকে। টং দোকানে গান বাজছে।
‘এ মধু মাসে তুমি নাই পাশে
কে খাবে গাছের পাকা আম, রে প্রাণো শাম
কে খাবে গাছের পাকা আম’
ক্রেতা ভিডানোর জন্য টং দোকানদের কৌশল এটা। উচ্চশব্দে গান অথবা টেলিভিশন ছেড়ে রাখে। ক্রেতা এসে চা খাওয়ার উসিলায় গান শোনে। আবিদ দোকানের বেঞ্চে বসলো। রাত আটতার দিকে চায়ের দোকানগুলোতে গমগমে আড্ডা চোখে পড়ে। এখানে তেমন দেখা যাচ্ছে না। দোকানদার মুরগির ছেঁড়া পালক দিয়ে কান চুলকাচ্ছে। আরামে তার এক চোখ বন্ধ হয়ে আছে। চুলকানোর পর দুই আঙুল দিয়ে পালকটাকে টিপে টিপে দেখছে সে। এই হাত দিয়েই একটু পরে দুধ চা বানিয়ে খাওয়ানো হবে। আবিদ আরেকটা সিগারেট ধরালো।
পৃথাদের বাসাটাকে আজ চেনাই যাচ্ছে না। বাড়ির লনে বিশাল প্যান্ডেল করা হয়েছে। গেটের বাইরে অনেকগুলো ফুলগাছ দেখা যাচ্ছে। পৃথাদের বাসায় ফুলগাছ দেখাশুনা করার মানুষ নেই। সুতরাং এগুলো ডেকোরেটর থেকে ভাড়া আনা হয়েছে। পৃথার মা খুব কাঠখোট্টা মানুষ। সারা দিন অফিস করে রগচটা হয়ে বাসায় ফেরেন। তাকে দিয়ে ফুলগাছ পালন সম্ভব নয়। বিয়ে বাড়িতে ইদানীং সবকিছুই ভাড়া আনা হয়। ফুলের টব থেকে শুরু করে বরের পাগড়ি। সব ভাড়া। শুধু বর-কনেটাই পারমানেন্ট। অবশ্য এই যুগে সেটাও আর বেশি পারমানেন্ট থাকছে না।
পৃথাদের বাসায় নিশ্চয়ই এখন সবাই আছে। যে বাড়ির বড় কন্যার বিয়ে সেখানে সবার থাকাটাই স্বাভাবিক। অন্য কোনো দিন হলে এই অসময়ে একটা চুঁ মারা যেত। পৃথার মা রাত ন’টার দিকে বাসায় ফেরেন। বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ দিন হওয়ায় এইদিন ফিরতে দেরি হয়। প্রায় দশটা বেজে যায়। পৃথার বাবার এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের ব্যবসা থাকায় উনি চট্টগ্রামে থাকেন বেশির ভাগ সময়। রাত আটটার দিকে ওদের বাসায় গেলে পৃথাকে পাওয়া যায়। অন্য কোনো বৃহস্পতিবার হলে সমস্যা ছিলো না। আজ সমস্যা আছে। গত এক বছরে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। এক বছর আগে আবিদ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলো। আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনের ছাত্রনেতা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা মামলা ঝুলছিলো। টিএসসিতে প্রকাশ্যে আড্ডা দেওয়া তো সেই কবেই বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে প্রেসক্লাবের সামনের মানববন্ধনে ঝাঁঝালো বক্তব্য দেওয়ায় তার গলায় বাড়তি আরো দু’টা মামলার কাঁটা বিধেছিলো। মাসের পর মাস তাকে ফেরারি হয়ে থাকতে হয়েছে। কয়েক দিন পরপর ফোন নম্বর পাল্টাতে হয়েছে। এই সময়টাতে পৃথা ছাড়া আর কারো সঙ্গেই যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। গ্রামের বাড়িতে আবিদের খবরাখবর পৃথাই পৌঁছে দিতো। গ্রামে আবিদের মা ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা মারা গেছেন আটানব্বইয়ের বন্যার সময়ে। সিরাজগঞ্জের তারাশের প্রায় পুরোটাই ডুবে গিয়েছিলো পানির নিচে। মাসের পর মাস স্থায়ী হলো বন্যা। বন্যার পরে পুরো তারাশে ছড়িয়ে পড়লো কলেরা। আবিদের বাবা মারা গেলেন কলেরায়।
কৈশোর থেকেই আবিদের খাটাখাটনির শুরু। ইন্টারমিডিয়েটে তুখোড় ছাত্র ছিলো সে। বোর্ড পরীক্ষায় অসাধারণ রেজাল্ট আসলো তার। বাড়ির পেছনের ধানি জমিটা বিক্রি করে কোচিংয়ের জন্য আবিদকে ঢাকায় পাঠালেন মা। রাতদিন মেশিনের মতো পড়াশুনা করলো সে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়ে গেল। খ ইউনিটে এগারোতম। সেমিস্টার পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্টের কারণে সারা ডিপার্টমেন্টে নাম ছড়িয়ে পড়লো তার। অন্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরাও তাকে স্নেহ করতে শুরু করলেন। তাদেরই একজন ছিলেন ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক আব্দুর রহমান। সবাই ডাকতো রহমান স্যার। অবশ্য রহমান স্যার ডাকলে ক্ষেপে যেতেন তিনি। কারণ রহমান আল্লাহর নাম। আল্লাহর নামে কারো নাম থাকলে নামের আগে ‘আব্দুল’ যোগ করতে হয়। আব্দুর রহমান মানে, দয়ালুর বান্দা। পুরো ক্যাম্পাসে একমাত্র আবিদই ওই স্যারকে পুরো নামে ডাকতো। এমন ছোট ছোট কারণে সব শিক্ষই আবিদকে ভালোবাসতে শুরু করলো। ভালোবাসতে শুরু করলো আরো অনেকে। তাদের মধ্যে পৃথা ছিলো একজন। পৃথার সঙ্গে পরিচয়টাও ছিলো হঠাৎ। আবিদ তখন সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। ততোদিনে রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে সে। দলীয় কাউন্সিলে ভার্সিটি কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে গেছে। পুরো ক্যাম্পাসে তার বিশাল প্রভাব। জুনিয়ররা তো অবশ্যই, সহপাঠীরাও কেউ কেউ তাকে সালাম দিয়ে চলে। সেদিন ছিলো শুক্রবার। ভর্তি পরীক্ষা থাকায় নীলক্ষেতের মোড় থেকে যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিলো। আবিদ জিয়া হল থেকে হেঁটে হেঁটে নীলক্ষেতে এসেছে। ছুটির দিনের সকালে সে রয়েলে তেহারি খায়। তেহারির প্রথম লোকমা মুখে দিতে দিতে দোকানের ঠিক সামনে একটা মেয়েকে দেখতে পেল আবিদ। মেয়েটা সম্ভবত কাঁদছে। খাওয়া থামিয়ে ভালোভাবে নজর দিলো আবিদ। কয়েকটা ছেলে একটু পরপর মেয়েটার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। আবিদ হাত ধুয়ে বেরিয়ে এলো। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো কান্নার কারণ। মেয়েটার মা তাকে প্রাইভেট কার দিয়ে নামিয়ে গেছে। নামার সময় প্রবেশপত্রটা রাস্তায় পরে গিয়েছিলো। সেটা তোলার সময় কয়েকটা ছেলে এসে তুলে নেয়। তারপর বলে, ফোন নম্বর দিলে তবেই ওটা পাওয়া যাবে। ওরা নাকি পলিটিক্যাল লোক। ইতোমধ্যেই ছেলেগুলো দূরে সরে গেছে। আবিদ হাতের ইশারায় ডাকলো তাদের তারা বেশ ‘হ্যাডম’ নিয়ে এলো। আবিদ পথাকে রিকশায় তুলে দিলো। তারপর ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বললো আবিদ। কোনো উচ্চবাচ্য হলো না। তবে যেটা হলো সেটাও কম না।
পরবর্তীতে যতোবার ওদের সঙ্গে পথার দেখা হয়েছে ওরা ‘আপ’ ডেকেছে। পৃথার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিলো শুক্রবার। আজ বৃহস্পতিবার। কেন যেন বৃহস্পতিবারগুলোকে অশুভ মনে হয় আবিদের। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালরাতও ছিলো বৃহস্পতিবার। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস এর ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ পড়ার পর থেকেই বহস্পতিবারের উপর সন্দেহ ঢুকে গেছে আবিদের। এক বছর আগে যখন দিনাজপুরের লিলির মোড় থেকে সে গ্রেফতার হয় সেদিনও ছিলো বহস্পতিবার। গ্রেফতারের পরে থানা গারদ আর কোর্টে যাবার পর কারাগারে স্থান হয় তার। কারাগারের জানালা দিয়ে চারকোণা আকাশ দেখে দিন কাটছিলো তার। কারাগারের সরকারি খাবারকে ফাইলের খাবার বলা হয়। ফাইলের খাবার খেয়ে আর বন্দীদের বিচিত্র জীবন দেখে দেখে সেন্ট্রাল জেলের মেঘনা ভবনে প্রথম সপ্তাহটা কাটলো আবিদের। এক দুপুরে কলিং বাইটার এসে তার হাতে সাক্ষাতের স্লিপ ধরিয়ে দিলো। সাক্ষাৎ কক্ষে ভয়ানক ভিড। ভিড় ঠেলে এক হাত জায়গা বের করে উকি দিলো আবিদ। দেওয়ালের ওপাশে শিকারি চোখে পৃথা খুঁজছে তাকে। আবিদ ‘পৃথা পৃথা’ বলে ডাকলো। সে ডাক তার কানে গেল না। আবিদের কণ্ঠ স্লোগান দেওয়া কণ্ঠ। সে এবার গলা ছেড়ে পৃথাকে ডাকলো ‘কাকাতুয়া’ বলে। এটা পৃথার গোপন নাম। ডাক শুনে চমকে উঠলো পৃথা। সামনে এসে দাঁড়ালো। মোটা দেয়ালের দু’পাশের গ্রিল দেওয়া। গ্রিলের ওপাশে পৃথা। এপাশে আবিদ। টপটপ করে অশ্রু ঝরছে পৃথার। মুখে কোনো কথা তুলতে পারছিলো না সে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল তার। পৃথার কাঁধে হাত রাখলো শারমিন। সেই পৃথাকে নিয়ে এসেছে। ভার্সিটিতে ওঠার পর ক্লাসের এই মেয়েটার সঙ্গেই কেবল বন্ধুত্ব গড়তে পেরেছে পৃথা। সেদিন আবিদের দিকে তাকিয়ে টানা আধা ঘণ্টা কেঁদেছিলো পৃথা। যাবার সময় শুধু বলেছিলো- তোমাকে ছেড়ে থাকাটা যে কত কঠিন তুমি বুঝবে না আবিদ।’ সেই দিনটাও ছিলো বৃহস্পতিবার।
হঠাৎ দোকানের পেছনের টিনে ঝরঝর ঝরঝর আওয়াজ শুরু হলো। মনে হচ্ছে বৃষ্টি পড়ছে। তবে উপর থেকে নয়। আড়াআড়িভাবে। দোকানদার চিৎকার করে উঠলো।
: হুমুন্দির পুত তরে না কইছি দোকানের টিনে মুতবি না!
: আলম ভাই, তোমার দোকানে না মুতলে আমার মুত কিলিয়ার অয় না
: একদিন যদি তর মুত দিয়া তরে চা বানায়া না খাওয়াইসি, আমার নাম আলম না
: আর মুতুম না।
দোকানের পেছন থেকে প্যান্টের জিপার লাগাতে লাগাতে ত্রিশ-বত্রিশ বছর বয়সী এক লোক বেরিয়ে এলো। দোকানদার কুঁচকানো ভ্রু নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
: আইজ্জাও পিনিক করসোস?
: হ। আইজকাই শ্যাষ। আর না।
: এইডি না খাইলে অয় না?
: মাছের রাজা ইলিশ, বয়সের রাজা তিরিশ। এই বয়সে ইট্ট ফর্তি না করলে কবে করুম কও?
: বছর পনেরো আগে এই এলাকায় যহন তরা আইলি, তহনতেই তো হুনতাসি ‘এই বয়সে ইট্ট ফুর্তি না করলে’। ফুর্তির আসল বয়সটা যে কোনডা আইজও বুঝলাম না।
দোকানদারের কথা শুনে লোকটার তেমন ভাবান্তর হলো না।
: দেও, দুধ চিনি বাড়ায়া একটা পিনিক চা দেও।
আবিদের পাশে বসতে বসতে তার দিকে গোল চোখে তাকালো লোকটা। কপালে আর হাতে রক্ত দেখে সম্ভবত সন্দেহ হচ্ছে তার। এতবড় জখম নিয়ে ছিনতাইকারী ছাড়া আর কেউ স্বাভাবিকভাবে বসে থাকতে পারে না। লোকটা আবিদকে ছিনতাইকারী ভাবছে। আজকাল ভদ্রঘরের ছেলেরাও এই লাইনে নামছে। পিনিকের টাকা জোগানোর জন্য।
: কী মিয়াসাব, ইনকাম কিমুন হইলো?
: ইনকাম কম হয়েছে। মাত্র এক প্যাকেট সিগারেট। তবে আউটগোয়িং হয়েছে বেশি। এক ব্যাগ রক্ত।
: এক প্যাগেড সিক্রেটের জন্য এতো খাডনি!
আবিদের কপাল ব্যথায় টনটন করছে। অসুস্থ হলে মানুষের মাথায় অদ্ভুত সব চিন্তা ঢোকে। আবিদের ইচ্ছা করছে পৃথার হাতের কাঁচা আম ভর্তা খেতে। পৃথা একবার ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার সামনে বসে আম ভর্তা খাইয়েছিলো তাকে। কাসুন্দি লেবুপাতা কাঁচা আম কচলে ভর্তাটা বানিয়েছিলো সে।
মেয়েদের নানান রকম শখ থাকে। পৃথার শখ শাড়ি পরা। সে বাইরে কোথাও শাড়ি পরে বের হয় না। ঘরের ভেতর নিজে নিজে শাড়ি পরে। নানান কায়দায় শাড়ি পরে। এক প্যাঁচ- নাইওরি- বেলুচিস্তানি- রাজস্থানি- ভাইটালি নানান কায়দা। পৃথার বান্ধবী শারমিনের অবশ্য শখটখ নেই। শারমিনের ভাষায়- হাবি নেই যার, হবি নেই তার।
এ যুগের মেয়েরা হাজব্যান্ডকে হাবি বলে।
ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার সামনে বসাটা আবিদ আর পৃথার পুরনো অভ্যাস। ফেরারি অবস্থাতেও একদিন এখানে বসা হয়েছিলো। পৃথাকে আসমানী রঙের শাড়ি পরে আসতে বলেছিলো সে। পথা এলো। আবিদ পকেট থেকে একটা রুপোর নূপুর বের করে নিজ হাতে পরিয়ে দিলো পথায় বাঁ পায়ে। লজ্জায় পথার দুই গাল আলতা রঙ হয়ে গেল। তারপর নিচ স্বরে বললো
: তুমি কি পাগল?
: কেন?
: এত মানুষের সামনে এসব কী করছো? :
: একজন মনোযোগী প্রেমিকের জন্য পথিবীতে অন্যান্য বলে কিছু নেই।
: কিন্তু তোমার কর্মীরা যখন দেখবে তাদের নেতা তার প্রেমিকার পায়ে নূপুর পরিয়ে দিচ্ছে তখন কী হবে?
: তখন তারা উৎসাহ পাবে। তারা শিখবে, দুই হাতে অদৃশ্য হাতকরা নিয়েও প্রেমিকার পায়ে নূপুর পরিয়ে দেওয়া যায়। ইচ্ছাটাই আসল।
: আপনার আর কী কী ইচ্ছা করে?
: ইচ্ছা করে তোমাকে নিয়ে দুর্গম হামহাম ঝরনার সামনে দাঁড়িয়ে আমভর্তা খেতে। কাসুন্দি লেবুপাতা কাঁচা আম দিয়ে বানানো আমভর্তা।
আবিদের কথা শুনে তার হাত জড়িয়ে ধরে হেসে দিলো পথা। সে হাসি ছিলো হামহাম ঝর্নার মতোই তরল, স্বচ্ছ আর বাধাহীন।
আবিদের খুব ইচ্ছে করছে পথাকে নিয়ে ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার সামনে বসতে। সোডিয়াম বাতির আলোতে প্রাণভরে পৃথাকে দেখতে। সে উপায় নেই। আজ পৃথার বিয়ে। দূরসম্পর্কের এক মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে পৃথার। পাত্র সুইডেনে থাকে। পৃথার মায়ের প্রবল চাপেই বিয়েটা হচ্ছে। হুট করে সপ্তাখানেক আগে বিয়ের তারিখ ঠিক করা হয়। পৃথার মা আবিদ-পৃথার সম্পর্কের ব্যাপারে জানতেন। কিন্তু কোনো মা-বাবাই তার সন্তানকে সদ্য কারামুক্ত একজন সাবেক ছাত্রনেতার সাথে বিয়ে দিতে চাইবে না। এছাড়া, দু’বছর আগে স্নাতক পাস করা একটা বেকার ছেলের সংসারে কতোটুকু সচ্ছলতা থাকবে তা সহজেই বোঝা যায়। চার দিন আগে পৃথা আবিদকে ফোন দিয়েছিলো। কান্নাকাটি করে সে তার বিয়ের খবরটা জানায়। আবিদকে বলেছিলো
: চলো পালিয়ে যাই
আবিদ বলেছিলো-উইনার্স নেভার কুইট, কুইটার্স নেভার উইন। যে জেতে সেপালায় না, যে পালায় সে জেতে না
: জেতাজিতি আমি বুঝি না। ভালোবাসাটা আমার কাছে খেলা না।
: কাকাতুয়া, জীবন একটা মুদ্রার মতো। এর দু’পাশেই পরাজয়। টস করে কোনো লাভ হয় না।
: কী বলতে চাচ্ছো পরিষ্কার করে বলো।
: আর পরিষ্কার করে বলতে পারবো না। শুধু জেনে রাখো, পরাজয় লিখতে হলেও ‘পরা’র পরে একটা ‘জয়’ লাগাতে হয়।
: মানে?
: মানে, কিছু পরাজয় আছে যেটা জয়ের আনন্দ দিতে পারে।
: আমাকে তুমি চাও নাকি চাও না পরিষ্কার করে বলো।
: হে আমার কাকাতুয়া, তুমি পারলে হাওয়া হয়ে যাও। কেউ তোমাকে না দেখুক। দেখবেও না বিয়েও হবে না। পারলে কিছুক্ষণের। টাল চাও। তারপর যে বৃক্ষটা তোমার পছন্দ, সেই বৃক্ষে নীড় বাঁধো। তবে আমার বৃক্ষে তোমাকে স্বাগতম।
: আবিদ, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।
: একই অবস্থা যে আমারও!
কাঁদতে কাঁদতে ফোন রেখে দিয়েছিলো পৃথা। আবিদ তার ভালোবাসাটা কখনোই প্রকাশ করে না। অনিয়ন্ত্রিত আবেগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশের নামই প্রকৃত প্রেম। রাস্তায় পুলিশের টহল গাড়ির সাইরেন বেজে উঠলো। আবিদ নিরাসক্ত চোখে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। আজ পুলিশ দেখে আর ভয় পাচ্ছে না সে। বরং গাড়িতে উঠিয়ে নিলে ভালো হতো। দু’চারটা কথা বলা যেত। বলা যেত- আজ আমার প্রেমিকার বিয়ে। আপনারা চাইলে ভালোমন্দ খেয়ে আসতে পারেন। তবে মহিলাটা একটু কিপটা। একবারের বেশি বাড়তি বিরানি দেবে বলে মনে হয় না।
পুলিশের গাড়িটা চলে গেল। রাত বাড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বরের গাড়ি ঢুকবে। আবিদ বরের গাড়ি দেখার জন্য তাকিয়ে আছে। গেট দিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকলো। বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকজনকে হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। ক্ষীণ চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। সাইরেন বাজিয়ে বেরিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্সটা। আবিদের মোবাইল বাজছে। শারমিন কল করেছে।
: হ্যালো আবিদ ভাইয়া, পৃথা বিষ খেয়েছে। আপনি তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যান। ওকে নিয়ে গেছে অলরেডি।
আবিদ মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসপাতালে যাওয়া ঠিক হবে কি না সে বুঝতে পারছে না। তার কথামতো কাকাতুয়া আকাশে উড়াল দিয়েছে। দেখা যাক সে আবিদের বৃক্ষে বাসা বাঁধে কি না। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আবারো হাঁটা শুরু করলো আবিদ। ব্যথায় তার হাত টনটন করছে।

দারুন,