এওয়ার্ড

মাকফি আক্তার

রাশেদ উদ্দিনের হাতে কলম। কাগজে শব্দ নিয়ে ফাইট করছিল। ফেনীর সিলোনিয়ার ছোট্ট বাসায় তার বসার জায়গায় একটা ভাঙ্গাচোরা টেবিল, পাশে ধুলোমাখা বইয়ের স্তূপ। দরজা-জানালায় বৃষ্টির ধাক্কা লাগছিল, কিন্তু তাতে তার মনোযোগে বাঁধা পড়লো না। তার জীবনের সবটুকু সময়, শক্তি এবং স্বপ্ন মিশে গিয়েছিল একটি মাত্র ব্যক্তির নামে কাজী নজরুল ইসলাম।

একসময় যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, রাশেদ ছিল মানবতাবাদী। সাহিত্য গবেষণায় সে বন্ধু মহলে নাম কুড়িয়েছে। সবাই বলতো, “ও হবে দেশের সেরা গবেষক।”
কিন্তু সময়, বাস্তবতা জঠরের মহাজনী আচরণে রাশেদ বাধ্য হয়ে চাকরি খুঁজলেও চাকরি পেল না। ছোট একটা কাজ পেয়েছিল, সেটাও টিকে থাকেনি। সামন্য অন্যায়ও সহ্য করতো না, প্রতিবাদ করতো। যার দরুন কাজটা হারায়। যখন তার বন্ধুরা বড় বড় পদে বসলো, রাশেদ তখন নজরুলের কবিতার বই হাতে ঘুরে বেড়াত।

তার স্ত্রী, আয়েশা, প্রথমদিকে তার লেখার ভক্ত ছিল। প্রথমে যে প্রেম থাকে সেটা। স্বামীকে ভালোবাসে তো স্বামীর লেখাকেও ভালোবাসা। ছোট্ট সংসারে দুঃখ থাকলেও একটা তৃপ্তি ছিল। রাশেদ যখন মধ্যরাতে চুপচাপ কবিতার ব্যাখ্যা লিখতো, আয়েশা চায়ের কাপ হাতে পাশে বসে থাকতো। কখনো জিজ্ঞেস করতো: ‘তুঁই কি এই গবেষণা দি বিশ্বরে পাল্টাই দিবানি?’
রাশেদ হেসে বলতে- ‘না আয়েশা, আঁই শুধু নজরুলের আত্মাগারে ছুঁইতাম চাই।’

ভাঙন শুরু হতে সময় নেয় না। অভাবের মেঘনাপাড়ে রাশেদের সংসার স্রেফ বালির। সময়ের সাথে সাথে বাস্তবতা আয়েশার মন থেকে রঙ মুছে দিতে লাগলো। বাসার ভাড়া বাকি থাকতো, ফ্রিজও বন্ধ রাখতে হতো। কখনো কখনো আয়েশা চুপ করে বসে থাকতো বারান্দায়- ঝাপসা চাহনিতে। উদাস তাকিয়ে থাকতো দূরে। তার ভেতরে এক অদৃশ্য ক্ষোভ জমছিল।
একদিন, দুপুরের ভাত ছিল না। রাশেদ তখনও বসে বসে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এক নতুন ব্যাখ্যার করছিল। আয়েশা কাছে এসে বলেছিল- ‘তুঁই কি বুইঝতা হারোর না? তোয়ার কবিতার তুন আংগো বোক বড়!’

রাশেদ চুপ করে ছিল। যেন এই পৃথিবীর শব্দগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছিল না। এই ঘটনা সেদিনই নতুন না। রোজ এইসব হচ্ছে। কিন্তু সেদিনের উপেক্ষা বড়ো রূঢ়। নারীরা সম্ভবত উপেক্ষা হজমের কোনো বিদ্যা আয়ত্ত করতে পারে না। পারেওনি। সেদিন রাতেই আয়েশা কিছু না বলে এক কাপড়ে চলে যায়। দরজার পেছনে টানানো ছিল একটা পুরনো ছবি- তাদের বিয়ের দিনে তোলা।

রাশেদ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ ছিল। তারপর আবার ডুবে গেল নজরুলের জগতে।

তারপর নিঃসঙ্গতা ও সংগ্রাম। দিনটা গেলো কিন্তু আয়েশা এলো না। দু’দিন গেলো আয়শা এলো না। সপ্তাহ গেলো এলো না। মাস গেলো এলো না। বলে রাখা ভালো এর মধ্যে কোনো ফোন আলাপও হয় নি। তুমুল ঝড়, তবুও পাশাপাশি এই দু’টি বৃক্ষ ভাঙবে, মচকাবে না। বছরও ঘুরলো। না। কোনো সাক্ষাত, ফোন, কিছুই না। এলো না শ্বশুরবাড়ির কেউ। রাশেদের ব্যাপারে বলা হয়নি যে তার কিন্তু বাবা মা ভাই বোন কেউই নেই। ভাইবোন ছিলোই না। বাবা ছোটোবেলা মারা যায় আর মা বিয়ের দু মাস আগে।

রাশেদ প্রকাশ করলো তার গবেষণার বই- ‘নজরুল ও একটি থেমে যাওয়া বুলবুল”। কিন্তু বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হলো না। কোনো পাঠক আসেনি। কোনো সমালোচনা হয়নি। বইয়ের কপি গুদামে পড়ে থাকলো। বই পঁচলো, পোকায় কাটলো। বাঁধাই নষ্ট হলো। প্রচন্ড ঝড়ে যেমন বাবুই পাখি দূর থেকে নিজের বোনা বাসা ছিটকে দূরে পড়তে দেখে, রাশেদও দেখছিল স্বপ্ন ও সংসার শব্দ ছাড়া এক সাথে ভাঙে। অবশেষে ভাগ্যের দুয়ার খুলল। বোবা মেয়ের যেমন বিয়ে হয়, তেমনই কেজি দরে সব বই বিক্রি হলো। রাশেদের জীবনে আরো দুটি মৃত্যু ঘটলো।

রাশেদ এখনো থামেনি। চোখের নিচে কালি, শরীর রোগা। তবু তার আগুন নিভলো না। সে নিজেকে বলতো: “আঁই হাইরাম য নয়। নজরুল তো হারি যায় নয়।”
কিন্তু, অদৃশে অন্য এক প্রতিযোগী ছিল। তার নাম নিউমোনিয়া। এই শত্রুর নাম শুনেছিল রাশেদ, কিন্তু দেখেনি। এক রাতে ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে রাশেদ রাস্তায় পড়ে গেলো।
চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছিল সবকিছু। কেউ একজন তাকে বাসায় পৌঁছে দিলো। কিন্তু কেউ একজনের সেবা করার কথা ছিল সে পাশে ছিল না। জ্বর, অনাহার আর ক্লান্তি তার বিরুদ্ধে জোট করেছে। বিছানায় শুয়ে, জানালার ফাঁক দিয়ে যে দৃশ্য দেখছিল তারাও তার পক্ষে বলে মনে হচ্ছিল না। কিছু শব্দ কানে আসছিল —দূরের মসজিদে আজান, রাস্তায় হকারের হাঁক, বাচ্চাদের হাসি। আর ভেতর থেকে উঠে আসছিল নজরুলের সেই লাইন: ‘ওগো বন্ধুরা পান্ডুর হয়ে এলো বিদায়ের রাতি।’

চোখ বন্ধ হতেই এক বিস্ময়কর দৃশ্য ফুটে উঠলো! এক উজ্জ্বল মাঠ, কোথাও শেষ নেই। আলো নরম, সোনালি। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম। খদ্দর পাঞ্জাবি, লম্বা ধুতি কাঁধে চাদর। কোকরানো বাবরি চুল। মাঝখানে সিঁথি করা। পান খাওয়া মুখ, চোখে প্রবল স্নেহ। নজরুল এগিয়ে এসে বললেন: “হে তরুন, তুই থামিস না। তোর ভালোবাসা আমায় ছুঁয়েছে।”
তারপর নিজের হাতে একটা পুরনো খাতায় অটোগ্রাফ দিলেন—“তোর রক্ত সাধনাকে আমার লাল সালাম। আমি লিখেছি জাতীর জন্য। তোর সাধনাও একই পথে। আমার সাথেই বেচে থাকবি। তোর- কাজীদা”
রাশেদ ঘোরে না বাস্তবে তা বুঝলো না। কিন্তু অশ্রু গড়াতেই থাকলো। কাজের স্বীকৃতি এমন ভাবে পেলো, যার চেয়ে ভালোটা হয় না। যদিও কাগজ বা ফটোসেশান নেই। দৃশ্য আরেকটু আছে।
সম্বিত ফিরলো দরজায় কারো উপস্থিতি টের পেয়ে। ছায়া ও কায়া খুব বেশি চেনা। ভাঙা গলা, শুকনো ঠোঁট। সে চোখ মেলেই রাখলো। দেখলো- আয়েশা দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ি ভেজা, চোখ টলমল।
রাশেদ অস্ফুটে বললো— এতো জল ও কাজল চোখে পাষাণী…।
কিন্তু তার উচ্চারণ হলো না। মনে মনেই। হাতের কাঁপুনিতে বোঝা যাচ্ছিল, আয়েশা ভেঙে পড়েছে ভেতরে ভেতরে। সে এগিয়ে এসে রাশেদের হাতে হাত রাখলো। নরম কণ্ঠে বললো: “তুঁই আঁর সব আছিলা রাশেদ… আঁই ভুল কইচ্ছিলাম।”
রাশেদ অস্ফুট হাসলো। ঠোঁট নড়ে উঠলো: “তুঁই আইছ? নজরুল আইছিলেন আন আঁই যাইতাম হারি…”
তারপর ধীরে…ধীরে.. ধীরে…
আয়শা প্রবল আহাজারি করে উঠলো। যতোক্ষনে পাড়া পড়শী জড়ো হলো মাঝখানের সময়টুকু হাওয়া সম্ভবত এই গান গাইছিলো- “আজি হতে হলো বন্ধ মোদের জানালার ঝিলিমিলি”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top