
সামিরা আজ্জম (১৯২৭-১৯৬৭) একজন প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি সাহিত্যিক, লেখক এবং সাংবাদিক ছিলেন। তিনি আরবি ভাষায় ছোটগল্প লিখে পরিচিতি লাভ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, সংগ্রাম ও আবেগকে তার গল্পে প্রকাশ করতেন। সামিরা আজ্জমের লেখায় বাস্তব জীবনের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট এবং মর্মস্পর্শীভাবে উঠে এসেছে, যা তাকে আরবি সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছে।
তিনি তরুণ বয়স থেকেই সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন এবং লেবাননের বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। তার লেখাগুলোতে নারীদের অধিকার, সামাজিক অসাম্য এবং আরব সমাজের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে সমালোচনা পাওয়া যায়। সামিরা আজ্জমের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প সংকলনগুলির মধ্যে রয়েছে *”ছোট শহরের গল্পগুলি”* এবং *”মাটির মানুষ”* যেখানে তিনি ফিলিস্তিনি জীবনধারা ও উদ্বাস্তু সমস্যাকে গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
১৯৬৭ সালের জুন মাসে, যখন তার দেশের মানচিত্র দ্বিতীয়বারের মতো আকস্মিকভাবে পরিবর্তিত হলো এবং কয়েক লক্ষ ফিলিস্তিনিকে আবারও তাদের ঘর থেকে উচ্ছেদ করা হলো, তখন সামিরা আজ্জাম তার কাজ করা উপন্যাসটি ধ্বংস করে দিলেন। উপন্যাসটির শিরোনাম ছিল সীমানাহীন সিনাই, যা ’৬৭-র প্রেক্ষাপটে এক বিষণ্নতার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়েছিল। এর দুই মাস পর, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে, আজ্জাম বন্ধুদের সঙ্গে এক ভ্রমণে বের হন। তারা যখন সিরিয়ার আল-রামথার বাইরে ছিলেন, তখন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সামিরা আজ্জাম (১৯২৭–১৯৬৭) আমাদের জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য ছিলেন, এবং আমরা কখনোই জানতে পারিনি তিনি একটি উপন্যাস নিয়ে কী করতেন। তবুও, তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন পাঁচটি জীবন্ত ছোটগল্পের সংকলন, পাশাপাশি রিভিউ, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং অসংখ্য রেডিও সম্প্রচার। তবুও তার মৃত্যুর পর, তার কাজ আংশিকভাবে অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়; তাকে মহান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তিনি পুরোপুরি সুনির্দিষ্ট মর্যাদা পাননি। ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনি ছোটগল্পের ওপর একটি প্রবন্ধে সমালোচক ফয়সাল দররাজ স্পষ্ট করে বলেন, “আজ্জাম এখনো তার প্রাপ্য সম্মান পাননি।”
সাইকেল পাম্প গল্পটি ২০২২ সালে প্রকাশিত তার গল্পগ্রন্থ আউট অফ টাইম গ্রন্থ নেয়া হয়েছে।
লেখাটি অনুবাদ করেছেন হাসনাইন ইকবাল
দমবন্ধ ভাব থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সন্ধ্যা ছটার শো দেখা ছাড়া অন্য কোনো ভালো উপায় মাথায় আসেনি। সিনেমার দর্শকরা যাকে বলে “ম্যাটিনি শো”।
বিশাল সিনেমা হলে হাতে গোনা কয়েকজন দর্শক, এদের অধিকাংশই হাইস্কুলের ছাত্র। আমি আমার সিট বেছে নেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সিনেমা শুরু হয়ে গেলো। আমার দৃষ্টি সিনেমার পর্দায় আটকে গেলো, সেখানে সস্তা রুচির দর্শকদের জন্য একটি অর্ধসমাপ্ত সিনেমা চলছিল। যদিও আমার প্রত্যাশা খুব কম ছিল, তারপরও কিছুক্ষণ চলার পরেই বিরক্তি ধরে গেলো; এখানে সাধারণত উইক-এন্ডে ভালো ভালো সিনেমা রাখা হয়, কারণ সে সময় দর্শক সমাগম বেশি থাকে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে যে কেউ সময় কাটানোর জন্য আসে। তারা যা-ই হোক, একটা কিছু হলেই হলো।
শেষ পর্যন্ত বসে থাকা সম্ভব না হওয়ায়, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম চলে যাবো, তবে পরবর্তী গন্তব্য কোথায় তা ভাবিনি। আমি নিঃশব্দে দরজা পেরিয়ে এলাম, তখন সন্ধ্যা। আবছা আলো আঁধারের খেলা চারপাশে। অন্ধকারের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে কিছুদূর পরপর রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট রয়েছে।
এই শহরে সাইকেলই মানুষের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। আমি যখন আমার সাইকেলটি খুঁজছিলাম, দেখলাম একটি ছেলে সাইকেলের চাকার দিকে ঝুঁকে রয়েছে। সে ভাল্ভের ক্যাপ নিয়ে খেলছিল, তখনই আমার টায়ারটি হাওয়া ছেড়ে এক ধরনের শ-শ-শ শব্দ করল।
আমার হাতের থাবা যখনতার কাঁধে পড়ল, তখন সে চমকে উঠলো, কিন্তু মাথা তুলল না। আমি তাকে টেনে তুললাম। দেখলাম ময়লা আর তেলতেলে একটি মুখ। কাছাকাছি কোথাও বাইকের ওয়ার্কশপে কাজ করে হয়তো। বুঝলাম এটিই তার প্রথম অপকর্ম নয়।
মনে পড়ল বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই এ রকম সমস্যায় পড়েছিল। ক্লাবে, সিনামায় এমনকি বাড়ির বাইরেও কেউ সাইকেল রেখে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতো না। কিছুক্ষণ পরে এসেই তারা দেখতো চাকায় হাওয়া নেই।
আর সাইকেলে হাওয়া না থাকলে তো তা আর চালানোর উপযোগী থাকে না। ছেলেটি ভাবনা অবশ্য ঠিকই ছিল, সে হাওয়া ছেড়ে দিতো, তারপর আমরা বের হয়ে যখন দেখতাম হাওয়া নেই তখন তার দোকান থেকৈই আবার হাওয়া ভরে নিতোম। এতে তার কিছুটা উপার্জন হতো।
আমি কিছুটা রাগ ও ক্রোধ নিয়ে তার ঘাড়ে চেপে ধরলাম। বললাম- তাহলে তুমিই এই কাজ করো! বাহ, বেশ বেশ।
ছেলেটি ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকালো। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগলো। বললো, ”স্যার, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি শপথ করছি, আমি…।” আমি বলেই সে থেমে গেলো। বাক্যটি পূর্ণ করলো না।
আমি তাড়া দিলাম- তুমি কী?
”আমি… ওহ, আপনাকে বলেই বা লাভ কী!”
“এ রকম অপরাধের জন্য কী শাস্তি হওয়া উচিত, জানো?”
সে দ্রুত তার ঘাড় থেকে আমার হাত সরিয়ে দিল। বললো- অন্যকে বিচার করা খুবই সোজা। এ ভাবে বিচার করতে যাবেন না। এখানে আমার কোন অপরাধ নেই। আমাকে ছেড়ে দেন, আপনার দোহাই লাগে।
বলতে বলতে তার চোখ ছলছল করতে লাগলো। এতে আমার মনটা নরম হয়ে গেলো। কী করা যায়, দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ছেলেটি আমাকে অনুরোধ করলো, যাতে পুলিশে না দিই। বললো, বিনা খরচে আপনার টায়ারে হাওয়া দিয়ে দেবো। এমনকি আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে আমার সাইকেলটি নিয়ে তার দোকানের দিকে হাটা দিল। আমি তার পিছু পিছু চলতে লাগলাম।
দোকানে গিয়ে বড় পাম্পার বের করে চাকায় হাওয়া দিল। কাপড় দিয়ে সাইকেলটি মুছে দিল। শেষে সাইকেলটি আমার দিকে ঠেলে দিল। তখন দেখলাম তার চোখ পিটপিট করছে।
তাকে আশ্বস্ত করার জন্য আমি হাসলাম। বোধ হলো কিছুটা নির্ভার হতে পরেছে। বললো- আপনি যদি প্রতিদিন আসেন, আমি প্রতিদিন ফ্রিতে আপনার সাইকেল মুছে দেবো।
আমি আবারও হাসলাম। এবার মনে হলো সে পুরোপুরি নির্ভার হতে পেরেছে। বললো- আমি কি আমাকে পুলিশের হাতে দেবেন?
আসলে, পুলিশে রিপোর্ট করার কথা মাথাতেই আসেনি। শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে এটি আমার কাছে খুবই তুচ্ছ ঘটনা, এসব ছোট খাটো ঘটনায় পুলিশের কাছে গিয়ে ঝামেলা বাড়ানোর পক্ষপাতি নই আমি। বিশেষ করে ছোটখাট বিষয়ের প্রতি যখন নগর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচেতনতা দেখা যায়। যাই হোক, আমি সাইকেলে চাপতে চাপতে বললাম, “না, তবে ভবিষ্যতে যেন এমনটা না হয়।”
আমি বাড়ির দিকে সাইকেল ঘোরালাম, কিন্তু অল্প দূর যাওয়ার পর দেখলাম ছেলেটি তার সাইকেল নিয়ে আমাকে অনুসরণ করছে। হঠাৎ করে সে আমার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো, বললো, “স্যার, এই রাস্তাটা তো থানার দিকে, আর আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—”
“আমি তো কথা রেখেছি,” আমি দ্রুত উত্তর দিলাম।
“ধন্যবাদ।” ধীরে ধীরে বলে সে আমার চোখের কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর ফিরে যেতে গিয়ে থমকে গিয়ে বললো- “আমি কিছু বলতে চাই, কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি আপনি আবার কী মনে করেন।” বলেই সে চারদিকে দেখে নিল। তারপর বলল, “এই জায়গাটাও খুব একটা ভাল নয়…”
জানি না কেন যে তার কথা শুনতে গেলাম। মনে হচ্ছে একধরনের মায়া কাজ করছিল। বললাম- “এসো।” কাছাকাছি এক চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। একটা ঠান্ডা নিলাম দুজনে মিলে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে মনোযোগের সাথে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে কিছু একটা আকছিল। অর্থাৎ আমার দৃষ্টি থেকে তার দৃষ্টি ভিন্ন কিছুতে ব্যস্ত রাখলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, বলো, কী বলতে চাও।
“কিছু না। আমি কেবল জানতে চেয়েছি, আপনি কি আমাকে অপরাধী ভাবেন?”
আমি শান্ত, যুক্তিসঙ্গত কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি।
আপনি কী ভাবছেন, আমি জানি। আর এটাই সবাই ভাবে, আমার মতো কাউকে ঘৃণা করাই তো আপনাদের কাজ। আমি জানি, আমি চালাকি করেছি। কিন্তু…
“কিন্তু কী?”
“আমার মা আছে, আর একটি বোন এবং ভাই আছে, তারা আমার মায়ের সেলাই এবং আমার বাইক পাম্প করার আয়ে বেঁচে থাকে। দোকানে আমি পাঁচটার আগে কয়েকটি পয়সার জন্য কাজ করি, তারপর বস বাড়ি চলে যান এবং দোকানটা আমার হাতে ছেড়ে দেন। আর তখনই আমার কিছু অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকে। যখন আমি নাইট স্কুলের পাঠ শুনি, যেখানে সততা আর ন্যায়পরায়ণতার জন্য উৎসাহিত করা হয়, আর দিনের বেলা এমন কাজ করতে বাধ্য হই, তখন নিজেকে ঘৃণা হয়। এমনকি আমার ধার্মিক মা জানেন না আমি কীভাবে এই কয়েকটা পয়সা উপার্জন করি: তিনি এ টাকা গ্রহণ করতেন না যদি জানতেন। আমি ভাগ্যবান যে এমন একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে পেয়েছি, অন্যথায় আমি হয়তো কারাগারে যেতাম। কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না যে আমি এই ধরনের কাজ বন্ধ করব, যদি না আমার পরিবারকে নিয়ে ক্ষুধার সাথে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেই।”
ছেলেটি কথা বন্ধ করল, তার চোখে অশ্রু কণা চিকচিক করছে। আমি তার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিলাম এবং দোকানোর দরজায় পৌঁছে আলাদা হলাম। এরপর সে আমার হাত ধরল হ্যান্ডশেক করার জন্য এবং অন্য হাতে কয়েকটি পয়সা বাড়িয়ে দিল– “আপনার মতো মানুষ আমার কাছে বেশি পাওয়ার যোগ্য,” সে বলল।
