একটি লাশ ও তার বাহকের গল্প

— ‘আপনের বস্তাডা খুব ভারি গো ছার। মানুষের লাশের লাহান। একটা ভ্যান লিয়ে লেন বরং।’

হৃষ্টপুষ্ট তরুণ কুলি বস্তাটা নামিয়ে রাখে। এইটুকু প্ল্যাটফরম পেরোতে হাঁপানি ধরে গেছে তার। স্টেশনটা আলোকোজ্জ্বল। লাল, বেগুনি, নীল, শাদা, সবুজ, কোন রং যে নেই! সিমেন্টের বেঞ্চ, লোহার থাম, নিজেদের রং হারিয়ে কিম্ভুতকিমাকার। ট্রেনটা চোখ-মুখহীন বিশাল জোঁকের মতো একবার পিঠ উঁচিয়ে তো আরেকবার পাঁজর বাঁকিয়ে ফের চলতে শুরু করে দিয়েছে।

স্টেশনে কে কার খোঁজে এসেছে বোঝা যায় না। সবাই কেবল ছোটাছুটি করছে। এটা কি তবে যুদ্ধ-ফেরত সৈন্যদের ট্রেন ছিল? অনেকদিন কোনো খবর নেই যেসব স্বজনদের তাদের নিতে এসে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য প্রত্যেকে। জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খাওয়া, কোলাকুলি করা, সব ছাপিয়ে যে-খবর সত্য হয়ে উঠছে, তা হলো তারা কাউকে খুঁজছে বটে, কিন্তু জানে না কাকে খুঁজছে, কে সে? তবে এটা তার খুব ভালভাবে জানা যে, তাকে খুঁজতে কেউ আসেনি। আসার কথাও নয়। কেননা সে যুদ্ধফেরত সৈন্য নয়। সে এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। যাই হোক, নীরব দর্শকও আছে কয়েকজন। তারা দূরে দাঁড়িয়ে, তাদের নজর এখন ট্রেনের ঘূর্ণায়মান চাকার দিকে, রেলের পাটের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে, ঘষটে ঘষটে ছুটে চলেছে চাকাগুলো।

এবার নিজেকে নিয়ে ভাবে সে। মোদ্দা কথা হলো, বস্তাটা বেজায় ভারি। রেলের লোহার পাতের মতো ভারি। কিন্তু কুলি লোকটার অমন মনে হলো কেন?— মানুষের লাশের লাহান! কথাটার মানে কী? সে কি লাশ বয়ে নিয়ে চলেছে নাকি? এরকম চিন্তা আসে কোত্থেকে? আশ্চর্য!

ভ্যান, রিকশা, অটো কিছু নেই। কুলিও নেই। আসলে স্টেশনে এখন কোনো লোকজনই নেই। এই তো ছিল, এখন নেই। মুহূর্তে হাওয়া। রাত বেড়ে যাচ্ছে। অগত্যা নিজেই কাঁধে বস্তা ঝুলিয়ে রওনা দেয় সে। ব্যাগটা সত্যিই ভারি, লোহা বোঝাই করা আছে যেন। হ্যাঁ, মানুষের লাশের মতোও বলা চলে। সে একবার একটা লাশ কাঁধে নিয়েছিলো। খাটিপাটির ওপর লাশ নিয়ে চারজন মিলে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল কবর পর্যন্ত। লাশ সত্যিই বড্ড ভারি, পৃথিবীতে এতো ভারি জিনিস সত্যিই আর নেই। সেই জন্যেই বোধ হয় কুলি লোকটা এরকম উপমা ব্যবহার করেছে। লোকটা দিগদর্শী তাতে সন্দেহ নেই। সে একটু করে এগোয়, আর থামে। একনাগাড়ে টেনে নিয়ে যেতে পারে না লাশটাকে, মানে বস্তাটা। থেমে থেমে দম নিতে হয় তাকে, শক্তি সঞ্চয় করতে হয় সামনে এগোনোর জন্য। যখন থামে তখন চারদিকে তাকিয়ে দেখে কোনো ভ্যান বা কুলি পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু না, কোথাও কেউ নেই। —’উপায় নেই গোলাম হোসেন, এ ভার তোমাকেই বইতে হবে।’ মনে মনে নিজেকে বলে সে। তারপর কাঁধে বস্তা নিয়ে এগোয়।

প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে সে রেললাইন বরাবর পথ ধরে। আজদাহা সাপের মতো পড়ে থাকা দুটো সমান্তরাল রেললাইনকে মাঝখানে রেখে দুপাশ ঘিরে চলেছে গাছ-গাছালির দুটো সারি। —’এই পথ ধরে চললে আমি পৌঁছে যাব আমার গন্তব্যে।’ মনে মনে ভাবে সে। কেননা, তার গন্তব্যটা একেবারে রেললাইনের ধারে-কাছেই অবস্থিত। তাকে এরকমই বলা হয়েছে। দ্রুত হাঁটতে থাকে সে। ঘন গাছের সারি ক্রমশঃ পাতলা হতে থাকে। তার কাঁধে লোহা বা লাশের মতো ভারি বস্তাটা ক্রমেই আরো বেশি বেশি চেপে বসছে। তার কাঁধ আর বাহু ঝিনঝিন করতে শুরু করে, সেটা অবশ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ। বারবার কাঁধ বদলাতে হয় তাকে। সে বুঝতে পারে তাকে আরো দ্রুত পথ ভাঙতে হবে। ধীরে ধীরে গাছপালাগুলো হাওয়া হয়ে যেতে থাকে। তারপর পড়ে থাকে কেবল রেললাইন দুটো, যেন দুটো লিকলিকে সাপ প্রতিযোগিতায় নেমেছে, ছুটে চলেছে তারা পাশাপাশি, কেউ জানে না তার শেষ কোথায়। দৌড়টাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।

এবার আকাশে চাঁদ দৃশ্যমান হয়, একেবারে সামনে, রেললাইন বরাবর। ছাই দিয়ে মাঞ্জা গোল কাঁসার থালার মতো জ্বলজ্বল করছে চাঁদটা। তাকে লক্ষ্যে রেখে রেললাইন ধরে হাঁটে সে। কিন্তু শিগগিরই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বস্তাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দাঁড়ায়। সামনে সুদূরে গিয়ে দিগন্তের সঙ্গে মিশে গেছে রেললাইন, তার শেষ দেখা যায় না। চাঁদের জোছনায় সাপের পিঠের মতো চকচক করে রেললাইন দুটো। সবকিছু সুনসান চারিদিক। কী ভীষণ নিস্তব্ধতা! জনমানুষহীন নৈঃশব্দ্যে চাঁদটাও যেন আতঙ্কগ্রস্ত। সে অবাক হয়ে আজ উপলব্ধি করে মায়াময় জোছনাপ্লাবিত রাতও কী ভীষণ আতঙ্ক ছড়াতে পারে!

আবার হাঁটতে শুরু করে সে। কিছুটা এগিয়ে দেখতে পায় একটা গাছ একাকী দাঁড়িয়ে আছে ভৌতিক কুয়াশাময় অন্ধকারে। হঠাৎ তার পেছন থেকে বেরিয়ে আসে একজন মানুষ। তার কাঁধে একটা লাশ। তার সামনে এসে লাশটাকে ঘাড় থেকে নামায় শববাহক। শক্ত, কাঠের মতো সটান একটা লাশ, দাঁড়ায় সে নিজেরই দু’পায়ের ওপর। মনে হয় একটা জীবিত মানুষই দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ খোলা, তাকিয়ে আছে একভাবে, পলকহীন, যেন তাকেই দেখছে বিস্মিত হয়ে। তার চোখ দুটো ঘোলা, যেন আতঙ্কে বেরিয়ে আসতে চায়, যেন বলতে চায় অনেক কিছু, কিন্তু বলতে পারে না, কারণ তার ঠোঁট দুটো পরস্পর জোড়া লেগে শক্ত হয়ে আছে, যেন আঠা দিয়ে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। সে জানে অনেক কিন্তু বলতে পারে না কিছু।

লাশবাহক তার দিকে ভ্রূকটি হানে, যেন তাকে ডাকে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বস্তুটা কাঁধে তুলে নেয়, হাঁটে তার পিছুপিছু। ব্যাগটা লোহার মতো ভারি, কিংবা ওই লাশটার মতো, কেননা, লাশবাহক লোকটা লাশের ভারে কিছুটা কুঁজো হয়ে গেছে। তবু সে প্রশান্ত, ধীর, এবং অটল। সে শ্লথ পায়ে এগিয়ে চলেছে অন্ধকারের দিকে যেখানে চাঁদের জোছনা পৌছেনি। সে-ও হেঁটে চলেছে তার পিছু পিছু। তার কাঁধে বস্তা, পাথরের মতো নিরেট আর লাশের মতো ভারি। তার কাঁধ দেবে বসেছে। একটা কনকনে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে তার বাহুতে, হাতের তালু পর্যন্ত। সে হাত দুটো ছড়িয়ে-নাডিয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করে। তখন আরেকটা লোকের সম্মুখীন হয় সে। তার কোলেও একটি লাশ। সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। —’কী ব্যাপার? ব্যাপার কী?’ সে ভেতর ভেতর শিহরিত হয়, এবং ভাবে, ‘এই মাঝরাতে এইরকম এক নির্জন মাঠের মধ্যে মানুষের লাশ নিয়ে এরা যায় কোথায়? আর লাশগুলো আসেই বা কোথেকে?’ তারপর সে নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিতে চেষ্টা করে। ‘নিশ্চয় মর্গে নিয়ে যাচ্ছে। মর্গ ছাড়া লাশ নিয়ে আর কোথায়ই বা যেতে পারে?’ তখন তার গোরস্থানের কথা মনে পড়ে। — ‘হতে পারে, হয় মর্গে নাহয় গোরস্থানে।’ সে হাঁটতে হাঁটতেই ভাবে এতসব।

এখন রেললাইনের দু’পাশে এখানে-সেখানে ছড়ানো-ছিটানো দু’একটা করে গাছ দেখা যাচ্ছে। আর রেললাইন দুটো এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে সামনে— একাকী, অপ্রতিহত, নিরুদ্বেগ।

এবার গাছগুলোর পেছন থেকে আরো আরো লোক বেরিয়ে আসে, একের পর এক, প্রত্যেকের কাঁধে একেকটা লাশ, মানুষের মরদেহ। দেখতে লাগে জীবন্ত মানুষ, কিন্তু শক্ত, অনড়, ঠাণ্ডা, সুতরাং মৃত। লাশবাহকরা মূক, হয়তো বা বধিরও, অথচ প্রশান্ত, ধীর, লাশের ভারে একটু যেন কুঁজো, এবং অটল পায়ে সম্মুখ পানে চলমান। একজন লাশবাহক বিড়বিড় করছে। আশপাশে কোনো মানুষ নেই, কোনো প্রাণীও নেই। অর্থাৎ লোকটা বিড়বিড় করে কথা বলছে লাশের সঙ্গে, যে লাশকে সে বহন করে চলেছে। সেখানে এমন আর কেউ নেই যার সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলা যায়। আরেক লাশবাহক যেন স্বগতোক্তি করে চলেছে— কতো?… আর কতো?…কতো…? মনে হচ্ছে লোকটা লাশ বয়ে বয়ে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কাউকে বলার সাহস নেই তার আপত্তির কথা। তাই নিজেকেই নিজে বলে চলেছে নিজের মনের কথা, পাগলরা যেমন বিড়বিড় করে আপন মনেই অনেকটা সেই রকম।

হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে সে-ও। এ কোন জগতে এসে পড়েছে সে। তার কাঁধের বস্তাটা ক্রমশঃ আরো ভারি হয়ে উঠছে। একজন লাশবাহক তার একেবারে সামনে এসে পড়ে। তাকে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। কোনো প্রশ্ন না করা সত্ত্বেও সে কথা বলে। বোঝা যায় কথা বলার জন্যে সে উন্মুখ হয়ে আছে।

— ‘আমরা লাশ তুলে আনছি।’

— ‘কী ভয়ানক কথা! এতগুলো লোক মারা গেছে?’

— ‘না, না, ভয়ানক নয় আজকাল আর।’

তাহলে এত গোপনীয়তা কেন? ভাবে সে। লাশবাহক হাসে। তার মুখের অভিব্যক্তিই বলে দেয় প্রশ্নটা সম্পূর্ণ অদরকারী।— এত ঘনঘন মৃত্যুর খবর জনগণকে জানতে দেওয়া উচিত নয়। এই যে জনগণ— মানে পাবলিক, ব্যাটাদের মাথায় যদি একবার ঢুকেছে তো বারোটা বেজে যাবে।’ একটু থেমে আবার মুখ খোলে সে— ‘ভাবনাটা অমূলক নয়, বলুন? সব কথা সবার জানা উচিত নয়।’

এসব কথায় লোকটার মন ভরে না। ‘এসব ঘটনা যখন দিনের বেলাতেই ঘটছে, তখন লোকজন তো দেখবেই।’ সে বলে। ‘তাহলে জনগণকে জানতে না দেওয়ার কথা আসছে কোত্থেকে?’

লাশবাহক তার এই কথাকেও অপ্রয়োজনীয় বলে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু কথা না বলে সে থাকতে পারে না।— ‘আসলে ব্যাপার হচ্ছে কী, এই ঘটনাগুলো সাধারণত রাতের বেলাতেই ঘটে থাকে। যেহেতু দিনের বেলা ঘটছে না, তার মানে অধিকাংশ ঘটনাই জনগণের অজানা থেকে যাচ্ছে। তাদেরকে বোঝানো সহজ হচ্ছে। সেজন্যে লাশগুলোও সন্ধ্যার পরে, মানে রাতের বেলা উদ্ধার করা হচ্ছে।’ তারপর লোকটার যেন বোধোদয় ঘটে।— অনেক বলে ফেললাম। কী করবো মন মানে না। যাই হোক আর কিছু জানতে চাইবেন না। আমাদের কথা বলা বারণ।’

তারপর সে লাশটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। লাশের চোখ দুটি খোলা। সে একটা নির্দিষ্ট দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে আছে। ভাব দেখে মনে হয় সে মরেনি। শববাহক আলতোভাবে তার চোখ দুটি বন্ধ করে দেয়। সে হাত তুলে নেওয়া মাত্র চোখ দুটি আবার খুলে যায়। শববাহক কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসে। সে লোকটার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন বলতে চাচ্ছে— ‘আমি কারো পরোয়া করি না।’ লোকটা সাবধানে লাশের চোখ পরখ করে দেখে। গাভীন গরুর মতো বড় আর মায়াময় দুটো চোখ! সে তার দৃষ্টি ফেরাতে পারে না। তারপর সে শববাহকের দিকে ফেরে। সে বলতে চায়— ‘কী হবে যদি তোমাদের দেখে ফেলে কেউ?’ কিন্তু ততক্ষণে শববাহক চলতে শুরু করে দিয়েছে। তার একটা মিশন আছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ মিশন। সে উত্তর দিতে পারে না, উত্তর দেওয়ার অধিকার নেই তার। লোকটা তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না। সুতরাং সে রেলওয়ে বরাবর হাঁটতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে আলো ফুটছে। এখন গন্তব্য খুঁজতে হবে। ‘ঠিক আছে, আমার কাছে ঠিকানা আছে। আমি আমার গন্তব্য জানি’ সে ভাবে। সবকিছু আগে থেকেই বন্দোবস্ত করে রাখা আছে। অন্তত তাকে সেরকমটাই বলা হয়েছে। সে হাঁটতে থাকে তার ভারি লাগেজ নিয়ে সীসার মতো ভারি। তার পিপাসা পায়। সারা রাত খোলা থাকে এমন একটা চায়ের স্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। খদ্দেরদের কেউ কেউ ঢলছে, ঢলতে ঢুলতে টেবিলে কপাল ঠকে যাচ্ছে তবু তাদের তন্দ্রা কাটে না। আবার কেউ কেউ চেয়ারে হেলান দিয়ে পড়ে রয়েছে, কারো পা অন্য চেয়ারে, কারো হাত দুটো ঝুলছে দুপাশে কিন্তু আসলে কেউই ঘুমোচ্ছে না। তারা সামনে তাকিয়ে রয়েছে সাদা চোখে, শূন্যে, নিষ্পলক। তাদের চোখগুলো সেই শবের চোখের মতো। গাভীন গরুর মতো স্নিগ্ধ আর মায়াময়। সে কেঁপে ওঠে। ব্যাগ নামিয়ে রাখে মাটিতে। দ্রুত পকেট থেকে ঠিকানা লেখা কাগজ বের করে স্টল মালিককে দেখায়। দোকানদার যত্নের সঙ্গে ঠিকানা পড়ে দূরের কোনও এক গন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে। লোকটা তার ব্যাগ তুলে নেয় ফের। ব্যাগটা এখন আগের চেয়েও ভারি।

গন্তব্যে পৌঁছে বস্তাটা নামায় সে। আগে থেকেই বন্দোবস্ত করে রাখা ছিল সেটা দে এখানে এসে বুঝতে পারে। দু’জন মাঝবয়সী লোক এগিয়ে আসে, যেন তারা এতক্ষণ তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বস্তাটা তুলে নেয় দুজন মিলে।

সে অবাক হয়ে দেখে, রেললাইনে দেখা পাওয়া শববাহকরাও হাজির এখানে। তাদের মতো আরো অনেক লাশবাহক জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন মাল খালাস করবে বলে অপেক্ষা করছে। তার কেমন ঘোর লাগে, মাথা কাজ করে না ঠিক মতো।

বাইরে থেকে বাড়ির মতো দেখালেও আসলে এটা একটা দূর্গের মতো। ভেতরে ঘরের পর ঘর, লম্বা, অপ্রশস্ত, সব রকম। তাকে একটা অফিসঘরে নিয়ে যাওগা হয়। সামনে প্রশস্ত বারান্দা, তারপর একটুখানি খোলা জায়গা। সেটা বাগান হতে পারতো, কিন্তু অযত্নে পরিত্যক্ত ঝোপের মতো। তাকে বসতে বলে লোক দুটো চাল যায়। ঘরটা জানালাশূন্য, এমনকী কোনো ভেন্টিলেটরও নেই। হঠাৎ একটা দমবন্ধ ভাব তাকে জাপটে ধরে। সে বাইরে যাবে বলে পা বাড়ায়। আর তখনই তিন-তিন জন লোক দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। তাদের দেখে সে বলে, ‘আমি আপনামেন জিনিস পৌঁছে দিয়েছি। আমার দায়িত্ব শেষ। এবার আমি বাড়ি যাব।

লোকগুলো কোনো কথা বলে না। তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই রোবটেন মতো যন্ত্র যেন একেক জন। প্রত্যেকের ঠোঁট দুটো যেন আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া।

— ‘আসার পথে, স্টেশনে, রেললাইনে, কার কার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?

— ‘অনেকের সঙ্গে।

পরস্পরের দিকে তাকায় ওরা তিনজন। বোঝা যায় না কে তাদের কমান্ডার, তাদের চেহারা-ছুরত আর পোশাক-আশাক- একইরকম।

—’ওদের কে কে তোমার চেনা-জানা?

—’কেউ না। কেউ আমাকে চেনে না। আমিও কাউকে চিনি না।’

—’তোমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেছে এতে কী আছে?’

—’না। কেবল স্টেশনের কুলি বলেছিলো ব্যাগটা খুব ভারি, মানুষের লাশের মতো।’

—’হুম!’

একজন বস্তাটা খোলে। অনেকগুলো মোটা রঙিন পলিথিনে মোড়া ব্যাগ, তার মধ্যে খণ্ড খণ্ড করে কাটা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়।— ‘এসব কী? আমাকে এসব কী বইতে দেওয়া হয়েছে?’

—’এই লাশের টুকরোগুলোকে এখন নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে।’

—’না, এ কিছুতেই হতে পারে না। ও কার লাশ?’

ওদের একজন রিভলবার বের করে। লোকটাকে এবার আতঙ্ক চেপে ধরে।

—’কী ব্যাপার?’

অস্ত্রধারী লোকটা তার কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না, বরং তার হাঁটু বরাবর একটা গুলি ছোঁড়ে।— ছোট্! বাঞ্চোত! বাঁচতে চাস তো ছোট্!’

লোকটা আর কিছু ভাবতে পারে না। কে তাকে এই ভারি বস্তা এখানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে, কারা, কেন, কীভাবে তার মধ্যে মানুষের দেহের খণ্ডাংশ ভরেছে, এরকম যেসব অসংখ্য প্রশ্ন তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেসব কিছুই এখন আর মনে পড়ে না। বাঁচার উদগ্র আকাঙ্ক্ষায় পড়িমড়ি দৌড় দেয় সে। একহাতে আহত রক্তাক্ত হাঁটু চেপে ধরে দৌড় লাগায়। পারে না, তবু দৌড়ায়। তার মনে হয় কত যোজন যোজন পথ সে পাড়ি দিয়ে চলেছে, কিন্তু পথ ফুরোয় না। আর একটা বুলেট তার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। সেটাই তার মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু বুলেটের হিসাব দিতে হবে না বলে আরো দুটি বুলেট তার জন্য খরচ করা হয়। সে মাটিতে ঢলে পড়ে।

তার চোখের সামনে দিয়ে তখন একটা ঝমঝমাঝম রেললাইন ছুটতে শুরু করেছে… আর তার ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটতে থাকে অসংখ্য লাশ…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top