নগদ কথা

দুপুর বেলা সুনসান নীরবতা ভেঙে একটা অন্ধ ভিখারি গান গেয়ে ভিক্ষা করছে। একটা লাঠির মাথা ধরে মনে হয় ওর বউটা সামনে হাঁটছে। আরেক মাথা ধরে পিছনে পিছনে বউকে ফলো করছে। 

ভিখারি গান গাচ্ছিল,

নুরের নবী মোস্তফায়, রাস্তা দিয়া হাইটা যায়,

হরিণ একটা বান্ধা ছিলো গাছেরি তলায়।

হরিণে কান্দিয়া কয় …

খানিকক্ষণ গেয়ে সে ভিক্ষার আবেদন জানাচ্ছে। এক টাকা ভিক্ষা দিলে আসমানে কত্তো বড়ো মহল পাওয়া যাবে ইত্যাদি গোপন ইলিমে সে দিব্যি হাফেজ। কিন্তু আন্ধা ভিখারি অথবা তার শ্রোতারা মরু শহর মক্কা বা মদিনার পথে হরিণ থাকা না থাকা নিয়ে কখনো ভেবেছে কি? ভিখারির দরকার সুর করে গান গাওয়া। তার দিকে সম্ভাব্য দাতাদের টেনে আনা।

পাকিস্তানের সদর আগা মোহাম্মাদ আইয়ুব খান মাশরেকি পাকিস্তানে একটা জনসভা করার এরাদা করেছেন। এখানকার সুবেদার তার সদর সাহাবকে এতই ভক্তি তাজিম তমিজ পেয়ার করতেন যে কথিত আছে ইসলামাবাদ হতে সদর-ই-জমহুরি মোহতারাম আগা মোহাম্মাদ আইয়ুব খানের টেলিফোন আসলে কথা বলার আগে তিনি মাথায় বিশেষ তরিকার টুপি দিয়ে নিতেন। সদরের প্রতি এটা তার ইজ্জত।

এহেন সুবেদার আবদার করলেন, জনসভাটা তার ‘মোমেনশাহি’তেই চাই।

আর্জি কবুল ও মনজুর হলো।

ধর ধর মার কাট করে সুবেদার সাহাব ময়দানে তার খানদানি সিয়াসতি হুকুমতি হর কিসিমের বাহিনি নামিয়ে দিলেন। ময়মনসিংহে বিশাল জলসার এন্তেজাম হলো। রইসে জমহুরি সাবেক সেপাহি সালার সদরে মোহতারাম ফিল্ড মার্শাল আগা মোহাম্মাদ আইয়ুব খান জাতির উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ হেদায়েতি খোতবা বয়ান করবেন।

বহুদিন পরে মাশরেকি মূলকে সদর সাহাব আম মরদুমদের সামনে হাজির হয়েছেন। সুবেদার সাহাবের খুশির সীমা নেই।

সদর সাহাব উর্দুতে বয়ান করবেন। তার সাথের হুকুমতি অনুবাদকরা বাংলাভাষী হাজেরানদের খেদমতে সাথে সাথে তার বাংলা তরজমা পেশ করবেন। কিন্তু সুবেদার সাহাবের আবদার পুরো বয়ানের শেষে এ কাজটা তিনি নিজেই করবেন। সদর সাহাব এজাজত দিলেন।

সদর সাহাব বহু বড়া এক খোতবা দিলেন। হুকুমতের এসতেমায়ি, সিয়াসতি, একতেসদি, খারেজি, ফৌজি, অগায়রা নানা বিষয়। মাশরেকি ও মাগরেবি পাকিস্তানের তামাম আওয়াম এক কওম, এক দেল। বাবায়ে কওমের দেখানো রাহে এসতেকামাত থাকার জন্য তিনি সকলকে আরজ গুজার করলেন।

ওদিকে সদর সাহাবের খোতবার শুরুতে সুবাদার সাব মঞ্চে বসেই ঘুমিয়ে পড়লেন। গভীর ঘুম। হুকুমতের কামলা ও আমলারা মহা পেরেশানিতে পড়ে গেল। তিনি তো ঘুমাচ্ছেন, খোতবা শুনছেন না। তরজমা করবেন কেমনে। কিন্তু সুবেদার সাবের এ সুন্দর দিবানিদ্রা ফতুর করার সাহস কারো নেই। পরস্পর চাওয়া-চাওয়ি করে অনুবাদকরাই খোতবার নোট নিতে শুরু করলেন।

মেরে পেয়ারে ভাইও আওর বোহিন, খোদা হাফেজ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে সদর সাহাব যখন তার খোতবা খতম করেন, সুবাদার সাহাব তখনো ঘুমাচ্ছেন। এক বেতমিজ ফৌজি এডিসি এবার সুবেদার সাহেবের কানের কাছে গিয়ে আরজ করলেন, স্যার, সদর সাহাবকা খোতবা খতম হুয়া।

হুড়মুড় করে তিনি উঠে গেলেন। মাইক হাতে নিলেন। একজন অনুবাদক তার হাতে রাখা সদর সাহাবের বয়ানের নোট এগিয়ে দিলো। তিনি নিলেন না। চল্লিশ মিনিটের খোতবা তিনি এক ঘণ্টা তরজমা ফরমালেন।

সে তরজমায় সদর সাহাবের বয়ানের জাহেরি, বাতেনি, গায়েবি সবই ছিলো। তিনি যা বলেননি তাও ছিল আর যা বলেছেন সেখান থেকেও ছিল।

আম ইনসান বারবার হাত তালি দিচ্ছে, পাক ওয়াতান জিন্দাবাদ, সদর আইউব জিন্দাবাদ, নারায়ে তকবির আল্লাহো আকবর।

সদর সাহাব তো বাংলায় আবাংগাল। তিনি বারবার তাকাচ্ছেন। কখন তার বয়ানের তরজমা শেষ হবে। উর্দু সমঝদাররা হাঁ করে আছে। সুবাদার সাহাব কি সব তরজমা করছেন! তরজমা শেষে সুবাদার সাহাব ক্লান্ত হয়ে বসলেন। যেন কেল্লা ফতে। সদর সাহাবের খোতবা চলাকালে যে মরদুম চুপচাপ ছিল তাদের তকবির মাত হতে অক্ত গুজার হয়ে এলো। আম ইনসানের জোশ দেখে সদর সাহাব দারুণ খুশি। জমায়েত কামিয়াব হো।

গভর্নর সাহাব, আপ বহুত কামেল লিডার হ্য। খোশ আমদেদ। সদর সাহাব বললেন।

আচ্ছা গভর্নর সাহাব, আপনি সারাক্ষন ঘুমিয়ে থেকে আমার কী ভাষণ শুনলেন আর কী-ই বা তরজমা করলেন। তাও এতোক্ষণ সময় নিয়ে?

স্যার, আমি জানি এ মুহূর্তে মাশরিকি পাকিস্তানের আম ইনসান আপনার কাছ থেকে কী শুনতে চায়। আমি তো সেই কথাগুলো তাদের শুনিয়েছি মাত্র। এগুলো আগে থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছি। আর এ জন্যই আমি আলাদা কোনো কাগজ কলম নেইনি।

“আমি কি কই, আমার সারিন্দায় কি বাজায়!”

উচ্চশিক্ষিত অবসরপ্রাপ্ত একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন তার বাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহের অজপাড়া গাঁয়ে। তিনি এবং আরো অনেক ছাত্র ময়মনসিংহ শহরের এক উকিলের বিশাল একটা টলঘরে থেকে লেখাপড়া করেছেন। গ্রাম থেকে আসা ছাত্রদের ভেতর যাদের শহরে থাকার জায়গার সমস্যা অথবা পর্যাপ্ত টাকা-পয়সার অভাব, এটা ছিল তাদের জন্য বড় একটা সাপোর্ট। এতোগুলো ছাত্রের থাকা খাওয়া ফ্রি। শর্ত একটাই, পড়াশুনা করতে হবে।

এবার আরেক মহাদেশে। আরেক সেনাপতি। ফিল্ড মার্শাল আলহাজ ড. ইদি আমিন দাদা, উগান্ডায় সেনা বিদ্রোহের পরে ক্ষমতা দখল করেন। তখনকার উগান্ডার ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সমস্ত অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো ভারতীয় ও ইউরোপীয়রা। একদিকে তারা এই গরিব দেশটির সম্পদ লুটপাট করতো আবার বড় বড় বাণী দিতো। তারা বলতো, কালা মানুষরা হলো সাদাদের বোঝা। এদের লালন পালন দেখভাল করতে করতে সাদারা রীতিমতো ক্লান্ত।

ক্ষমতা দখলের পরেই ইদি আমিন দাদা কাম্পালাস্থ মহাধরিবাজ সাদা ব্যবসায়ীদের ডাকলেন। খাটিয়া বা পালকি কিছু একটা আনা হলো। দাদা তাতে উঠে লাট বাহাদুরের মতো মসনদে গদ্দিনসিন হলেন। উচ্চতা ছ’ফুট চার ইঞ্চি, ওজন পোনে তিনশ পাউন্ড। হুকুম হলো, পালকিটা কাঁধে নিয়ে রাজধানী শহরে চক্কর মারো। ছবি তোল। দুনিয়াবাসী দেখুক, কালা মানুষরা সাদাদের কেমন বোঝা। ছবিগুলো ইউরোপের পত্রিকাগুলোতে পাঠিয়ে দেয়া হোক।

কি আর করবে। ঠ্যালায় পড়লে বুড়ো গরুও ভাঙ্গা চার পার হয়।

এহেন ইদি আমিন সাংবাদিক সম্মেলন ডাকলেন। সেনাদের ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপট বর্ননা করলেন। আরো বলল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে বার্মা ফন্টে যুদ্ধরত অবস্থায় স্বপ্নে দেখলেন তিনি একদিন সেনাপ্রধান হবেন। পরে আরেকবার খোয়াব দেখলেন দেশের প্রসিডেন্ট হবেন।

সাংবাদিকেরা জানতে চাইলো, আপনি কি প্রায়ই এমন স্বপ্ন দেখেন?

: যখনই আমার দরকার হয়।

ইদির চাকরির শুরু ছিল ব্রিটিশ কলোনিয়াল বাহিনির বাবুর্চির জোগাইল্যা হিসাবে। পরে অফিসার হন। বিলাতিরা তাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মেডেলও দিয়েছিল। যার নাম CBE, কিন্তু বাকিগুলো নিজের বানানো ডিগ্রি। হোম মেড। ডক্টর VC DSO MC স্ব-আরোপিত ডিগ্রি।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধরাশয়কারী জমিনের সমস্ত পশু ও সাগরের মৎস্যকুলের মহান তার নাম মোবারক লিখতে হলে আরো লিখতে হতো, ‘উগান্ডা তথা আফ্রিকায় প্রভু. দেশের আজীবন প্রেসিডেন্ট, ফিল্ড মার্শাল মহামহিম আলহাজ ডক্টর ইদি আমিন দাদা VC DSO MC CBE।

স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি এহেন বেয়াড়া খাদেমকে বিলাতি রানী কমনওয়েলথ সম্মেলনে দাওয়াত দিয়েছিলেন। ইদি কাম্পালাস্থ বিটিশ হাইকমিশনারকে তার অফিসে তলব করলেন। বললেন, তোমাদের রানী আমাকে কমনওয়েলথ সম্মেলনে দাওয়াত দিয়েছেন। রেওয়াজ অনুযায়ী তিনি তো আমাকে ফরমাল স্যুট পাঠাবেন। আমার পায়ের সাইজ অনেক বড়। স্যুট পরে তো ছোট জুতা পরে বা খালি পায়ে সেখানে যাওয়া যাবে না। তাই তাকে বলতে হবে, আমার পায়ের সাইজের এক জোড়া জুতা পাঠালে আমি যাবো। আর তোমাকে ডাকলাম, আমার পা দুটো নিজ হাতে মাপ। জুতার নম্বরটা তোমাদের রানীকে জানিয়ে দাও।

ইদি সামরিক অফিসার ছিলেন। ব্রিটিশদের সাথে কাজ করেছেন। ডিপ্লোম্যাটদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তা ভালোভাবেই জানতেন। আর জেনে শুনেই তিনি এ কাজটা করেছেন। অপমান ও লজ্জায় হাইকমিশনারের চেহারা টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। বললেন, আমি আপনার জুতার বিষয়টা ফরেন অফিসকে জানাবো। তাদের নির্দেশনার অপেক্ষা করবো।

কয়েকদিন পরে ব্রিটিশ ফরেন অফিস বিনয়ের সাথে জানালো, ইদি আমিনকে সম্মেলনে যেতে হবে না। (তেতাল্লিশ সন্তানের জনক ইদি আমিনের জুতার নম্বরটা পরে মিডিয়াতে এসেছিল। স্মরণ শক্তির দুর্বলতার কারণে তা ভুলে গেছি। সহৃদয় পাঠক পাঠিকাদের কারো মনে থাকলে জানালে বাধিত হবো।) একদম নগদ কথা।

নগদ যা পাও হাত পেতে নাও,

বাকির খাতা শূন্য থাক।

দূরের বাদ্য শুনতে মধুর,

মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক।

(ওমর খৈয়াম)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top