প্রাপ্তি

সুহাইম আদনান

কোথায় যাচ্ছিস?… বললি না কোথায় যাচ্ছিস?… আবার একটু থেমে, কী রে ব্যাটা, কোথায় যাচ্ছিস বলবি না?

হঠাৎ করে চমকে উঠলাম। এতক্ষণ অন্যমনস্ক ছিলাম, তাই বুঝিনি কী বলেছে। যদিও জবাবে বলেছি ওয়ারলেস যাচ্ছি, তবুও আমার দিকে ফরহাদ তাকিয়ে আছে। এত পথ হেঁটে এলাম, তবু ফরহাদের সাথে একটা কথাও বলিনি। ওর দিকে চেয়ে বললাম, কিছু বলবি?

না, কিছু না।

তাহলে ওভাবে চেয়ে আছিস ক্যান?

না, দেখছিলাম তোর মাথায় তো চুল নাই বললেই চলে, আজ বাদে কাল টাক হয়ে যাবি রে।

কথাটা শুনতেই আমার ভেতর চক্কর দিয়ে উঠলো। ব্যাটা মনে হয় আমাকে পটানোর চেষ্টা করছে। বললাম, আমার টাক হলে তোর কী?

বৌ পাবি না, বৌ।

শোন, ফাজলামো করবি না। আমার চৌদ্দ গুষ্টিতে কারো টাক নেই-আমার টাক হবে কেন?

টাকের জন্য চৌদ্দ গুষ্টি লাগে? আমি তো জানি আদমের মাথায় টাক ছিলো না। তাহলে শুনি-পৃথিবীতে এত টাক কীভাবে এলো?

তুই কি আজ আমারে একটু মাফ করবি?

আমার ভাবে যদিও ফরহাদ বুঝতে পেরেছে আমার মন ততটা ভালো নেই, তারপরও গোটা কয়েকবার চেষ্টা করলো মজা করতে। কিন্তু আমি কোনো কথাই বলিনি। ততক্ষণে পৌঁছে গেছি ওয়ারলেস। চোখ দুটো আমার সারাক্ষণই নিচে। কোনোদিকে আমার মন নেই। গত পুরোটা মাস আমার ক্ষুদে ছাত্রদেরকে পড়িয়ে যা পেয়েছি তা দিয়ে একজোড়া স্যান্ডেল কিনেছিলাম। কিন্তু স্যান্ডেলের বয়স একসপ্তাহ না যেতেই ছিঁড়ে গেছে। আমার মনটা যে কেমন সেটা প্রকাশ করার মতো শক্তিশালী অথবা ন্যূনতম শক্তিশালী শব্দও আমার জানা নেই। নইলে চিৎকার করে বলতাম আমার পাঁচশোটা টাকা পুরোই পানিতে গেলো-তাও স্বচ্ছ পানি হলে না হয় কথা ছিলো, কিন্তু এটা হলো ঘোলাপানি। জাল ফেললেও টাকা আর উসুল হবে না।

অলি ভাইয়ের দোকানে এসেছি দশ-বারো মিনিট হবে, কিন্তু একটা কথাও বলিনি। হঠাৎ ফরহাদ খেঁকিয়ে উঠলো, কী রে দোস, তোর মতিগতি তো ভালো লাগছে না। ছ্যাক খেয়েছিস না কি?

মানে? ও এমন প্রশ্ন করবে বুঝে উঠতে পারিনি।

যদি কোনো রমণী, কুমারী কিংবা মেয়ে তোকে ভালোবাসার নামে চুলার ওপর উঠিয়ে গরম খুন্তির ছ্যাকা দিয়ে কলিজায় ঘা করে ফেলে তাহলে আমাকে বলতে পারিস। আসলে তুই তো জানিস না মেয়েরা হলো…।

ওর বকবক চলতেই থাকলো। ও মনে হয় ভাত খায় না। ভাতের বদলে কথা খায় আর বাইরে এসে তা উগড়ায়। কিছুক্ষণ পর আবার বললো, আচ্ছা দোস, মেয়েটা কি ভাইবোনদের মধ্যে বড় না ছোট? না কি বাপের এক মেয়ে? যদি হালি ভাইবোন থেকেই থাকে তাহলে ওপথে না হাঁটাই ভালো।

একটু চিন্তা করে ঠিক করলাম ওর সাথে তাল মিলাই। বললাম, ওরা দুই বোন; আমারটা ছোট। বাপের মেলা সম্পত্তি। আর চেহারা? ওদিকে তাকানোই যায় না। এতটাই ফরসা যে, তাকাতে গেলে সানগ্লাস পরতে হয়।… কথা সেটা না। কথা হলো মাঝখানে কিছুদিন জমেছিলো-বেশি না, মাত্র এই তিন সপ্তাহ। ছ্যাকা দিয়েছি আমিই। ভালো লাগে না এসব করতে। মোবাইল নম্বর আছে। তুই যদি বলিস… থাক, তুই বা ওর মোবাইল নম্বর দিয়ে কী করবি?

ফরহাদের মধ্যে মনে হয় কাঁপন শুরু হয়ে গেছে। ইনিয়ে-বিনিয়ে ও এবার যেভাবে হোক আমার কাছ থেকে মেয়ের মোবাইল নম্বর চাইছে

আমাকে খুশি করলে আমি দিতে পারি। এছাড়া অসম্ভব। সাফ সাফ বলে দিলাম।

ও তখন পারলে অলি ভাইয়ের দোকানটা আমার হাতের ওপর এনে দেয়। ‘কিন্তু আমি নিতে চাই না, আমার মন এগুলোয় গলবে না; কারণ আমার চাই একজোড়া নতুন জুতো’-বলবো না কি একবার? না, থাক।

থাক, তোকে আর কষ্ট দেবো না। সিমু নামে সেভ করা আছে। ওর মোবাইলে আমার পরিত্যক্ত সিমের নম্বরটা এডিট করে সিমু নামে বদলে দিলাম।

এরই মধ্যে জোহরের আজান হয়ে গেলো। আমি বললাম, দোস, আজান দিয়েছে। আমার সাথে এই মসজিদে গেলে চল।

না, আমার প্যান্টে একটু সমস্যা আছে।

বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম। আমার সামনেই যদি ফোন করা শুরু করতো, তাহলে ধরা পড়ে যেতাম।

নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হতে গিয়ে দেখলাম আমার জুতো জোড়া যেখানে ছিলো, ঠিক তার পাশে তেমনই আরেক জোড়া জুতো। ভাবলাম, এ-সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। আমার জুতো যদিও এ-জোড়ার মতো চকচকে না, কিন্তু আসল সুবিধা হলো এই জোড়া আমারটার মতো ছেঁড়া না।

বের হতে গিয়ে আবার মনটা কেন যেন ঘুরে গেলো। সামান্য একজোড়া জুতো চুরি করবো? তাও আবার মসজিদ থেকে? তাহলে আমার আর হিরোইঞ্চিদের মধ্যে তফাতটা কী? আবার উল্টো দিকে ফিরলাম।

কিন্তু ততক্ষণে সেই জুতোর মালিক আমার জুতো নিয়ে হনহন করে হাঁটতে শুরু করেছেন।

আমি তাকে ডাক দিলাম, ভাই, এই যে আপনার জুতা।

কী বলছেন? মাথা খারাপ না কি আপনার?

না ভাই, সত্যি-এটাই আপনার।

আরে মিয়া, এই কয়দিন আগে কিনলাম নতুন জুতো। বলে আর দেরি করলো না। আগের গতিতে হাঁটতে লাগলো।

তাহলে কি এই জুতো জোড়া আমার জন্য হালাল হয়ে গেলো? আহ, আমিই তো এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

আমি কিন্তু রাস্তার পাশে সরে গেলেও লোকটার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। লোকটা কয়েক কদম যাওয়ার পরই পায়ের দিকে ভালো করে তাকিয়ে এদিক-ওদিক মাথা ঘোরাতে লাগলো। আমি আস্তে এগিয়ে গেলাম তার দিকে।

লোকটা নিজেই এখন লজ্জিত। তার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর পর বললো, ভাই, আর কী আমার জুতা জোড়া ছেঁড়া ছিলো না। আপনারটা কি ছিলো?

হ্যাঁ।

এরই মধ্যে মসজিদ থেকে বের হওয়া আরেক মুসল্লি বলে গেলেন, মসজিদের সামনে খাড়ায়া এত কতা কন ক্যা? দূরে গিয়া কন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top