পলাশের ডালে রাঙা ভোর

তাহমিনা মারজান

সারা দিনের ব্যস্ততার পর রাত এলেই কলি সতেজ হয়ে যায়। এটা যদিও অদ্ভুত কথা। ব্যস্ততার পর আসে তো ক্লান্তি। কলির ব্যস্ততা ভিন্ন রকম। সারা দিন শুধু ছোটাছুটি। ঝারি খাওয়া, থাপ্পড় খাওয়া, লাল চোখের দৃষ্টিতে পুড়ে যাওয়া।

বিবি মহলে প্রায় বছরখানেক হলো কলি এসেছে। গেল ফেব্রুয়ারির আঠাশ তারিখ। কড় গুনে হিসাব কষে মনে মনে আওড়াচ্ছে কলি, আর মাত্র ছয় দিন পর বছর হবে। গেল বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি রানাদের সাথে কী আনন্দ নিয়ে নারকেল পাতা আর সর কাঠি দিয়ে শহীদ মিনার বানাইছিলো। কলির মন উদাস হয়ে যায়। গ্রামে খাওনের অনেক অভাব। জামার অভাব। তবুও কতো আনন্দ আছে। ছোট আরো তিনটা বোন আছে কলির। ওদের কথা ভেবেই ক্লাস থ্রির বইগুলারে ট্রাংকের ভেতর লুকিয়ে রেখে এই শহরে চলে আসছে। বাবার বন্ধু মতি কাকা কইছিলো শহরে অনেক আনন্দ আর মজা। অভাব নাই। কাকা মিথ্যা কইছে। আর না হয় কাকায় বিবি মহলের মানুষ গো চিনে না। আড়াল থিক্কা প্রতিবার কলি শুনে, বড় ম্যাডাম কাকা আসলেই বিচার দেয়। কলি কাজ পারে না। কথা শুনে না। অশুদ্ধ কথা কয়। আর খালি নাকি খাম খাম করে। কাকাও প্রতিবার শাসাইয়া যায়। কলির বেতন বারোশ টাকা। কাকায় নেয় দুইশো আর বাবারে দেয় এক হাজার।

কলির বাচ্চা মনে কতো কথা জমে! কতোবার হিসাব মিলায়। আচ্ছা ইসকুল রে স্কুল, লুডিরে রুটি, কইতর রে কবুতর কইতে পারলেই সবাই উন্নত মানুষ হইয়া যায়! টেবিলের ফুলদানি পাল্টাতে হয়, রুমে রুমে চা দিতে হয়। চা বানায় ফজিলা কলির তেমন কোনো কাজ নেই। শুধু সকালে উঠে খালা বাসন মাজতে হয়, খালায়। খালারে সবাই ভয় পায়। কলিও। কারন খালার বাজখাই গলা। কেউরে ডরায় না।

যাই হোক কলির কাজ তেমন না এই রাফিরে আটটার আগে ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়াইতে হয়। রাফি এই বাড়িডর গুরুত্বপূর্ণ একজন। বিদেশি কুত্তা। পুরু করুর কুত্তা কইয়া একবার যেই থাপ্পড় খাইছে। কলি বুঝে পায় না। শহর এমন কেন।

মানুষের তন কুত্তার দাম বেশি। বেশি না শুধু হাজার গুণ বেশি।

তারপর রাফির রুম পরিষ্কার করতে হয়। বড় ম্যাডামের জুতা মোছা, ছোড ম্যাডামের বারান্দার গাছে পানি দেয়া, সাবের ব্যাগপত্র গাড়িত তুলে দেয়া। আর এর ভেতর কলি এই দিকে আয়!

কলি শুন!

কলি হারামি, কই তুই!

এমন সব বাজখাঁই আদেশ চলতেই থাকে রাত দশ/এগারো অবধি। তবে বিবি মহলে একজন আছে যে অন্য সবার থেকে ভিন্ন। ছোড সাব!

তারে সাব কইলে রাগ করে। ভাই কইতে কয়। ভাই কইলে দুই ম্যাডামের ঝারি খাইতে হয়। কলি তাই একলা পাইলেই ছোড সাবরে ভাই ডাকে। ছোড ভাইয়ের হুকুম। দশটার পর কলিরে আর ফরমাশ করা যাবে না। করলে কলিরে বিদায় করে দেবে। কলির তাই দশটার পর ছুটি। তবে সারা দিন কলি তেমন কাজ তো করে না। এইডা বাড়ির সবার একটা কমন বাক্য। কলির শুনতে ভালোই লাগে।

কলির একটা ছুড টিনের বাক্স আছে। রান্নাঘরের পাশে এক চিলতে একটা বারান্দা আছে। সেই বারান্দায় বিছানা ফেলে কলি ঘুমায়। বারান্দার এক কোণে কলির টিনের বাক্সটা থাকে। বারান্দায় আলো নাই। রান্নাঘরের আলো দিয়া রোজ রাতে টিনের বাক্স খুলে কলি বাড়ির সবার লগে কথা কয়। তিনডা ছবি আছে কলির কাছে। একটায় বাবার কোলে ওরা দুই বোন। কলি আর মলি। একটায় মা বাবার লগে চার বইন। কলি, মলি, রানু, পলি। একটায় মা আর বাবায়।

রানা আসার সময় হাতে আকা কাগজের পৃষ্ঠা দিছে একটা। শহীদ মিনার আঁকা। ঠিক যেমন ওরা নদীর পাড় বানাইতো তেমন। ফাতেমা দিছে চারটা কড়ি, শিলায় দিছে একটা পুঁতির মালা। মলি দিছে এক গাছি লাল সুতা। বাবায় মাজার থিক্কা আইন্না দিছেলো চার বইনরে। কলি হারায় ফেলছিলো। মলি নিজেরটা দিয়া দিছে। আর কইছে আফা তর কোন বিপদ অইবো না। লগে রাখিছ।

কলি হাসি পায়। কতোদিন বইনগুলারে দেখে না। কতোদিন মার মুখ দেখে না। বাবারে দুইবার দেখছিলো একটু সময়ের জন্য। বাবা কয় মা শা আল্লাহ! কলি মায় দেহি ছুন্দর হই গেছো। থাহো মা থাহো। আরো ছুন্দর অইবা। কলির কান্না পায় নাই। ভাল্লাগছে। বাবারে খুশি দেইক্ষা ভাল্লাগছে। কলির আর ঘুম আসে না। বারান্দার এক পাশে একটা লেবু গাছ। লেবু গাছে ফুল ফুটছে। আইজ এই নিয়াও কি এক কাণ্ড হইছে।

শুদ্ধ কথা কইতে হবে এই ভয়ে ভয়ে ও যখন খাবারের টেবিলে কইলো বড় ম্যাডাম ‘লেবু গাছে কি সুন্দর সুল সুটছে’। সবাই কি হাসাহাসি। লজ্জায় কলির চোখে পানি চলে আসছিলো।

এখন খুব হাসি পাইতাছে। কলি শব্দ কইরা হাসতে থাকলো। কলি বুজে না রাত আইলেই কলির এত্ত ভাল্লাগে কেন। মনে হয় অর কোনো দুখ নাই। সারা দিনের কষ্টের সব ঘটনা মনে পরলে কেমন হাসি পায়। আসলেই দুনিয়া আজব জায়গা। আর রাইত আরো আজব! নিজেরে রাত হইলেই বড় সুন্দর লাগে। সুন্দরি কলি! কলি আবার শব্দ কইরা হাসতে থাকে….

শহরে আইসা কলি দেখছে এখানে আর কিছু থাকুক আর না থাকুক। অনেক অনুষ্ঠান হয়। এই দিন, সেই দিন।

ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ।

কতো দিন যে বড় লোকরা পালন করে। এই দিনগুলার আবার জামাকাপড় আলাদা আলাদা। বড় ম্যাডাম, ছোড ম্যাডাম মিলাইয়া মিলাইয়া বড় সাব ছোড সাব তাগো বন্ধু বোন ভাইগো জন্য হলুদ, সাদা, লাল, সবুজ জামা পাঞ্জাবি বানাইছে। সবগুলা নিয়া কলির আজ লন্ড্রিত যাওয়ার কথা। কী যে সুন্দর সুন্দর জামা তারা বানায়। সবাইরে পরি পরি লাগে।

কলিইইইইই!

কলি চমকায় উঠে। দৌড়ে যায়, জি বড় সাব!

আজ রাফিরে দুধ দেয়া হয়নি?

কলি চমকে উঠে। সত্যিইইই দেয়া হয় নাই। নতুন জামাগুলার রং আর রূপ

দেইখা কলি রাফির কথা ভুলে গেছে।

কি হলোওও?

আবার ও চমকে যায়। মাথা নিচু করে কয় সাব এক্ষন নিয়া আসতাছি।

কলি চোখের পলকে তবুও গালে আধমন ওজনের থাপ্পড় টের পায়!

সাথে ‘কুত্তার বাচ্চা’… গালি!

আজকাল আর থাপ্পড়ে তেমন ব্যথা পায় না। তবে গালি শুনলেই কইলজা ছিঁড়া যায়। কিন্তু কি করার। তাগো কাছে কুত্তা দামি। মানুষ নামের ‘কুত্তার বাচ্চা’ তো দামি না!

আজ সারা দিন অনেক দৌডাইতে হইবো ওর। কাইল একুশে ফেব্রুয়ারি। সবাই এক রকম জামা পাঞ্জাবি পরবো। তারপর নাকি কই যাইবো ফুল দিতে। অনেক ফুল ও নাকি আনবো রাইতে। দুপুরে আজ বিরিয়ানি রান্না হইবো। রাতে ছাদে গানের আসর হইবো ছোড ম্যাডামের বন্ধুগো নিয়া। সক্কাল থিক্কা কলি ছোড ভাইরে চোখে চোখে খুঁজতাছে। কলি ছোড ভাইর লগে অনেক কথা কয়। অনেক কিছু জানে। অনেক কিছু জিগায়। ছুড ভাই কলিরে অনেক আদর করে। যদিও এতে সবাই কলিরেই থমকায়। থাপ্পড় ও মারে মাঝে মাঝে।

রাফির ফিডার শেষ। রাফি চুক চুক করতে করতে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বো এখন। রাফিরে কলির ভালোই লাগে। যদিও রাফির জন্য কলি বহুত থাপ্পড় খায়। কিন্তু এতে বেচারার কোনো দোষ নাই। এইডা বেচারার ভাগ্য। রাফি মানুষের বাচ্চা না হইয়া ‘কুত্তার বাচ্চা’ হইছিলো। রক্ষা!

এখন ছাদের গাছে পানি দিতে হইবো। কাপড় নিয়া লন্ডিত যাইতে হইবো। ছুড ভাইর লগে আর দেখা হইবো না আজ। লন্ড্রি থিকা আসার আগেই ভাই বের হইয়া যাইবো। ছুড ভাই কেমন মানুষ জানি। তার পোশাক খুব সাধারণ। বাড়ির সবার লগে মিলে না। থাকেও উষ্কখুষ্ক হইয়া। বাড়িত থাকেও না বেশি। অনেক এলোমেলো।

একবার জিজ্ঞেস করতেই কয় আমি এই বাড়ির পালক পোলা। বুজলি কলি। তারপর হা হা হা কইরা হাসি।

আর এই হাসির দামে কলির গালে পরছে থাপ্পড়। বড় ম্যাডামের থাপ্পড়। তবে ভাই সেদিন খুব রাগ হইছিলো ম্যাডামের ওপর। তিন দিন বাড়িত ভাত খায় নাই। কলিও ভয়ে অনেক দিন কথা কয় নাই ভাইয়ের সাথে।

তারপর এক বিকালে ছুড ভাই এক প্যাকেট চকলেট ওর হাতে দিয়া কয়-কলি তুই পড়ালিখা শিখবি আমার কাছে?

বোকারে তোরা কেন অন্যের বাড়িত কাজ করতে আসিস। বিদেশে এই নিয়ম কিন্তু নাই। অইখানে সবাই পড়ালেখা করে তোদের বয়সে।

কলি হাঁ কইরা সেদিন ছুড ভাইয়ের দিকে তাকায় ছিলো। এই মানুষটারে কলির কিছুতেই ডর লাগে না। মার পেটের ভাইয়ের মতো লাগে। আপন আপন। কলি চকলেটের প্যাকেটটা আজো ভাঙে নাই। বাড়িত গেলে বইনগো নিয়া খাইবো। কলির চোখে পানি চলে আসে। ও মনে হয় একটু বড় হইতাছে। এখন কেমন জানি নিজেরে বড় বড় লাগে। আবার কারণ ছাড়াই শরমও লাগে। এই যেমন চোখে পানি আসাতে শরম লাগতাছে এখন।

লন্ডি থিকা আসতে আসতে বিকেল মইরা গেছে। একট বাদেই মাগরিবের আজান দিবো। গেইট দিয়া ঢুকতেই দারোয়ান চাচায় থেক করে উঠছে। যা আজকা। পিঠে তাল পড়বো। কলিও বুজতাছে কাণ্ড একটা হইবো। কিন্তু ও কি করবো। দুপুরে খায়ও নাই। এত্ত লম্বা লাইন লন্ডিতে। এত্তগুলা জামা। গুটিগুটি পায়ে ড্রয়িংরুম পার হতেই বড় সাব হুংকার দিয়া উঠছে, ওই হারামি বাহির হইলে রং বাইড়া যায়?

কই ছিলি এতক্ষণ?

আমার জুতা পালিশ করে রাখতে বলি নাই।

ইড ম্যাডাম যোগ দেয় কান মলা দিয়া।

বাহানার আর কিছু পাও না!

কখন বাহিরে গেছিস ফকিরের বাচ্চা!

আমার বন্ধুরা একটু পর এসে পড়বে। ছাদে চেয়ার পাতবো কে। তোর বাপে?

বড় ম্যাডামের থাপ্পড়ের ভার আর কলি শইতে পারেনি। মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে।

কারণ দুপুরে ও খায়ওনি। উঠতে গিয়ে টের পাচ্ছে শরীরে শক্তি নাই। ঠোঁট কেটে

মুখে নোনা স্বাদ।

গ্রহ জীবন। কলির কেনো জানি কান্না পাচ্ছে না। খুব অবাক লাগছে। বড় লোকদের উপর অবাক না। ওদের মতো গরিবদের উপর অবাক লাগছে।

পরিবদের এত ঘেন্না কম কেন!

এত লজ্জা কম কেন!

এত অভাব কেন!

এত ধৈর্য কেন!

ছাদে গানের ঝলসা বসছে। বাজনার আওয়াজে চারিদিকে ঈদ ঈদ আনন্দ। কলি গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে কেমন বমি বমি লাগছে ওর। দুপুরে খায়নি। রাতেও না। খিদাও লাগছে না। অথচ আজ বিরানি রান্না হইছে। কাল থিক্কা বিরানির লোভে জিবে পানি আসছে। আর আজ বিরানির গন্ধে বমি আসতাছে। লেবু ফুলের ঘ্রাণ আসতাছে। সাথে মায়ের আঁচলের রসুন রসুন গন্ধ। ওর কেমন ঘোর ঘোর লাগতাছে!

ঘোরের ভেতর কলি টের পাইতাছে একটা শীতল হাত ওর কপালে। সিঁথিতে কেউ বিলি কাটে। নরম ছোঁয়ায় কেউ ওরে নিয়ে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা নদী পার হয়। বুকের ভেতর ঝাপটে ধরে রাখা টিনের বাক্স!

নতুন জামার ঘ্রাণ। ফিসফিস শব্দে কেউ ছড়া কাটে। সাত ভাই চম্পার গল্পো!

আর অতিপরিচিত একটা সুন্দর ঘ্রাণ। উষ্কখুন্ধু ঘ্রাণ। এইডা তো ছুড ভাইর ঘ্রাণ! আমরা কই যাই ভাই?

রূপনগর!

কলি তোর ভয় লাগে?

তোর খিদা পাইছে?

মেলায় যাবি কলি?

ভাই আমি একটু ঘুমাই! তোমার কোলে! একটু ঘুমাই!

কলির ঘুম ভাঙে অনেক বেলা করে। চোখ ডলতে ডলতে কলি লাফ দিয়ে ওঠে। তাগো কত কাজ। ও আল্লাহ! আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারি! কত্ত কাজ। কিন্তু চোদ হায় আল্লাহ! রাফিরে ফিডার দিতে হইবো। বড় ম্যাডাম, বড় সাব, ডোড ম্যাডাম খুলে কলি চমকে উঠে ও কোথায়।

টিনের নড়বড়ে দেয়াল, মাকড়সার জাল দিয়ে আল্পনা করা মাথার উপরের ডাস কলি ভালো করে তাকায় দেখে অনেকগুলা চোখ ওর উপরে হুমড়ি খেয়ে আছে। পরিচিত সব চোখ। ফেলে আসা স্মৃতিতে ভিজে থাকা চোখ। কেমন সন্দেহ আর সংশয় নিয়ে চারিপাশ ঘুরে এক জোড়া চোখে আটকে যায় কলি।

: ছুড ভাই আপনি?

: আমি কই ভাই?

: স্বপ্ন দেখি!

: না কলি উঠে বস। আমরা রূপনগরে এখন। রাতে তোকে নিয়ে চলে এসেছি। তোর কিছু মনে নেই?

আর না থাকলেই ভালো। উঠ! কিছু খেয়ে নে। আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমরা শহীদ মিনার বানিয়েছি। তোর বন্ধুরা বোনরা মিলে। আয় ফুল দিতে যেতে হবে আয়। কুড়ানো ফুল। ছুড ভাইয়ের মুখে হাসি, চোখে আলো।

কলি এখনো স্বপ্নঘোরে আছে।

হাঁটতে হাঁটতে কলি জিজ্ঞেস করে ভাই আপনে কেমনে আমারে নিয়ে আসলেন?

কেউ দেখে নাই, আর কেন আনলেন?

এখন যদি বড় সাব আমারে কাজে না নেয়। তারেক (ছুড ভাই) থমকে দাঁড়ায়!

কলি আর তুই কাজে যাবি না। তুই স্কুলে ভর্তি হবি। প্রতি বছর সব বন্ধুকে নিয়ে নদীর পাড়ে শহীদ মিনার বানাতে হবে যে তোদের। জানিস কলি তোদের এই নির্মল নিবেদনটুকু বড়ই প্রয়োজন ভাষাশহীদদের। আমাদের শহরে যে উৎসব তুই দেখেছিস, সেখানের সবটুকু ভান। মানুষের মাঝে মমতা নেই, বিস্ময় নেই, অনুতাপ নেই। তুই বল যে রাজ্য থেকে বিস্ময়, অনুতাপ আর মমতা হারিয়ে যায় সেখানে কোনো জীবত মানুষ বসবাস করতে পারে!

তাই তো তোকে বাঁচিয়ে রাখতে রাতের অন্ধকারেই চলে এলাম। তোদের এখানে অভাব আছে বটে, তবুও সবাই জীবিত! অভাব নিয়ে বাঁচা যায় রে কলি, অনাদর নিয়ে বাঁচা যায় না। আমি প্রতি মাসে তোর বেতনের টাকা পাঠিয়ে দিবো। পারলে বেশিও পাঠাবো। তুই সবাইকে নিয়ে আনন্দে বেঁচে থাক। আমি তোর ভাই হয়ে এইটুকু চাই!

কলি কিছুই বুঝতে পারে না। এত ভারী ভারী কথার মানেও বুঝে না। ও অবাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে ছুড ভাইয়ের দিকে।

ও শুধু এইটুকু বুজতে চেষ্টা করছে। ছুড ভাই কি সত্যিইইই টুকাই পোলা বড় সাবগো। নাইলে বাড়ি ভর্তি শকুনের রাজ্যে এমন একখান সাদা কইতর কোন থিক্কা আইলো।

কলি একটু উঁচু আওয়াজেই খুকু কইয়া কবুতর উচ্চারণ করে। কলির ফুড ভাই মিষ্টি হেসে কলিরে কয়, কলি আজ থেকে তুই স্বাধীন!

খুকু দিয়া আর কিছু ঠিক করতে হবে না।

একুশে ফেব্রুয়ারি মানে কি জানিস?

ভাষা আন্দোলন। ভাষা মানে মনের ভাষা! যে ভাষায় কথা বলে আরাম লাগে। কোনো নিয়মের বালাই নেই। মায়ের মুখের আদল থেকে যে ভাষা শিখে সবাই সেই মায়ের ভাষার জন্যই এই দিন!

: বুজলি কলি! আজ থেকে তোর যা বলতে আরাম, সেটাই তোর ভাষা! বুকের ভেতর আদর, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা থাকলেই হবে। লোক দেখানো উৎসবে আর যাই হোক নিবেদন হয় না!

কলি কতটুকু কী বুঝলো কে জানে! ফিক করে হেসে দিয়ে সবাইরে নিয়ে বলতে থাকলো আজকের দিন স্বাধীনতার দিন!

আজকের দিন কইতর ভাইয়ের দিন!

তারেক নিজেও হাসতে থাকলো।

ও খুব সত্যি করে এটা বিশ্বাস করে, জীবন যেখানে যেমন তেমন করে কাটাতে পারলেই জীবনের সার্থকতা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top