রবি ঠাকুরের দুরন্ত সব মেয়ের চরিত্র আমার মধ্যে ছিল : হাজেরা নজরুল

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রাক্কালে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির মিটিং চলাকালে শান্তিনগরের যে বাড়িটি থেকে গ্রেফতার হন ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন, অলি আহাদ সহ বেশ কয়েকজন ভাষা সৈনিক, শান্তিনগরের সেই ৮২ নম্বর বাড়িটিতে; যার একটি অংশ বর্তমানে ২৫ নং শান্তিনগর। সেখানে ১৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে হাজির হই কবি রফিক লিটন ও আমি (হাসনাইন ইকবাল)-উদ্দেশ্য সেই দিনটির সাক্ষী, সাহিত্যিক, অধ্যাপিকা হাজেরা নজরুলের সাথে বৈঠক আড্ডা।
হাজেরা নজরুল সম্পর্কে ড. মুস্তফা নুর-উল ইসলাম লিখেছেন- হাজেরা নজরুল আমার কাছে বিস্ময়। তিনি এতো বেশি লিখেছেন যা আমার কাছে বিস্ময়ের। অনেক তরুণ বয়সে লেখা শুরু করে আর লেখেন না। কিন্তু হাজেরা নজরুল চার দশক সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। সাহিত্যে সব শাখাতেই তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক সব দু’হাতে লিখে যাচ্ছেন। সমাজ ও জীবন সম্বন্ধে গভীর উপলব্ধি আর মানুষের প্রতি গভীর দরদ না থাকলে সত্যিকারার্থে লেখক হওয়া যায় না। 

-হাসনাইন ইকবাল

শান্তিনগরের এই বাড়িটাই কী আপনাদের নিজেদের বাড়ি?

এটা আমাদের নিজেদের বাড়ি। এই বাড়িটা আব্বা কিনেছেন ৪৮ সালে। আমার বাবা তদানীন্তন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। দেশ বিভাগের পর আব্বার Extention সময়ে আমরা কিছুদিন ময়মনসিংহে ছিলাম। আব্বার রিটায়ারমেন্টের পরে এখানে আমাদের প্রায় চার বিঘা জমি ছিল।

কিন্তু রাস্তার মধ্যে চলে গেছে দেড় বিঘা। আব্বা মৃত্যুর আগে আমাদের ভাই-বোনদেরকে উইল করে দান করে গেছেন। এটা আমাদের ছয় বোনের বাড়ি। আর ভাইদের দিয়ে গেছেন আলাদা আলাদা বাড়ি ও জমি। কিন্তু ভাইরা কেউ নাই। কেউ মারা গেছেন দেশে, কেউ বিদেশে। আমার বড় ভাই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত ডাক্তার ও গবেষক মুত্তালিব মারা গেছেন ১৯৯০ সালে, যিনি বিজয়নগরে চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র ও ডা. মুত্তালিব কমিউনিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। “মায়ের দুধের বিকল্প নাই”-এটা তারই স্লোগান। তার গবেষনা জরিপে প্রমাণিত হয় যে, কৃমি বাংলাদেশের এক নম্বর শত্রু, পুষ্টিহীনতা ও রক্তশূন্যতার মূল কারণ। তাই এর নিরাময় ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রামকে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন তার টিম নিয়ে এবং ঢাকার অদূরে তিনি ‘বাসকি’ নামক এক ভয়ঙ্কর কৃমি আবিষ্কার করেন। তিনি বাংলাদেশে Tropical Medicine & Hygine চিকিৎসার পথিকৃৎ।

আমরা বোনরা সবাই আল্লাহর অপার রহমতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছি। বড়বোন রত্নগর্ভা নুরজাহান খান এ বছর এপ্রিল মাসে ইন্তেকাল করেছেন।

আপনার জন্ম কি এই শান্তিনগরেই?

না। আমার জন্ম রাজবাড়ী। আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে প্রায় সবাই রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেছে। আব্বা ব্রিটিশ ভারতের আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েতে সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। সে জন্যই আমাদের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের একটা বৈচিত্র্যময় জীবন ছিল। দেশ বিভাগের পরে আব্বা Extension Period-এ বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলাতে কিছু সময় কাটিয়েছিলেন ছিলেন। তারপর ঢাকায় বাড়িটা কেনার পর ১৯৪৮-এ আমরা এখানে স্থায়ীভাবে চলে আসি। সেই সময় আমাদের এই শান্তিনগরের বাড়িতে আম, জাম, লিচু, সবেদা, তেঁতুল, আমলকি, গোলাপজাম, জামরুল, কাঁঠাল ও কলা সহ প্রায় দুশো গাছ ছিল। আমার উপক্রমণিকা উপন্যাসে এই বাড়ির তখনকার অবস্থার বর্ণনা আছে। তখন এই শান্তিনগর রোডে কেউ ছিল না। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে বড় রাস্তাটি চলে গেছে; এই যে পীর সাহেবের গলি বলে এটাকে, অথচ পীর সাহেব এখানে এসেছেন অনেক পরে। তাঁর বাড়ি অনেক ভিতরে। আমরা ১৯৪৮-এ এসেছি। আমাদের কত পরে উনি এসেছেন, অথচ এখন দুর্ভাগ্যক্রমে এই গলিটা পীর সাহেবের নামে হয়ে গেছে। অথচ ভিতরে যারা ছিলেন তাদেরকে বড় রাস্তা ব্যবহার করার জন্য আমার বাবা-ই জায়গা দিয়েছেন, রাস্তা দিয়েছেন। যার জন্য আমাদের জায়গাটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে এবং অনেক গাছপালাও কাটা হয়েছে। বাবা এই রাস্তার জন্য কোন টাকা পয়সা নেননি, সবার সুবিধার জন্য জায়গা দান করে গেছেন। দেশের বাড়ি থেকে এসে মা যখন দেখলেন, খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। অথচ এই গলিটা আমাদের, আমরাই জমি দিয়েছি এলাকার লোকের রাস্তার জন্য। গলির দুই পাশেই আমাদের জমি। এই গলির মুখের চারপাশের বাড়িগুলো আমাদের। তাহলে এটা কীভাবে পীর সাহেবের নামে হয়? এটা হওয়া উচিত ছিল আমার আব্বার নামে অথবা আমার বড় ভাই ডাক্তার মুত্তালিবের নামে। যা-ই হোক, এখনও আমাদের প্রত্যাশা ওনাদের নামেও কিছু একটা হউক। তবে এখানে একটা কথা বলা দরকার। এখানে আমি শৈশবে যে স্বাধীনতা নিয়ে বড় হয়েছি, খুব কম মেয়েই এ রকম স্বাধীনতা পায়। আমি খুব ছোট থেকেই ছেলেদের মতোই ছিলাম। নাচ-গান-স্পোর্টস ছিল নারীসুলভ, আবার ছেলেদের মতো দাড়িয়াবান্ধা খেলা, ফুটবল খেলা; এই খেলা সেই খেলা করতাম। আমার ছেলে বেলার বন্ধুরা এখনও আছে। ওরা আমাকে ভয় পেত। আমি খুব ডানপিটে ছিলাম। সাইকেল চালিয়ে এখান থেকে কমলাপুরে জাহাজ বাড়ি নামে একটা বাড়ি ছিল (যারা পুরানো তারা নিশ্চয় চিনবেন); আমি সাইকেল চালিয়ে সেই বাড়িতে চলে যেতাম। হেনা আপা থাকতেন সে বাড়িতে।

বেগম খালেদা জিয়ার বেয়াই এয়ার মার্শাল মাহবুব আলী খান, মো. তোহা, এম আর আখতার, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, সাদেক খান, হোদায়েত হোসেন চৌধুরী, আবদুল লতিফ চৌধুরী প্রমুখ আমার মেজ ভাই আবদুল মালেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। মেজ ভাই ছিলেন খুব বিপ্লবী ও সাহসী মানবিক গুণসম্পন্ন যার মাধ্যমে এখানে একুশের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিলো। একুশের আন্দোলনের সময় ১৯৫২ সালের ৭ই মার্চ শুক্রবার আমাদের বাসা থেকে বেশ কয়েকজন ভাষা সৈনিক গ্রেফতার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন সর্বজনাব গাজীউল হক, অলি আহাদ, ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন প্রমূখ। আমি তখন বিকেলে খেলতে না গিয়ে ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে উনাদের কথোপকথন দরজায় আড়ি পেতে শুনতাম। আমি মনোজ বসুর ‘ভুলি নাই’ এবং ‘কত অজনারে’ পড়ে সেই বয়সেই স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম।

এভাবে আমি অপার স্বাধীনতা নিয়ে বড় হয়েছিলাম। আমার বড় বোনেরা ছিল গুড গার্লস। তারা স্কুলে যেত, আসতো আর ঘরে গৃহ কর্ম করতো। সূচী কর্ম করতো। কিন্তু আমি গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধাসহ নানা রকম খেলাধুলা করতাম। আবার ঘরে এসে ছাদে বসে গল্প লিখতাম, কবিতা লিখতাম। মানে একটা কনট্রাডিকটরি নেচার ছিল আমার।

আমি ঐ বয়সেই কবিতা লিখতাম। আমার বড় মামা প্রফেসর মনসুর উদ্দীন থাকতেন এই গলির মাথায় ‘মনসুর ভবন’-এ। ওনাকে বলা হত Folklore সম্রাট। তিনি ভারতবর্ষে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম M.A পাশ করেন। ওনার বিরাট বইয়ের সংগ্রহ ছিল। ফেরদৌসীর শাহনামা, ওমর খৈয়ামের রচনাবলী থেকে শুরু করে অনেক অনেক দুর্লভ সংগ্রহ ছিল ওনার। ওনার বাসায় গল্প পাঠের আসর বসতো। সেখানে আমি যেতাম। আমি বলতাম, মামা আমি একটা গল্প পড়বো, একটা কবিতা পড়বো। তখন সেখানের আড্ডায় আসতেন কবি আবদুল কাদির। উনি বলতেন এই মেয়ের লেখায় মুনশিয়ানা আছে। আমি তো তখন বাচ্চা মেয়ে। ক্লাস সেভেনে পড়ি। উনি এবং অন্যান্য সাহিত্যিক যারা ওই আসরে আসতেন তারা প্রায় সবাই আমার ভূয়সী প্রশংসা করতেন ও আমাকে উৎসাহ জোগাতেন। এ বাসায় আরও আসতেন কবি জসীমউদ্‌দীন, কবি গোলাম মোস্তফা। জসীমউদ্‌দীন আমাদের বাসায় এলে আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আমার ডাক নাম ছিল আতা। ‘আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ’ এই ছড়াটাকে জসীমউদ্‌দীন একটু পরিবর্তন করে আমাকে বলতেন, ‘আতা গাছে তোতাপাখি পাখায় আঁকা ছড়া, ডালে ডালে ঘুরে ফিরে করে লেখাপড়া’। এটা অনেক বড় একটা কবিতা ছিল, আমি হারিয়ে ফেলেছি। উনি প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। আমার কাছে গান শুনতে চাইতেন।

আমাকে বলতেন, আমার কোন কবিতাটা তুমি জানো? আমি তখন তার একটা কবিতাই জানতাম। রাখাল ছেলে। আমি এই কবিতাটা তাকে পড়ে শোনাতাম। পরে উনি যখন কমলাপুর বাড়ি কিনলেন, তখনও আমি নজরুলকে নিয়ে ওনার বাড়িতে যেতাম। ওনার বাসায় অনেক বড় বড় সাহিত্যিক আসতেন, তিনি তাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিতেন। সে ছিল এক সৌরভময় দিন।

সিদ্ধেশ্বরীতে আমার ভাই ভর্তি করালেন না। দাই বা আয়া বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যেত, সেটা দেখে আমার বড় যা-ই হোক, আমি পড়তাম সেই সময়ের একমাত্র গার্লস স্কুল কামরুন্নেসা সরকারী গার্লস হাই স্কুলে। এখানে তাই বলতেন ‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।’ খুব রসিক ছিলেন আমার বড় ভাই। তখন সিদ্ধেশ্বরী খুব একটা ভালো স্কুল হিসেবে পরিচিত ছিল না। আমরা পড়তাম কামরুন্নেসা স্কুলে। তখনকার সময়ে ঢাকার বেস্ট স্কুল। এখান থেকেই মেয়েরা মেটিকে ভালো রেজাল্ট করতো। এখন যদিও ওটার এত খ্যাতি নাই, কিন্তু তখন যত মন্ত্রী-মিনিস্টারের মেয়ে, ওখানে পড়তো। যা-ই হোক, এভাবে এক দিন বড় হয়ে গেলাম।

আমার স্পোর্টসের নেশা ছিল। তখন আমাদের এই শান্তি নগরে অনেক খোলা জায়গা বা খেলার মাঠ ছিল। আমি পাড়ার সব মেয়েকে জোগাড় করে এখানের বিভিন্ন মাঠে, এমনকি রাজারবাগ পুলিশের মাঠ, এ সব মাসে আমি মেয়েদের নিয়ে স্পোর্টসের আয়োজন করতাম। খালামনিদের বাসা থেকে দুই টাকা চার টাকা চাঁদা তুলে কোনো একজন বিশিষ্ট মহিলাকে দিয়ে সে স্পোর্টসের পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করতাম। আমি ছিলাম আয়োজক। এটা হলো আমার একটা দিক।

এ ছাড়া এ বাড়িতে যত গাছ ছিল সব গাছের চূড়ায় উঠতাম আমি। বাঁদরের মতো গাছে গাছে ঘুরে ফল খেতাম। এ পাড়ার ছোট-বড় প্রায় সবাই এটা জানে। তাদের অনেকে গত হয়েছেন। ভোর বেলায় আমরা বান্ধবীরা মিলে শেফালী ফুল কুড়াতে যেতাম। প্রায়ই দেখতাম হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী রাস্তার মধ্যে এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছেন। উনি শেষ বয়সে ব্রেইনের রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ওনাকে ধরে নিয়ে আমরা তার বাসায় পৌঁছে দিতাম। কবি গোলাম মোস্তফার নাতনী ফরিদা আমার বান্ধবী ছিল। ফরিদার সাথে বসে বসে কবিতা লিখতাম। আবার ওয়াল পেপার বের করতাম। সেই ১৯৫০ সালে আমি আর গোলাম মোস্তফার নাতনী ফরিদা মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। শৈশব থেকে এ রকম অনেক কাজ করতাম। আমি আমাদের পাড়ার মুকুল ফৌজের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। আমার অনেক স্মৃতি হারিয়ে গেছে। এভাবেই আমার বেড়ে ওঠা। গাছ, লতাপাতা, নদী, ফুল, পাখি-এ সব ছিল আমার জীবনের উৎস ও উজ্জিবনী শক্তি। এরা আমার ভালোবাসা, প্রেম। এদের মাঝেই আমি বেড়ে উঠেছি।

আর আমি প্রচুর গান গাইতাম। আমি ছাদে বসে গান গাইতাম। পুরো পাড়ার লোক সেটা শুনতো। আবার কারো বাসায় গেলে বলতো, আসো একটা গান শুনিয়ে যাও। আবার বলতো মা. তুমি একটা নাচ দেখাও তো। সাথে সাথে নেচে দেখিয়ে দিতাম। মানে লজ্জা-শরম খুব কম ছিল আর কী।

আপনার আব্বা কি তখন এখানে থাকতেন?

জি। রিটায়ারমেন্টের পর তিনিও চলে এসেছেন।

তিনিও কি তখন এই শান্তিনগরেই থাকতেন?

জি। আমাদের সাথেই থাকতেন।

কখনো আপনার এই অপার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি?

না না। আমার আব্বা কখনো ছেলে-মেয়েদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি। বরং সন্ধ্যা বেলায় হয়তো আমি গান গাইছি, এমন সময় আব্বা বাসায় ঢুকলেন, তিনি শুনেই বলতেন, এই অবেলায় কে রেডিও ছাড়লো? আমি বনলতাম, আমি রেডিও ছাড়িনি, আমিই গাচ্ছিলাম। তখন তিনি বলতেন, তুই এত সুন্দর গাইতে পারিস? তো এভাবেই তিনি বরং আমাদের উৎসাহ দিতেন। যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন বড় ভাই বললেন, তুই আর নাটক-টাটক করবি না, এখন তুই বড় হয়ে গেছিস। তখন আমরা পাড়ায় নাটক করতাম, আমরাই ছেলে, আমরাই মেষে সেজে।

আপনার আম্মা কেমন মানুষ ছিলেন?

আম্মা অত্যন্ত শান্ত-শিষ্ট মহিলা ছিলেন। খুবই স্নেহবৎসল ছিলেন। এতগুলো বাচ্চাকে উনি সারা দিন খাবার জোগাড় দিতে দিতেই ব্যস্ত। তার মধ্যেই তিনি গুনগুন করে গান গাইতেন। সাহিত্যিক মনসুর উদ্দীন সাহেবের বোন না। উনি আবার সাহিত্য চর্চাও করতেন। মামা পড়িয়েছিলেন বোনকে। আমাদের শাসন করতেন। এতটুকু পর্দা সরে গেলে বকতেন। নাইলন শাড়ি বেরিয়েছে তখন, সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে পরছে। আমাদেরও শখ হয়েছিল এই শাড়ি পরবার। কিন্তু মা বললেন না, এই শাড়ি পরবে না। তিনি আমাদের পরতে দিলেন না। মা আমাদের শাসনের মধ্যে রেখেছিলেন। বলতেন, এভাবে চলো, ওভাবে চলো। তারপর নামাজ। আমাদের বাসার সবাইকে নামাজ পড়তেই হবে। আমরা সব বোন একসাথে নামাজ পড়তাম। আমার বড় বোন তাহমিনা কোরাইশীর মা নুরজাহান বেগম। উনি অত্যন্ত সফল একজন মা। ওনার ছয়টা মেয়েই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। রিটায়ারমেন্টের পর দুলাভাইয়ের আয় কমে গেল, কিন্তু আপা যত্ন করে কষ্ট করে তার ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছেন। তিনি আমার মতই খুব সামাজিক ছিলেন। তিনি তার স্বউদ্যোগে তখন সেলাইকর্ম ও চর্মকর্ম সূচী সরকারিভাবে রেজিস্ট্রিকৃত ‘নীড় বিন্যাস শিল্পকলা একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য আমার বোন নিজের উন্নয়নের জন্য সেলাই জানা সত্ত্বেও সিঙ্গার কোম্পানিতে যোগ দিয়ে উন্নত সেলাই শেখেন। এই প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রী বিনীতা রায়, মহিলা মন্ত্রী রাজিয়া রহমান, কবি সুফিয়া কামাল, নীলিমা ইব্রাহীম প্রমূখ প্রায়ই আসতেন। আমার বোনের তুলনা হয় না। তিনি রত্নগর্ভা হয়েছেন।

মেজো বোন অধ্যাপিকা রাবেয়া হক পুরানা পল্টন গার্লস কলেজে প্রায় চল্লিশ বছর অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেজো বোন সুফিয়া খান বুয়েটের অধ্যাপক ছিলেন। আমি চতুর্থ। পঞ্চম বোন জাহানারা তোফায়েল একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সর্বকনিষ্ঠ দিলরুবা মাহবুব একজন ব্যবসায়ী।

আপনার শৈশবের উল্লেখযোগ্য বান্ধবী-বন্ধু কারা?

জি, আমার প্রচুর বন্ধু। কতজনের কথা বলবো? জুবাইদা গুলশান আরাও আমার বন্ধু ছিল। কিন্তু একটু বড় বয়সে। ছোট বেলায় বান্ধবী ছিল আসমা আব্বাসী, কবি গোলাম মোস্তফার নাতনী ফরিদা, মঞ্জু। বুলবুল আহমেদের বোনও আমার বান্ধবী ছিল। ডাক্তার তালুকদারের স্ত্রী হাসি।

মঞ্জু বলতে ফাহমিদা মজিদ মঞ্জু?

চেনো তুমি তাকে?

জি। মোস্তফা মনোয়ারের ভাগ্নী, এখন তো মনে হয় তিনি আমেরিকায় থাকেন।

হবে হয়তো।

জুবাইদা গুলশান আরা তো কিছু দিন আগে মারা গেলেন…

হ্যাঁ। কিছু দিন আগেই মারা গেলেন। তিনি ছিলেন আমার কলেজ লাইফের বান্ধবী। তিনি আমার উপরে লিখেছেনও।

শৈশবের বন্ধুরা ছিল লেজে-গোবরে মাখা। আমি ছিলাম সায়েন্সের দিকে। শখ ছিল ডাক্তার হবো। আইএসসি পাশ করলাম। তারপর মেডিক্যাল ল্যাবে মরা কাটার দৃশ্য দেখে চলে আসলাম। আমি মরা কাটতে পারবো না। ডাক্তারি আর পড়া হলো না। তারপর বিএসসিতে পাশ করে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। আমি বিএসসি পরীক্ষার রেজাল্টে ৫০ টাকা মাসিক স্কলারশিপ পেতাম এবং এককালীন ৭০০ টাকা পেয়েছি।

কোন কলেজে?

ইডেনে। তখনকার সবচেয়ে বড় কলেজ ইডেন গালর্স কলেজ। এখন যেটা বদরুন্নেসা। এখনকার যে ইডেন কলেজ আছে এটা স্থাপিত হয়েছে ৬২. সালে।

এই বদরুন্নেসা কলেজের এমপি বদরুন্নেসা আমার পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির আমি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। বদরুন্নেসা ছিলেন প্রেসিডেন্ট। সমিতির সবাই প্লান করে এক দিন আমার বাসায় এসে আমাকে অনুরোধ করলো যে, বদরুন্নেসা পলিটিক্যাল ফিগার: ওনাকে আমরা রাখবো না। আমরা আপনাকে প্রেসিডেন্ট করবো। আমি তখন বললাম, উনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আমি তার সাথে এ ধরনের প্রবঞ্চনা করতে পারবো না। আপনারা আমাকে এ প্রস্তাব করবেন না। আমি বদরুন্নেসা আপাকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট হবো না। স্ট্রেট বলে দিয়েছি, এ সব চৌর্যবৃত্তি আমার দ্বারা হবে না। এবং যারা যারা বলেছিলো তাদের মধ্য থেকে এক ভদ্রলোক এখনও বেঁচে আছেন। আছে হয়তো আরো অনেকে: একজনের সাথেই এখন শুধুমাত্র সম্পর্ক রয়েছে। প্রায়ই যোগাযোগ হয়।

লেখালেখিতে কীভাবে এলেন?

অঙ্ক খাতার কিনারে কিনারে কবিতা লিখে রাখতাম। হয়তো কোনো একটা বিষয়ে নোট করছি, কিংবা অঙ্ক করছি অথবা অন্য কিছু করছি এমন সময় মাথায় কবিতা এলো। আমি সে সব খাতার কিনারে কিনারে লিখে রাখতাম। আমার বড় ভাই তখন আমাদের পাহারা দিতেন। হঠাৎ এক দিন তিনি হঠাৎ ডাক দিলেন, এই তুই কী করছিস? আমি বললাম ভাই, আমি অঙ্ক করছি। তখন তিনি বললেন, এত মনোযোগ দিয়ে কী অঙ্ক করছিস? বলে তিনি এসে আমার পেছনে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়েই বললেন, ওগুলো কী? দেখি।

আমার বয়স তখন অনেক কম। আমি ভাইকে বললাম ভাই, আমি কবিতা লিখছি। ভাই বললেন, কবিতা? কই দেখি। বলেই খাতা টেনে নিয়ে তিনি পড়লেন। পড়ে বললেন, ভালোই তো লিখেছিস। নে, এই দুই আনা দিলাম, আজাদে পাঠিয়ে দে। সেই দুই আনা থেকে ছয় পয়সা দিয়ে একটা খাম কিনলাম আর দুই পয়সার মুড়লি ভাজা খেলাম। তারপর লেখাটা পাঠিয়ে দিলাম। আজাদের পরবর্তী সংখ্যাতেই ওটা ছাপা হয়ে গেল। তখন লিখেছিলাম হাজেরা খাতুন আতা নামে। ঐ ছাপা হওয়া লেখাটা দিনের মধ্যে যে কতবার দেখতাম, তার আর শেষ নাই। প্রথম লেখার আনন্দই আলাদা।

লেখালেখিতে কাদের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন?

সত্যি কথা বলতে কী, অনুপ্রেরণা অনেক পেয়েছি, আবার বাধাও পেয়েছি। কারণ বুঝতেই পারছো…।

কামরুন্নেসা স্কুলে আসমা আমার বন্ধু ছিল-আসমা আব্বাসী। যখন এইটে পড়তাম, তখন সবাই আমাকে হাজু ডাকতো। আসমা প্রতি দিন বলতো, এই হাজু, আজকে তুই কী গল্প লিখেছিস দেখি তো।

আমার লেখা ছাপা হওয়ার পরে, আমি ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখাতাম। বড় মামাকে দেখালাম, বড় মামা বললেন লিখো লিখো। এর বেশি কিছু না। কবি গোলাম মোস্তফাও খুব আদর করতেন। আমাকে নাতনী ডাকতেন। তার নাতনীর বান্ধবী তো, তাই।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন আমাদের পাশের গলিতে থাকতেন। প্রায়ই ওই বাড়িতে যাওয়া হতো। তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। মিসেস জাহানারা আবেদীনের সাথে খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো এবং এখনও আছে। আমি আব্বা-আম্মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পত্রিকায় নিয়মিত লেখা পাঠাতে থাকতাম। মেট্রিক পাশের পর আমি বিশ টাকা করে স্কলারশিপ পেতাম। সেই স্কলারশিপের টাকা ছয় মাসে একসাথে একশো বিশ টাকা পেতাম। সেটা মায়ের হাতে তুলে দিতাম। মা ওখান থেকে এক টাকা দু টাকা যা দিতেন, তা দিয়েই খাম জোগাড় করতাম। ইত্তেফাক, ইত্তেহাদ, আজাদ-তখনকার এমন কোনো পত্রিকা নাই যেটায় আমি লেখি নাই। করাচি হতে প্রকাশিত ‘দিগন্ত’ পত্রিকায় লিখতাম। ‘দিগন্ত’ পত্রিকায় আমার প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছে। সে পত্রিকা এখন আছে কি না জানি না। খন্দকার নূরুল আলম ছিলেন ওই পত্রিকার সম্পাদক।

লেখা সব সময় বাই পোস্টেই পাঠাতেন? কখনো পত্রিকার অফিসে যাওয়া লাগেনি?

না। তবে বিয়ের পরে গিয়েছি। আমার বিয়ের পরে আমার স্বামী প্রকৌশলী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম আমাকে চরম উৎস্নহ দিয়েছেন এটা আমাকে বলতেই হবে। আমার বিয়ে হলো ৬১’র ডিসেম্বরে। তারপর থেকে আমার স্বামী আমার লেখা নিয়ে যেতেন পত্রিকার অফিসে। ছাপানোর ব্যবস্থা করতেন। আবার ছাপা হবার পর নিজে বাসায় পাবলিশড কপি নিয়ে আসতেন। হয়তো রাতের বেলায় আমি বললাম চন্দন, আমি এখন একটা কবিতা লিখবো। তাড়াতাড়ি করে সে আমার সামনে কাগজ-কলম নিয়ে আসতেন, যাতে আমি ভুলে না যাই বা কবিতাটা মাথা থেকে হারিয়ে না যায়। তারপর থেকে তিনি কাগজ-কলম হাতের কাছে এনে রাখতেন সব সময়। বলতেন, আর খোঁজা লাগবে না। তোমার হাতের কাছেই আছে। বিছানার পাশেই রেখে দিতেন তিনি, যাতে কখনো কোন মুড হারিয়ে না ফেলি। ধরো একটা প্লট আসছে, প্লটটা ধরে রাখার জন্য স্কেচ করে রাখতাম আমি। আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন উনি। তারপর ৬৪-তে গাড়ির ড্রাইভিং শিখলাম। তারপর থেকে নিজেই ড্রাইভ করে সদরঘাট ‘চিত্রালী’ অফিসে যেতাম। চিত্রালীতে আমার প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছে। প্রথম দিকে আমার স্বামী আমাকে নিয়ে যেতেন, পরে কে আমাকে ধরে? ঢাকার শহর তখন আমি ভেজে খাই। এখান থেকে জয়দেবপুর চলে যেতাম। আমার স্বামীকে না জানিয়ে সেখানে জমি কিনলাম। বাড্ডায় জায়গা কিনেছি তাকে না জানিয়ে। আমার প্রতি তার প্রেম-ভালোবাসা ছিল অসীম। বেলিফুল না নিয়ে এক দিনও আসতো না। আমার স্বামী বাবা-মা-ভাই-বোন ছাড়া কিছু বুঝতো না। আমাকে একটা শাড়িও কিনে দিতো না। বলতো দেখো, তোমার জন্য শাড়ি কিনতে গেলে ছ’টা শাড়ি কিনতে হবে। এত শাড়ি কেনা আমার দ্বারা সম্ভব না। মানে ভাবী, মা, বোন সহ সবার জন্যই কেনা লাগতো। তো আমিও বলতাম-ঠিক আছে, তোমার কিনতে হবে না। আমি যে বেতন পেতাম সেটা কিন্তু সে নিতো না। আমার বেতনের টাকা দিয়ে আমি ইচ্ছেমতো শাড়ি-গয়না-জমি কিনতাম। সে কোনদিন বাধা দিতো না।

আপনার বিয়েটা কি পারিবারিকভাবে হয়েছিল?

আমার ফ্যামিলি অ্যারেঞ্জড বিয়ে ছিল ঠিক, কিন্তু এত প্রেমের বিয়ে হয়তো আমার প্রেম করেও হতো না। আগে আমার আরো কয়েকটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। আমি তখন বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। নজরুল ছিল আমার কপালে, অন্য মানুষ আসবে কী করে। নজরুল এলো আমাকে দেখতে। তখন সবাই বোধহয় ভয়ে ছিল যে, আমাকে পছন্দ করে কি না? কিন্তু ও দেখেই পছন্দ করে ফেললো।

ওর দেখতে আসার গল্পটা বলি। এক দিন আব্বার বিছানা ঝাড়তে গিয়ে চিঠি পেলাম। আমার চাচাদের চিঠি। আমাকে দেখতে আসার খবর থাকতো ঐ সব চিঠিতে। কোনোটাতে হয়তো লিখতো একজন প্রফেসর যাবে দেখতে। আর কোনোটাতে থাকতো ইঞ্জিনিয়ার। চাচা লিখলেন, প্রফেসর ছেলেটি ওকে প্রফেসর মনসুর উদ্দীনের বাসায় দেখে পছন্দ করেছে। সে এখন আংটি নিয়ে যাবে। প্রফেসর আমার পছন্দ না। আমি ইঞ্জিনিয়ার পছন্দ করি। যাই হোক, আমার আব্বাকে চাচা লিখলেন- আপনি গিয়ে দেখে আসেন ছেলেটাকে। নারীশিক্ষা মন্দিরের পাশের বাড়িটিই। আব্বা বললেন, আমার মেয়ে আমার কাছেই আছে। আমি আবার ছেলে খুঁজতে যাবো কেন? ছেলেই আসবে আমার কাছে। যার আসার সে আসবে। তারপর এক দিন সকাল বেলা আমার শ্বশুর আসলেন। আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছিলাম। এমএসসিতে পড়ি। যাওয়ার সময় আব্বা বললেন মা, তুমি দাঁড়াও। এই যে আমার বন্ধু, পরিচিত হও। ওনাকে সালাম করো। কদমবুচি করো। তখন আমি সালাম করে চলে গেলাম। আমার হাতে তখন সময় ছিল না। ইউনিভার্সিটির সময় হয়ে গিয়েছিল।

চারটার সময় আমার ছোট বোন দিলরুবা ভার্সিটিতে গিয়ে হাজির। ও বললো, তুমি তাড়াতাড়ি চলো। আমি আব্বার সাথে দুলাভাইয়ের বাসায় গেছিলাম। দুলাভাই যে কত সুন্দর। তুমি দেখলে পাগল হয়ে যাবে। আর তার বাসা ভরা রেডিও। তুমি তো রেডিওতে গান শুনতে পছন্দ করো। তখন আমি ওকে বললাম, তুই যা। আমি আসছি।

আমি তখন চিন্তিত হয়ে পড়লাম। ওরা দেখতে এসে যদি আমাকে পছন্দ না করে। যদি আমি রিফিউজড হই তাহলে আমার লাশ ঝুলবে। আমি কিছুতেই রিফিউজড হবো না। আমি ভাবতাম, আমাকে যে বিয়ে করবে সে পঙ্খীরাজে চড়ে এসে আমাকে তার পাশে বসিয়ে নিয়ে চলে যাবে। এটা ছিল আমার ছোট বেলার ভাবনা। আমি সব সময়ই ছিলাম কল্পনাপ্রবণ।

যাই হোক, তিনি এলেন। তিনি আমাকে দেখলেন। শশুড়বাড়ির অন্য সবাই দেখলেন। এরই মধ্যে সেই আগে যার কথা বলেছিলাম সেই প্রফেসরও তখন এসে হাজির। একই ড্রইং রুমে দুই ছেলে পাশাপাশি। পরে শুনেছি, নজরুল ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আপনি এখানে কী জন্য এসেছেন? উনি বললেন, মেয়ে দেখতে এসেছি। নজরুল তো বুঝে ফেলেছে। আমার বড় ভাবী ছিলেন সিলেটের কমলালেবুর মতো চেহায়া। আর বড় ভাবীর বোনটা আপেলের মতো। তো তারা দুইজন দুই পাশে বসলেন। মধ্যখানে আমি গোশতের টুকরা, স্যান্ডউইচ। মানে স্যান্ডউইচের দুই পাশের দুইটা সাদা রুটির মধ্যখানে আমি এক টুকরো কালো গোশতের মতো বসলাম। যাই হোক, আমাকে নজরুলের পছন্দ হয়ে গেল। যাওয়ার সময় গেটে আব্বাকে বলে গেল, আমাদের পছন্দ হয়ে গেছে। আপনারা ডেট ফেলতে পারেন আতাম। কতক্ষণ পরে আব্বা এসে বললেন-দেখ, দেশ থেকে প্রফেসর ছেলেটা আংটি নিয়ে এসেছে। পারেন। শুনে আমি খুব খুশি হলাম। ভাবলাম যদি আমাকে রিফিউজ করতো তাহলে হয়তো কিছু একটা অঘটন তুই বিয়ে না করলি, কিন্তু একটু দেখা দে। ইতোমধ্যে ভাবী গিয়ে প্রফেসর সাহেবকে বললেন, ওর তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আপনি কি ওর ছোট বোনটাকে বিয়ে করবেন? ও কিন্তু পরীর মতো সুন্দর। প্রফেসর সাহেব বললেন, না না। আমি তো আতাকে দেখতে এসেছি।

আজও আমি মাঝে মাঝে ভাবি লোকটাকে রিফিউজ করেছি বলেই কি দশ বছরের মাথায় নজরুল চলে গেলো! আমি তো… এটাতো আমার মনে আসবেই। যাই হোক, তারা চলে যাবার পর দিনই ভোর বেলায় সানাই বেজে উঠলো। আমার শাশুড়ী এলেন, ননদ এলেন। দফায় দফায় তারা আসতে লাগলো। আর তারা আমার বাড়ির খাওয়া দেখে, মানে দুই-তিনটা কাজের লোক খাবার পরিবেশন করছে শুধু ডিম, পরোটা, আলুর দম, মুগের ডাল ভুনা… মানে আমাদের বাসায় খাবার-দাবার খুব বিখ্যাত। যখন দিচ্ছে, তারা খেয়ে তৃপ্ত হতো। আর আমাদের গরু ছিল তিনটা। তিনটা গরুতে এক কড়াই দুধ হতো। সেই কড়াই থেকে ভরে ভরে বড় বড় গ্লাসে করে দুধ দেয়া হচ্ছে। তো ওরা খাবার-দাবারের এ রকম ব্যবস্থা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে। তারপর বিয়ে হয়ে গেল। আর আমি তার কাছে চলে গেলাম। যাবার সময় যখন গাড়িতে বসে কাঁদছিলাম, সে আমার পিঠে হাত দিয়ে বসে ছিল। আমি এটা কোনো দিন ভুলবো না। আমাকে কোনো দিন ডিস্টার্ব করেনি। একটা পুরুষ একটা নারীকে পেলে প্রথম রাতেই তাকে ব্যবহার করে। আমাদের বাসরের একটা রাত কেটে গেল। চারদিক থেকে নানাজন উকিঝুকি মারছে। সে বসে বসে আমার সাথে শুধু গল্পই করছে। তার জীবনের পরিশ্রমের কথা বলছে, সংগ্রামের কথা বলছে। প্রবল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সে এগারোজন ভাই-বোনের সংসারকে দাঁড় করিয়েছে। সে সব সংগ্রামের কথা শুনতে শুনতে ভোর হয়ে গেল। আমার জায়েরা এসে বললেন- ওঠেন ওঠেন, ভোর হয়ে গেছে। নানা রকম তামাশা করছে তারা। তখন সে বললো, আমরা গল্পই করেছি শুধু। আর কিছু করিনি।

ওনাদের বাড়ি ছিল শরীয়তপুরের নড়িয়াতে? নড়িয়ার শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছিলেন কখনো?

হ্যাঁ। গিয়েছি। লঞ্চে চড়ে গিয়েছিলাম। একবার এ দিক যাই, আবার ও দিক যাই। লঞ্চ এ দিকে কাত হলে আমি উল্টো দিকে দৌড় দিই, আবার ও দিকে কাত হলে আমি এ দিকে দৌড়ে আসি। কী সব কেলেঙ্কারী। তারপর সবাই বললো, আপনি বসে থাকেন না, লঞ্চ ডুববে না। গ্রামের বাড়িতে যাবার সময় শাশুড়ী আমাকে বোরখা পরিয়ে নিয়েছিলেন।

আপনার শাশুড়ী তো বেঁচে ছিলেন তখনও?

শাশুড়ীর মতো শাশুড়ী ছিলেন আমার। অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। আমার শ্বশুরও ছিলেন অসাধারণ। কিন্তু আমার ভাশুর ছিলো জঘন্য। সে নজরুল মরে যাবার পর আমার সব সম্পত্তি নিয়ে গেছে। স্বাধীনের পরে আমি দীনহীন ফকির হয়ে গেছি। শ্বশুর বাড়ি থেকে আমাকে কিছুই দেয়নি। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে (আমরা যেটিতে বসে সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম সেটি দেখিয়ে) এই সোফাটি কিনেছিলাম। বর্তমানে আমার ছেলে আমাকে দামী দামী ফোমের সোফা দিতে চেয়েছে। আমি সে সব নিইনি। আমি আমার জয়দেবপুরের জমি থেকে গাছ কেটে সেই গাছের কাঠ দিয়ে ফার্নিচার বানিয়েছি। স্মৃতি একটা ব্যাপার। আরেকটা ব্যাপার হলো, অপচয় করবো কেন? এটাতেই তো আমার বাকি জীবন কেটে যাবে। আমি আজ মরে গেলে কাল ছেলেপেলেরা এগুলো ফেলে দেবে। ফেলে দিলে দিক, কিন্তু আমি এর মধ্যেই আমার জীবনটা কাটিয়ে যেতে চাই। এই আর কী।

আমার স্বামী ছিল আমার মনের মতো। নজরুলের উপর আমার একটা বই আছে, ওটা পড়লে তার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবা। ওটার মধ্যে অনেক স্মৃতি আছে। আমার স্বামীর মতো আর স্বামী হয় না। সে আমাকে বিয়ের রাতে বললো তোমাকে আমি পরশু দিন কক্সবাজার নিয়ে যাবো। বিয়ের তিন দিনের মাথায় প্লেনে উঠলাম। জীবনের প্রথম প্লেনে চড়া। কক্সবাজারে আমি প্রথম সমুদ্রের গর্জন শুনলাম। ‘স্প্রেড নাইট’ আমি রোজ শুনতাম। তখনও আমি সমুদ্র দেখিনি। সন্ধ্যার সময় আমাকে সমুদ্রে নিয়ে গেল। সেই জলধি দেখে আমি তাকিয়ে আছি। সমুদ্র এত বিশাল। ছুয়েও তো তাকে ধরা যাবে না। নজরুল আমাকে বললো, তুমি আমাকে একটা গান শোনাও। তুমি গল্প লেখো শুনে আমি ‘বেগম’ হাতিয়ে একটা গল্পও পাইনি।

আমি বললাম, আমি তো বেগমের লেখিকা না। আমি ‘মাহে নও’-এর লেখিকা। ‘সচিত্র বাংলাদেশে’ও আমার লেখা ছাপা হতো। আমি খুব স্টান্ডার্ড লেখিকা ছিলাম। সাহিত্যিক মহিউদ্দীন সাহেব আমাকে খুব অনার করতেন। পরে দেশ স্বাধীনের পরে আমার একটা উপন্যাস ছাপা হয়েছে বেগম-এ। ঐ উপন্যাসটা ছিল নজরুলের উপর বেইজ করে।

তো যাই হোক, ও যখন আমাকে গান শোনাতে বললো, তখন আমি ভাবলাম কী গান শোনাবো? তারপর সমুদ্রের উপর একটা গান আমার মনে আসলো। এখন মনে হচ্ছে ঐ গানটা গাওয়া উচিত হয়নি। ‘যদি ডাকো ওপার হতে, এই আমি আর ফিরবো না’- এই গানটাই গেয়েছিলাম। এইটার পরে ও বললো আরেকটা গাও। তারপর আমি ওগো মোর গীতিময়… গানটা গাইলাম।

জসীমউদ্‌দীনের কথা বলেছিলেন, জসীমউদ্‌দীন আপনাদের বাসায় প্রায়ই আসতেন। তাকে নিয়ে কোনো স্মৃতি আছে?

হ্যাঁ। কবি জসীমউদ্দীন রেগুলার আমাদের বাসায় আসতেন। জসীমউদ্‌দীনের বাসায়ও যেতাম আমি। ইন্ডিয়া থেকে তার বাসায় মনোজ বসু সহ আরো অনেকে আসতেন। তাদের সাথেও আমি পরিচিত হতাম। মনোজ বসু একবার আমাকে তার লেখা একটি বই উপহার দিয়েছিলেন।

জয়নুল আবেদিন থাকতেন ঐ কোনার একটা বাসায়। তার সাথেও মোটামুটি ভালো সম্পর্ক ছিল। মোট কথা বাংলাদেশের ঢাউস ঢাউস লেখকরা আমার পরিচিত ছিলেন। সৈয়দ আলী আহসান তো আমার ভূয়সী প্রসংশা করতেন। ড. আনিসুজ্জামান, রাবেয়া খাতুন, ড. মনিরুজ্জামান, নাজমুল করীম, শহীদ আখন্দও থাকতেন।

গোলাম মোস্তফাকে কেমন দেখেছিলেন?

উনি তো আসলে আমার নানা, মানে আমার বান্ধবী ফরিদার নানা। উনি পিয়ানো বাজিয়ে গান গাইতেন। আমি তখন তার সাথে গান গাইতাম। সকালে রাস্তায় হাঁটতাম। হাবীবুল্লাহ্ বাহার চৌধুরী তো মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। আমরা মাঝে মাঝে হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরীকে বাসায় পৌঁছে দিতাম।

আমি খুব দুরন্ত ছিলাম। সাইক্লিং করতাম। ঐ যে মাঠু ভাই, খালেদা জিয়ার বেয়াই। তার সাইকেল ছিল। উনি সাইকেল রেখে ভেতরে গিয়ে মেঝো ভাইয়ের সাথে গল্প করছেন, ফিরে এসে দেখেন আর সাইকেল নাই। কী হলো কী হলো? পরে জানতেন যে, আতা নিয়ে গেছে। আমি হয়তো তখন চলে গেছি কমলাপুরে। পরে আসলে বলতেন, এই দুষ্টু মেয়ে। উনি পরে যখন মন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন আমাদের বাসায় এসেছিলেন। আমার ভাই ডাক্তার মোত্তালিব, মালেক এদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল। আমাদের এমন কোনো বন্ধু ছিল না যারা আমার মায়ের বিশ পদের রান্না খায়নি।

এক দিন মাঠ ভাইয়ের আমন্ত্রণে আমরা তিন বোন আর বড় ভাই গিয়েছিলাম। তখন তিনি মন্ত্রী। তো সে দিন আমাকে দেখে বললেন এই, তুমি কি এখনও সাইকেল চালাও? আমি বললাম না, আমি এখন গাড়ি চালাই। তখন হেসে বললেন, তাই না কি। তো আমাকে নিয়ে এক দিন চালিও তো…। আমি চল্লিশ বছর ধরে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালিয়েছি। সেই পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে কত জায়গায় গিয়েছি। জয়দেবপুর তো রেগুলার গিয়েছি। একটাই তো জীবন। এই যে একা জীবনে এই রকম স্বাধীনভাবে চলেছি… শান্তিনগর বলো, কমলাপুর বলো, তারপর গুলশান, বনানী, কাকলী বলো, পুরান ঢাকা, সদরঘাট; এ সব তো ঘেঁটে খেয়েছি। বনানী বাসা ছিল তো। কিন্তু কখনও কোনো যুবক আমার সাথে খারাপ আচরণ করার সাহস পায়নি। না বার্ধক্যে, না যৌবনে; এমনকি শৈশবে-কৈশোরেও না। কৈশোরে তো ছেলেরা আমাকে ভয় পেতো। পাড়ার যেসব ছেলে বয়সে আমার বড় ছিল ভারাও আমাকে সম্মান করে চলতো।

হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পর্কে আর কিছু বলবেন?

ওনার স্ত্রী ছিলেন আমাদের স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। কামরুন্নেসা গভঃ গার্লস স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। সেই রকম দাপুটে, দুর্দান্ত প্রতাপশালী, ব্যক্তিত্বময় ও সম্ভ্রান্ত নারী। বিশাল শরীর। ওনার রুমের কাছে কারো যাওয়ার সাহদ ছিল না। কী অসীম ব্যাক্তিত্ব ছিল তার। একটা কথা মেনশন করি, এটা আমার ইন্টারভিউতে থাকা দরকার। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম, তখনও আমি ফ্রক পরতাম। আমি খুব অল্প বয়সে পড়াশোনা করেছিলাম। আগেই তোমাদেরকে বলেছি। ডা. বদরুদ্দোজার দুই বোন পড়তো আমাদের সাথে।

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা?

হ্যাঁ। পরে যিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। উনি তো আমাদের বাসায় আসতেন বড় ভাইর কাছে, ডাক্তার তো।। বড় মামার বাসায় প্রায়ই আসতেন। বদরুদ্দোজার সাথে আমার গাদা গাদা ছবি আছে। ওনার ছোট বোন ফাতেমা আর মনি আমাদের সাথে পড়তো। এক দিন বসে আছি। হঠাৎ হেড মিস্ট্রেস প্রবেশ করলেন। আনোয়ারা বাহার চৌধুরী। সাথে এক মেম সাহেব। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। ‘ওকে গুড। সিট ডাউন সিট ডাউন।’ বসিয়ে দিলেন আমাদের। তারপর মেম সাহেব প্রিন্সিপালকে কী যেন বললেন ইংরেজিতে। তখন তো আর এত ইংরেজি বুঝতাম না, তাই আমরা বুঝিনি কী বলেছে। তারপর প্রিন্সিপাল আমাকে, বদরুদ্দোজার দুই বোন আর অন্য একটা মেয়ে-মোট চারজনকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। মেম সাহেব সবাইকে বসিয়ে আমাকে বললেন ইংরেজি বই পড়তে। অর্থাৎ তিনি বিশ্বাস করেননি যে আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। কণিকার ঘটনাটা যেমন একটা স্মৃতি, আমার জীবনে এটাও একটা স্মৃতি। আগেই বলেছি, ক্লাসে সবাই আমার বড়। পেছন থেকে মেয়েরা বললো-হাজু হাজু, প্রথম গল্পটা পড়। প্রথম গল্পটা পড়। আমার প্রতি ওদের মায়া আছে, মানে আমি দ্বিতীয়টা পড়তে গিয়ে যদি আটকে যাই, এ জন্য ওরা আমাকে প্রথমটা পড়ার জন্য বলছে। আমি পড়ার পর মেম সাহেব আমাকে বসতে বললেন। আমি ভাবলাম, আমি কী অপরাধ করলাম, আমাকে পড়তে বললেন কেন? আমি তো বুঝি নাই যে, বয়সটা আমার দোষ হয়ে গেছে।

যাই হোক, দয়াময় আল্লাহ তায়ালা আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছেন। হাবীবুল্লাহ্ বাহারের মেয়ে সেলিনা বাহার চৌধুরী আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আমাদের থেকে দুই ক্লাস সিনিয়র ছিলেন। আমাকে যখন তখন ডাকতেন। মাঠু ভাইয়ের স্ত্রী অর্থাৎ খালেদা জিয়ার বেয়াইনের নাম ছিল গুলু আপা। তাদের বিয়ের আগের কথা। মাঠ ভাই আমাকে চিঠি দিতেন, বলতেন এটা নিয়ে গুলুকে দিয়ে এসো। আমি তো আর এত কিছু বুঝতাম না। উনি আমাকে সাইকেল দিতেন। কী দিলো এটা দেখার দরকার নাই, আমি যে সাইকেল পেয়েছি এটাই বেশি। এই খুশিতে আমি সাইকেল নিয়ে উড়ে যেতাম গুলু আপাদের বাসায়। আমাকে তো আর কেউ সাইকেল কিনে দেবে না।

সেভেনটি টু। বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী কণিকাকে সম্বর্ধনা দেয়া হচ্ছিল। গানের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। রবীন্দ্র সংগীতের। ফাহমিদা থেকে শুরু করে সবাই গান করছে। আমি তো বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। একজন আমাকে বললেন, আপা আপনি তো যেখানে সেখানে যত্রতত্র বনেবাদাড়ে গান গেয়ে বেড়ান। রবীন্দ্র সংগীত আপনার প্রিয়, একটা গান শুনিয়ে দেন না। আমি বললাম, আমি তো বাজাতে পারি না। ‘আপনি বাজায়েন না। তবলচি তবলা বাজাবে শুধু।’ এই ঘটনার কিছু দিন আগেই আমি আমার হাজব্যান্ডেজর কবরটা দেখে এসেছিলাম। তো সেই কবরের সাথে সম্পৃক্ত একটা গান ধরলাম।

কবর তো ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে?

হ্যাঁ। বি বাড়িয়াতে।

তুমি আমার ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে তুমি আমায়

তখন ছিলেম বহুদূরে কিসের অন্বেষণে

তুমি আমায় ডেকেছিলে

আমি নজরুলকে সামনে রেখে গাই। আমি সব সময় নজরুলকে সামনে মনে করে গান গাই। টিভিতে আমাকে ধরলো, হাজেরা একটা গান শোনান। হাজেরা একটা গান শোনান। বদরুন্নেসা আবদুল্লাহ। আমার খুব প্রিয় ফ্রেন্ড। এক দিন সে আমাকে ধরলো যে, আজকে একটা গান শোনাও, আজ আর তোমাকে ছাড়বো না। টিভিতে একটা গান শোনাতেই হবে। প্রস্তুতির জন্য একজন আর্টিস্টকে তো একটু সময় দিতে হয়। তা না, আমাকে সোজা বসিয়ে দেয়া হলো। তখন গাইলাম-

এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর হে। ধন্য হলো অঙ্গ মম, পূর্ণ হলো অন্তর… সুন্দর হে সুন্দর আলোকে মোর চক্ষু দুটি মুগ্ধ হয়ে উঠলো ফুটি হৃদ গননে পবন হলো সৌরভেতে মন্তর।

এই তোমারই পরশখানি চিত্তে রইল সঞ্চিত। এই তোমারই মিলনও সুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।

তোমার মাঝে এমনি করে নবীন করে লওগো মোরে এই জনমে ঘটালে মোর জন্ম জন্মান্তর।

বললাম যে, এই জনমে তুমি আমার জন্মজন্মান্তর ঘটাইয়া দিলা। হিন্দুরা বলে না, আমি এক জনমে আমার আরেক জনম পেয়ে গেলাম। সেই গানের মুহূর্তেও নজরুলের চেহারা আমার সামনে ছিল।

কবি মাহফুজ সিদ্দিকী আমাকে ফোন করে উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন। মাহফুজ সিদ্দিকী চিত্রালি পত্রিকার জন্য একবার আমার লন্ডন ভিত্তিক উপন্যাস ‘বরফের ফুল’ নিয়ে ছেপেছিলেন। তিনি সেটা ছেপেছিলেন, কিন্তু পৃষ্ঠা সংকুলানের জন্য মাঝে মাঝে ফেলে দিয়ে ছেপেছিলেন। ওইদিন তিনি এ জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন আমার কাছে।

গানের ব্যাপারে যেহেতু কথা উঠলোই, আপনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এক সেমিনারে বলেছিলেন যে, শিল্পকলার এক অনুষ্ঠানে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় আপনার প্রসংশা করেছিলেন। আবার দেশের বাইরে আপানাকে নাইটিঙ্গেল উপাধি দেয়া হয়েছিল। তো নাইটিঙ্গেল উপাধির গল্পটা শুনবো।

‘সায়েন্স ইন এডুকেশন’ কোর্স করার জন্য আমরা লন্ডন গিয়েছিলাম। সেখানে একবার আমাদের একটা গ্যাদারিং হলো। তো সেই গ্যাদারিং-এ চাইনিজ-জাপানী গান গাওয়া হচ্ছে। ম্যাও.. চ্যাও… কিচ্ছু বুঝি না। আমার সাথে একজন বাঙালী মহিলা ছিলেন, রাজিয়া আপা। ঐ মহিলা বললেন হাজেরা, ভালো লাগছে না। তুমি তাদেরকে একটা বাংলা গান শুনিয়ে দাও। আমি বললাম, আমার আমার গলায় তো এখন গান নাই। তিনি বললেন না, তোমাকে গান আনতেই হবে। তারপর উনিই গিয়ে আমার কথা বললেন। তারপর আমার নাম ঘোষণা করার পর আমি গিয়ে গান গাইলাম।

সেভেনটি টু-এর কথা। তখন গলা ছিল আরো অনেক সুন্দর। সেই অনুষ্ঠানে গলা ছেড়ে গান ধরলাম ‘পাখি কইও বন্ধুয়ার দেখা পাইলে…’। তারপর সবাই আমাকে নাইটিঙ্গেল উপাধি দিল। আরো একটা গানের অনুরোধ করলো আমি ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার’ এই গানটা গাইলাম। পরদিন ক্লাসে রোল কলের সময় টিয়ায় আমার রোল নম্বরে এসে বললেন, নাইটিঙ্গেল অব বাংলাদেশ।

ধান নিয়ে আমার আরেকটা স্মৃতি মনে পড়লো। বয়স তখন পাঁচ কি ভয় হবে। তখনও স্কুলে যাবার বয়ন হয়নি। আমরা থাকি ময়মনসিংহ। সে সময় ময়মনসিংহ স্কুলে পরিদর্শক এলেন। সেখানে উদ্বোধনী সংগীতের কোম ব্যবস্থা ছিল না। আমাকে বলা হলো একটি গান গাইতে। অত মানুষ দেখে আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সে সময় গেয়েছিলাম ‘হে মোর দেবতা প্রভু, মম চিত্ত মাঝে / প্রকাশিত হও মহিমার সাজে / আঘাতে আঘাতে কর মোরে মহিয়ান।’ এই গানটা শেষ করে যখন আমি দৌড়ে চলে যাচ্ছি, তখন পেছন থেকে আমাকে ডেকে আনে পুরস্কার দেয়া হলো। সেদিন দুটি বই আমি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছি, ‘ঈমানের জোর’ আর ‘নবী কাহিনী। আমার মনে আছে, এই দুইটা বই আমি স্কুলের অদূরে একটা গাছের নিচে বসে একটানা পড়ে শেষ করেছিলাম আজ বুঝি, খোদা আমাতে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছেন এবং আঘাতে আঘাতে আমাকে মহান করেছেন।

আপনার জীবনের অতৃপ্তি কী?

মা। জীবনে কোনো অতৃপ্তি নাই আমার। অতৃপ্তি একটাই, সেটা হলো সেভেনটি ওয়ান থেকে এ পর্যন্ত, আমার সেই ভালোবাসার মানুষটা থাকলো না। সে আমার অনেকখানি ছিল। সে আমার মা ছিল, সে আমার বাবা ছিল। যে আমার সন্তান ছিল, সে আমার বন্ধু ছিল। সে আমার সব ছিল।

আপনার ছেলে-মেয়ে সবাইকেই তো আপনি বড় করেছেন?

শুধু বড়ই না। আমি তাদেরকে স্টাবলিশড করেছি। আমি বিশ ঘণ্টা পরিশ্রম করেছি। সে সমস্ত দিনের ডায়েরিগুলো দেখলে তোমরা বুঝতে পারবে যে, আমি কতটা পরিশ্রম করেছি। টাইম মেইনটেইন করে কাজ করেছি। সকালে উঠে রান্না করে ঘর গুছিয়ে গাড়ী চালিয়ে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কলেজে যেতাম। কলেজের ক্লাস শেষ করে বোর্ড অফিসে গিয়ে টেবুলেশন, রিএক্সামিনেশন: এরই মধ্যে বাচ্চাদের স্কুল হতে বাসায় পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি কাজ করেছি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২০ ঘন্টা কাজ করেছি। এর মধ্যে গল্প লিখেছি, টিভি নাটক রচনা করেছি।

মুক্তিযুদ্ধের পরে বনানীর ঐ বাসায় আর যাননি?

বনানীতে তো আমাদের কোয়ার্টার ছিল। কিন্তু পরে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আমরা থাকতাম। ওখানেই আমাদের জায়গা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরে ওখানে এক দিন গিয়েছিলাম। সেখানে যখন আমি গেলাম, সেভেনটি ওয়ানের পর প্রায় নয় মাস পরে ওখানে যাওয়া হলো। গিয়ে দেখি বড় বড় ঘাস হয়ে আছে। আমার ঘরে তানপুরা ছিল, হারমোনিয়াম ছিল। গিয়ে দেখি তানপুরাটাতে ধুলা পড়ে আছে। সে সময় ঐ গানটা গাইলাম-‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’।

আজ তোমাদের কাছে একটা সত্যি কথা বলি। উপরে আল্লাহ মা’বুদ জানেন। যদিও হিন্দুরা এটা বিশ্বাস করে, আমরা করি না। আমি যখন ঢুকলাম গেট দিয়ে, মনে হলো একটা দমকা হাওয়া আমার উপর দিয়ে বয়ে চলে গেল। এক পাশ থেকে আরেক পাশে চলে গেছে সেই হাওয়া। একটা কামিনী গাছ ছিল। নজরুলের প্রিয় ফুল ছিল কামিনী ফুল। কামিনী গাছের নিচে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন। মনে হলো নয় কলই আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে চলে গেলো। তারপর ঘরে ঢুকে দেখি ঘরে সব পড়ে আছে। হারমোনিয়াম, তবলা, তানপুরা; সব কিছুতে ধুলা পড়ে আছে।

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে আমি বাইবো না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে গো

আপনি অনেকগুলো টিভি নাটক লিখেছেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার অনেকগুলো প্রচারিতও হয়েছে। আপনাদের সময়ে আপনারা কী রকম নাটক দেখতেন, কীভাবে আপনার নাটক লেখার ঝোঁক এলো?

আমাকে টিভির মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৬৮ সালে একটা গল্পের অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে গেলেন। ১৯৬৮ সালে।

আমাকে ডেকে বললেন হাজেরা নজরুল, আপনি আজকে একটা গল্প পড়বেন। আমি গেলাম। আমি সে দিন যে গল্পটা বললাম তার নাম ছিল আমি ও জিন্নাহ এভিনিউ। তখন তো জিন্নাহ এভিনিউ। এখন যার নাম বঙ্গবন্ধু এভিনিউ।

গল্পটা পড়ার পর রাজিয়া খান আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সুলেখিকা রাজিয়া খান ছিলেন তমিজউদ্দিন খাঁর মেয়ে। তিনি বললেন, আল্লাহ! তুই এত সুন্দর গল্প লিখেছিস হাজেরা? হেলেনা খান আমার টিচার ছিলেন। এক দিন আমি আর আমার স্বামী সিনেমা দেখে বের হচ্ছি, তখন হেলেনা খানের সাথে দেখা। হেলেনা খান আমাকে দেখে বললেন, তুমি এখন কী করো? আমি বললাম আপা, আমি তো আপনার মতো গল্প লিখি। তিনি বললেন, তাই না কি। তারপর বললেন কী নামে লেখো? আমি বললাম- হাজেরা নজরুল। তিনি অবাক হলেন, বললেন- তুমি সেই হাজেরা নজরুল। আরেকদিন বাংলা একাডেমিতে লেখিকাদের সমাবেশে আমি আমার পরিচয় দিয়েছি; কেউ বিশ্বাস করে না। এত ম্যাচিউর লেখা তোমার, তুমি এত ইয়াং। আমরা ভেবেছিলাম তুমি অনেক বয়স্ক হবে। নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন একবার বললেন, আপনি তো ভালো লেখেন, একটা নাটকের স্ক্রীপ্ট দেন।

‘শাড়ী, বাড়ি, গাড়ী’ নাম দিয়ে একটি নাটক দিলাম। নাটকটি উনারা পছন্দ করলেন কিন্তু নামটা বদলে দিয়ে ‘শাড়ী বাড়ী গয়না’ নামে ব্রডকাস্ট হলো। অভিনয় করেছিলেন, রহমানের স্ত্রী কুমকুম। ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে’ নাটকে প্রয়াত রাজু আহমেদ অভিনয় করেছিলেন। ‘পালাবদল’ নামক নাটকে রওশন জামিল, খায়রুল আলম সবুজ প্রমুখ অভিনয় করেছিলেন।

শৈশব থেকে আমি সব দেখে বড় হয়েছি। সোনার মতো মুঠো মুঠো আমি সুখ পেয়েছি। বাবার কাছে, মার কাছে, ভাই-বোনদের কাছে কার কাছে না? সবাই আমাকে ভালোবাসতো। খালাম্মারা ডেকে বলতেন-এই, তুমি একটা নাচ দেখাও তো। আমি সাথে সাথে নেচে দেখিয়েছি। কেউ একজন বলতেন- এই, তুমি তেঁতুলটা পেড়ে দাও তো। আমি তখন গাছের মাথায় উঠে তেঁতুল পেড়ে এনেছি। রবী ঠাকুরের দুরস্ত সব মেয়ের চরিত্র আমার মধ্যে ছিল।

হলে গিয়ে সিনেমা দেখতেন?

ওরে বাবা! সে তো একটা আয়োজন। আমাদের এক দাদু ছিলেন, সিনেমা হলের সাথে তার মোটামুটি যোগসূত্রতা ছিল। আমাদেরকে সিনেমায় নিয়ে যাবে, সেটা একটা ঘটনা। আব্বা-আম্মা সহ সবাই দল বেঁধে যেতাম। একটু বড় হবার পর কলেজ থেকে লুকিয়ে গিয়ে দেখার কোনো চান্স ছিল না। আনোয়ারা বাহার চৌধুরী বলতেন-যদি কোনো দিন শুনি তাহলে ঠ্যাং ভেঙে দেবো। মামা-চাচা কিংবা ভাবীদের সাথে গেলে আব্বাই পারমিশন দিতেন। ঐ সময় এক দিন আমার দাদু এসে বললেন, তোরা যদি কোনো দিন সিনেমা দেখতে চাস, তাহলে আমার কাছ থেকে পাশ নিয়ে যাবি। তিনি পাশ দিতেন আর আমরা রূপমহল হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। সদরঘাটে রূপমহল। তখন আশপাশের এ সব হল ছিল না। গুলিস্তানে হল হয়েছে ঘাটের পরে। সত্তরের কাছাকাছি সময়ে। তখন সিনেমা হলই ছিল মুকুল আর রূপমহল।

আপনাদের তখনকার নায়ক-নায়িকা কারা ছিল?

উত্তম-সুচিত্রা। বাংলাদেশের সিনেমা তো তখনও তৈরি হয়নি। হিন্দিতে ছিল অশোক কুমার, দিলীপ কুমার প্রমূখ।

তখন তো ভারত-পাকিস্তান আলাদা ছিল?

হ্যাঁ। কিন্তু তখন সিনেমা আসতো। ৬৫’র পরে ও পারের সিনেমা আসা বন্ধ হলো। তারপর ভিডিও টেপ চালু হলো, ঘরে ঘরে ক্যাসেট। ঘরে ঘরে ভিসিআর। এমন সিনেমা নাই যে, আমরা দেখিনাই।

আপনার প্রথম পেশা শুরু শিক্ষকতা দিয়ে…

আমার প্রথম পেশা শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয়নি। আমি এমএসসি পরীক্ষা যখন দিই, তখন আমার বিয়ে হয়েছিল।

আগেই বলেছি। বিয়ের পর শ্বশুড় বাড়িতে প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম। আমার শাশুড়ী আমাকে ভালোবাসতেন। দেবর, ননদ এদের সবার সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল। কিন্তু ওরা অত্যন্ত ব্যাকডেটেড ছিলো। আমার সব কিছুতে ইন্টারফেয়ার করতো।

শ্বশুড় বাড়ি বলতে শরীয়তপুরে?

আরে না। টিকাটুলিতে। সেখানে আমাকে ওরা খুব টিজ করতো। যেমন নজরুল আমাকে নোট লিখে দিতো।

আমি তো একা কুলোতে পারছি না। নজরুল হয়তো আমাকে একটু হেল্প করছে, তখন আমার মেজো ভাসুর আমি দিতেন- এই নজরুল, তুই কী করছিস? আমার ঘরে এসে আমার ঘরগুলো একটু সাফ করে দিয়ে যা।’ তখন নজরুল বলতো দাদা তুইও আয়, আমার সাথে হেল্প কর।

তারপর যখন নিয়ন হয়েছে-আমার বড় ছেলে আমি ওকে বলতাম, আমি বাচ্চাদের ময়লা কাঁথা ধুতে পারবো না। বাসায় তো কাজের লোক নাই। তখন যার যার কাজ সে করে। আমার আব্বার বাসায় তো চারটা কাজের লোক। নজরুল বলতো-তুমি চিন্তা করো না, কাঁথাগুলো নিয়ে ওখানে রেখে দাও, আমি পরে ধুয়ে দেব। কুয়া ছিল, কুয়া থেকে পানি তুলে নজরুল কাঁথাগুলো হয়তো ধুয়ে দিচ্ছে। আমি পাশে বসে আছি। কুয়াটা ছিল আমার ভাসুরের ঘরের সাথেই। তখন ভাশুর ডেকে বলতো ও নজরুল, আমার ঘরের কাপড়গুলো ল। নজরুল তখন বলতো হ ভাই, তুইও আয় আমার লগে হাত লাগা।

পরের বাচ্চাদেরটা আমি পরিষ্কার করেছি, তখন কাজের লোকও ছিলো। কিন্তু প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে একটু অশুচি লাগতো। পরের দিকে অবশ্য কাজের লোকও ছিল। কোনো অসুবিধা হয়নি।

বিয়ের পর নজরুল সাহেব আপনাকে কি কোন বিশেষ নামে ডাকতেন?

বিয়ের পরদিন সে বললো, ইসলাম অর্থ শান্তি। তুমিই আমার শান্তি। এ নামেই ডাকবো। চিঠিতে সে ‘জানে-মন’ সম্বোধন করতো। সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি বই হতে সংগৃহীত।

বলছিলেন শিক্ষকতা পেশার আসার কথা…।

এমএসসি পরীক্ষার আগেই নজরুল লন্ডন গেল। লজরুলের সাথে আমারও লন্ডন যাবার প্লান ছিল। আমি পিএইচডি করতে যাবো। আমার তো কলিজার মধ্যে এমন পরতে পরতে দুঃখ আছে। আমি নজরুলের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে ঘুরতাম। তখনও নজরুলের গাড়ি হয়নি। রমনা পার্কে বসতাম, এখানে বসতাম, ওখানে বসতাম। তখন আমাদের প্রেম আর কী…। তখনও থাকতাম বাপের বাড়িতে। এমএসসি পরীক্ষার সময় শ্বশুর বাড়িতে ছিলাম, তখন হঠাৎ আমার জ্বর হলো। নজরুল হলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতো, ডাবের পানি নিয়ে। এ সব নিয়েও অনেক টিটকারি শুনতে হয়েছে। নজরুল লন্ডন যাবে, আমি বললাম-চন্দন, আমি লন্ডন যাবো। পিএইচডি করবো। এটা আমার অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। ও বললো-আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আগে যাই। গিয়ে তোমার টিকিট পাঠিয়ে দেব। সে গিয়ে টিকিট পাঠিয়ে দিল। আমার ভাশুর বললো, বাপজান! পাগল হইছেন? ও আমাদেরকে এতখানি উঠাইয়া দিয়ে গেছে। এখন আমরা যদি ওকে বৌ নিয়া লন্ডন পাঠাই, ও তো বৌ নিয়া গেলে আর আইবো না। লন্ডনে ওরা থেকে যাবে। আমরা তো তাহলে মাটিতে বসে যাবো। এ কথাটা আমি কোনো দিন ভুলবো না। আমি এই ভরা সন্ধ্যায় বলছি, আমার পুরো ঘরে অনেক টেপ রেকর্ডার ছিল।

আমি যে কোনো কথা টেপ করতে পারতাম। তার এই কথাটাও টেপ করেছি। নজরুল বললো, বাদ দাও। ও তো এ রকমই। যাই হোক, নজরুল টিকিট পাঠালো, কিন্তু এরা আমাকে যেতে দিলো না। ওরা নজরুলকে লিখলো-নজরুল, আমরা বৌকে পাঠাতে পারবো না। নজরুলের কিছু চিঠি এখনও আমার কাছে আছে। বাকি সব হারিয়ে গেছে। ওদের চিঠি পেয়ে নজরুল লিখেছে-বৌ, তোমাকে ছেড়ে একা আমার পক্ষে লন্ডনে থাকা সম্ভব নয়। আমি চলে আসছি। তারপর চলে আসলো।

আসার পর তাকে নানা রকম কথা শোনালো। অপমান করলো। সে আর বলার মতো না। যাই হোক, সে আসার আগে লন্ডনে থাকাকালীন একবার ডাক্তার কুদরত-এ-খুদা লন্ডনে গিয়েছিলেন। সে সময় নজরুল তাঁকে পোলাও রান্না করে খাইয়েছে। আর বলেছিল স্যার, আমার বৌকে একটা চাকরি দিয়েন। তখন মাত্র আমি এমএসসি দিয়েছি। রেজাল্ট তখনও বের হয়নি। তো আমি সায়েন্স ল্যাবে গেলাম, দেখি কুদরত-এ-খুদা বিরাট চেয়ারের মধ্যে বসে আছেন। ওনার টেবিলটা বিশাল আকৃতির। উনিও ক্ষীণদেহী। অনেকটা জিন্নাহর মতো চেহারা। উনি আমাকে বললেন, বলো মা বলো। নজরুল আমাকে পোলাও রান্না করে খাইয়েছে। তোমাকে আমি কী সাহায্য করতে পারি? আমাকে বললেন, পাশ করেছো? আমি বললাম না, আমি পরীক্ষা দিয়ে এসেছি। তারপর উনি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি জয়েন করো। চলো, তোমাকে আমি তোমার রিসার্চ রুমটা দেখিয়ে দিয়ে আসি।

তিনি আমাকে রিসার্চ রুম দেখিয়ে বললেন, এখানে এগারোটা ছেলে আর তুমি একটা মেয়ে। সাবধানে থেকো। খুব সাবধানে আমাকে থাকা লাগেনি। ওরা তো আমারে ভয় পেতো। তাছাড়া কুদরত-এ-খুদা তখন সায়েন্স ল্যাবরেটরির মহাপরিচালক। তিনি প্রতি দিন আমাকে এসে দেখে যেতেন। আমি একমাত্র মেয়ে ওখানে, কী স্ক্যান্ডাল হয়। উনি আমাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন। আমি ওদেরকে হুকুম দিয়ে, ধমক দিয়ে, বকা দিয়ে শাসনের উপর রাখতাম। কোথায় আমার সোনার টুকরা স্বামী! আমি ঐ ছেলেদের প্রেমে পড়বো। ওরা অনেক সম্মান করতো আমাকে।

যে দিন আমার রেজাল্ট আউট হলো সে দিন ড. কুদরত-এ-খুদা আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দিলেন। ওখানে আমি ছিলাম দুই বছর। ওখানে আমি সাপের বিষ নিয়ে গবেষণা করতাম। মাছের বিভিন্ন রকম অ্যামাইনো এসিডের উপর গবেষণা করতাম। সকাল-সন্ধ্যা গবেষণা করতাম।

পরে নজরুল আসলো। আমি প্রেগন্যান্ট হলাম। বড় ছেলেটা তখন আমার গর্ভে। এ সময় আমার পিএইচডির অফার এলো। আমাকে পাঠাবে পিএইচডি করতে, সে সময় আমার ছেলেটা গর্ভে এলো। আমার চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়লো। এদিকে শ্বশুর বাড়িতে দেবর-ভাসুর-ননদদের নির্যাতন চরম আকার ধারণ করলো। তখন নজরুলই আমার জন্য ব্যবস্থা করলো। সে-ই আমাকে হোম ইকোনোমিক্স কলেজের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা এনে দিল। নজরুল বললো তুমি গিয়ে দেখা করো, ওখানে বায়োকেমিস্ট্রির একটা পোস্ট খালি আছে। তখন ওখানকার প্রিন্সিপাল ছিলেন সংগীত শিল্পী আহাদের বোন হামিদা খানম। ওখানে গিয়ে প্রিন্সিপালকে বলার পর তিনি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি জয়েন করো। তখন তো আর আজকের মতো চাকরি এত কঠিন ছিল না।

আমার মাধ্যমেই হোম ইকোনোমিক্স-এ বায়োকেমেস্ট্রি শুরু হলো। আমিই হলাম হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট। এর মধ্যেই টিভিতে নাটক জমা দিলাম। আবদুল্লাহ আল মামুন নিলেন। এবং হয়ে গেল। আতিকুল হক চৌধুরীও আমার নাটক নিয়েছিলেন। তিনি মারা যাবার আগেই আমার একটা নাটক স্কেচ করে গিয়েছিলেন। এরা যে আমাকে কী ভালোবাসতেন। এবং শুধু তাই না, এটাও নোট ডাউন করো-আলিমুজ্জামান ছিলেন বিটিভির মহাপরিচালক। এই আলিমুজ্জামান আমাকে চিঠি পাঠাতেন টিভিতে ড্রামার উপর আলোচনা করার জন্য। এত মূল্যায়ন ছিল আমার, যখন আমার বয়স মাত্র একুশ-বাইশ বছর।

অনেক নাটক প্রচারিত হয়েছে বিটিভিতে। আমার ‘চাতক’ নাটকে রাজু আহমেদ অভিনয় করেছেন। ‘পালাবদল’ পত্রিকায় আমার ধাত্রী নাটকের অনেক প্রশংসা করেছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। রওশন জামিল মারা যাবার পর ঐ নাটকটা পুনঃপ্রচার হয়েছিল বিটিভিতে। এক গ্রাম্য ধাই, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাচ্চা ডেলিভারি করে। এই যে অন্তর্বেদনা, এটা তো আমি একজন সাহিত্যিক হিসেবে বুঝেছি। এখানে রহিমের মা নামে এক মহিলা বাচ্চা ডেলিভারি করে বেড়াতো। আমরা জানতাম যে, ও এই কাজ করে বেড়ায়। সে জন্য ওকে দেখলে আমরা মিটিমিটি হাসতাম। দুষ্টুমি করতাম। আমার বিয়ের কয়েক মাস পরে তার সাথে দেখা, সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো কী গো, খবর আছে নি? আমি বললাম এই, তুমি আমার সাথে এই সব ব্যাপারে কথা বলবা না। মাইর খাবা। যা-ই হোক, নিয়নের জন্মের সময় আমি ওকেই খবর দিলাম। বললাম, ওকে ধরে আনো। আমি হাসপাতালে যাবো না। হাসপাতালে নাকি পেট কেটে দেয়, আমি যাবো না। যা-ই হোক, এই ঘটনাটাকেই আমি নাটকে লিখলাম। যখন আমি লিখেছি তখন রহিমের মা পৃথিবীতে নাই।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেলিভারি করাত সে। কোথাও সে আনন্দ পেতো, কোথাও বেদনা পেতো। এই নাটকটাকেই আমি টিভিতে দিলাম। এবং বিটিভি এটাকে ভিজুয়াল করে প্রচার করলো। অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ এ নাটকে অভিনয় করেছিল।

হোম ইকোনোমিক্স থেকে বদরুন্নেসায় কীভাবে এলেন?

হোম ইকোনোমিক্স-এ ছিলাম ৬৪ থেকে ৮৮ পর্যন্ত। ২৪ বছর। তখন আমার পদোন্নতি হয়েছে। তখন আমাকে প্রিন্সিপাল করে পাঠানো হলো বদরুন্নেসা কলেজে। ৮৮ থেকে ৯৪ পর্যন্ত ছিলাম বদরুন্নেসায়। বদরুন্নেসা থেকে গেলাম বাংলা কলেজে। ঐ কলেজে এখনও রক্তের দাগ আছে। ওখানে নাম করা কিছু গুপ্তা ছিল। ওরা গিয়ে জমিরউদ্দিন আমাকে বললেন, আপনি গিয়ে ঐ কলেজটাকে শৃঙ্খল করে দিয়ে আসেন। আমি গিয়ে ঐ হোস্টেলে ছেলেপিলেদের মারধর করতো। প্রায় একশো বিঘা জায়গার উপর ছিল বাংলা কলেজ। মন্ত্রী কলেজটাকে শৃঙ্খলার মধ্যে এনেছিলাম।

সেখান থেকে আমাকে পাঠানো হলো খুলনা মহিলা কলেজে। আসলে আমার স্বপ্ন ছিল আমি খুলনা যাবো স্টিমারে করে। চাঁদনী রাতে গান গাইতে গাইতে যাবো। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। খুলনায় গেলাম বাসে চড়ে। আমি তো ভয় পাই না। আমি বসলাম ফ্রন্ট সিটে। ইচ্ছে হলো আমি দেখি ড্রাইভার কীভাবে গাড়ি চালায়। আমি ড্রাইভারকে ডাইনে-বাঁয়ে সারাক্ষণ ডিরেকশন দিতে দিতে খুলনায় গিয়ে নামলাম। সেখানে ওরা ফুল ছিটিয়ে আমাকে বরণ করে নিল।

খুলনায় দু’বছর কাটালাম। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় আসলাম একটা ট্রেনিং-এ। ট্রেনিংটা হচ্ছিল নায়েম-এ। ট্রেনিং থেকে সবাই গেল চিটাগাং। চিটাগাং-এর কলেজগুলো পরিদর্শনের জন্য। তখন আমি বললাম, আপনারা যান চিটাগাং। আমি চিটাগাং যাচ্ছি না। কারণ চিটাগাং-এর কলেজগুলো আমার দেখা আছে। সবাই চট্টগ্রাম চলে গেল। আমি বাসায়। এ সময় বিএনপির মন্ত্রী আকবর আলীর স্ত্রী মোমেনা আমাকে ফোন করলেন। তিনি বললেন, আপা এখন বসে বসে হাসিনার সাথে চা খান। আমি বললাম, কেন? হাসিনার সাথে চা খাবো কেন? তিনি বললেন, আপনি দেখেননি আজকের ভোরের কাগজ? আমি বললাম, না। কী হয়েছে? তিনি বললেন, প্রথম পৃষ্ঠা দেখেন। তখন পত্রিকা খুলে দেখি যোগ্যতার ভিত্তিতে আমাকে জয়েন্ট সেক্রেটারি করা হয়েছে। অর্থাৎ শত শত প্রিন্সিপালের মধ্যে তিনজনকে জয়েন্ট সেক্রেটারি করা হয়েছে। সেই তিনজনের একজন আমি। আরেকজন ছিলেন জয়নব বেগম, খুব নাম করা এক মহিলা। চট্টগ্রাম তার বাড়ি। আর একজন হলেন মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বোন নিলুফার।

শোনো, আমার ভেতরে যত কাব্যময়তাই থাকুক না কেন, যতই সাহিত্য চিন্তা থাকুক, আমি মিটিং-এ একটা পারসোনালিটি নিয়ে বসে থাকতাম। কিন্তু নিলুফার বসে বসে ঝিমাতো। আমার পাশাপাশিই বসতো প্রায় সময়। তখন আমি বলতাম-এই নিলু আপা, মিটিং চলছে। ওঠো তো! কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবার ঝিমাতো। আল্লাহর রহমতে আমার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল এবং এই বার্ধক্যেও তেমনি আছে। আমার বোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে কালো দেখতে, কিন্তু আমার ছিল সবেচেয়ে বেশি হাই এনার্জি।

আপনি কালো ছিলেন?

কালো নয় তো কী? ফর্সা? কোনো মেকাপ করতাম না আমি।

আমাদের এই সময়ে যে সব আমলা লেখালেখি করে তাদেরকে অনেকে বাঁকা চেখে দেখে। অনেকেই মনে করেন গায়ের জোরে সাহিত্যিক হওয়ার চেষ্টা।

আমি এটা সমর্থন করি না। লেখক সব যুগেই ছিল। সব সময়ই ছিল। যার কীর্তির ও যে জেগে ওঠে, ফুটে উঠে সে-ই লেখক। যার লেখা মানুষকে বাঁচিয়ে তোলে, সমাজকে জাগিয়ে তোলে সে-ই লেখক।

আপনি তো কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা পাননি।

গিয়ে সম্মান নেব। না। আমি ঝাড়ু পুরস্কারও পাইনি। আমার পুরস্কারের দরকারও নাই। বাংলাদেশ না দিক সম্মান, আমি বেহেশতে বিশ্বসাহিত্যে কেন্দ্রের এক সেমিনারে আপনি বলেছিলেন, আমরা যেমন দেশ চেয়েছিলাম তেমন দেশ আজও পাইনি। এটা আমার বড় অতৃপ্তি।

কী রকম দেশ চেয়েছিলেন আপনি?

কঙ্ক্ষিত একটা দেশ থাকবে। কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। মানুষের মধ্যে এত অসমতা থাকবে না। এত অনটন থাকবে না। এত দারিদ্র্য তখন ছিল না। এখনকার মতো এত বৈষম্য তখন ছিল না।

আমরা তো শুনছি পাকিস্তানীরা অনেক নির্যাতন করতো।

নির্যাতন হাই লেভেলে হতে পারে। আমাদের লেভেলে আমরা নির্যাতন পাইনি। তখন অসমতা থাকলে তো আমি চাকরিই পেতাম না। আমার সাথে বিহারী মেয়েরা ছিল। তারাও আমাদের সাথে পড়তো। আমরা তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে পড়াশোনা করেছি, কখনো কোনো বাদাবাদির সৃষ্টি হয়নি। প্রতিপক্ষকে সংহার করে জায়গা দখলের এ ঘৃণ্য প্রতিযোগিতার অবসান হোক।

দ্রব্যমূল্য অনেক বেশি ছিল, চাল-ডালের দাম সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ছিল বেশি…।

আট আনা কেজি চাল ছিল। দু’টাকা কেজি সয়াবিন তেল খেয়েছি আমরা।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে পোস্টার ছিল, সেখানে ছিল পূর্ব পাকিস্তানে দ্রব্যমূল্য বেশি ছিল।

আমি এটা মানবো না। আল্লাহর রহমতে আমরা তখন অনেক ভালো ছিলাম। পাকিস্তানের বৈষম্যের শিকার কেউ হতে পারেন, যারা পেয়েছেন তারা বলেছেন। কিন্তু আমি কোনো বৈষম্য পাইনি। আমাদের কলেজে বিহারী মহিলারা ছিল, তারা চলে গেল পাকিস্তানে। নায়েব জাহান আলী ছিলেন আমাদের কলেজের টিচার। খুব ভালোবাসতেন আমাকে। আমি খারাপ পাইনি। কোনো খারাপ পাইনি। আমাদের কলিগ যারা অবাঙালী ছিলেন, তারাও কোনো দিন আমার সাথে খারাপ আচরণ করেনি। আমার হাজব্যান্ডও যুদ্ধের সময় বহু অবাঙালীকে বাঁচিয়েছেন। বহু হিন্দুকেও তিনি বাঁচিয়েছেন। তিনি মানুষ ছিলেন। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

আপনার স্বামী নজরুল সাহেব মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আপনিও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাংলাদেশের ব্লুপ্রিন্ট বের করে ২ নং সেক্টরে ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তো সে সময়কার কিছু স্মৃতি বলুন।

আমি তখন হোম ইকোনোমিক্স কলেজে। পহেলা মার্চ। নজরুল আমাকে বললো, আজ এক তারিখ। তুমি আজ অফিসে যেও না। বঙ্গবন্ধুর সাথে ভুট্টোর একটা মিটিং হবে আজ। আজ অফিস টফিস হবে না। দেশের অবস্থা ভালো না। চারদিকের অবস্থা খুব খারাপ। আমি তো এ সব বুঝি না। আমি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, মা, রাঁধুনী। আমি কি আর রাজনীতির এ সব কিছু বুঝি? আমি নজরুলকে খুব উত্তেজিত দেখলাম। ও তো পলিটিক্স করতো না। ওর উত্তেজনা দেখে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। আমি ওকে চন্দন বলে ডাকতাম। কেন ডাকতাম জানি না। বিয়ের পর থেকেই আমি তাকে এ নামে ডাকতাম। শ্বশুর বাড়িতে সবাই বলাবলি করতো কী কইয়া ডাকে গো? চন্দন কী? আমি বলতাম, চন্দন কাঠ হলো সবচেয়ে সুগন্ধী সুরভিত কাঠ। আমি তাকে সেই চন্দন কাঠের নামেই ডাকছি। একটা বলে তো ডাকতে হবে। হ্যাঁ, ওগো করে ডাকতে আমার ভালো লাগেনি। তো যাই হোক, আমি বললাম-চন্দন, তুমি এমন করছো কেন?

ছয়-ই মার্চ নজরুল আমাকে বললো, অবস্থা খুব একটা ভালো না। চলো, আমরা শান্তিনগর চলে যাই। তারপর আমরা শান্তিনগর চলে এলাম। এখানে আসার পর দিনই নজরুল বললো, আমি এখন যাবো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ টেপ করে নিয়ে আসবো। তো রেসকোর্স থেকে সে ভাষণ টেপ করে এনে এখানে পাঁচটা মাইক লাগিয়ে বাজাতে থাকলো। পাড়ার লোকেরা বললো, কী করছেন নজরুল সাহেব? আপনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করছেন। আপনাকে তো মেরে ফেলবে। নজরুল বললো, একবারই তো মরবো, দুইবার মরবো না।

তারপর আমরা আবার তেজগাঁও চলে গেলাম। ২৫শে মার্চ। ২৫শে মার্চের আগে কোনো গণহত্যা হয়নি। নজরুলের একই কথা, এভাবে ওরা ইন করছে, ওদের কিছু একটা করতে হবে। ২৫শে মার্চে আমার বোন আমাকে ফোন করলো, তুই আসবি না? চারদিকের অবস্থা তো খুব খারাপ। তুই চলে আয়। আমি নজরুলকে বললাম, কী গো যাবা না কি শান্তিনগর? নজরুল বললো, এখন বোধহয় আর যাওয়া যাবে না। সন্ধ্যা তখন সাতটা কি আটটা বাজে। আমার বোন আবার ফোন করে বললো-এই, তোরা এখন আর বের হবি না। আইজির গাড়িতে রেড ফ্লাগ নিয়ে পুলিশের গাড়ি ঘুরছে। ভয়ানক অবস্থা। রাজারবাগ উড়িয়ে দিয়েছে। এই যখন শুনলাম, আমি তো তখন কান্না শুরু করে দিলাম।

নজরুল তখন বললো, এভাবেই বসে থাকবো? পাশের বাড়ি থেকে তখন লোকজন ডাকাডাকি শুরু করলো। আমরা পেছনের একটা বাসায় গেলাম। সেই বাসায় আমরা সবাই গাদাগাদি করে বসে ছিলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ নজরুল সাহেব বের হোন। আপনার রোডের পাশে বাসা, আপনাকে মেরে ফেলবে। জলদি বের হন। তখন করে বসে আছি আমরা। আকাশে তখন আগুনের গোলা। আসলে ওরা ফায়ার করছিল সেই ফায়ারের গোলা আমরা সারা রাত দেখেছি।

সকালে দেখি, ঢাকা থেকে দল বেঁধে মানুষ যাচ্ছে। মানুষের স্রোেত। আমরা জিজ্ঞেস করি ভাই কী হইছে? ভাতা বলে, আমাদের ঢাকা ভিয়েতনাম হয়ে গেছে। পালাতে হবে আমাদের। আমরা আর কেউ বাঁচবো না।

নজরুলকে বললাম, কী করবা তুমি? ও বললো, পালাতে হবে। তো বাসা ছেড়ে আমরা বাড্ডা গেলাম। এক দিন ছিলাম ওখানে। তারপর আমার দেবর ওখানে গেল। আমার একটা জামদানী ছিল, এখনও আছে শাড়িটা। একটা ড্রামে আমাদের চাল-ডাল রেখে সেই জামদানি শাড়িটা দিয়ে ঢেকে রেখে আমরা চলে গেলাম আমার শ্বশুর বাড়ি। সেখানে গিয়ে আমার নিজের কানে শুনলাম আমি মেজর জিয়া বলছি, বঙ্গবন্ধু ভালো আছেন। আপনারা মনোবল হারাবেন না। তো ঢাকাতে আর টেকা যাচ্ছিল না। আগুনের গোলা ছুটছে। রাত হলে অন্ধকারে ঢুকে ঢুকে মেয়েদের রেপ করে যাচ্ছে। এ সব দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। আমার শ্বশুর বাড়িতে অনেক মেয়ে ছিল। সবাইকে নিয়ে আমরা রওনা হলাম। আমার যতটুকু মনে আছে, নজরুলই গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদেরকে পোস্তগোলার এ দিকে নামিয়ে দিল। আমি বললাম-চন্দন, তুমি যাবে না। বললো, আমি গাড়ি রেখে আসছি। আমার আর কদম চলে না। এক নাপিতের বাসায় আমরা বসলাম। তারপর নজরুল আসলো। আমরা আবার হেঁটে রওনা হলাম। রাস্তার পাশে পাশে মানুষ গুড়-মুড়ি-চিড়া-পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ অভূতপূর্ব দৃশ্য আমি কোনো দিন ভুলবো না।

যাই হোক, আমরা কাঠপট্টি গেলাম, সেখান থেকে চাঁদপুর, তালতলা। চাঁদপুর যাওয়ার পরে আমরা একটা বড় গয়নার নৌকা ভাড়া করলাম। আমরা ত্রিশ-চল্লিশজন মানুষ নৌকায় বসলাম। নজরুল করলো কী, আমার দেবর-ভাঙর সবাইকে নৌকার কিনারে কিনারে বৈঠা নিয়ে বসিয়ে দিল। আর নজরুল সামনে দাঁড়িয়ে ডিরেকশন দিতে থাকলো। মেঘনার মোহনায় এসে নিয়ন পানি খাইতে চাইলো। তখন নজরুল নদী থেকে পানি তুলে দিয়ে বললো, নদীর পানি পবিত্র। খাও।

যা-ই হোক, এভাবে আমরা শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে পৌছলাম। পুকুর ঘাটে গিয়ে সবাই গোসল করলো। আমরাও সাঁতার কাটলাম। সেখানে আমরা কয়েক দিন থাকলাম। নজরুল ওখানকার ছেলেদের সংঘবদ্ধ করে বললো, তোমরা তৈরি হয়ে যাও। তোমাদেরকে যুদ্ধে যেতে হবে। এদিকে ঢাকা থেকে খবর যাবার পর নজরুল ঢাকায় চলে এলো। ওরা পুকুরের পানি দিয়ে রান্নাবান্না করে। যে পুকুরের পানিতে কাপড়-চোপড় ধুচ্ছে, বাচ্চাদের নোংরা কাঁথা ধুচ্ছে, তারই এক পাশ থেকে পানি তুলে সেই পানি দিয়ে ভাত, ডাল, তরকারি রান্না করছে। এটা দেখার পর আমি বললাম, আমি এই খাবার খাবো না। আমার শাশুড়ী বললেন আচ্ছা, তুমি যেভাবে রান্না করতে চাও সেভাবেই করো। আমি কলের পানি দিয়ে রান্না করলাম। কিন্তু সেই তরকারি এত কালো হলো, জঘন্য। তখন আমাকে একজন পরামর্শ দিলো যে, সাজো পানি (টাটকা পানি) দিয়ে রান্না করলে হবে না, বাসি পানি দিয়ে রান্না করলে আর এমন হবে না। তারপর থেকে কলের বাসি পানি দিয়েই আমি রান্নাবান্না করতাম।

নজরুল যখন ঢাকায় চলে আসতে চাইলো তখন আমি বললাম, আমি একা এখানে থাকতে পারবো না। তুমি আমাকেও সাথে নিয়ে যাও। সে বললো- আচ্ছা, আমি আগে যাই, তারপর তোমাকেও নিয়ে যাবো। তো এক মাস পরে আমি ঢাকায় এলাম। টিকাটুলিতে আমার শ্বশুর বাড়িতে উঠলাম। এসে দেখি তাদের ক্রাক প্লাটুনের কাজকর্ম শুরু হয়ে গেছে। মায়া গ্রুপ, গাজী গ্রুপ এদের সবাইকে নিয়ে টেবিলের উপর উপুড় হয়ে ম্যাপ দেখাচ্ছে। পাঁচটা পাওয়ার স্টেশন নজরুলের নির্দেশনায় একই দিনে একই সময়ে (সন্ধ্যা ৮ টার দিকে) একই সাথে উড়িয়ে দিলো তারা।

এই ঘটনার আগ থেকে সে আমাদের সবাইকে টর্চ লাইট হারিকেন কেনার জন্য বলতে থাকলো বারবার। টিউবওয়েল কিনতে বলতো। আমরা বললাম, হারিকেন কেন? টিউবওয়েল কেন? সে বলে, বিদ্যুৎ থাকবে না মাসের পর মাস। পানি থাকবে না। মানে ওর প্লান ছিল সব ধ্বংস করে দেবে। পাঁচটা পাওয়ার স্টেশন ইনক্লুডিং সিদ্ধিরগঞ্জ উড়ে গেলে তো আর সহজে বিদ্যুৎ আসার কথা না।। সে দিন ঘরের মধ্যে সে পায়চারি করছে। রাত আটটা বাজে। আমি বাথরুমে যাচ্ছি। হঠাৎ দ্রুম। আমি দৌড়ে ঘরে গিয়ে বললাম চন্দন চন্দন, ওরা তো আবার কামান দাগছে। কিন্তু চন্দনের কোনো মনোযোগ নাই, সে পায়চারি করছে আর গুনছে। একটা, দুইটা… এভাবে চারটা ফাটার কিছুক্ষণ পর আর ফাটলো না। সে তাড়াতাড়ি জায়নামাজ চাইলো। জায়নামাজে বসে সে শোকরানা নামাজ পড়লো। তারপর সে আমাকে ছাদে নিয়ে গেল। নিয়ে গিয়ে বললো, দেখো সব অন্ধকার। আই অ্যাম সাকসেসফুল। বলেই আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললো, আমাকে এবার চলে যেতে হবে। তুমি ভয় পেয়ো না। আল্লাহ আছেন। আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না।

আমি তখন ওর বুকে মাথা রেখে কেঁদে বললাম, আমাকে রেখে তুমি যেও না। তখন আমাদের তিনটা বাচ্চা। তো সে বললো, তুমি-আমি তো বাচ্চাদের নিয়ে যেতে পারবো না। এটা সম্ভবও না। আমি কতভাবে কীভাবে যাব্যে আল্লাহ জানেন। তারপর সে চলে গেল। কিছু দিন অস্বাভাবিক হয়ে রইলাম। কোনো দিকে তাকাতে পারছি না।

আমার একটা প্রশ্ন দেশের প্রতি এত যে নিবেদিত আত্মদান নজরুলের, সে কি একটা রাষ্ট্রীয় সম্মান পেতে পারতো না? তার সন্তানেরা তবে গর্ব করতে পারতো, মাথা উচু করে চলতে পারতো। আগরতলা থেকে চিঠিতে সে লিখেছিল আমাকে তুমি দেশের জন্য উৎসর্গ করো। যদি আর দেখা না হয়, তোমার স্মৃতি নিয়েই আমি মরবো। যুদ্ধকালীন সময়ে নজরুলের তিনটা চিঠি পেয়েছিলাম। সেগুলোও হারিয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন হায়দার আলী, কর্নেল শওকত আলী, খালেদ মোশাররফ-এদের সাথে একই ক্যাম্পে থাকতো সে। সে চিঠিতে আমাকে সান্তনা দিতো, বলতো চিন্তা করো না, আল্লাহর রহমতে দেশ স্বাধীন হবে। তারপর এক দিন খবর পেলাম যে সে শাহাদাত বরণ করেছে। আমি বিশ্বাস করিনি। অজ্ঞান হয়ে গেলাম। শুনেছিলাম ও আহত হয়েছিল, এবং তারপর তাকে ভুল ইনজেশন দেয়া হয়েছিল। এত স্বাস্থ্যবান ও সুন্দর লোক ছিল সে। সেখান থেকে খালেদ মোশাররফরা তাকে কুমিল্লায় নিয়ে কবর দিয়েছে। সেই কবরের পাশে আমার জন্য একটা কবরের জায়গা রাখা আছে। কারো বৌয়ের কবর নাই, শুধু আমারই কবরের জায়গা আছে। ওর কবরে আমি একটা এফিটাফ লিখেছিলাম-

“হেথা এই শালদা নদীর তীরে ঘুমিয়ে আছো শেষ শান্তির নীড়ে দাড়াও পথিক, জানো কি তোমরা কেউ

লাখো শহীদের একজন আজিকে হয়েছে সেও

ধন দৈলত জায়া সন্তান বাঁধিতে পারেনি যারে

হে খোদা মহান, দিও গো শান্তি তারে।”

গল্প, নাটক, উপন্যাস লিখছেন। কোনটা লিখে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন?

এটা যদিও একটা গতানুগতিক প্রশ্ন, আমি চড়াই-উত্রাইয়ের মধ্যে কখনো গল্প, কখনও নাটক, কখনো উপন্যাস লিখেছি। আমি থেমে থাকিনি কখনো। হয়তো কখনো চট করে একটা গল্প এসে যায়। তখন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমার গল্পের রিভিউ আসতো। তখনকার দিনের পরিচিত সকল সাহিত্যিকই আমার লেখার প্রশংসা করেছিল। ড. মনিরুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান, কবি আল মাহমুদ থেকে শুরু করে প্রায় সবাই আমার লেখার প্রশংসা করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top