ডাকটিকিট: আসসালামু আলাইকুম
শরিফ ওসমান হাদি: ওয়ালাইকুম আসসালাম।
ডাকটিকিট: কেমন আছেন?
শরিফ ওসমান হাদি: আলহামদুলিল্লাহ।
ডাকটিকিট: ডাকটিকিট এর পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা।
শরিফ ওসমান হাদি: আপনাকেও।
ডাকটিকিট: প্রশ্নে চলে আসি। এই যে জুলাই বিপ্লবে রাজনৈতিক হাসিনার পতন হয়েছে; কালচারাল হাসিনার পতন কি হয়েছে?
শরিফ ওসমান হাদি: আসলে রাজনৈতিক হাসিনার পতনও প্রথম স্টেজে হয়েছে; অর্থাৎ আইকনিক পতন হয়েছে, কাঠামো এখনো ফ্যাসিস্টই আছে। দেশের পুলিশ আমলাতন্ত্র যে ওপর ছিল সেটার পরিবর্তন হয় নাই। গত ১০-১৫ বছরে যারা হাসিনার সহযোগী ছিল তারাই সামান্য ঘষামাজার পর ক্ষমতায় বহাল আছে। এখানে পূর্ণ বিপ্লব হতে হবে। আর কালচারাল ফ্যাসিজমের অবস্থা তো ভয়াবহ। ফ্যাসিবাদকে মননে মগজে গ্রহণযোগ্য করে— কালচারাল ফ্যাসিবাদ। মানুষ এ সম্পর্কে কম জানে। তারা মনে করে, নাচ-গানই সংস্কৃতি। কিন্তু আমি যে ভাত খাই সেটাও কালচার। ফ্যাসিজমকে তৈরি করে দেয় কে? পত্রিকা, নাটক, বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ডের মতো মাধ্যমগুলো; এরাই সকাল-সন্ধ্যা আমাদের কাছে ফ্যাসিবাদকে প্রেজেন্ট করে। ধরুন— প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে শতভাগ বিপ্লব সম্পন্ন করা গেল; তবুও যেটা বেশি জরুরী সেই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকে সরানো কি সহজ? অথচ সেটাই জরুরী। যেমন, অনেক হাসিনা-বিরোধী আছে যারা আজও মনে করে— হাসিনা খারাপ; কিন্তু মুজিব ভালো। অথবা দাড়ি-টুপি ওয়ালাদেরকে যতই মারা হোক সমস্যা নাই। এসব ন্যারেটিভ অনেক ইনভেস্ট ও সময় নিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। এটা কালচার দিয়ে হয়েছে। সুতরাং সাংস্কৃতিকভাবে ছাড়া এর মোকাবিলা করা যাবে না।
ডাকটিকিট: একটা কথা বলা হয় যে, ৫ আগস্টের পর ওইটা ভাঙ্গা বা ওইটা বন্ধ করা দরকার ছিল। বাংলাদেশের কাঠামো ও সক্ষমতা বিবেচনায় এই তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করে ফেলা কি আদৌ সম্ভব বা সঠিক হতো?
শরিফ ওসমান হাদি: কালচারাল পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। সময় লাগে। যদিও রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ করেই হতে পারে। কিন্তু কালচারাল পরিবর্তনে সময় লাগে। কালচারকে যেটা ক্যারি করে তার একটা পার্ট হল— নাটক, সিনেমা, উপন্যাস। আমরা কি চব্বিশের পর স্পর্শ করে যাওয়া উপন্যাস, নাটক, সিনেমা সৃষ্টি করতে পেরেছি? কোথাও সেভাবে জুলাইকে প্রদর্শন করতে পারি নাই। যদি না পারি তবে দীর্ঘ লড়াই টেনে নেওয়া কঠিন।
ডাকটিকিট: এখন তাহলে কি করা উচিত?
শরিফ ওসমান হাদি: একটা ন্যারেটিভ নির্মাণের চেষ্টা চলছে যে, এমনটা বুঝলে জুলাই করতাম না। অনেক বুদ্ধিজীবী তালিকা ধরে ইন্টেরিম সরকারের ব্যর্থতা ধরছে। অথচ গত ১৬ বছরে তারা কিছুই বলেনি। মাঝেমধ্যে কুসুম কুসুম সমালোচনা করে সরকারেরই পক্ষে থাকতো। কেউ বলছে না— যে রাষ্ট্র ১৬ বছরে শেষ করা হয়েছে, এক বছরে সেটা কতটা ঠিক করা যায়?
সরকারের ভুল আছে সেটা মানি, কিন্তু দেশের এই অবস্থায় যদি সমালোচকদেরকেও পদে বসাই তারাও পারবে না। গত ১৬ বছরে ভয়াবহ হত্যাই শুধু না; ব্যাংক এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ধংস করা হয়েছে, হাজার কোটি ডলার ঋণ রেখে গেছে। অর্থাৎ, একটা রাষ্ট্রের সব শেষ এমন একটা ব্যবস্থা দিয়ে কিভাবে কি করবেন? ৭১’র পরেও পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল না; যে পরিস্থিতি হাসিনা করে গেছে। রিজার্ভ ইতিহাসে এত কমে নাই। এর থেকে উত্তরনের উপায় দুইটা— কিছু মৌলিক সংস্কার আর সাংস্কৃতিক দীর্ঘ লড়াই লাগবে। এক কথায় প্রচুর যোগ্য লোক লাগবে যারা বুঝবে ও নেতৃত্ব দিতে পারবে।
ডাকটিকিট: এদেশে একটা চিরাচরিত নিয়ম লক্ষ করা যায় যে— লেখক সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা দেশের জন্য কাজ করে, রাষ্ট্র তাদের পাশে থাকে না। জনতামুখী আদর্শিক কালচারাল লড়াইয়ে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা কি না হলেই নয়?
শরিফ ওসমান হাদি: এখানে দুইটা ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাগবে। আবার এটাও সত্য যে, বিপ্লবের ইতিহাসে দেখা যায়- যেসকল কবি সাহিত্যিকগণ সংগ্রাম করেছেন, এস্টাব্লিশমেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; তাঁরা রাষ্ট্রের সাপোর্ট পানানি। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের সাপোর্ট পেলে কবি সাহিত্যিকদের জনবিচ্ছিন্নতা, অলসতা, অকর্মন্যতা আসে; এবং জনগণের বদলে রাষ্ট্রের কাছেই তারা দায়বদ্ধ থাকে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা লাগবে, তবে তার চেয়ে বেশি লাগবে জনতার সাপোর্ট ও সম্পৃক্ততা। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কিছু যোগ্য লোক আমাদের লাগবে। সততা আছে যোগ্যতা নাই, এমন হলে হবে না। ‘সততা এবং যোগ্যতা’ দুটোই লাগবে।
ডাকটিকিট: ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃবৃন্দকে আমরা জুলাই সংগ্রামেও দেখেছি, এখনও দেখছি। ইনকিলাব মঞ্চের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
শরিফ ওসমান হাদি: আমাদের মিশন পরিষ্কার। আমরা ইনসাফের বাংলাদেশ চাই। তবে সেটা একদিনের ব্যাপার না। চব্বিশ আমাদেরকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। একটা কল্যাণকর, মানবিক, পক্ষপাতহীন বাংলাদেশ গড়ার; যেখানে নারীরা সমান অধিকার পাবে, কোনো জুলুম থাকবে না। সেটা পেতে হলে দীর্ঘ লড়াই লাগবে। মানুষের মনস্তত্বকে ধাক্কা দিতে হবে। বোঝাতে হবে যে, শত্রুর সাথেও জুলুম কাম্য নয়। শত্রুও যদি মজলুম হয় তবে তার সাথে দাঁড়াতেই হবে। এই ব্যাপারটাই আমাদের মধ্যে কম। মানুষকে বোঝাতে হবে, আজ যে জুলুম শত্রুর ওপর হচ্ছে কাল তা আমার ওপরও হতে পারে।
ইনকিলাব মঞ্চ বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে চায়। কবে সফল হব জানি না, কিন্তু শুরু করতে হবে। মানুষের মনস্তত্ত্বকে জুলুমের বিপক্ষে দাঁড় করাতে চাই। বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটা ইয়ং ডেডিকেটেড প্রজন্ম লাগবে। আমরা শুরু করি। আল্লাহ চাইলে সফলতা আমরাও দেখে যেতে পারি। মোটকথা লড়াই করে যাওয়াই বিজয়। আমি বা আমার পরের প্রজন্মকে লড়াই চালিয়ে যেতেই হবে, যদিও প্রচণ্ড জুলুমের শিকার হতে হয় তবুও চালিয়ে যেতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত। ইনসাফের লড়াই চালিয়ে যাওয়াই বিজয়, জিতে যাওয়াই শুধু বিজয় নয়।
ডাকটিকিট: আমাদের কবি লেখকদেরকে কিছু বলতে চান?
শরিফ ওসমান হাদি: আমি বলবো— প্লিজ কেউ দরকারের জন্য কবি বা লেখক হবেন না। আপাত সুবিধা পাওয়া গেলেও না; বরং আপনি প্রতিষ্ঠান হয়ে যান। যেনো আপনি মরে গেলেও কাজ চালানো যায়। ধরুন— নজরুল; যেনো চব্বিশের জন্যই তাঁর জন্ম। এরকম কিছু কবি সাহিত্যিক আমাদের লাগবে।
ডাকটিকিট: আমরা জানি আপনি কবিতা ও গান লেখেন। এ সম্পর্কে কিছু বলেন।
শরিফ ওসমান হাদি: জুলাই আমাদেরকে অনেক দিয়েছে। তবে আমি যা হারিয়েছি তাহলো— কোনো কবিতা লিখতে পারি নাই। ন্যূনতম সময় পাই না। যদিও সময়ই আমাকে কবি বানিয়েছে। আমার লেখা কাব্যগ্রন্থ ২০২৩ এর বইমেলায় বেস্ট সেলার হয়েছে। এটা আমার জন্য আনন্দের। এমনিতেই মানুষ কবিতা পড়ে না, তারপরও বইমেলা চলাকালিন একাধিক সংস্করণ ছাপা হওয়া আমার জন্য আনন্দের। আমার বইয়ের প্রেমের কবিতাগুলোতেও গুম, খুন, সীমান্ত হত্যা, আগ্রসনের মতো বিষয়গুলো চলে আসায় অনেক বড় বড় প্রকাশনী বই ছাপাতে চায়নি। সে সময় রাজপথে নামতে পারিনি তাই কবিতা লিখেছি। এখন রাজপথে নামতে পারছি, কাজ করছি; এটাও তো একধরনের কবিতা। তবে লিখতে না পাড়ার বেদনা আছে। একটু গুছিয়ে নিয়ে আবার লিখতে চেষ্টা করব।
আসলে জুলাই এতো বড় ফ্যাসিজম যে, কোন জায়গা থেকে লিখব সেটাই চিন্তার বিষয়। কালও লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এতো রক্ত এতো গল্প; কোন দিক থেকে শুরু করব? মানসিক স্থিরতা হারিয়ে যায়, কিভাবে লিখব?
‘লাল জুলাই’ গানটা আন্দোলনের পটে লেখা ‘র্যাপ সং’ মাবরুর রশিদ বান্না ভাই ডিরেকশন দিয়েছে রাজ শান্তনু ভাই গেয়েছে; প্রচুর মানুষ শুনেছে এই গানটা। এই গানে কিছুই আরোপিত না। ইউটিউব জুলাইয়ের গানে ভরে যাওয়ার কথা, পারি নাই। আমাদের ব্যর্থতা। আমি একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। আমি আমার সব কাজকেই অ্যাক্টিভিজমে রূপান্তর করার চেষ্টা করি। আসলে প্রজ্ঞার সাথে চাইলে দুনিয়ার সব কাজকেই সে কানেক্ট করতে পারবে।
ডাকটিকিট: আগামী বইমেলায় আপনার কোনো বই কি আমরা দেখতে পাবো?
শরিফ ওসমান হাদি: আপাতত সুযোগ পাচ্ছি না। ইনশাআল্লাহ চেষ্টা থাকবে জুলাই নিয়ে কিছু লেখার। সেটা হোক স্মৃতিকথা বা অন্য কিছু। আবার কবিতায় ফেরার ইচ্ছা আছে। কবিতা একটা বড় অসুখের নাম আপনিও জানেন। কবিতা মাথায় চাপলে চারপাশ শূন্য লাগে, প্রসব যন্ত্রণার মতো। না লিখলে কোনো কাজ করা যায় না। স্ত্রী আধাঘন্টা কথা বললেও যেন কিছুই শুনি নাই। মাথায় তো কবিতা। তাই কালচারাল সেন্টারকে দাঁড় করাতে পারলে কবিতায় ফিরে আসবো। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার আশা করি নতুন বাংলাদেশের সংস্কৃতি নির্মাণে একটু হলেও অবদান রাখবে।
ডাকটিকিট: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
শরিফ ওসমান হাদি: আপনাকেও ধন্যবাদ।